ভগবদ্গীতা ৮.২ | অধিযজ্ঞ, দেহে ঈশ্বরের অবস্থান ও প্রয়াণকালে পরম সত্যের উপলব্ধি
অধিযজ্ঞঃ কথং কোহত্র দেহেহস্মিন্মধুসূদন।
প্রয়াণকালে চ কথং জ্ঞেয়োহসি নিয়তাত্মভিঃ।।২।।
অনুবাদঃ হে মধুসূদন! এই দেহে অধিযজ্ঞ কে, এবং এই দেহের মধ্যে তিনি কিরূপে অবস্থিত? মৃত্যুকালে জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তিরা কিভাবে তোমাকে জানতে পারেন?
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ের দ্বিতীয় শ্লোকটি মানুষের অস্তিত্বের এক অত্যন্ত গভীর আধ্যাত্মিক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে প্রশ্ন করছেন অধিযজ্ঞ কে, তিনি এই দেহের মধ্যে কীভাবে অবস্থান করেন এবং মৃত্যুর সময় সংযতচিত্ত মানুষ কীভাবে তাঁকে জানতে পারে। শ্লোকটি হলো অধিযজ্ঞঃ কথং কোহত্র দেহেস্মিন্ মধুসূদন। প্রয়াণকালে চ কথং জ্ঞেয়োऽসি নিয়তাত্মভিঃ। এই প্রশ্নের মধ্যে শুধু কোনো ধর্মতাত্ত্বিক ধারণার পরিচয় জানার আকাঙ্ক্ষা নেই। এর মধ্যে রয়েছে মানুষ, দেহ, কর্ম, যজ্ঞ, চেতনা, ঈশ্বর এবং মৃত্যুর পারস্পরিক সম্পর্ককে উপলব্ধি করার গভীর অনুসন্ধান।
অধিযজ্ঞ শব্দটি সংস্কৃত অধি এবং যজ্ঞ এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। অধি শব্দের মধ্যে উপর, আশ্রিত, সম্পর্কিত, অধিষ্ঠিত এবং নিয়ামক অর্থ নিহিত রয়েছে। যজ্ঞ শব্দটি যজ্ ধাতু থেকে উৎপন্ন। যজ্ ধাতুর অর্থ পূজা করা, উপাসনা করা, সম্মান করা, নিবেদন করা এবং পবিত্র উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য প্রদান করা। সেই দিক থেকে অধিযজ্ঞ বলতে যজ্ঞের অধিষ্ঠাতা, যজ্ঞের অন্তর্নিহিত নিয়ামক অথবা সমস্ত যজ্ঞের পরম আশ্রয়কে বোঝানো যায়। গীতার দার্শনিক পরিসরে যজ্ঞকে কেবল অগ্নিতে আহুতি দেওয়ার বাহ্যিক অনুষ্ঠান হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত অর্থ সম্পূর্ণভাবে ধরা যায় না। যজ্ঞের গভীর অর্থ হলো নিজের কর্ম, শক্তি, আকাঙ্ক্ষা এবং অহংকারকে বৃহত্তর সত্যের কাছে নিবেদন করা। সেই নিবেদনের পরম গ্রহীতা এবং চূড়ান্ত আশ্রয় হলেন অধিযজ্ঞ।
যজ্ঞের এই অন্তর্নিহিত অর্থ মানুষের সমগ্র জীবনকে একটি বৃহৎ যজ্ঞ হিসেবে দেখার সুযোগ দেয়। মানুষ প্রতিদিন নিজের সময়, শ্রম, জ্ঞান, ভালোবাসা এবং শক্তি কোনো না কোনো উদ্দেশ্যে নিবেদন করে। কেউ নিজের স্বার্থের জন্য কাজ করে, কেউ পরিবারের জন্য, কেউ সমাজের জন্য এবং কেউ সত্য ও ঈশ্বরের জন্য। বাহ্যিকভাবে কাজ একই রকম মনে হলেও তার অন্তর্নিহিত চেতনা ভিন্ন হতে পারে। যখন কর্মের কেন্দ্রে থাকে ব্যক্তিগত অহংকার এবং ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি, তখন কর্ম মানুষকে বন্ধনে আবদ্ধ করে। কিন্তু যখন কর্ম বৃহত্তর কল্যাণ এবং পরম সত্যের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়, তখন সেই কর্ম যজ্ঞের রূপ ধারণ করে। এই অর্থে অধিযজ্ঞ হলেন সেই পরম চেতনা যাঁকে কেন্দ্র করে মানুষের কর্ম পবিত্রতা লাভ করে।
অর্জুনের প্রশ্নে কথং শব্দটির ব্যবহারও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কথং অর্থ কীভাবে। অর্জুন শুধু জানতে চাননি অধিযজ্ঞ কে। তিনি জানতে চাইছেন তিনি কীভাবে এই দেহের মধ্যে অবস্থান করেন। অর্থাৎ তিনি নাম বা সংজ্ঞার চেয়ে গভীরতর সত্য জানতে আগ্রহী। কোনো একটি তত্ত্ব সম্পর্কে তথ্য জানা এবং সেই তত্ত্বকে নিজের অস্তিত্বের মধ্যে উপলব্ধি করা এক বিষয় নয়। গীতার আধ্যাত্মিক শিক্ষা মূলত দ্বিতীয়টির দিকে মানুষকে নিয়ে যায়। ঈশ্বর কোথায় আছেন এই প্রশ্নের পাশাপাশি তিনি কীভাবে আমাদের জীবনের মধ্যে উপস্থিত আছেন সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কোহত্র শব্দটি কঃ এবং অত্র এর সন্ধিরূপ। কঃ অর্থ কে এবং অত্র অর্থ এখানে। অর্থাৎ কোহত্র অর্থ কে এখানে। এই এখানে শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অর্জুন ঈশ্বরকে কেবল দূরবর্তী কোনো অতীন্দ্রিয় সত্তা হিসেবে জানতে চাইছেন না। তিনি জানতে চাইছেন এই দেহের মধ্যে সেই পরম সত্যের অবস্থান কীভাবে বোঝা যায়। দেহ মানুষের কাছে সাধারণত শরীরের পরিচয় বহন করে। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে দেহ শুধু মাংস, রক্ত, অস্থি এবং ইন্দ্রিয়ের সমষ্টি নয়। দেহ হলো অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র, কর্মের ক্ষেত্র এবং আত্মসন্ধানের ক্ষেত্র। এই দেহের মধ্যেই মানুষ সুখ ও দুঃখ অনুভব করে, জ্ঞান অর্জন করে, কর্ম সম্পাদন করে, আসক্ত হয়, আবার মুক্তির পথও অনুসন্ধান করে।
মধুসূদন শব্দটিও এই প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মধুসূদন শব্দের আক্ষরিক অর্থ মধু নামক অসুরের বিনাশকারী। কিন্তু আধ্যাত্মিক প্রতীকের দিক থেকে মধু মানুষের অন্তরের অজ্ঞানতা, আসক্তি, অহংকার এবং অশুভ প্রবৃত্তির প্রতীক হিসেবেও ভাবা যায়। মধুসূদন তখন সেই পরম চেতনার প্রতীক যিনি মানুষের অন্তরের অন্ধকারকে দূর করেন। অর্জুন যখন জানতে চাইছেন মৃত্যুর সময় কীভাবে পরম সত্যকে জানা যায়, তখন মধুসূদন সম্বোধনের মধ্যেও একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে। যে শক্তি অজ্ঞতার বিনাশ করতে পারে, সেই শক্তিই মানুষের মৃত্যুভয়, বিভ্রান্তি এবং আত্মপরিচয়ের সংকট দূর করতে পারে।
প্রয়াণকালে শব্দটি শ্লোকটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রয়াণ অর্থ গমন, যাত্রা বা প্রস্থান এবং প্রয়াণকাল অর্থ প্রস্থানের সময়। গীতার প্রসঙ্গে এর অর্থ বিশেষভাবে দেহত্যাগের সময় বা মৃত্যুকাল। তবে ভারতীয় দর্শনে মৃত্যু কেবল অস্তিত্বের সম্পূর্ণ সমাপ্তি নয়। এটি এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় গমন হিসেবেও বিবেচিত হয়। দেহের পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু আত্মাকে নিত্য বলে দেখা হয়। তাই প্রয়াণকাল এমন একটি সীমান্ত মুহূর্ত যখন মানুষের বাহ্যিক পরিচয় ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে আসে এবং তার অন্তরের গভীরতম সংস্কার, আকাঙ্ক্ষা ও চেতনার প্রকৃতি প্রকাশিত হয়।
জ্ঞেয়োऽসি শব্দের মধ্যেও গভীর অর্থ রয়েছে। জ্ঞেয় শব্দটি জ্ঞা ধাতু থেকে উৎপন্ন। জ্ঞা অর্থ জানা, উপলব্ধি করা বা জ্ঞান লাভ করা। জ্ঞেয় অর্থ যাকে জানা উচিত অথবা যাকে জ্ঞান দ্বারা উপলব্ধি করা যায়। অসি অর্থ তুমি আছ। ফলে জ্ঞেয়োऽসি বলতে বোঝায় তুমি কীভাবে জ্ঞাতব্য বা উপলব্ধিযোগ্য। এখানে ঈশ্বরকে শুধু বিশ্বাসের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। তাঁকে জ্ঞানের বিষয় হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এই জ্ঞান সাধারণ তথ্যগত জ্ঞান নয়। এটি আত্মিক উপলব্ধির জ্ঞান, যেখানে জ্ঞাতা এবং জ্ঞেয়ের সম্পর্ক গভীরভাবে পরিবর্তিত হয়।
নিয়তাত্মভিঃ শব্দটি শ্লোকটির সাধনামূলক দিকটি স্পষ্ট করে। নিয়ত অর্থ সংযত, নিয়ন্ত্রিত, শৃঙ্খলিত এবং স্থির। আত্মা শব্দটি এখানে অন্তঃকরণ, মন বা ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সত্তার অর্থেও ব্যাখ্যা করা যায়। নিয়তাত্মা বলতে তাই এমন ব্যক্তিকে বোঝায় যার মন ও অন্তঃকরণ সংযত এবং ঈশ্বরস্মরণে স্থির। এই শব্দটি একটি গভীর শিক্ষা দেয়। মৃত্যুর মুহূর্তে ঈশ্বরকে স্মরণ করা কেবল শেষ মুহূর্তের কোনো আকস্মিক মানসিক প্রচেষ্টা নয়। এর জন্য সমগ্র জীবনের সাধনা, আত্মসংযম এবং চিত্তের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
মানুষ সারাজীবন যে চিন্তা করে, যে আকাঙ্ক্ষাকে লালন করে এবং যে অভ্যাসের মধ্যে নিজেকে গড়ে তোলে, তার গভীর ছাপ চেতনার মধ্যে জমা হয়। সংকটের মুহূর্তে সেই গভীর সংস্কারই স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায়। একজন মানুষ যদি সারাজীবন কেবল সম্পদ, ক্ষমতা, ভোগ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের চিন্তায় নিমগ্ন থাকে, তাহলে মৃত্যুর সময় তার চেতনা হঠাৎ সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে চলে যাবে এমন আশা করা কঠিন। আবার যে ব্যক্তি প্রতিদিন ঈশ্বরকে স্মরণ করে, নিজের কর্মকে নিবেদন করে, মনকে সংযত করে এবং সত্যের প্রতি নিজেকে সমর্পণ করে, তার কাছে ঈশ্বরস্মরণ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক মানসিক প্রবণতায় পরিণত হয়। এই কারণেই নিয়তাত্মা হওয়া গীতার সাধনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দার্শনিকভাবে অধিযজ্ঞ ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে আত্মসমর্পণ। মানুষের বন্ধনের একটি প্রধান কারণ হলো আমি এবং আমার এই অহংকেন্দ্রিক ধারণা। মানুষ মনে করে আমি কাজ করছি, আমি অর্জন করছি, ফল আমার এবং সবকিছুর উপর আমার অধিকার রয়েছে। যজ্ঞের ধারণা এই অহংকেন্দ্রিকতাকে পরিবর্তন করে। কর্ম তখন ব্যক্তিগত ভোগের মাধ্যম না হয়ে নিবেদনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। নিজের কর্মকে পরম সত্যের কাছে নিবেদন করার মধ্য দিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে কর্মের ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি থেকে মুক্ত হতে পারে।
বেদান্তের দৃষ্টিতে এই ধারণা আরও গভীর। পরম সত্য ব্রহ্ম সর্বব্যাপী চৈতন্য এবং জীবের অন্তর্নিহিত সত্যও সেই চৈতন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিভিন্ন বেদান্তীয় মত এই সম্পর্ককে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। কোথাও জীব ও ব্রহ্মের অভিন্নতার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কোথাও ঈশ্বর ও জীবের বিশেষ সম্পর্কের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সব ধারার মধ্যেই ঈশ্বরকে মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনের চূড়ান্ত আশ্রয় হিসেবে উপলব্ধি করার একটি শক্তিশালী প্রবণতা রয়েছে। অধিযজ্ঞ সেই উপলব্ধিকে কর্ম, দেহ এবং আত্মসমর্পণের সঙ্গে যুক্ত করে।
কর্মযোগের সঙ্গেও অধিযজ্ঞের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কর্মযোগ কর্ম থেকে পালিয়ে যেতে শেখায় না। বরং কর্মের মধ্যে থেকেই কর্মকে পবিত্র করতে শেখায়। একজন শিক্ষক যদি নিজের শিক্ষাদানকে কেবল জীবিকা হিসেবে না দেখে জ্ঞানসেবারূপে গ্রহণ করেন, একজন চিকিৎসক যদি চিকিৎসাকে মানবসেবারূপে গ্রহণ করেন এবং একজন সাধারণ মানুষ যদি নিজের দৈনন্দিন কর্তব্যকে ঈশ্বরার্পণ হিসেবে পালন করেন, তাহলে তার কর্ম যজ্ঞের রূপ ধারণ করতে পারে। তখন কর্ম মানুষের বন্ধনের কারণ না হয়ে আত্মশুদ্ধির উপায় হয়ে ওঠে।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। দেহ এখানে জীবনের ক্ষেত্রের প্রতীক। যজ্ঞ আত্মসমর্পণের প্রতীক। অধিযজ্ঞ পরম চেতনার প্রতীক। প্রয়াণ জীবনের এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় গমনের প্রতীক। নিয়তাত্মা আত্মসংযমের প্রতীক। আর মধুসূদন অজ্ঞানতা ও অন্তরের অশুভ প্রবৃত্তির বিনাশের প্রতীক। এই দৃষ্টিতে পুরো শ্লোকটিকে মানুষের অন্তর্জীবনের একটি আধ্যাত্মিক মানচিত্র হিসেবে দেখা যায়। মানুষ নিজের দেহের মধ্যে বাস করে, কর্মের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করে, আসক্তির মাধ্যমে বন্ধনে পড়ে, আত্মসংযমের মাধ্যমে অন্তরকে শুদ্ধ করে এবং শেষ পর্যন্ত পরম সত্যের দিকে অগ্রসর হয়।
বাস্তব জীবনের একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। কোনো ছাত্র যদি সারা বছর পড়াশোনা না করে পরীক্ষার আগের রাতে সবকিছু মুখস্থ করতে চায়, তাহলে তার প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু যে ছাত্র প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়ে, তার কাছে পরীক্ষার সময় নতুন কিছু শুরু করতে হয় না। একইভাবে মৃত্যুর মুহূর্তে ঈশ্বরস্মরণও সারাজীবনের সাধনার ফল। জীবনভর চেতনা যে দিকে প্রবাহিত হয়েছে, মৃত্যুর সময় সেই প্রবাহকে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া সহজ নয়। তাই গীতার শিক্ষা হলো জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে ঈশ্বরস্মরণ এবং আত্মশুদ্ধির প্রস্তুতি হিসেবে গ্রহণ করা।
এই শ্লোক মানুষের কাছে মৃত্যুর একটি নতুন অর্থও উন্মোচন করে। মৃত্যু তখন শুধু ভয়ের বিষয় নয়। এটি আত্মপরিচয়ের গভীরতম পরীক্ষার মুহূর্ত। জীবনের সমস্ত বাহ্যিক পরিচয়, সম্পদ, ক্ষমতা, সম্পর্ক এবং অর্জন এক সময় পিছনে পড়ে যায়। তখন মানুষের সঙ্গে থাকে তার চেতনা, সংস্কার এবং অন্তরের সত্য। এই কারণেই গীতার দৃষ্টিতে মৃত্যুর প্রস্তুতি আসলে জীবনের প্রস্তুতি। যে সত্যিকার অর্থে ভালোভাবে বাঁচতে শেখে, সে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার জন্যও প্রস্তুত হতে থাকে।
সবশেষে বলা যায়, অধিযজ্ঞঃ কথং কোহত্র দেহেস্মিন্ মধুসূদন এই প্রশ্নের মধ্যে মানুষের সমগ্র আধ্যাত্মিক যাত্রার একটি গভীর সংকেত রয়েছে। অধিযজ্ঞ আমাদের শেখায় যে জীবনের সমস্ত পবিত্র কর্মের একটি পরম কেন্দ্র আছে। দেহেস্মিন্ আমাদের নিজের অন্তর্জগতে ফিরে তাকাতে শেখায়। কথং আমাদের শুধু সত্যের পরিচয় নয়, সেই সত্যকে কীভাবে উপলব্ধি করা যায় তা জানতে উদ্বুদ্ধ করে। প্রয়াণকালে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবনের শেষ মুহূর্তও জীবনেরই অংশ এবং জ্ঞেয়োऽসি আমাদের জানায় যে পরম সত্য কেবল বিশ্বাসের বিষয় নয়, উপলব্ধির বিষয়। নিয়তাত্মভিঃ আমাদের শেখায় যে সেই উপলব্ধির জন্য চিত্তকে সংযত ও প্রস্তুত করতে হয়। আর মধুসূদন আমাদের মনে করিয়ে দেন যে অজ্ঞতা, অহংকার ও অন্তরের অন্ধকারকে জয় করেই সত্যের দিকে অগ্রসর হতে হয়। এইভাবে শ্লোকটি শুধু মৃত্যুকালের ঈশ্বরস্মরণের শিক্ষা নয়, বরং সমগ্র জীবনকে এক পবিত্র যজ্ঞে পরিণত করার আহ্বান। মানুষ যখন নিজের কর্মকে নিবেদন করতে শেখে, মনকে সংযত করতে শেখে এবং নিজের অন্তরে পরম চেতনার উপস্থিতি অনুভব করতে শেখে, তখন জীবন ও মৃত্যু উভয়ই তার কাছে পরম সত্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার দুটি পরস্পরসম্পর্কিত অধ্যায় হয়ে ওঠে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!