সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ৮.২৩ | আবৃত্তি ও অনাবৃত্তি, মৃত্যুকাল এবং যোগীর চূড়ান্ত গতির তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
যত্র কালে ত্বনাবৃত্তিমাবৃত্তিং চৈব যোগিনঃ।প্রয়াতা যান্তি তং কালং বক্ষ্যামি ভরতর্ষভ।।২৩।।
যত্র কালে ত্বনাবৃত্তিমাবৃত্তিং চৈব যোগিনঃ।
প্রয়াতা যান্তি তং কালং বক্ষ্যামি ভরতর্ষভ।।২৩।।

অনুবাদঃ হে ভারতশ্রেষ্ঠ! যে কালে মৃত্যু হলে যোগীরা এই জগতে ফিরে আসেন অথবা ফিরে আসেন না, সেই কালের কথা আমি তোমাকে বলব।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ের তেইশতম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে জীবনের সবচেয়ে গভীর রহস্যগুলোর একটি সম্পর্কে শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেন, যে সময়ে দেহত্যাগ করে যোগীগণ অনাবৃত্তি অর্থাৎ আর ফিরে না আসার গতি লাভ করেন এবং যে সময়ে দেহত্যাগ করে তাঁরা আবৃত্তি অর্থাৎ পুনরায় ফিরে আসার গতি লাভ করেন, সেই কাল তিনি অর্জুনকে ব্যাখ্যা করবেন। শ্লোকটির মূল পাঠ হলো যত্র কালে ত্বনাবৃত্তিমাবৃত্তিং চৈব যোগিনঃ প্রয়াতা যান্তি তং কালং বক্ষ্যামি ভরতর্ষভ। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মৃত্যুকে জীবনের পরিসমাপ্তি হিসেবে দেখছেন না। বরং মৃত্যুকে তিনি এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় গমনের একটি পর্যায় হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই কারণেই শ্লোকটির মধ্যে কাল, যোগী, প্রয়াত, আবৃত্তি এবং অনাবৃত্তি এই শব্দগুলোর মাধ্যমে জীবন, মৃত্যু, পুনর্জন্ম এবং মুক্তির একটি গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন প্রকাশ পেয়েছে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি শব্দ হলো আবৃত্তি এবং অনাবৃত্তি। আবৃত্তি শব্দটি সংস্কৃত আ এবং √বৃত্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। √বৃত্ ধাতুর মধ্যে ঘোরা, আবর্তিত হওয়া, চলা এবং কোনো অবস্থায় থাকা এই ধরনের অর্থ নিহিত রয়েছে। এর সঙ্গে আ উপসর্গ যুক্ত হয়ে আবৃত্তি শব্দের মধ্যে পুনরায় ফিরে আসা বা আবর্তিত হওয়ার ভাব প্রকাশ পেয়েছে। সাধারণ ভাষায় আবৃত্তি বলতে কোনো কিছুর পুনরাবৃত্তি বোঝায়। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে আবৃত্তির অর্থ আরও গভীর। এখানে আবৃত্তি হলো জন্ম ও মৃত্যুর চক্রে পুনরায় ফিরে আসা। অর্থাৎ জীব তার কর্ম, বাসনা এবং অজ্ঞতার দ্বারা সংসারের সঙ্গে আবদ্ধ থেকে এক দেহ ত্যাগের পর আবার অন্য দেহ ধারণ করে। তাই আবৃত্তি কেবল ফিরে আসা নয়, এটি সেই অস্তিত্বচক্রের প্রতীক যেখানে জীব বারবার জন্মগ্রহণ করে, কর্ম করে, কর্মফল ভোগ করে, মৃত্যুবরণ করে এবং আবার নতুন জন্ম লাভ করে।

অনাবৃত্তি শব্দটি আবৃত্তির বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে। অন শব্দাংশটি নিষেধ বা অনুপস্থিতির ভাব প্রকাশ করে। ফলে অনাবৃত্তি অর্থ দাঁড়ায় আর ফিরে না আসা। গীতার আধ্যাত্মিক দর্শনে অনাবৃত্তি বলতে সংসারের জন্ম ও মৃত্যুর পুনরাবৃত্তিময় চক্র থেকে মুক্তিকে বোঝানো হয়েছে। এই অর্থে অনাবৃত্তি হলো মোক্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। জীব যখন নিজের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করে, কর্মবন্ধনের ঊর্ধ্বে ওঠে এবং পরম সত্যের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক উপলব্ধি করে, তখন তার জন্য পুনরায় সংসারচক্রে আবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন থাকে না। তাই অনাবৃত্তি শব্দের মধ্যে শুধু ফিরে না আসার ধারণা নেই। এর মধ্যে রয়েছে চূড়ান্ত স্বাধীনতা, আত্মজ্ঞান এবং অস্তিত্বের পরম পরিণতি।

এই শ্লোকে কাল শব্দটিরও বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সাধারণ অর্থে কাল বলতে সময়কে বোঝায়। কিন্তু গীতার এই অধ্যায়ে কাল শব্দটি কেবল ঘড়ির সময় বা দিনের কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তের অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। এখানে কাল আত্মার দেহত্যাগ এবং তার পরবর্তী গতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মহাজাগতিক সময়তত্ত্বের ধারণা বহন করে। পরবর্তী শ্লোকগুলোতে আলো, দিন, শুক্লপক্ষ, উত্তরায়ণ এবং অন্যদিকে অন্ধকার, রাত্রি, কৃষ্ণপক্ষ ও দক্ষিণায়ণের মতো প্রতীকী পথের আলোচনা এসেছে। তাই এই শ্লোককে বৃহত্তর প্রসঙ্গে দেখলে বোঝা যায় যে কৃষ্ণ এমন একটি মহাজাগতিক ব্যবস্থার কথা বলছেন যার মধ্যে জীবের মৃত্যুর পরবর্তী গতি এবং তার আধ্যাত্মিক অবস্থার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

যোগিনঃ শব্দটি যোগী শব্দের বহুবচন রূপ। যোগ শব্দের মূল √যুজ্ ধাতু। এর মধ্যে যুক্ত হওয়া, সংযুক্ত করা এবং একাগ্র হওয়ার ধারণা রয়েছে। তাই যোগী বলতে শুধু শরীরচর্চা বা যোগাসন অনুশীলনকারী ব্যক্তিকে বোঝায় না। গীতার ভাষায় যোগী হলেন সেই ব্যক্তি যিনি নিজের মন ও চেতনাকে সংযত করেছেন, আত্মসত্যের অনুসন্ধানে নিবিষ্ট হয়েছেন এবং পরম সত্তার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। যোগীর জীবন বাহ্যিক আচরণের চেয়ে চেতনার অবস্থার দ্বারা অধিক নির্ধারিত। তিনি জীবনের পরিবর্তনশীলতার মধ্যেও একটি অপরিবর্তনীয় সত্যের সন্ধান করেন।

প্রয়াতা শব্দটি প্র এবং √যা ধাতু থেকে গঠিত। √যা অর্থ যাওয়া বা গমন করা এবং প্র উপসর্গের মাধ্যমে সামনে বা দূরে অগ্রসর হওয়ার ভাব প্রকাশ পায়। প্রয়াতা অর্থ যিনি প্রস্থান করেছেন। শ্লোকে এটি দেহত্যাগের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে মৃত্যুর জন্য যাওয়া বা প্রস্থান করার ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি গভীর দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। মৃত্যু কোনো সম্পূর্ণ বিলুপ্তি নয় বরং একটি যাত্রা। দেহের পরিবর্তন ঘটলেও জীবনের অন্তর্নিহিত চেতনার গতি অব্যাহত থাকে। এই ধারণাই গীতার পুনর্জন্ম ও মুক্তির দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

যান্তি শব্দটি √যা ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ যায় বা গমন করে। প্রয়াতা যান্তি অর্থাৎ দেহত্যাগ করে তারা নির্দিষ্ট গতি লাভ করে। এখানে গতি বলতে শুধু স্থান পরিবর্তন বোঝানো হয় না। এটি চেতনার অস্তিত্বগত পরিণতিও বোঝায়। জীব তার কর্ম, জ্ঞান, চেতনা এবং আধ্যাত্মিক অবস্থার ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়। এই কারণে গীতার দর্শনে মৃত্যু একটি দরজা। সেই দরজার ওপারে জীবের গতি তার পূর্ববর্তী সাধনা এবং চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

এই শ্লোকের মধ্যে আবৃত্তি এবং অনাবৃত্তির যে দ্বৈততা রয়েছে, তা আসলে সমগ্র সংসার ও মোক্ষের দর্শনকে দুটি শব্দের মধ্যে প্রকাশ করেছে। আবৃত্তি হলো পুনরায় ফিরে আসা এবং অনাবৃত্তি হলো আর ফিরে না আসা। আবৃত্তি সংসারের প্রতীক এবং অনাবৃত্তি মুক্তির প্রতীক। আবৃত্তি এমন একটি বৃত্তের মতো যেখানে শুরু এবং শেষ আবার একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। জন্ম থেকে মৃত্যু এবং মৃত্যু থেকে আবার জন্ম। কিন্তু অনাবৃত্তি সেই বৃত্তের বাইরে চলে যাওয়ার প্রতীক। সেখানে জীব আর একই চক্রে ফিরে আসে না।

এই ধারণাকে মানবজীবনের মনস্তাত্ত্বিক স্তরেও বোঝা যায়। একজন মানুষ যদি বারবার একই ভুল করে, একই আসক্তির মধ্যে ফিরে যায়, একই রাগ, অহংকার, ভয় এবং আকাঙ্ক্ষার দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে তার জীবনেও এক ধরনের আবৃত্তি সৃষ্টি হয়। সে বাহ্যিকভাবে পরিবর্তিত হলেও তার অন্তর্গত জীবন একই চক্রের মধ্যে ঘুরতে থাকে। কোনো ব্যক্তি যদি নিজের আচরণ সম্পর্কে সচেতন হয়, নিজের মনকে পর্যবেক্ষণ করে এবং জ্ঞানের মাধ্যমে পুরোনো আসক্তি ও অচেতন প্রবণতা অতিক্রম করতে শেখে, তাহলে সেই পুনরাবৃত্তি ভাঙতে শুরু করে। এই দৃষ্টিতে অনাবৃত্তি শুধু মৃত্যুর পরের কোনো অবস্থা নয়। এটি জীবিত অবস্থাতেও চেতনার মুক্তির একটি প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের গভীর অর্থ আরও স্পষ্ট হয়। অদ্বৈত দর্শনে মানুষের প্রকৃত স্বরূপ আত্মা এবং আত্মার পরম সত্য ব্রহ্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। অবিদ্যার কারণে মানুষ নিজেকে দেহ, মন, ইন্দ্রিয় এবং অহংকারের সঙ্গে এক করে দেখে। এই ভুল পরিচয় থেকেই কামনা সৃষ্টি হয়, কামনা থেকে কর্ম এবং কর্ম থেকে কর্মফল। কর্মফলের ধারাবাহিকতা জীবকে পুনর্জন্মের বন্ধনে আবদ্ধ করে। যখন আত্মজ্ঞান উদিত হয় এবং ব্যক্তি উপলব্ধি করে যে তার প্রকৃত স্বরূপ দেহ বা অহংকারের সীমায় আবদ্ধ নয়, তখন সেই অজ্ঞতার অবসান ঘটে। এই অবস্থাই অনাবৃত্তির দার্শনিক ভিত্তি।

বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে অনাবৃত্তিকে ঈশ্বরপ্রাপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়। জীব পরমেশ্বরের উপর নির্ভরশীল এবং ঈশ্বরের সঙ্গে তার সম্পর্ক চিরন্তন। তাই মুক্তি মানে শুধু সংসার থেকে বেরিয়ে যাওয়া নয়। এটি ঈশ্বরের পরম সান্নিধ্য লাভ। ভক্তিমার্গেও একইভাবে অনাবৃত্তির মধ্যে একটি গভীর প্রেমময় অর্থ রয়েছে। ভক্তের জন্য মুক্তি কেবল জন্মমৃত্যুর অবসান নয়। ভগবানের সঙ্গে চিরস্থায়ী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাই তার পরম আকাঙ্ক্ষা। ফলে অনাবৃত্তি এখানে ঈশ্বরের দিকে চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন এবং সংসারের পুনরাবর্তন থেকে মুক্তি।

শ্লোকটির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী দিক হলো আলো এবং অন্ধকারের ধারণা। পরবর্তী শ্লোকগুলোতে আলোকময় পথ এবং ধূম্র বা অন্ধকারময় পথের যে আলোচনা এসেছে, তা আক্ষরিক অর্থের পাশাপাশি প্রতীকী অর্থও বহন করে। আলো জ্ঞান, সচেতনতা এবং সত্যের প্রতীক। অন্ধকার অজ্ঞতা, আসক্তি এবং বিভ্রান্তির প্রতীক। এই দৃষ্টিতে অনাবৃত্তির পথ হলো জ্ঞানের পথ এবং আবৃত্তির পথ হলো অজ্ঞতার দ্বারা পরিচালিত পুনরাবর্তনের পথ। মানুষের অন্তর্জগতেও একই সত্য কাজ করে। জ্ঞান যত গভীর হয়, অচেতনতার বন্ধন তত দুর্বল হয়। আর অজ্ঞতা যত প্রবল থাকে, মানুষ তত বেশি পুরোনো চক্রের মধ্যে ফিরে যায়।

এই শ্লোকের সাহিত্যিক সৌন্দর্যও অসাধারণ। অনাবৃত্তিম্ এবং আবৃত্তিম্ এই দুটি শব্দের পাশাপাশি ব্যবহার করে কৃষ্ণ একই সঙ্গে দুটি বিপরীত গন্তব্যকে আমাদের সামনে স্থাপন করেছেন। একটি হলো ফিরে আসা এবং অন্যটি হলো আর ফিরে না আসা। দুটি শব্দের মধ্যে কেবল একটি নিষেধাত্মক অংশের পার্থক্য থাকলেও তাদের দার্শনিক পরিণতি সম্পূর্ণ বিপরীত। এই ক্ষুদ্র ভাষাগত পার্থক্যের মধ্যে সংসার এবং মোক্ষের বিরাট দার্শনিক ব্যবধান প্রকাশ পেয়েছে।

বাস্তব জীবনের একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একজন মানুষ প্রতিবার রাগের সময় নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। রাগের কারণে সে কঠিন কথা বলল, সম্পর্ক নষ্ট হলো, পরে অনুতপ্ত হলো এবং কিছুদিন পর আবার একই পরিস্থিতিতে একই আচরণ করল। এই পুনরাবৃত্তি একটি মানসিক আবৃত্তি। কিন্তু একদিন সে নিজের রাগকে সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শিখল। রাগের মুহূর্তে সে প্রতিক্রিয়া না দিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করল কেন সে এমন অনুভব করছে। ধীরে ধীরে তার পুরোনো প্রতিক্রিয়ার চক্র ভেঙে গেল। এই চক্র ভাঙার মধ্যেই অনাবৃত্তির একটি প্রতীকী রূপ দেখা যায়। অর্থাৎ মানুষ যখন নিজের অচেতন প্রবণতার বাইরে উঠে সচেতনতার আলোয় নিজেকে দেখতে শেখে, তখন সে পুরোনো পুনরাবৃত্তি থেকে মুক্ত হতে শুরু করে।

এই কারণে শ্লোকটি কেবল মৃত্যুর পরের জগত সম্পর্কে একটি শিক্ষা নয়। এটি মানুষের বর্তমান জীবন সম্পর্কেও একটি গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে। আমরা কি একই কামনা, একই ভয়, একই অহংকার এবং একই অজ্ঞতার মধ্যে বারবার ফিরে যাচ্ছি, নাকি আমরা নিজেদের চেতনার গভীরে প্রবেশ করে সেই চক্র অতিক্রম করার চেষ্টা করছি। গীতার দৃষ্টিতে সত্যিকারের আধ্যাত্মিক অগ্রগতি হলো এই পুনরাবৃত্তির প্রকৃতি বোঝা এবং তার কারণ অতিক্রম করা।

ভরতর্ষভ সম্বোধনটির মধ্যেও একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ভরতর্ষভ অর্থ ভরতবংশীয়দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। কৃষ্ণ অর্জুনকে এই নামে সম্বোধন করে যেন বোঝাচ্ছেন যে এই জ্ঞান গ্রহণ করার জন্য তার মধ্যে বিচক্ষণতা ও যোগ্যতা রয়েছে। জীবনের গভীরতম প্রশ্নের উত্তর গ্রহণের জন্য বাহ্যিক শক্তির চেয়ে অন্তর্দৃষ্টির শক্তি বেশি প্রয়োজন। তাই অর্জুনকে ভরতর্ষভ বলে সম্বোধন করা কেবল স্নেহ বা প্রশংসা নয়, বরং তাকে তার অন্তর্নিহিত সামর্থ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়াও।

সবশেষে বলা যায়, যত্র কালে ত্বনাবৃত্তিমাবৃত্তিং চৈব যোগিনঃ পদবন্ধটি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার জন্ম, মৃত্যু, পুনর্জন্ম, কর্ম, যোগ এবং মুক্তির দর্শনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বার উন্মুক্ত করে। আবৃত্তি হলো সেই চক্র যেখানে জীব বারবার ফিরে আসে। অনাবৃত্তি হলো সেই মুক্ত অবস্থা যেখানে আর ফিরে আসার প্রয়োজন থাকে না। কাল হলো সেই মহাজাগতিক পরিসর যার মধ্যে এই গতি সংঘটিত হয়। যোগী হলেন সেই সাধক যিনি নিজের চেতনাকে এমনভাবে প্রস্তুত করেন যাতে তার গতি পরম সত্যের দিকে হয়। এই সমগ্র শিক্ষার গভীরে রয়েছে একটি চিরন্তন সত্য। মানুষ কেবল বাহ্যিক জীবনের পরিবর্তনশীল ঘটনাবলির সমষ্টি নয়। তার অস্তিত্বের মধ্যে এমন এক চেতনার সম্ভাবনা রয়েছে যা জন্ম ও মৃত্যুর পরিবর্তনশীল চক্রকে অতিক্রম করতে পারে। তাই আবৃত্তি এবং অনাবৃত্তির শিক্ষা শেষ পর্যন্ত আমাদের সামনে দুটি জীবনদর্শন স্থাপন করে। একটি হলো অচেতন পুনরাবৃত্তির জীবন এবং অন্যটি হলো জ্ঞান, যোগ, আত্মসচেতনতা ও পরম সত্যের উপলব্ধির মাধ্যমে মুক্তির জীবন। গীতার এই শ্লোক সেই চিরন্তন যাত্রার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় যেখানে মানুষের সর্বোচ্চ গন্তব্য কেবল কোথাও পৌঁছানো নয়, বরং নিজের প্রকৃত স্বরূপকে উপলব্ধি করা।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 18, 2026 August 18, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি