ভগবদ্গীতা ৮.২২ | পরম পুরুষ, অনন্য ভক্তি ও সর্বব্যাপী ঈশ্বরতত্ত্বের গভীর দর্শন
পুরুষঃ স পরঃ পার্থ ভক্ত্যা লভ্যস্ত্বনন্যয়া।
যস্যান্তঃস্থানি ভূতানি যেন সর্বমিদং ততম্।।২২।।
অনুবাদঃ হে পার্থ! সর্বশ্রেষ্ঠ পরমেশ্বর ভগবানকে অনন্যা ভক্তির মাধ্যমেই কেবল লাভ করা যায়। তিনি যদিও তাঁর ধামে নিত্য বিরাজমান, তবুও সর্বব্যাপ্ত এবং সব কিছু তাঁর মধ্যেই অবস্থিত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ের বাইশতম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে পরম সত্যের এমন একটি গভীর স্বরূপের কথা বলেছেন, যেখানে ঈশ্বরকে একই সঙ্গে সর্বোচ্চ, সর্বব্যাপী এবং সকল সত্তার চূড়ান্ত আশ্রয় হিসেবে উপলব্ধি করা যায়। শ্লোকটি হলো “পুরুষঃ স পরঃ পার্থ ভক্ত্যা লভ্যস্ত্বনন্যয়া। যস্যান্তঃস্থানি ভূতানি যেন সর্বমিদং ততম্।” এর সরল অর্থ হলো, হে পার্থ, সেই পরম পুরুষকে অনন্য ভক্তির দ্বারা লাভ করা যায়, যাঁর মধ্যে সমস্ত জীব অবস্থিত এবং যাঁর দ্বারা সমগ্র এই জগৎ পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে ঈশ্বরতত্ত্ব, ভক্তিতত্ত্ব, বিশ্বতত্ত্ব এবং মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক বক্তব্য নিহিত রয়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “পুরুষঃ”। সংস্কৃত “পুরুষ” শব্দটির ব্যুৎপত্তি নিয়ে প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। একটি প্রচলিত ব্যাখ্যায় পুরুষ বলতে সেই সত্তাকে বোঝানো হয় যিনি পুরের মধ্যে অবস্থান করেন। এখানে পুরকে দেহ বা অস্তিত্বের আবাস হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যায়। আবার বৈদিক ও উপনিষদীয় সাহিত্যে পুরুষ শব্দটি কেবল মানবপুরুষকে বোঝায় না। এটি এমন এক মহাসত্তাকে নির্দেশ করতে পারে যিনি সমগ্র অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত চৈতন্য এবং মহাজাগতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই শ্লোকে পুরুষ শব্দের অর্থ তাই কোনো সাধারণ ব্যক্তি নয়, বরং পরম পুরুষ। তাঁর সঙ্গে সমস্ত জীবনের অস্তিত্বের সম্পর্ক রয়েছে এবং তিনি জগতের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন।
এর পরেই এসেছে “স পরঃ”। “স” অর্থ সেই বা তিনি এবং “পর” অর্থ অপর, ঊর্ধ্বতর, শ্রেষ্ঠ, সর্বোচ্চ কিংবা জাগতিক সীমার অতীত। ফলে “স পরঃ” বলতে বোঝানো হয়েছে সেই পরম সত্তাকে যিনি সমস্ত সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। এখানে পর শব্দটি শুধু অন্য অর্থে ব্যবহৃত নয়। এটি এমন একটি বাস্তবতাকে নির্দেশ করে যা পরিবর্তনশীল জগতের তুলনায় চূড়ান্ত এবং উচ্চতর। মানুষের অভিজ্ঞতার জগৎ পরিবর্তনশীল। জন্ম আছে, বৃদ্ধি আছে, ক্ষয় আছে এবং মৃত্যু আছে। কিন্তু পরম পুরুষ সেই পরিবর্তনশীলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। তাই তাঁকে পর বলা হয়েছে।
“পার্থ” শব্দটি শ্লোকটির সম্বোধন। পার্থ অর্থ পৃথার পুত্র। পৃথা ছিলেন কুন্তীর আরেক নাম এবং অর্জুন তাঁর পুত্র। কৃষ্ণ যখন অর্জুনকে পার্থ বলে সম্বোধন করেন, তখন তিনি শুধু তাঁর পরিচয় স্মরণ করিয়ে দেন না, তাঁর মানবিক অবস্থানকেও সামনে নিয়ে আসেন। মহাজাগতিক ও পরম সত্যের আলোচনা এমন একজন মানুষের সঙ্গে হচ্ছে যিনি যুদ্ধ, কর্তব্য, সম্পর্ক, দ্বন্দ্ব এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। ফলে এই শ্লোক কেবল বিমূর্ত দর্শনের বক্তব্য নয়। এটি বাস্তব মানবজীবনের সংকটের মধ্যেই পরম সত্যের সন্ধান করার আহ্বান।
এরপর এসেছে “ভক্ত্যা লভ্যস্ত্বনন্যয়া”। এই অংশটি শ্লোকটির আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। “ভক্ত্যা” শব্দটি “ভক্তি” থেকে এসেছে। ভক্তি শব্দটির সঙ্গে সংস্কৃত “ভজ্” ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে, যার মধ্যে ভাগ করা, অংশ নেওয়া, সেবা করা, আশ্রয় গ্রহণ করা এবং উপাসনা করার অর্থ নিহিত। ফলে ভক্তিকে শুধু আবেগ বা ধর্মীয় অনুভূতি হিসেবে বোঝা যথেষ্ট নয়। ভক্তি হলো এমন এক অন্তর্গত সম্পর্ক যেখানে মানুষ নিজের চেতনা, কর্ম, ভালোবাসা এবং আত্মসমর্পণকে পরম সত্যের দিকে নিবদ্ধ করে। ভক্তির মধ্যে শ্রদ্ধা আছে, ভালোবাসা আছে, সেবা আছে এবং নিজের সীমাবদ্ধ অহংকে বৃহত্তর সত্যের কাছে সমর্পণের প্রবণতা আছে।
“লভ্যঃ” শব্দটি এসেছে লাভের ধারণা থেকে। অর্থ হলো যাকে লাভ করা যায় বা যাঁকে অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু এখানে পরম পুরুষকে কোনো বস্তু অর্জনের মতো করে পাওয়ার কথা বলা হয়নি। বরং মানুষের চেতনা যখন ভক্তি ও একাগ্রতার মাধ্যমে পরম সত্যের দিকে উন্মুক্ত হয়, তখন সেই সত্য উপলব্ধ হয়। অর্থাৎ ঈশ্বরকে সৃষ্টি করতে হয় না, তাঁকে নতুন করে অস্তিত্বে আনতে হয় না। মানুষের উপলব্ধির পরিবর্তন ঘটে। যে সত্য সর্বদা বর্তমান, তাকে উপলব্ধি করার যোগ্যতা মানুষের মধ্যে বিকশিত হয়।
এই কারণে “অনন্যয়া” শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অনন্য শব্দের অর্থ অন্য নয়, যার দ্বিতীয় কোনো চূড়ান্ত আশ্রয় নেই। অনন্য ভক্তি মানে এমন ভক্তি যা বিভক্ত নয়। মানুষের মন সাধারণত নানা আকর্ষণের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে। অর্থ, ক্ষমতা, সম্মান, সম্পর্ক, ভোগ, নিরাপত্তা এবং সাফল্য মানুষের চেতনার উপর বিভিন্ন ধরনের দাবি তৈরি করে। অনন্য ভক্তি এই বিচ্ছিন্নতার বিপরীতে চেতনার একটি কেন্দ্রীভূত অবস্থাকে নির্দেশ করে। এর অর্থ এই নয় যে একজন মানুষ পৃথিবীর অন্য সবকিছুকে অস্বীকার করবে। বরং এর অর্থ হলো জীবনের সমস্ত কাজ ও সম্পর্কের অন্তরালে একটি পরম সত্যকে চূড়ান্ত আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করা।
“অনন্য ভক্তি”কে তাই মনোবৈজ্ঞানিক অর্থেও বোঝা যায়। যখন মানুষের জীবনে একটি উচ্চতর আদর্শ কেন্দ্রে অবস্থান করে, তখন তার চিন্তা ও কর্মের মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ ঐক্য তৈরি হয়। বিচ্ছিন্ন আকাঙ্ক্ষাগুলি একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়। মানুষ তখন শুধু সাফল্যের জন্য কাজ করে না, বরং কাজের অর্থ উপলব্ধি করতে শেখে। শুধু সম্পদ সংগ্রহ করে না, সম্পদের প্রকৃত ব্যবহার নিয়ে ভাবতে শেখে। শুধু সম্পর্ক ধরে রাখে না, সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা ও দায়িত্বের মূল্য উপলব্ধি করে। এই দিক থেকে অনন্য ভক্তি মানুষের জীবনকে অন্তর্গতভাবে সংহত করার একটি পথ।
শ্লোকের পরবর্তী অংশ হলো “যস্যান্তঃস্থানি ভূতানি”। “যস্য” অর্থ যার বা যাঁর। “অন্তঃস্থানি” অর্থ যার মধ্যে অবস্থান করে এবং “ভূতানি” অর্থ সমস্ত সৃষ্ট সত্তা বা জীবসমূহ। “ভূত” শব্দটি “ভূ” ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ হওয়া বা অস্তিত্ব লাভ করা। ফলে ভূতানি বলতে সমস্ত অস্তিত্বশীল সত্তাকে বোঝানো হয়েছে। এই অংশের অর্থ হলো সমস্ত জীব ও সৃষ্ট সত্তা পরম পুরুষের মধ্যে অবস্থান করে। এখানে ঈশ্বরকে অস্তিত্বের চূড়ান্ত আশ্রয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এই ধারণাটি অত্যন্ত গভীর। আমরা সাধারণত নিজেদের পৃথক ব্যক্তি হিসেবে অনুভব করি। একজন মানুষ মনে করে সে অন্য মানুষের থেকে আলাদা, একটি প্রাণী অন্য প্রাণী থেকে আলাদা এবং একটি বস্তু অন্য বস্তু থেকে আলাদা। কিন্তু শ্লোকটি আমাদের এই বহুত্বের অন্তরালে একটি বৃহত্তর ঐক্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সমস্ত সত্তার অস্তিত্ব একটি পরম বাস্তবতার উপর নির্ভরশীল। যেমন অসংখ্য তরঙ্গ সমুদ্রের উপর নির্ভরশীল, তেমনি অসংখ্য জীব ও জগতের রূপ একটি বৃহত্তর অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল।
এর সঙ্গে সঙ্গে শ্লোকের শেষ অংশে বলা হয়েছে “যেন সর্বমিদং ততম্”। “যেন” অর্থ যাঁর দ্বারা, “সর্বম্” অর্থ সবকিছু, “ইদম্” অর্থ এই এবং “ততম্” শব্দটি বিস্তার বা পরিব্যাপ্তির ধারণা প্রকাশ করে। ফলে এর অর্থ হলো যাঁর দ্বারা এই সমগ্র জগৎ পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। এখানে পরম পুরুষকে শুধু জগতের বাইরে অবস্থানকারী কোনো সত্তা হিসেবে দেখানো হয়নি। তিনি জগতের মধ্যেও তাঁর উপস্থিতি বিস্তার করে আছেন। এই কারণে শ্লোকটিতে একই সঙ্গে অতীন্দ্রিয়তা এবং সর্বব্যাপিত্বের ধারণা প্রকাশিত হয়েছে।
এই দুই বক্তব্য একসঙ্গে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে বলা হচ্ছে সমস্ত সত্তা তাঁর মধ্যে অবস্থান করে। অন্যদিকে বলা হচ্ছে তিনি সমগ্র জগৎকে পরিব্যাপ্ত করে আছেন। অর্থাৎ তিনি একই সঙ্গে আশ্রয় এবং পরিব্যাপক। তিনি জগতের চূড়ান্ত ভিত্তি এবং জগতের অন্তর্গত উপস্থিতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। ভারতীয় দর্শনে ঈশ্বরের এই দ্বৈত উপলব্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বর জগতের সীমাকে অতিক্রম করেন, আবার জগতের মধ্যেও তাঁর উপস্থিতি অনুভূত হয়।
অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই বক্তব্যকে পরম ব্রহ্মের সর্বব্যাপী চৈতন্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। বহুত্বের অন্তরালে যে এক অদ্বিতীয় সত্য রয়েছে, সেই সত্যই সমস্ত অস্তিত্বের ভিত্তি। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর, জীব এবং জগতের মধ্যে একটি গভীর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা বলা হয়। সমস্ত জীব ও জগত ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল এবং ঈশ্বর তাদের অন্তর্যামী। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীবের পার্থক্য বাস্তব হলেও জীবের অস্তিত্ব ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল এবং ঈশ্বর সর্বোচ্চ স্বাধীন সত্তা। ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও এই শ্লোকের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো পরম পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাঁর সঙ্গে সমস্ত জীবনের গভীর সম্পর্ক।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সমুদ্র ও তরঙ্গের উপমা এর অন্যতম সুন্দর উদাহরণ। অসংখ্য তরঙ্গ সমুদ্রের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক তরঙ্গের আকার আলাদা হলেও তার উপাদান সমুদ্রের জল। তরঙ্গের জন্ম হয়, তার পরিবর্তন হয় এবং একসময় তার পৃথক রূপ বিলীন হয়। কিন্তু সমুদ্র থেকে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয় না। একইভাবে মানুষ ও অন্যান্য জীব নিজেদের পৃথক সত্তা হিসেবে অনুভব করলেও তাদের অস্তিত্ব একটি বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই উপমা বহুত্বের মধ্যে ঐক্যের ধারণাকে সহজভাবে প্রকাশ করে।
আকাশের উপমাও এখানে অর্থবহ। আকাশ ঘরের মধ্যে যেমন আছে, তেমনি ঘরের বাইরে আছে। পাহাড়ের উপরে যেমন আছে, তেমনি সমুদ্রের উপরেও আছে। কোনো একটি স্থান আকাশকে সম্পূর্ণ আবদ্ধ করতে পারে না। এই উপমা পরম সত্তার সর্বব্যাপী ধারণাকে কিছুটা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। যদিও কোনো উপমাই পরম সত্যকে সম্পূর্ণ ধারণ করতে পারে না, তবু এগুলি মানুষের সীমিত বুদ্ধিকে একটি গভীর ধারণার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
মানবজীবনের দিক থেকেও শ্লোকটির শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যখন নিজের পরিচয়কে শুধু শরীর, সম্পদ, পেশা, সামাজিক অবস্থান বা সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে, তখন তার অস্তিত্ববোধ সংকুচিত হয়ে যায়। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করতে শেখে যে তার জীবন একটি বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়। নিজের প্রতি অহংকার কমে, অন্যের প্রতি সহমর্মিতা বাড়ে এবং জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে গভীরতা তৈরি হয়। যদি সমস্ত সত্তা একই পরম বাস্তবতার উপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে অন্য জীবের প্রতি অবজ্ঞা বা নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের জন্ম হওয়া স্বাভাবিক।
সাহিত্যিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটির নির্মাণ অত্যন্ত সুন্দর। প্রথমে পরম পুরুষের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তারপর তাঁকে লাভ করার পথ বলা হয়েছে। শেষে তাঁর স্বরূপ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ শ্লোকটি প্রথমে বলে কে পরম, তারপর বলে কীভাবে তাঁকে উপলব্ধি করা যায় এবং শেষে বলে কেন তিনি পরম। এই বিন্যাসের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ দার্শনিক যুক্তি রয়েছে। তিনি পরম কারণ সমস্ত অস্তিত্ব তাঁর মধ্যে আশ্রিত এবং তিনি সমগ্র অস্তিত্বকে পরিব্যাপ্ত করে আছেন।
এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা সম্ভবত মানুষের চেতনার কেন্দ্র পরিবর্তনের মধ্যে নিহিত। সাধারণ মানুষ নিজের চারপাশের জগতকে কেন্দ্র করে জীবন গড়ে তোলে। সে ভাবে কীভাবে আরও অর্জন করবে, কীভাবে নিরাপদ থাকবে, কীভাবে সম্মান পাবে এবং কীভাবে নিজের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে। কিন্তু গীতার এই শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় যে এই সমস্ত অর্জনের পরেও জীবনের চূড়ান্ত আশ্রয় কোথায়। অনন্য ভক্তি সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। এটি বাহ্যিক জগতকে অস্বীকার করে না, বরং বাহ্যিক জগতের মধ্যেই একটি গভীরতর সত্যের সন্ধান করে।
সুতরাং “পুরুষঃ স পরঃ পার্থ” শুধু একটি ধর্মীয় বাক্য নয়। এটি পরম বাস্তবতার ঘোষণা। “ভক্ত্যা লভ্যস্ত্বনন্যয়া” হলো সেই বাস্তবতার দিকে অগ্রসর হওয়ার আধ্যাত্মিক পথ। আর “যস্যান্তঃস্থানি ভূতানি যেন সর্বমিদং ততম্” হলো সেই পরম পুরুষের সর্বব্যাপী ও আশ্রয়দায়ী স্বরূপের প্রকাশ। ভাষাতাত্ত্বিকভাবে প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থবহ। দার্শনিকভাবে এগুলি অস্তিত্বের ভিত্তি, চেতনার প্রকৃতি এবং ঈশ্বর ও জগতের সম্পর্ক নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে। আধ্যাত্মিকভাবে এগুলি মানুষের বিচ্ছিন্ন চেতনাকে একটি পরম কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানায়।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক মানুষের সামনে এমন এক সত্যের দ্বার খুলে দেয় যেখানে বহুত্বের মধ্যে ঐক্য, পরিবর্তনের মধ্যে অপরিবর্তনীয়তা, সীমাবদ্ধতার মধ্যে অসীমতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে মহাজাগতিক সম্পর্ক অনুভব করা যায়। পরম পুরুষ সেই সর্বোচ্চ সত্য যাঁর মধ্যে সমস্ত সত্তা আশ্রয় পায় এবং যাঁর উপস্থিতি সমগ্র অস্তিত্বকে পরিব্যাপ্ত করে। তাঁকে লাভের পথ হিসেবে অনন্য ভক্তির কথা বলা হয়েছে, কারণ ভক্তি মানুষের হৃদয়কে সেই সত্যের প্রতি উন্মুক্ত করে এবং অনন্যতা চেতনাকে বিচ্ছিন্নতা থেকে একাগ্রতার দিকে নিয়ে যায়। তাই এই শ্লোকের সারমর্ম হলো, মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বাহ্যিক অর্জনের সীমায় শেষ হয় না। তার গভীরে রয়েছে এক পরম আশ্রয়ের অনুসন্ধান, এবং সেই অনুসন্ধানের পরিণতি হলো এমন এক চেতনা যেখানে মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে সমগ্র অস্তিত্ব একটি গভীরতর ঐক্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!