ভগবদ্গীতা ৮.২১ | অব্যক্ত অক্ষর, পরম গতি ও শ্রীকৃষ্ণের পরম ধামের তত্ত্ব
অব্যক্তোহক্ষর ইত্যুক্তস্তমাহুঃ পরমাং গতিম্।
যং প্রাপ্য ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম।।২১।।
অনুবাদঃ সেই অব্যক্তকে অক্ষর বলে, তাই সমস্ত জীবের পরমা গতি। কেউ যখন সেখানে যায়, তখন আর তাঁকে এই জগতে ফিরে আসতে হয় না। সেটিই হচ্ছে আমার পরম ধাম।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ের একবিংশ শ্লোকটি পরম সত্য, জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং মোক্ষের গভীর দর্শনকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী ভাষায় প্রকাশ করেছে। শ্লোকটি হলো “অব্যক্তোऽক্ষর ইত্যুক্তস্তমাহুঃ পরমাং গতিম্। যং প্রাপ্য ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম।” এর সহজ অর্থ হলো, যাকে অব্যক্ত ও অক্ষর বলা হয়, জ্ঞানীরা তাঁকেই পরম গতি বলে অভিহিত করেন। যাঁকে লাভ করার পর আর সংসারে ফিরে আসতে হয় না, সেটিই আমার পরম ধাম। এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দের মধ্যে ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তার একটি গভীর স্তর নিহিত রয়েছে। এখানে অব্যক্তের মধ্যে প্রকাশের অতীত সত্য, অক্ষরের মধ্যে অবিনশ্বর সত্য, পরম গতির মধ্যে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং পরম ধামের মধ্যে ঈশ্বরীয় আশ্রয়ের ধারণা প্রকাশ পেয়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো অব্যক্ত। সংস্কৃত অব্যক্ত শব্দটি অ এবং ব্যক্ত এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। এখানে অ একটি নিষেধাত্মক উপসর্গ এবং ব্যক্ত শব্দটি প্রকাশিত, স্পষ্ট বা দৃশ্যমান অর্থ বহন করে। ব্যক্ত শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত ব্যজ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে, যার মধ্যে প্রকাশ বা প্রকাশিত হওয়ার ভাব নিহিত আছে। সেই কারণে অব্যক্ত বলতে সাধারণভাবে বোঝায় যা ব্যক্ত নয়, যা প্রকাশিত নয়, যা সাধারণ ইন্দ্রিয়ের সামনে নাম ও রূপের মাধ্যমে উপস্থিত নয়। তবে এখানে অব্যক্তকে শুধু অদৃশ্য বলে বোঝা যথেষ্ট নয়। কোনো বস্তু দূরে থাকার কারণে চোখে দেখা না গেলেও তা অব্যক্তের দার্শনিক অর্থ বহন করে না। গীতার অব্যক্ত এমন এক বাস্তবতার দিকে নির্দেশ করে যা সাধারণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রকাশের অতীত। এটি এমন এক গভীর অস্তিত্বের ধারণা, যা ব্যক্ত জগতের দৃশ্যমান নাম ও রূপের সীমাকে অতিক্রম করে।
অব্যক্তের পরেই এসেছে অক্ষর শব্দটি। অক্ষর শব্দটি ভারতীয় দর্শনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি প্রধান অর্থ হলো যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। ক্ষর শব্দটি ক্ষরণ, প্রবাহ, ঝরে পড়া এবং ক্ষয় হওয়ার ধারণার সঙ্গে যুক্ত। তার বিপরীতে অক্ষর হলো যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, যা ঝরে যায় না এবং যা বিনষ্ট হয় না। এই অর্থে অক্ষর হলো অবিনশ্বর। আবার অক্ষর শব্দের অর্থ ধ্বনি বা বর্ণের এককও হতে পারে। কিন্তু এই শ্লোকের প্রসঙ্গে অক্ষরের মূল তাৎপর্য হলো অবিনশ্বরতা। জগতে আমরা যে সমস্ত বস্তু দেখি তার অধিকাংশই পরিবর্তনশীল। শরীর পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয়, অনুভূতি পরিবর্তিত হয়, সম্পর্ক পরিবর্তিত হয় এবং জাগতিক পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু কৃষ্ণ এমন এক সত্যের কথা বলছেন যা এই পরিবর্তনশীলতার নিয়মের অধীন নয়। সেই কারণেই তাকে অক্ষর বলা হয়েছে।
অব্যক্ত এবং অক্ষর শব্দ দুটি পাশাপাশি ব্যবহারের মধ্যেও গভীর অর্থ রয়েছে। অব্যক্ত নির্দেশ করছে যে পরম সত্য সাধারণ প্রকাশের অতীত এবং অক্ষর নির্দেশ করছে যে সেই সত্য ক্ষয় ও বিনাশের অতীত। অর্থাৎ একই পরম বাস্তবতাকে দুটি ভিন্ন দিক থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তার একটি দিক হলো সে সাধারণ নাম ও রূপের মধ্যে আবদ্ধ নয় এবং অন্য দিক হলো সে পরিবর্তন ও বিনাশের অধীন নয়। ব্যক্ত জগৎ যেমন প্রকাশিত ও পরিবর্তনশীল, তেমনি অব্যক্ত অক্ষর সত্য হলো প্রকাশের অতীত ও অবিনশ্বর। এই দুই বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে পরম সত্যের একটি গভীর অস্তিত্বতাত্ত্বিক পরিচয় গড়ে ওঠে।
এরপর এসেছে ইত্যুক্তস্তমাহুঃ অংশটি। ইতি শব্দের অর্থ এইভাবে, এই নামে বা এইরূপে। উক্ত শব্দের অর্থ বলা হয়েছে। আর তমাহুঃ বলতে বোঝায় তাঁকেই তাঁরা বলেন। অর্থাৎ জ্ঞানীরা সেই অব্যক্ত ও অক্ষর সত্যকেই পরম গতি বলে অভিহিত করেন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরম সত্যকে বোঝানোর জন্য বিভিন্ন নাম ব্যবহার করা হলেও কোনো একটি নাম সেই সত্যকে সম্পূর্ণভাবে সীমাবদ্ধ করতে পারে না। অব্যক্ত তার একটি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে, অক্ষর তার আরেকটি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে এবং পরম গতি তার চূড়ান্ত লক্ষ্যগত অর্থ প্রকাশ করে।
পরম গতি শব্দবন্ধটি শ্লোকটির আরেকটি কেন্দ্রীয় ধারণা। পরম শব্দের অর্থ সর্বোচ্চ, শ্রেষ্ঠ, চূড়ান্ত এবং যার ঊর্ধ্বে আর কিছু নেই। গতি শব্দটি এসেছে গম্ ধাতু থেকে, যার অর্থ যাওয়া বা গমন করা। কিন্তু সংস্কৃতে গতি শুধু চলাচল বোঝায় না। গতি বলতে পথ, গন্তব্য, প্রাপ্তি, অবস্থা এবং চূড়ান্ত পরিণতিকেও বোঝানো হয়। তাই পরম গতি বলতে কেবল কোনো স্থানে পৌঁছানো বোঝায় না। এখানে এটি মানুষের অস্তিত্বের সর্বোচ্চ লক্ষ্যকে নির্দেশ করে। মানুষ জীবনে অসংখ্য লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। অর্থ, সম্মান, জ্ঞান, সম্পর্ক, সাফল্য এবং সুখ মানুষের জীবনের বিভিন্ন উদ্দেশ্য হতে পারে। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই চিরস্থায়ী নয়। কৃষ্ণ সেই লক্ষ্যটির কথা বলছেন যা সমস্ত সাময়িক লক্ষ্যকে অতিক্রম করে এবং জীবনের চূড়ান্ত অর্থের দিকে নিয়ে যায়। সেই কারণেই এটি পরম গতি।
যং প্রাপ্য ন নিবর্তন্তে অংশটি এই পরম গতির ফলকে আরও স্পষ্ট করেছে। যং অর্থ যাঁকে বা যাকে এবং প্রাপ্য অর্থ প্রাপ্ত হয়ে বা লাভ করে। কিন্তু এখানে প্রাপ্তি শব্দটিকে সাধারণ বস্তু অর্জনের মতো বোঝা উচিত নয়। পরম সত্যকে কোনো বাহ্যিক বস্তু হিসেবে সংগ্রহ করা যায় না। আধ্যাত্মিক অর্থে এই প্রাপ্তি হলো উপলব্ধি, আত্মজ্ঞান অথবা ঈশ্বরপ্রাপ্তি। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত অস্তিত্বের সত্যকে উপলব্ধি করে তখন তার চেতনার মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। আর ন নিবর্তন্তে বলতে বোঝায় আর ফিরে আসে না। গীতার প্রসঙ্গে এই ফিরে আসা মূলত সংসারচক্রে পুনরাবর্তনের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। জন্ম, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের যে চক্র কর্ম ও বাসনার দ্বারা পরিচালিত হয়, পরম সত্যের উপলব্ধির পর সেই বন্ধন আর থাকে না। এই কারণে এই শ্লোক মোক্ষের ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
শ্লোকের শেষ অংশ হলো তদ্ধাম পরমং মম। তৎ অর্থ সেই এবং ধাম অর্থ আবাস, আশ্রয়, অধিষ্ঠান বা পরম অবস্থান। ধাম শব্দটি ধারণ বা স্থাপনের ভাবের সঙ্গে যুক্ত। তাই ধামকে শুধু একটি স্থান হিসেবে বোঝা যথেষ্ট নয়। তদ্ধাম পরমং মম অর্থ হলো সেটিই আমার পরম ধাম। এখানে কৃষ্ণ পরম সত্যকে নিজের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত করেছেন। এই কারণে শ্লোকটি একদিকে নিরাকার ও অব্যক্ত পরম সত্যের কথা বললেও অন্যদিকে সেটিকে ভগবানের পরম ধাম হিসেবে প্রকাশ করেছে। এর ফলে শ্লোকটির মধ্যে পরম সত্যের নিরাকার ও ব্যক্তিগত ঈশ্বরীয় উভয় ব্যাখ্যার জন্য একটি গভীর ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের ব্যাখ্যা করলে অব্যক্ত ও অক্ষরকে পরম ব্রহ্মের সঙ্গে সম্পর্কিত করা যায়। ব্রহ্ম নাম ও রূপের অতীত, অবিনশ্বর এবং অদ্বিতীয়। এই দৃষ্টিতে পরম গতি কোনো ভৌগোলিক স্থানে গমন নয়। বরং নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে ব্রহ্মরূপে উপলব্ধি করাই পরম গতি। মানুষ অজ্ঞতার কারণে নিজের প্রকৃত স্বরূপকে শরীর, মন ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এক করে দেখে। জ্ঞান উদয়ের মাধ্যমে যখন সে উপলব্ধি করে যে তার প্রকৃত আত্মসত্তা ক্ষয়শীল শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তখন সেই জ্ঞানই মুক্তির পথ খুলে দেয়। এই ব্যাখ্যায় পরম প্রাপ্তি হলো নিজের চিরন্তন স্বরূপের জাগরণ।
বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের মধ্যে ব্যক্তিগত ঈশ্বরের উপস্থিতি আরও স্পষ্ট। এখানে পরম ধাম বলতে ভগবানের পরম আবাস এবং ঈশ্বরের নিত্য সান্নিধ্য বোঝানো হয়। জীব ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং ঈশ্বরপ্রাপ্তির মধ্যেই তার চূড়ান্ত পরিণতি। সেই কারণে তদ্ধাম পরমং মম বাক্যটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল একটি বিমূর্ত অবিনশ্বর নীতির কথা বলে না, বরং ভগবানের সঙ্গে জীবের চিরন্তন সম্পর্কের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
দ্বৈত দর্শনের আলোকে জীব ও ঈশ্বরের পার্থক্য বাস্তব। এই দৃষ্টিতে পরম গতি হলো ঈশ্বরের প্রাপ্তি এবং তাঁর পরম ধামে অবস্থান। জীব ঈশ্বরের সঙ্গে এক হয়ে যায় না, বরং তাঁর নিত্য সান্নিধ্য লাভ করে। এই অবস্থায় সংসারে পুনরাবর্তনের প্রয়োজন থাকে না। ফলে ন নিবর্তন্তে বাক্যটি মুক্ত জীবের চিরস্থায়ী ঈশ্বরীয় অবস্থানকে নির্দেশ করে।
এই শ্লোককে প্রতীকীভাবে বোঝার জন্য সমুদ্র ও তরঙ্গের উপমা অত্যন্ত কার্যকর। তরঙ্গ হলো ব্যক্ত জগতের প্রতীক। তার জন্ম আছে, পরিবর্তন আছে এবং বিলয় আছে। কখনো সে উঁচু হয়, কখনো নিচু হয় এবং শেষ পর্যন্ত তার দৃশ্যমান রূপ বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু সমুদ্রের গভীরতা তরঙ্গের সাময়িক পরিবর্তনের তুলনায় অনেক বৃহৎ। একইভাবে মানুষের জীবনে শরীর, নাম, পরিচয়, সম্পদ এবং সামাজিক অবস্থান পরিবর্তিত হতে থাকে। কিন্তু মানুষের অস্তিত্বের গভীরে এমন এক সত্যের অনুসন্ধান রয়েছে যা পরিবর্তনশীল পরিচয়ের অতীত। এই গভীর সত্যের প্রতীক হলো অক্ষর।
নদী ও সমুদ্রের উপমাও পরম গতির ধারণাকে সহজভাবে বোঝায়। নদী তার উৎস থেকে যাত্রা শুরু করে এবং নানা বাঁক পেরিয়ে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যায়। তার পথ পরিবর্তিত হয়, তার গতি পরিবর্তিত হয় এবং তার চারপাশের দৃশ্য পরিবর্তিত হয়। কিন্তু সমুদ্রে পৌঁছে তার পৃথক যাত্রার অবসান ঘটে। মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনও তেমন। মানুষ জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, আকাঙ্ক্ষা, সাফল্য এবং ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু যখন তার চেতনা পরম সত্যের দিকে পৌঁছায়, তখন তার দীর্ঘ অনুসন্ধান একটি চূড়ান্ত অর্থ লাভ করে। এই চূড়ান্ত প্রাপ্তিই পরম গতি।
মানবজীবনের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ মানুষ জীবনের অধিকাংশ সময় ক্ষণস্থায়ী বিষয় অর্জনের জন্য ব্যয় করে। সম্পদ অর্জিত হয় এবং হারিয়ে যায়। সম্মান আসে এবং চলে যায়। শরীর শক্তিশালী হয় এবং দুর্বল হয়। সম্পর্ক তৈরি হয় এবং পরিবর্তিত হয়। চিন্তা ও অনুভূতিও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের মধ্যেই মানুষ কখনো কখনো এমন একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হয় যা সমস্ত বাহ্যিক অর্জনের ঊর্ধ্বে। সেই প্রশ্ন হলো আমি কে এবং আমার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী। গীতার এই শ্লোক সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য মানুষকে নশ্বরের মধ্য থেকে অবিনশ্বরকে অনুসন্ধান করতে আহ্বান জানায়।
এই দৃষ্টিতে অব্যক্ত আমাদের শেখায় যে বাস্তবতার সবকিছু চোখে দেখা যায় না। অক্ষর আমাদের শেখায় যে যা সত্য তা সবসময় পরিবর্তনের অধীন নয়। পরম গতি আমাদের শেখায় যে জীবনের এমন একটি লক্ষ্য আছে যা সাময়িক সাফল্যের ঊর্ধ্বে। আর পরম ধাম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সেই চূড়ান্ত সত্য কেবল একটি বিমূর্ত ধারণা নয়, ভক্তির দৃষ্টিতে সেটি ঈশ্বরের পরম আশ্রয় ও নিত্য আবাস।
সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটির গঠন অত্যন্ত সুন্দর। প্রথমে বলা হয়েছে পরম সত্য কেমন। সেটি অব্যক্ত ও অক্ষর। তারপর বলা হয়েছে তার মর্যাদা কী। সেটি পরম গতি। এরপর বলা হয়েছে তাকে লাভ করলে কী হয়। আর ফিরে আসতে হয় না। সবশেষে বলা হয়েছে সেই পরম অবস্থানের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক কী। সেটিই আমার পরম ধাম। অর্থাৎ শ্লোকটির মধ্যে সত্যের পরিচয়, তার মর্যাদা, তার প্রাপ্তির ফল এবং তার ঈশ্বরীয় পরিচয় এক সুসংবদ্ধ ধারায় প্রকাশিত হয়েছে।
আধ্যাত্মিকভাবে এই শ্লোক মানুষের অন্তর্জগতের একটি গভীর যাত্রার প্রতীক। মানুষ প্রথমে বাহ্যিক জগতের প্রতি আকৃষ্ট থাকে। এরপর সে নিজের মনকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে। তারপর সে নিজের চিন্তা, বাসনা এবং অহংকারের প্রকৃতি বুঝতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সে প্রশ্ন করে যে পরিবর্তনশীল ব্যক্তিত্বের আড়ালে কি কোনো অপরিবর্তনীয় সত্য রয়েছে। এই অনুসন্ধান যখন গভীর হয় তখন মানুষ অব্যক্ত ও অক্ষরের ধারণার দিকে অগ্রসর হয়। শেষ পর্যন্ত সেই সত্যের উপলব্ধিই পরম গতির প্রতীক হয়ে ওঠে।
অতএব “অব্যক্তোऽক্ষর ইত্যুক্তস্তমাহুঃ পরমাং গতিম্” কেবল একটি ধর্মীয় বাক্য নয়। এটি ভারতীয় দর্শনের একটি গভীর অস্তিত্বতাত্ত্বিক ঘোষণা। এখানে বলা হয়েছে যে দৃশ্যমান জগতের পরিবর্তনশীলতার আড়ালে এমন এক পরম সত্য রয়েছে যা সাধারণ প্রকাশের অতীত এবং ক্ষয়হীন। সেই সত্যই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। তাকে উপলব্ধি করলে জীব আর অজ্ঞতা ও সংসারবন্ধনের পুরোনো অবস্থায় ফিরে যায় না। আর “তদ্ধাম পরমং মম” এই উপলব্ধিকে ভগবানের পরম ধামের সঙ্গে যুক্ত করে।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো নশ্বরের মধ্যে বাস করেও অনশ্বরকে অনুসন্ধান করা। মানুষ বাহ্যিক জগতে যতই পরিবর্তন দেখুক, তার অন্তরে এমন একটি সত্যের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে যা পরিবর্তনশীল নয়। অব্যক্ত সেই সত্যের অপ্রকাশিত স্বরূপকে নির্দেশ করে, অক্ষর তার অবিনশ্বরতাকে প্রকাশ করে, পরম গতি তার চূড়ান্ত লক্ষ্যকে নির্দেশ করে এবং পরম ধাম তার ঈশ্বরীয় আশ্রয়কে প্রকাশ করে। তাই এই শ্লোক আমাদের জীবনের বাহ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি একটি গভীরতর প্রশ্নের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আমরা কী অর্জন করছি তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা শেষ পর্যন্ত কী উপলব্ধি করছি। গীতার ভাষায় সেই সর্বোচ্চ উপলব্ধিই হলো পরম গতি এবং সেই পরম সত্যই হলো ভগবানের পরম ধাম।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!