ভগবদ্গীতা ৮.২০ | অব্যক্তের অতীত সনাতন পরম সত্য ও অবিনশ্বর সত্তার তত্ত্ব
পরস্তস্মাত্তু ভাবোহন্যোহব্যক্তোহব্যক্তাৎ সনাতনঃ।
যঃ স সর্বেষু ভুতেষু নশ্যৎসু ন বিনশ্যতি।।২০।।
অনুবাদঃ কিন্তু আর একটি অব্যক্ত প্রকৃতি রয়েছে, যা নিত্য এবং ব্যক্ত ও অব্যক্ত বস্তুর অতীত। সমস্ত ভূত বিনষ্ট হলেও তা বিনষ্ট হয় না।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ের বিংশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানব অস্তিত্ব, জগতের সৃষ্টি ও বিনাশ এবং পরম সত্যের প্রকৃতি সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক সত্য প্রকাশ করেছেন। শ্লোকটি হলো “পরস্তস্মাত্তু ভাবোহন্যোহব্যক্তোহব্যক্তাৎ সনাতনঃ। যঃ স সর্বেষু ভূতেষু নশ্যৎসু ন বিনশ্যতি।” এর সহজ অর্থ হলো, সেই অব্যক্ত প্রকৃতিরও অতীত আরেক অব্যক্ত ও সনাতন সত্তা রয়েছে, যা সমস্ত জীব ও সৃষ্টির বিনাশ হলেও বিনষ্ট হয় না। এই বক্তব্যের মধ্যে ভারতীয় দর্শনের অন্যতম মৌলিক প্রশ্ন নিহিত রয়েছে। যা কিছু আমরা দেখি তা কি অস্তিত্বের সম্পূর্ণ সত্য, নাকি দৃশ্যমান পরিবর্তনশীল জগতের অন্তরালে এমন কোনো নিত্য বাস্তবতা রয়েছে যা কখনো পরিবর্তিত বা বিনষ্ট হয় না।
এই শ্লোকের গভীরে প্রবেশ করতে হলে প্রথমে “পরস্তস্মাত্তু” শব্দটির দিকে তাকাতে হয়। “পর” শব্দের অর্থ হলো অতীত, ঊর্ধ্বতর, শ্রেষ্ঠ অথবা কোনো কিছুর সীমা অতিক্রমকারী। “তস্মাৎ” অর্থ তার থেকে বা তার তুলনায় এবং “তু” অর্থ কিন্তু বা তবে। এই তিনটি অংশ একত্রে এমন একটি অর্থ প্রকাশ করে যে, পূর্বে যে অব্যক্ত স্তরের কথা বলা হয়েছে, সেটিই অস্তিত্বের শেষ সীমা নয়। তারও অতীতে একটি উচ্চতর বাস্তবতা রয়েছে। অর্থাৎ কৃষ্ণ মানুষের চিন্তাকে ধাপে ধাপে দৃশ্যমান জগত থেকে অদৃশ্য জগতের দিকে এবং অদৃশ্য জগত থেকেও আরও গভীর এক পরম সত্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।
এরপর এসেছে “ভাবোহন্যঃ”। “ভাব” শব্দটির উৎস সংস্কৃত √ভূ ধাতু থেকে, যার মূল অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা বিদ্যমান হওয়া। এই ধাতু থেকেই ভাব, ভব, ভূত প্রভৃতি শব্দের উৎপত্তি। তাই এখানে “ভাব” কেবল কোনো বস্তু বা জিনিসকে বোঝায় না। এটি অস্তিত্ব, সত্তা কিংবা বাস্তবতার ধারণা বহন করে। “অন্য” শব্দটি বোঝায় ভিন্ন বা পৃথক। ফলে “ভাবোহন্যঃ” বলতে এমন এক ভিন্ন অস্তিত্ব বা সত্তার কথা বলা হচ্ছে যা পূর্বে আলোচিত স্তরের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। এই শব্দের মাধ্যমে কৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে মানুষের পরিচিত প্রকাশিত জগতের পেছনে যে অপ্রকাশিত কারণগত স্তর রয়েছে, তারও অতীত একটি স্বতন্ত্র ও উচ্চতর অস্তিত্ব আছে।
“অব্যক্ত” শব্দটি এই শ্লোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। “অব্যক্ত” গঠিত হয়েছে “অ” এবং “ব্যক্ত” থেকে। ব্যক্ত অর্থ প্রকাশিত, দৃশ্যমান, স্পষ্ট বা অভিব্যক্ত। তার আগে “অ” যুক্ত হওয়ায় অর্থ দাঁড়ায় যা প্রকাশিত নয়, যা ইন্দ্রিয়ের সামনে সরাসরি ধরা পড়ে না। তবে গীতার অব্যক্ত ধারণাকে শুধু চোখে দেখা যায় না এমন কোনো বস্তু হিসেবে বোঝা যথেষ্ট নয়। এখানে অব্যক্ত এমন একটি সূক্ষ্ম অস্তিত্ব বা কারণগত অবস্থাকে নির্দেশ করতে পারে, যেখান থেকে প্রকাশিত জগতের উদ্ভব ঘটে এবং যেখানে প্রকাশিত জগত আবার লীন হয়। তাই ব্যক্ত হলো প্রকাশ, অব্যক্ত হলো অপ্রকাশিত সম্ভাবনা বা কারণগত স্তর।
কিন্তু এই শ্লোকের সবচেয়ে বিস্ময়কর বক্তব্য হলো “অব্যক্তোহব্যক্তাৎ”। অর্থাৎ অব্যক্তেরও অতীত আরেক অব্যক্ত। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি বিরোধাভাসের মতো মনে হয়। যদি অব্যক্তই প্রকাশের অতীত হয়, তবে তারও অতীত আবার কীভাবে অব্যক্ত হতে পারে। এই প্রশ্নের মধ্যেই শ্লোকটির দার্শনিক গভীরতা নিহিত। এখানে প্রথম অব্যক্তকে পরিবর্তনশীল সৃষ্টির অপ্রকাশিত কারণগত স্তর হিসেবে এবং পরবর্তী অব্যক্তকে সেই কারণগত স্তরেরও অতীত পরম বাস্তবতা হিসেবে উপলব্ধি করা যায়। অর্থাৎ যা প্রকাশিত তার বাইরে একটি অপ্রকাশিত স্তর রয়েছে এবং সেই অপ্রকাশিত স্তরও চূড়ান্ত সত্য নয়। তারও অতীতে এমন এক বাস্তবতা রয়েছে যা সাধারণ প্রকাশ ও অপ্রকাশের দ্বৈততার দ্বারা আবদ্ধ নয়।
এই পরম সত্তাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে “সনাতন” শব্দটি। সনাতন অর্থ চিরন্তন, নিত্য, অনাদি এবং অবিনশ্বর। সনাতন শব্দের অর্থ কেবল বহু পুরোনো নয়। কোনো বস্তু হাজার বছর পুরোনো হতে পারে, কিন্তু তাই বলে তা সনাতন হয় না। সনাতন হলো এমন যা সময়ের দ্বারা সৃষ্টি হয়নি এবং সময়ের পরিবর্তনের দ্বারা যার অস্তিত্ব শেষ হয় না। এখানে সনাতন শব্দটি সেই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে যা সৃষ্টি, পরিবর্তন এবং বিনাশের সাধারণ নিয়মের অধীন নয়। মানুষের জীবনে যা কিছু আমরা দেখি তার প্রায় সবকিছুরই একটি শুরু আছে, একটি পরিবর্তনের ধারা আছে এবং একসময় একটি সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু কৃষ্ণ এমন এক অস্তিত্বের কথা বলছেন যার ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
শ্লোকের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে “যঃ স সর্বেষু ভূতেষু নশ্যৎসু ন বিনশ্যতি”। এখানে “যঃ” অর্থ যে বা যিনি এবং “সঃ” অর্থ সেই। অর্থাৎ পূর্বে যে সনাতন অব্যক্ত সত্তার কথা বলা হয়েছে, এখন তার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করা হচ্ছে। “সর্বেষু ভূতেষু” অর্থ সমস্ত জীব বা সৃষ্ট সত্তার মধ্যে। “ভূত” শব্দটিও √ভূ ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ যা হয়েছে, যা অস্তিত্ব লাভ করেছে অথবা সৃষ্ট সত্তা। ফলে সমস্ত ভূত বলতে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জীব ও অস্তিত্বমান সত্তাগুলিকে বোঝানো যায়।
“নশ্যৎসু” শব্দটি এসেছে √নশ্ ধাতু থেকে, যার অর্থ বিনষ্ট হওয়া, ধ্বংস হওয়া বা অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। এখানে একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। শ্লোকটি শুধু বলে না যে সমস্ত সত্তা ধ্বংস হয়ে যায়। বরং এমন একটি অবস্থার কথা বলে যখন সমস্ত সত্তা ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হয়। এর মধ্য দিয়ে জগতকে একটি চলমান পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া হিসেবে দেখানো হয়েছে। জন্ম, বৃদ্ধি, পরিবর্তন, ক্ষয় এবং বিনাশ প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যেও এমন একটি সত্তা রয়েছে যা “ন বিনশ্যতি”, অর্থাৎ বিনষ্ট হয় না।
এই বক্তব্যকে মানবজীবনের সঙ্গে যুক্ত করলে এর গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। মানুষের শরীর জন্মের পর ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। শৈশবের শরীর, যৌবনের শরীর এবং বার্ধক্যের শরীর এক নয়। মানুষের চিন্তা বদলে যায়, অনুভূতি বদলে যায়, স্মৃতি বদলে যায় এবং ব্যক্তিত্বও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। তবু মানুষ নিজের মধ্যে একটি ধারাবাহিক অস্তিত্বের অনুভূতি অনুভব করে। সে বলে, আমি ছোটবেলায় এমন ছিলাম, আমি এখন এমন হয়েছি। অর্থাৎ পরিবর্তনের মধ্যেও সে নিজের অস্তিত্বের কোনো ধারাবাহিকতা অনুভব করে। গীতার আত্মদর্শন এই সাধারণ অভিজ্ঞতাকে আরও গভীর প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়। যে পরিবর্তনকে আমরা প্রত্যক্ষ করছি, সেই পরিবর্তনের সাক্ষী কে।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোককে পরম ব্রহ্মের ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত করা যায়। অদ্বৈত মতে ব্রহ্ম নিত্য, অজ, অবিনশ্বর এবং পরিবর্তনের অতীত। দৃশ্যমান জগতের নাম ও রূপ পরিবর্তিত হয়, কিন্তু সেই পরম চৈতন্য পরিবর্তনের দ্বারা প্রভাবিত হয় না। এই ধারণাটি বোঝাতে পর্দা ও চলচ্চিত্রের উপমা ব্যবহার করা যায়। চলচ্চিত্রের পর্দায় অসংখ্য দৃশ্য আসে এবং চলে যায়। কখনো সেখানে আনন্দ, কখনো দুঃখ, কখনো যুদ্ধ, কখনো শান্তি দেখা যায়। কিন্তু দৃশ্যগুলোর পরিবর্তনের সঙ্গে পর্দার নিজের কোনো জন্ম বা মৃত্যু ঘটে না। তেমনি প্রকাশিত জগতের অসংখ্য পরিবর্তনের অন্তরালে এমন এক পরম বাস্তবতার কথা গীতা নির্দেশ করে যা পরিবর্তনের সাক্ষী।
সাংখ্য দর্শনের সঙ্গে এই ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। সাংখ্যে প্রকৃতি পরিবর্তনশীল এবং পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ সাক্ষী। প্রকৃতির মধ্যে সৃষ্টি, বিকাশ এবং পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু পুরুষ নিজে সেই পরিবর্তনের কর্তা নয়। গীতার দর্শন সাংখ্যের এই ভাবনাকে গ্রহণ করে আরও বিস্তৃত আধ্যাত্মিক পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করেছে। এই দৃষ্টিতে মানুষ যখন নিজেকে কেবল দেহ, মন, ইন্দ্রিয় এবং পরিবর্তনশীল মানসিক অবস্থার সঙ্গে এক করে দেখে, তখন সে নিজের গভীরতম পরিচয়কে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে সে উপলব্ধি করতে পারে যে তার অস্তিত্বের গভীরে এমন একটি চৈতন্য রয়েছে যা পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার সাক্ষী।
ভক্তি দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সনাতন অব্যক্ত সত্তাকে পরমেশ্বর বা পরব্রহ্মের সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে বোঝা যায়। ঈশ্বর সৃষ্টির মধ্যে উপস্থিত, কিন্তু সৃষ্টি তাঁকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না। তিনি জগতের অন্তরে অবস্থান করেও জগতের অতীত। এই ধারণার মধ্যে অন্তর্নিহিততা এবং অতীততার একটি গভীর সমন্বয় রয়েছে। অর্থাৎ পরম সত্য আমাদের থেকে দূরে কোনো অজানা বাস্তবতা মাত্র নয়, আবার আমাদের দৃশ্যমান জগতের কোনো একটি সীমাবদ্ধ বস্তুতেও তাকে আবদ্ধ করা যায় না।
শ্লোকটির প্রতীকী তাৎপর্যও অত্যন্ত গভীর। সমুদ্রের তরঙ্গের উপমা এখানে বিশেষভাবে কার্যকর। একটি তরঙ্গ জন্ম নেয়, কিছু সময় স্থায়ী হয় এবং পরে বিলীন হয়ে যায়। অন্য একটি তরঙ্গ আবার জন্ম নেয়। তরঙ্গের রূপ পরিবর্তিত হয়, কিন্তু সমুদ্রের জল থেকে তার অস্তিত্ব বিচ্ছিন্ন নয়। একইভাবে জীবনের অসংখ্য রূপ প্রকাশিত হয় এবং বিলীন হয়। ব্যক্তি, সমাজ, সভ্যতা এবং এমনকি মহাজাগতিক প্রকাশও পরিবর্তনের অধীন। কিন্তু এই পরিবর্তনের অন্তরালে যে নিত্য বাস্তবতার কথা গীতা বলছে, তা তরঙ্গের মতো জন্ম নিয়ে তরঙ্গের মতো বিলীন হয় না।
এই শিক্ষার সঙ্গে মৃত্যুচিন্তারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ সাধারণত নিজের পরিচয়কে শরীরের সঙ্গে এক করে দেখে। তাই শরীরের মৃত্যু মানেই নিজের সম্পূর্ণ বিনাশ বলে মনে হয়। গীতা সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্ন করে। যদি শরীর পরিবর্তনশীল হয়, মনও পরিবর্তনশীল হয় এবং জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোও পরিবর্তিত হয়, তাহলে পরিবর্তনশীলতার মধ্যে যে চৈতন্য সবকিছুকে প্রত্যক্ষ করছে তার প্রকৃতি কী। এই অনুসন্ধান মানুষকে মৃত্যুভয় থেকে মুক্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে। এখানে মৃত্যুকে অস্বীকার করা হচ্ছে না। বরং বলা হচ্ছে যে পরিবর্তনশীল সত্তার বিনাশকে অস্তিত্বের সম্পূর্ণ বিনাশ বলে মনে করা হয়তো সত্যের পূর্ণ উপলব্ধি নয়।
এই শ্লোকের সাহিত্যিক সৌন্দর্যও তার দার্শনিক গভীরতার সঙ্গে যুক্ত। “অব্যক্তেরও অতীত অব্যক্ত” কথাটি প্রথমে একটি রহস্য সৃষ্টি করে। কিন্তু এই রহস্যই পাঠককে সাধারণ চিন্তার সীমা অতিক্রম করতে বাধ্য করে। ভাষা যখন এমন বাস্তবতার কথা বলতে চায় যা ইন্দ্রিয় ও সাধারণ ধারণার অতীত, তখন সরল বর্ণনার পরিবর্তে বিরোধাভাস, প্রতীক এবং ইঙ্গিতের আশ্রয় নেয়। এই কারণে শ্লোকটি শুধু একটি ধর্মীয় বক্তব্য নয়, বরং ভারতীয় দার্শনিক ভাষার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
মনস্তাত্ত্বিক অর্থেও এই শ্লোককে প্রতীকীভাবে পাঠ করা যায়। মানুষের সচেতন মন তার চিন্তা, অনুভূতি এবং স্মৃতির মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করে। তার গভীরে এমন অনেক স্তর রয়েছে যা সরাসরি সচেতনতার সামনে উপস্থিত নয়। কিন্তু গীতার অব্যক্ত ধারণাকে আধুনিক অবচেতন মনের সঙ্গে সরাসরি সমান করে দেখা উচিত নয়। বরং প্রতীকী অর্থে বলা যায় যে মানুষের প্রকাশিত মানসিক পরিচয়ের গভীরেও এমন একটি অস্তিত্বগত স্তর অনুসন্ধান করা সম্ভব যা ব্যক্তিগত চিন্তা ও অনুভূতির সীমাকে অতিক্রম করে।
বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার একটি বড় প্রয়োগ হলো অনিত্যতার উপলব্ধি। মানুষ যখন বুঝতে শেখে যে সম্পদ, খ্যাতি, সম্পর্ক, শরীর, ক্ষমতা এবং সামাজিক পরিচয় সবই পরিবর্তনশীল, তখন তার জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে পারে। সে বাহ্যিক অর্জনের মূল্য অস্বীকার না করেও বুঝতে পারে যে এগুলো চূড়ান্ত নয়। ফলে জীবনে একটি গভীর ভারসাম্য তৈরি হয়। মানুষ পরিবর্তনের মধ্যে থেকেও অপরিবর্তনীয় সত্যের সন্ধান করতে শেখে।
এই কারণে “পরস্তস্মাত্তু ভাবোহন্যোহব্যক্তোহব্যক্তাৎ সনাতনঃ” শুধু মহাজগতের কোনো রহস্যময় তত্ত্বের কথা বলে না। এটি মানুষের নিজের পরিচয় সম্পর্কেও একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। আমি কে। আমি কি কেবল জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পরিবর্তিত একটি শরীর। আমি কি আমার চিন্তা, স্মৃতি এবং আবেগের সমষ্টি। নাকি এই সমস্ত পরিবর্তনের অন্তরালে এমন কোনো গভীরতর চৈতন্য রয়েছে যা পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করে। ভারতীয় আত্মদর্শনের দীর্ঘ সাধনা এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের মধ্য দিয়েই এগিয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো পরিবর্তনশীল জগতের অন্তরালে নিত্য বাস্তবতার অনুসন্ধান। ব্যক্ত জগত জন্ম নেয়, পরিবর্তিত হয় এবং বিনষ্ট হয়। অব্যক্ত প্রকৃতি প্রকাশিত জগতের কারণগত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু সেই অব্যক্তেরও অতীতে রয়েছে এক সনাতন অব্যক্ত সত্য, যা সৃষ্টি ও বিনাশের চক্রের দ্বারা ধ্বংস হয় না। ভাষাগতভাবে এই শ্লোক আমাদের পর, ভাব, অন্য, অব্যক্ত, সনাতন, ভূত এবং বিনাশের ধারণার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। দার্শনিকভাবে এটি অনিত্যতার মধ্যে নিত্যতার অনুসন্ধান শেখায়। আধ্যাত্মিকভাবে এটি মানুষকে নিজের গভীরতম অস্তিত্বের দিকে ফিরে তাকাতে আহ্বান জানায়। আর প্রতীকীভাবে এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে তরঙ্গের জন্ম ও মৃত্যু আছে, কিন্তু সমুদ্রের গভীরতা তরঙ্গের ক্ষণস্থায়ী রূপের দ্বারা শেষ হয়ে যায় না। এই উপলব্ধিই শ্লোকটির অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য। যা কিছু প্রকাশিত তা পরিবর্তনশীল, যা কিছু পরিবর্তনশীল তা একদিন লয়ে যায়, কিন্তু পরম সত্য সেই পরিবর্তনেরও অতীত। তাই শ্রীকৃষ্ণের এই বাণী শেষ পর্যন্ত মানুষের সামনে এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসা রেখে যায়। পরিবর্তনের মধ্যে যে অপরিবর্তনীয়কে অনুভব করা যায়, বিনাশের মধ্যে যে অবিনশ্বরকে অনুসন্ধান করা যায় এবং সীমিত জীবনের মধ্য দিয়ে যে সনাতন সত্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়, সেই অনুসন্ধানই এই শ্লোকের প্রকৃত আধ্যাত্মিক আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!