ভগবদ্গীতা ৮.২৫ | ধূম, রাত্রি, দক্ষিণায়ণ ও পুনরাবর্তনের আধ্যাত্মিক তত্ত্ব
ধূমো রাত্রিস্তথা কৃষ্ণঃ যণ্মাসা দক্ষিণায়নম্।
তত্র চান্দ্রমসং জ্যোতির্যোগী প্রাপ্য নিবর্ততে।।২৫।।
অনুবাদঃ ধূম, রাত্রি, কৃষ্ণপক্ষ অথবা দক্ষিণায়নের ছয় মাস কালে দেহত্যাগ করে যোগী চন্দ্রলোকে গমনপূর্বক সুখভোগ করার পর পুনরায় মর্ত্যালোকে প্রত্যাবর্তন করেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায় অক্ষরব্রহ্মযোগের পঁচিশতম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আত্মার এক বিশেষ গতিপথের কথা বলেছেন। শ্লোকটি হলো ধূমো রাত্রিস্তথা কৃষ্ণঃ ষণ্মাসা দক্ষিণায়নম্ তত্র চান্দ্রমসং জ্যোতির্যোগী প্রাপ্য নিবর্ততে। এই শ্লোকের মধ্যে ধূম, রাত্রি, কৃষ্ণপক্ষ এবং দক্ষিণায়ণের মতো শব্দ ব্যবহৃত হলেও এগুলোর তাৎপর্য কেবল বাহ্যিক সময় বা প্রকৃতির কোনো অবস্থাকে বোঝানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে নিহিত রয়েছে মানুষের চেতনা, কর্মফল, আধ্যাত্মিক অগ্রগতি, জ্ঞান ও পুনরাবর্তনের এক গভীর দার্শনিক ব্যাখ্যা। পূর্ববর্তী শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অগ্নি, জ্যোতি, দিবা, শুক্লপক্ষ এবং উত্তরায়ণের মাধ্যমে যে আলোকময় গতিপথের কথা বলেছেন, এই শ্লোকে তার বিপরীত একটি গতিপথ তুলে ধরেছেন। সেই পথের শেষে যোগী চন্দ্রময় জ্যোতি লাভ করলেও পুনরায় ফিরে আসে। তাই এই শ্লোকের কেন্দ্রীয় শিক্ষা হলো উচ্চতর কোনো অভিজ্ঞতা বা পুণ্যফল লাভ করাই চূড়ান্ত মুক্তি নয়। যতক্ষণ চেতনা কর্ম ও পরিবর্তনশীলতার সঙ্গে আবদ্ধ থাকে, ততক্ষণ প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা থেকে যায়।
প্রথম শব্দ ধূমো এসেছে ধূমঃ থেকে। সংস্কৃত ধূম শব্দের আক্ষরিক অর্থ ধোঁয়া। ধোঁয়া সাধারণত আগুনের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে আগুনের প্রকৃত আলোকে আচ্ছন্নও করে। এই কারণে ধূম শব্দটির মধ্যে একটি গভীর প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। আগুন আছে, আলো আছে, কিন্তু ধোঁয়ার কারণে সেই আলো পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে না। মানুষের আধ্যাত্মিক অবস্থার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। আত্মস্বরূপের জ্ঞান মানুষের অন্তরে সম্ভাব্যভাবে উপস্থিত থাকলেও অহংকার, কামনা, বাসনা, আসক্তি, ভয় এবং অজ্ঞতার আবরণ সেই জ্ঞানকে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হতে দেয় না। তাই ধূমকে আধ্যাত্মিক অস্বচ্ছতার প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। মানুষ সত্যের কাছাকাছি থেকেও সত্যকে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। তার অন্তরে জ্ঞানের আগুন জ্বললেও চিত্তের ধোঁয়া সেই আলোকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
এরপর এসেছে রাত্রি শব্দটি। রাত্রির আক্ষরিক অর্থ রাত বা অন্ধকার। কিন্তু ভারতীয় দর্শনে অন্ধকার কেবল সূর্যালোকের অনুপস্থিতি নয়। অন্ধকার বহুক্ষেত্রে অবিদ্যা, অপ্রকাশ এবং আত্মস্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞতার প্রতীক। মানুষের জীবনে এমন অনেক সময় আসে যখন বাহ্যিক জগত সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও নিজের প্রকৃত সত্তা সম্পর্কে সে অজ্ঞ থাকে। সেই অবস্থাই এক অর্থে আধ্যাত্মিক রাত্রি। উপনিষদীয় ভাবধারায় অন্ধকার থেকে আলোর দিকে অগ্রসর হওয়া জ্ঞানের পথে অগ্রসর হওয়ার প্রতীক। তাই এই শ্লোকে রাত্রি শব্দটি এমন এক চেতনার অবস্থাকে নির্দেশ করতে পারে যেখানে সত্যের আলো এখনো সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়নি।
এরপর এসেছে কৃষ্ণ শব্দটি। এখানে কৃষ্ণ শব্দটি মূলত কৃষ্ণপক্ষকে নির্দেশ করে। কৃষ্ণপক্ষ হলো পূর্ণিমার পর চাঁদের আলো ক্রমশ হ্রাস পাওয়ার সময়। এর বিপরীতে শুক্লপক্ষে চাঁদের আলো ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। তাই কৃষ্ণপক্ষের মধ্যে ক্ষয়, হ্রাস এবং আলোর সংকোচনের একটি প্রতীকী ধারণা রয়েছে। গীতার পূর্ববর্তী শ্লোকে শুক্লপক্ষ এবং এই শ্লোকে কৃষ্ণপক্ষের উল্লেখের মাধ্যমে দুটি বিপরীত আধ্যাত্মিক গতিকে পাশাপাশি রাখা হয়েছে। শুক্লপক্ষ যেখানে আলোর বৃদ্ধি নির্দেশ করে, কৃষ্ণপক্ষ সেখানে দৃশ্যমান আলোর হ্রাসের প্রতীক। মানুষের চেতনার ক্ষেত্রেও এমন হতে পারে যে জ্ঞান অর্জনের পরও যদি সে পুনরায় আসক্তি ও অজ্ঞতার দিকে ফিরে যায়, তবে তার অন্তর্গত আলোর প্রকাশ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে পড়ে।
ষণ্মাসা শব্দটি গঠিত হয়েছে ষট্ এবং মাস শব্দের সমন্বয়ে। ষট্ অর্থ ছয় এবং মাস অর্থ মাস। অর্থাৎ ষণ্মাসা বলতে ছয় মাস বোঝানো হয়েছে। এই ছয় মাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষিণায়ন শব্দটি। দক্ষিণায়ন গঠিত হয়েছে দক্ষিণ এবং অয়ন শব্দের সমন্বয়ে। দক্ষিণ অর্থ দক্ষিণ দিক এবং অয়ন অর্থ গমন বা গতিপথ। তাই দক্ষিণায়নের আক্ষরিক অর্থ দক্ষিণমুখী গতি। বৈদিক ও প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বৈদিক ধারণায় এটি সূর্যের দক্ষিণমুখী আপাত গতির সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু গীতার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায় দক্ষিণায়নকে শুধু একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সময়কাল হিসেবে দেখলে এর গভীরতা সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা যায় না। এটি এমন একটি প্রতীকী পথ, যার সঙ্গে প্রত্যাবর্তনের ধারণা যুক্ত।
তত্র শব্দের অর্থ সেখানে। অর্থাৎ পূর্বে বর্ণিত গতিপথের ফলস্বরূপ যে অবস্থায় বা যে গন্তব্যে যোগী পৌঁছায়, তারই দিকে এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এরপর এসেছে চান্দ্রমসং শব্দটি। এটি চন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিশেষণ। চন্দ্র শব্দের অর্থ চাঁদ এবং চান্দ্রমসং অর্থ চন্দ্রসম্পর্কিত বা চন্দ্রময়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্যোতিঃ শব্দটি। জ্যোতি অর্থ আলো, দীপ্তি বা আলোক। ভারতীয় আধ্যাত্মিক সাহিত্যে জ্যোতি একটি অত্যন্ত গভীর প্রতীক। এটি কখনো বাহ্যিক আলো, কখনো জ্ঞান, কখনো চেতনা এবং কখনো পরম সত্যের দীপ্তিকে বোঝায়। কিন্তু এই শ্লোকে চান্দ্রমসং জ্যোতি বলতে যে জ্যোতির কথা বলা হয়েছে তা পরম ব্রহ্মজ্যোতির সমার্থক নয়। এটি চন্দ্রলোকীয় বা সীমিত এক আলোকপ্রাপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।
শ্লোকের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো যোগী। যোগী বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায় যিনি যোগসাধনা করেন এবং নিজের চিত্তকে সংযত ও একাগ্র করার চেষ্টা করেন। যোগ শব্দের সঙ্গে যুজ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। এর মধ্যে সংযোগ, একত্রতা এবং নিয়ন্ত্রণের ভাব নিহিত। কিন্তু এই শ্লোকে যোগী শব্দটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক সত্য প্রকাশ করে। কেবল যোগসাধনা করলেই যে চূড়ান্ত মুক্তি লাভ হবে তা নয়। সাধনার প্রকৃতি, চেতনার পরিশুদ্ধতা এবং আত্মস্বরূপের জ্ঞানও গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাধক উচ্চতর কোনো অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন, কিন্তু যদি তার কর্মসংস্কার এবং আসক্তির মূল সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন না হয়, তাহলে তাকে আবার প্রত্যাবর্তন করতে হতে পারে।
প্রাপ্য শব্দের অর্থ হলো লাভ করে বা অর্জন করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিবর্ততে। নিবর্ততে এসেছে নি এবং বৃত্ ধাতুর ভাব থেকে। এর অর্থ ফিরে আসে, প্রত্যাবর্তন করে বা পুনরায় ফিরে যায়। এই একটি শব্দই পুরো শ্লোকের দার্শনিক ফলাফলকে স্পষ্ট করে দেয়। যোগী চন্দ্রময় জ্যোতি লাভ করে, কিন্তু তারপরও নিবর্ততে অর্থাৎ ফিরে আসে। এখানে ফিরে আসা বলতে শুধু একটি স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া বোঝানো হয় না। গীতার কর্মফল ও পুনর্জন্মের দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে এটি সংসারচক্রে প্রত্যাবর্তনের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ যে সাধনা বা কর্মফল এখনো চূড়ান্ত মুক্তি এনে দেয়নি, তার ফল ভোগের পর জীবের পুনরায় কর্ম ও জন্মের ধারায় ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে।
এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা এখানেই নিহিত যে উচ্চতর কোনো অভিজ্ঞতা এবং চূড়ান্ত মুক্তি একই বিষয় নয়। মানুষ পুণ্যকর্মের মাধ্যমে উচ্চতর কোনো অবস্থায় পৌঁছাতে পারে, ধ্যানের মাধ্যমে গভীর প্রশান্তি লাভ করতে পারে, আধ্যাত্মিক অনুভূতিও পেতে পারে, কিন্তু যদি তার অজ্ঞতার মূল সম্পূর্ণরূপে দূর না হয় তবে সেই অভিজ্ঞতা স্থায়ী মুক্তিতে পরিণত নাও হতে পারে। চন্দ্রের আলো অত্যন্ত সুন্দর ও কোমল, কিন্তু চন্দ্রের আলো নিজস্ব দীপ্তি নয়। প্রতীকীভাবে এটি এমন এক জ্ঞানের সঙ্গে তুলনা করা যায় যা এখনো পরম সত্যের প্রত্যক্ষ উপলব্ধিতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই চান্দ্রমসং জ্যোতি অর্জন করেও যোগীর নিবর্তন ঘটে।
ধূম, রাত্রি, কৃষ্ণপক্ষ এবং দক্ষিণায়নকে একত্রে দেখলে একটি ধারাবাহিক প্রতীকী চিত্র তৈরি হয়। ধূম হলো সত্যকে আচ্ছন্ন করা অস্পষ্টতা। রাত্রি হলো সেই অপ্রকাশের গভীরতা। কৃষ্ণপক্ষ হলো প্রকাশমান আলোর ক্রমশ ক্ষয়। দক্ষিণায়ন হলো সেই চেতনার প্রত্যাবর্তনশীল গতি। তারপর আসে চন্দ্রময় জ্যোতি, যা অন্ধকারের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়, বরং সীমিত এক আলোকপ্রাপ্তি। আর শেষে নিবর্ততে জানিয়ে দেয় যে সেই অবস্থাও চূড়ান্ত নয়। এই ধারাবাহিকতা মানুষের অন্তর্জীবনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মানুষ কখনো সত্যের আভাস পায়, কখনো সেই সত্য অস্পষ্ট হয়ে যায়, কখনো তার অন্তরের আলো ক্ষীণ হয়ে পড়ে এবং কখনো পুরোনো অভ্যাস ও আসক্তির কাছে আবার ফিরে যায়।
এই দৃষ্টিতে ধূম শব্দটি মানুষের মানসিক জীবনের একটি অসাধারণ প্রতীক। যেমন ধোঁয়ায় আগুন ঢাকা পড়ে যায়, তেমনি মানুষের চেতনার মধ্যেও অহংকার ও বাসনা জ্ঞানের আলোকে আচ্ছন্ন করে। রাত্রি সেই অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে মানুষ নিজের অন্তর্গত সত্য দেখতে পায় না। কৃষ্ণপক্ষ নির্দেশ করে সেই জ্ঞানের আলো ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে যাওয়া। দক্ষিণায়ন বোঝায় চেতনার এমন একটি গতিপথ যেখানে জীব আবার বাহ্যিকতা ও কর্মফলের জগতে ফিরে যায়। এই ব্যাখ্যায় শ্লোকটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে অত্যন্ত গভীরভাবে যুক্ত হয়ে ওঠে।
ধরা যাক একজন মানুষ কোনো এক সময় গভীর আত্মচিন্তা করে উপলব্ধি করলেন যে জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য কেবল অর্থ, সম্মান বা ইন্দ্রিয়সুখ নয়। তিনি কিছুদিন ধ্যান করলেন, নিজের আচরণ পরিবর্তন করলেন এবং অন্তরে শান্তি অনুভব করলেন। কিন্তু পরে পুরোনো অহংকার, আসক্তি ও বাসনা আবার তাকে গ্রাস করল। তিনি আবার সেই পুরোনো জীবনে ফিরে গেলেন। এই ঘটনাকে প্রতীকীভাবে ধূম থেকে জ্যোতি এবং জ্যোতি থেকে নিবর্তনের একটি মানবিক উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। তিনি আলো দেখেছিলেন, কিন্তু আলোর উৎসে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেননি।
বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। বেদান্তের চূড়ান্ত অনুসন্ধান কোনো নির্দিষ্ট লোক বা সাময়িক সুখ লাভ নয়, বরং আত্মা ও ব্রহ্মের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করা। যে অভিজ্ঞতা পরিবর্তনশীল, যে অবস্থার শুরু ও শেষ আছে এবং যা কর্মফলের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা চূড়ান্ত সত্য হতে পারে না। তাই চন্দ্রলোকীয় জ্যোতিও যদি কর্মফলনির্ভর হয়, তবে তা মুক্তির চূড়ান্ত অবস্থা নয়। অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে চূড়ান্ত সত্য হলো ব্রহ্ম, যেখানে গন্তব্য ও গন্তার পৃথকত্ব বিলীন হয়ে যায়। সেখানে কোনো নির্দিষ্ট লোকের দিকে যাত্রা করার প্রশ্নও শেষ পর্যন্ত অতিক্রান্ত হয়।
যোগদর্শনের আলোকে এই শ্লোককে চিত্তের গতির দিক থেকেও বোঝা যায়। যতক্ষণ চিত্তের মধ্যে সংস্কার, বাসনা এবং অস্থিরতা সক্রিয় থাকে, ততক্ষণ চেতনা বিভিন্ন অবস্থার মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। যোগের লক্ষ্য চিত্তকে এমনভাবে স্থিত করা যাতে তার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করা যায়। সেই উপলব্ধি সম্পূর্ণ না হলে পুরোনো প্রবণতা আবার ফিরে আসতে পারে। তাই নিবর্ততে শব্দটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পুনরাবৃত্তিরও একটি গভীর প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। মানুষ বারবার একই ভুল করে, একই আসক্তির কাছে ফিরে যায় এবং একই দুঃখের কারণ সৃষ্টি করে। এই পুনরাবৃত্তির অন্তর্গত কারণকে চিনতে পারাই প্রকৃত সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটির সৌন্দর্য অসাধারণ। ধোঁয়া রহস্য ও অস্পষ্টতার প্রতীক, রাত অজানা ও অন্ধকারের প্রতীক, কৃষ্ণপক্ষ ক্ষয় ও পরিবর্তনের প্রতীক, দক্ষিণায়ন প্রত্যাবর্তনের প্রতীক এবং চন্দ্রজ্যোতি কোমল অথচ সীমিত আলোর প্রতীক। এই প্রতীকগুলো একত্রে মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রার একটি কাব্যিক চিত্র নির্মাণ করে। এখানে অন্ধকার সম্পূর্ণ শূন্যতা নয় এবং আলোও চূড়ান্ত মুক্তি নয়। বরং আলো ও অন্ধকারের মাঝখানে মানুষের যাত্রা, তার অর্জন এবং তার পুনরায় ফিরে আসার প্রবণতাই মূল বিষয়।
এই শ্লোকের সঙ্গে পূর্ববর্তী শ্লোকের সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে অগ্নি, জ্যোতি, দিবা, শুক্লপক্ষ এবং উত্তরায়ণের কথা বলা হয়েছে। এখানে এসেছে ধূম, রাত্রি, কৃষ্ণপক্ষ এবং দক্ষিণায়ন। একদিকে রয়েছে প্রকাশ, ঊর্ধ্বগতি এবং অপ্রত্যাবর্তনের প্রতীক। অন্যদিকে রয়েছে আচ্ছন্নতা, আলোর হ্রাস এবং প্রত্যাবর্তনের প্রতীক। এই বৈপরীত্যের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ বোঝাতে চান যে জীবনের আধ্যাত্মিক গতি একরকম নয়। মানুষের চেতনা কোন দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং তার সাধনার চূড়ান্ত ভিত্তি কোথায় প্রতিষ্ঠিত তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে দক্ষিণায়নকে কেবল অশুভ এবং উত্তরায়ণকে কেবল শুভ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এখানে বিষয়টি নৈতিক ভালো এবং মন্দের সরল বিভাজন নয়। বরং দুটি ভিন্ন আধ্যাত্মিক গতিপথের কথা বলা হয়েছে। দক্ষিণায়নের সঙ্গে যুক্ত পথও একটি ফল প্রদান করে। যোগী চান্দ্রমসং জ্যোতি লাভ করে। কিন্তু সেই ফল অনন্ত নয়। তাই সমস্যা দক্ষিণায়নের মধ্যে কোনো নৈতিক অশুভতা নয়। সমস্যাটি হলো তার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যাবর্তনশীলতা। যে অবস্থায় পৌঁছে আবার ফিরে আসতে হয়, তা চূড়ান্ত মুক্তির সমার্থক হতে পারে না।
এই শ্লোক আমাদের একটি গভীর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমরা কি শুধু আলো চাই, নাকি আলোর উৎসকে জানতে চাই। আমরা কি সাময়িক শান্তি চাই, নাকি এমন জ্ঞান চাই যা আমাদের অন্তর্গত অজ্ঞতার মূলকে দূর করে। আমরা কি কোনো উচ্চতর অভিজ্ঞতা চাই, নাকি এমন উপলব্ধি চাই যেখানে আর প্রত্যাবর্তনের প্রয়োজন থাকে না। গীতার দৃষ্টিতে আধ্যাত্মিকতার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য শুধু কোনো সুন্দর অভিজ্ঞতা অর্জন করা নয়। উদ্দেশ্য হলো সেই জ্ঞান অর্জন করা যা জীবকে অনিত্যতার চক্র অতিক্রম করে অবিনশ্বর সত্যে প্রতিষ্ঠিত করে।
অতএব ধূমো রাত্রিস্তথা কৃষ্ণঃ ষণ্মাসা দক্ষিণায়নম্ এই পদসমষ্টি কেবল একটি প্রাচীন জ্যোতির্বৈদিক ধারণার বর্ণনা নয়। এটি মানুষের চেতনার এক গভীর মানচিত্র। ধূম আমাদের দেখায় জ্ঞানের উপর অজ্ঞতার আবরণ। রাত্রি দেখায় সত্যের অপ্রকাশ। কৃষ্ণপক্ষ দেখায় আলোর ক্ষয়। দক্ষিণায়ন দেখায় প্রত্যাবর্তনের গতি। চান্দ্রমসং জ্যোতি দেখায় সীমিত আলোকপ্রাপ্তি এবং নিবর্ততে জানিয়ে দেয় যে সেই আলোকপ্রাপ্তিও চূড়ান্ত মুক্তি নয়।
শেষ বিচারে এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রায় সাময়িক আলো এবং চূড়ান্ত জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য উপলব্ধি করা। ধোঁয়া সরিয়ে আগুনকে দেখতে হবে, রাত অতিক্রম করে দিনের আলোয় পৌঁছাতে হবে এবং ক্ষয়িষ্ণু আলোর পরিবর্তে এমন জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে যা নিজেই অবিনশ্বর। চন্দ্রময় জ্যোতি সুন্দর হতে পারে, কিন্তু গীতার চূড়ান্ত আহ্বান সেই পরম জ্যোতির দিকে, যেখানে আর প্রত্যাবর্তন নেই। তাই ধূমো রাত্রিস্তথা কৃষ্ণঃ ষণ্মাসা দক্ষিণায়নম্ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আধ্যাত্মিক জীবনের প্রকৃত সাফল্য কোনো সাময়িক উচ্চ অবস্থায় পৌঁছানো নয়, বরং অজ্ঞতা, আসক্তি ও কর্মবন্ধনের সীমা অতিক্রম করে নিজের অবিনশ্বর স্বরূপকে উপলব্ধি করা। সেই উপলব্ধিই মানুষের যাত্রাকে প্রত্যাবর্তনের পথ থেকে মুক্তির পথে নিয়ে যায়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!