সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ৮.২৭ | শুক্ল-কৃষ্ণ গতির জ্ঞান, মোহমুক্তি ও সর্বকালে যোগে যুক্ত থাকার শিক্ষা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
নৈতে সৃতী পার্থ জানন্ যোগী মুহ্যতি কশ্চন।তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু যোগযুক্তো ভবার্জুন।।২৭।।
নৈতে সৃতী পার্থ জানন্ যোগী মুহ্যতি কশ্চন।
তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু যোগযুক্তো ভবার্জুন।।২৭।।

অনুবাদঃ হে পার্থ! ভক্তেরা এই দুটি মার্গ সম্বন্ধে অবগত হয়ে কখনও মোহগ্রস্ত হন না। অতএব হে অর্জুন! তুমি ভক্তিযোগ অবলম্বন কর।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ের সাতাশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, “নৈতে সৃতী পার্থ জানন্ যোগী মুহ্যতি কশ্চন। তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু যোগযুক্তো ভব অর্জুন।” এই শ্লোকটি মানুষের জীবন, মৃত্যু, কর্ম, জ্ঞান, মোহ এবং আধ্যাত্মিক সাধনার মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক স্থাপন করে। এর সরল অর্থ হলো, হে পার্থ, এই দুই গতির প্রকৃতি জেনে কোনো যোগী মোহগ্রস্ত হয় না। অতএব হে অর্জুন, সকল সময়ে যোগে যুক্ত থাকো। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্যে নিহিত দর্শন অত্যন্ত গভীর। এখানে শ্রীকৃষ্ণ শুধু মৃত্যুর পর জীবের সম্ভাব্য গতির কথা বলছেন না, বরং মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করলে অজ্ঞতা ও মোহ অতিক্রম করে নিজের প্রকৃত অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে পারে, সেই পথও নির্দেশ করছেন।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো সৃতী। সৃতি শব্দটি সংস্কৃত সৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। সৃ ধাতুর মূল অর্থ হলো চলা, গমন করা, প্রবাহিত হওয়া বা এগিয়ে যাওয়া। সেই অর্থ থেকে সৃতি বলতে বোঝায় গতি, চলার ধারা বা কোনো নির্দিষ্ট পথে অগ্রসর হওয়া। এখানে সৃতি দ্বিবচন রূপে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ দুটি গতি বা দুটি পথের কথা বলা হয়েছে। অষ্টম অধ্যায়ের পূর্ববর্তী শ্লোকগুলির আলোচনার ভিত্তিতে এই দুই গতি হলো শুক্লগতি এবং কৃষ্ণগতি। একদিকে রয়েছে আলো ও ঊর্ধ্বমুখী চেতনার প্রতীকী পথ, অন্যদিকে রয়েছে অন্ধকার ও পুনরাবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত পথ। তাই সৃতি শব্দটি শুধু একটি বাহ্যিক রাস্তা বোঝায় না। এটি জীবনের গতিপথ এবং চেতনার যাত্রাকেও নির্দেশ করে।

পার্থ শব্দটি অর্জুনের একটি বিশেষ নাম। পৃথা ছিলেন কুন্তীর আরেক নাম এবং পৃথার পুত্র হওয়ার কারণে অর্জুন পার্থ নামে পরিচিত। গীতায় কৃষ্ণ যখন অর্জুনকে পার্থ বলে সম্বোধন করেন, তখন সেই সম্বোধনের মধ্যে যেমন স্নেহ রয়েছে, তেমনি রয়েছে গভীর মানবিক আবেদন। এখানে কৃষ্ণ যেন অর্জুনকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে সে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে থাকা একজন যোদ্ধা নয়, বরং জীবনের গভীর সত্য অনুসন্ধানের জন্য আহ্বানপ্রাপ্ত একজন মানুষ। তাই এই সম্বোধন সমগ্র মানবজাতির প্রতিও একটি আধ্যাত্মিক আহ্বান হিসেবে ধরা যায়।

জানন্ শব্দটি জ্ঞান বা জানা অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মূল রয়েছে সংস্কৃত জ্ঞা ধাতুতে, যার অর্থ জানা, উপলব্ধি করা বা সত্যকে চিনতে পারা। এখানে জানা বলতে শুধু কোনো তথ্য মুখস্থ করা বোঝায় না। একজন ব্যক্তি যদি জানে যে জীবনের দুটি পথ রয়েছে, সেটি সাধারণ তথ্যগত জ্ঞান। কিন্তু সেই পথগুলির প্রকৃতি, কারণ, ফল এবং মানুষের চেতনার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক উপলব্ধি করা হলো গভীর জ্ঞান। গীতার দৃষ্টিতে প্রকৃত জ্ঞান এমন একটি উপলব্ধি যা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করে এবং তাকে মোহের বন্ধন থেকে মুক্ত করে।

এরপর আসে যোগী শব্দটি। যোগী শব্দটি যোগ থেকে এসেছে এবং যোগ শব্দটির মূল রয়েছে যুজ ধাতুতে। যুজ ধাতুর অর্থ হলো যুক্ত করা, সংযুক্ত করা, নিয়োজিত করা বা একত্র করা। সেই অর্থে যোগী হলেন এমন ব্যক্তি যিনি নিজের মন, বুদ্ধি, কর্ম এবং চেতনাকে একটি উচ্চতর সত্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। গীতার যোগী কেবল ধ্যান বা শারীরিক অনুশীলনে অভ্যস্ত ব্যক্তি নন। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের অন্তরের ভারসাম্য ও সত্যচেতনা বজায় রাখার চেষ্টা করেন। তাঁর কাছে যোগ কোনো বিচ্ছিন্ন সাধনা নয়, বরং জীবনযাপনের একটি সম্পূর্ণ পদ্ধতি।

মুহ্যতি শব্দটি এসেছে মুহ্ ধাতু থেকে। এর অর্থ হলো মোহগ্রস্ত হওয়া, বিভ্রান্ত হওয়া, সত্যকে ভুলভাবে দেখা বা বুদ্ধির স্থিরতা হারানো। গীতার দর্শনে মোহ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। মানুষ যখন অনিত্যকে নিত্য বলে মনে করে, দেহকে আত্মা বলে মনে করে, ক্ষণস্থায়ী সুখকে চূড়ান্ত সুখ বলে ধরে নেয় এবং নিজের প্রকৃত স্বরূপকে ভুলে যায়, তখন সে মোহের মধ্যে আবদ্ধ হয়। তাই মুহ্যতি শব্দটি শুধু সাধারণ বিভ্রান্তি বোঝায় না। এটি মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে ভুল ধারণার প্রতীক। কৃষ্ণ বলছেন, যে যোগী জীবনের গতির প্রকৃতি জানে, সে এই মোহে সহজে পতিত হয় না।

কশ্চন শব্দের অর্থ হলো কেউ বা কোনো ব্যক্তি। এখানে যোগী এবং মোহের সম্পর্কটি স্পষ্ট করা হয়েছে। যে যোগী প্রকৃত জ্ঞান লাভ করেছে, সে মোহগ্রস্ত হয় না। এর অর্থ এই নয় যে যোগীর জীবনে কখনো দুঃখ, ভয় বা কঠিন পরিস্থিতি আসবে না। বরং এর অর্থ হলো সে এসব পরিস্থিতির মধ্যে নিজের অন্তর্নিহিত সত্যকে সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলে না। সাধারণ মানুষ পরিস্থিতির দ্বারা পরিচালিত হয়, কিন্তু যোগী পরিস্থিতিকে প্রত্যক্ষ করে এবং তার মধ্যে স্থির থাকার চেষ্টা করে। এটাই যোগের মানসিক শক্তি।

তস্মাৎ শব্দটির অর্থ অতএব বা তাই। এই ছোট শব্দটি শ্লোকটির যুক্তিকে সম্পূর্ণ করে। কৃষ্ণ প্রথমে বলেন যে দুই গতির প্রকৃতি জানলে যোগী মোহগ্রস্ত হয় না। তারপর সেই জ্ঞান থেকে একটি জীবনব্যাপী নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশ হলো সর্বেষু কালেষু যোগযুক্তো ভব। অর্থাৎ সকল সময়ে যোগে যুক্ত থাকো। এখানে জ্ঞান কোনো নিষ্ক্রিয় বিষয় নয়। জ্ঞান যখন সত্য উপলব্ধিতে পরিণত হয়, তখন তা মানুষের জীবনযাত্রাকে পরিবর্তন করে। এই কারণে শ্লোকটি জ্ঞান থেকে সাধনা এবং উপলব্ধি থেকে জীবনযাপনের দিকে অগ্রসর হয়।

সর্বেষু কালেষু শব্দবন্ধের মধ্যে শ্লোকটির অন্যতম গভীর শিক্ষা নিহিত রয়েছে। সর্বেষু অর্থ সকল এবং কালেষু অর্থ সময়সমূহে। অর্থাৎ সুখের সময়ে যেমন যোগে থাকতে হবে, তেমনি দুঃখের সময়েও যোগে থাকতে হবে। সাফল্যের সময়ে যেমন আত্মসচেতন থাকতে হবে, তেমনি ব্যর্থতার সময়েও নিজের কেন্দ্র হারানো যাবে না। জীবনের কোনো একটি বিশেষ মুহূর্তে যোগী হওয়া যথেষ্ট নয়। যোগকে জীবনের অবিচ্ছিন্ন চেতনা হিসেবে ধারণ করতে হবে। কৃষ্ণ তাই মৃত্যুর মুহূর্তে হঠাৎ আধ্যাত্মিক সচেতন হয়ে ওঠার পরিবর্তে সমগ্র জীবনকে যোগময় করে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন।

যোগযুক্তো শব্দটির মধ্যেও গভীর তাৎপর্য রয়েছে। যোগ অর্থ সংযোগ এবং যুক্ত অর্থ সংযুক্ত বা প্রতিষ্ঠিত। যোগযুক্ত হওয়া মানে নিজের মনকে সত্যের সঙ্গে, কর্মকে কর্তব্যের সঙ্গে, চেতনাকে ঈশ্বরের সঙ্গে এবং জীবনকে তার গভীর উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করা। যখন মানুষ নিজের সমস্ত কাজকে কেবল ব্যক্তিগত লাভ ও ক্ষতির দৃষ্টিতে বিচার করে, তখন তার চেতনা সংকুচিত হয়ে যায়। কিন্তু যখন সে কর্তব্যকে বৃহত্তর সত্যের অংশ হিসেবে দেখতে শেখে, তখন তার কর্মই যোগে পরিণত হয়। এই অর্থে যোগযুক্ত জীবন মানে সংসার থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং সংসারের মধ্যেই সচেতনভাবে অবস্থান করা।

ভব শব্দটি এসেছে ভূ ধাতু থেকে, যার অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা হয়ে ওঠা। এখানে ভব একটি নির্দেশ। কৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, যোগযুক্ত হয়ে ওঠো। এর মধ্যে একটি সক্রিয় সাধনার আহ্বান রয়েছে। মানুষ জন্মগতভাবে সম্পূর্ণ যোগী হয়ে জন্মায় না। তাকে নিজের মনকে প্রশিক্ষিত করতে হয়, নিজের আসক্তিকে চিনতে হয়, নিজের ভয়কে অতিক্রম করতে হয় এবং নিজের চেতনাকে ধীরে ধীরে স্থির করতে হয়। তাই যোগযুক্ত হওয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া।

এই শ্লোকের গভীর দার্শনিক অর্থ বুঝতে হলে এর পূর্ববর্তী আলোচনার দিকে তাকাতে হয়। অষ্টম অধ্যায়ে কৃষ্ণ মৃত্যুর সময়ের চেতনা, ব্রহ্মস্মরণ এবং জীবের গতির কথা বলেছেন। সেখানে শুক্লগতি এবং কৃষ্ণগতির কথা এসেছে। এগুলোকে শুধু বাহ্যিক সময় বা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনায় সীমাবদ্ধ করলে শ্লোকের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য সম্পূর্ণভাবে ধরা যায় না। আলো এখানে জ্ঞান ও চেতনার প্রতীক হতে পারে এবং অন্ধকার অজ্ঞতা ও আত্মবিস্মৃতির প্রতীক হতে পারে। সেই অর্থে দুই গতি মানুষের চেতনার দুই ধরনের প্রবণতাকেও নির্দেশ করে।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোককে আত্মজ্ঞান ও অবিদ্যার সম্পর্কের আলোকে বোঝা যায়। মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে দেহ, মন, ইন্দ্রিয় এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখে। এই ভুল পরিচয় থেকে জন্ম নেয় আসক্তি, ভয়, আকাঙ্ক্ষা এবং মোহ। আত্মজ্ঞান সেই ভুল পরিচয়কে ধীরে ধীরে দূর করে। তখন মানুষ বুঝতে পারে যে তার গভীরতম স্বরূপ ক্ষণস্থায়ী দেহ বা পরিবর্তনশীল মানসিক অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই উপলব্ধিই মোহের অবসানের পথ।

ভক্তির দৃষ্টিতে যোগযুক্ত হওয়ার অর্থ হলো ঈশ্বরের স্মরণে স্থিত থাকা। মানুষ যখন নিজের জীবনের কেন্দ্রকে কেবল নিজের ইচ্ছা, ভোগ এবং ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে স্থাপন করে, তখন তার চেতনা অস্থির হয়। কিন্তু যখন সে নিজের কর্ম ও জীবনকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করতে শেখে, তখন তার মধ্যে একটি গভীর শান্তি জন্মায়। কাজ তখন কেবল ব্যক্তিগত ফল পাওয়ার মাধ্যম থাকে না। কাজ হয়ে ওঠে সাধনা। স্মরণ হয়ে ওঠে ভক্তি এবং জীবন হয়ে ওঠে ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্র।

কর্মযোগের দৃষ্টিতেও এই শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যোগে যুক্ত থাকা মানে কর্ম ত্যাগ করা নয়। বরং কর্মের মধ্যে থেকেও নিজের অন্তর্নিহিত ভারসাম্য বজায় রাখা। একজন শিক্ষক যদি নিজের শিক্ষাদানকে কেবল জীবিকা হিসেবে না দেখে মানুষের বিকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন, একজন কৃষক যদি নিজের শ্রমকে জীবনধারণের পাশাপাশি একটি কর্তব্য হিসেবে দেখেন, একজন চিকিৎসক যদি সেবাকে নিজের পেশার গভীরতম উদ্দেশ্য হিসেবে উপলব্ধি করেন, তাহলে তাঁদের প্রত্যেকের দৈনন্দিন কর্ম যোগের রূপ নিতে পারে। এই অর্থে যোগ কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা সময়ের বিষয় নয়। যোগ হলো কর্মের মধ্যে চেতনার বিশুদ্ধতা।

মানবজীবনের বাস্তব ক্ষেত্রেও এই শ্লোকটির শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একই বিপদের মুখে দুইজন মানুষের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে। একজন আতঙ্কে নিজের বিবেচনাশক্তি হারিয়ে ফেলতে পারেন, অন্যজন পরিস্থিতিকে গ্রহণ করে শান্তভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বাহ্যিক পরিস্থিতি একই থাকলেও তাদের অন্তর্গত চেতনার অবস্থান আলাদা। জ্ঞান ও আত্মসচেতনতা মানুষকে পরিস্থিতির দাস না হয়ে পরিস্থিতির সাক্ষী হতে সাহায্য করে। গীতার ভাষায় এই স্থিরতা যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

মৃত্যুর প্রসঙ্গেও শ্লোকটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ মানুষের কাছে মৃত্যু অজানা বলে ভয়ের কারণ হতে পারে। কিন্তু যোগী জীবনের অনিত্যতা সম্পর্কে সচেতন। সে জানে যে দেহ পরিবর্তনশীল এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে মৃত্যু তার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা কোনো ঘটনা নয়। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই সে পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করেছে। তাই মৃত্যুর সময়ের স্থিরতা আসলে সারা জীবনের সাধনার ফল। যে ব্যক্তি জীবনে নিজের মনকে সংযত করতে শেখেনি, তার পক্ষে মৃত্যুর মুহূর্তে সম্পূর্ণ স্থির থাকা কঠিন। এই কারণে কৃষ্ণ বলেন, সর্বেষু কালেষু যোগযুক্তো ভব।

এই শিক্ষাকে একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। একজন যাত্রী যদি অপরিচিত কোনো শহরে পৌঁছে দুটি রাস্তার সামনে দাঁড়ায় এবং কোন রাস্তা কোথায় যায় তা না জানে, তাহলে সে সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারে। কিন্তু যে যাত্রী আগে থেকেই পথের প্রকৃতি জানে, সে বাহ্যিক সৌন্দর্য বা সাময়িক আকর্ষণে ভুল পথে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। মানবজীবনও এমন একটি যাত্রা। আমাদের সামনে অসংখ্য আকর্ষণ, ভয়, ইচ্ছা এবং সিদ্ধান্তের পথ রয়েছে। প্রকৃত জ্ঞান আমাদের সেই পথগুলির প্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করে এবং যোগ আমাদের গন্তব্যের কথা ভুলে যেতে দেয় না।

সাহিত্যিক ও প্রতীকী দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সৃতি এখানে মানুষের অস্তিত্বের যাত্রার প্রতীক। জ্ঞান হলো সেই যাত্রাকে বোঝার আলো। মোহ হলো পথ হারিয়ে ফেলার অবস্থা। যোগ হলো নিজের কেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা। সময় হলো সেই ক্ষেত্র যার মধ্য দিয়ে জীবনের সমগ্র অভিজ্ঞতা প্রবাহিত হয়। আর কৃষ্ণের নির্দেশ হলো এই সমস্ত পরিবর্তনের মধ্যেও চেতনার গভীর সত্যকে ধরে রাখা। ফলে শ্লোকটি কেবল ধর্মীয় উপদেশ নয়, মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটি সার্বজনীন বক্তব্য হয়ে ওঠে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এই যে, আধ্যাত্মিকতা কোনো বিশেষ সময়ের জন্য সংরক্ষিত বিষয় নয়। মানুষ অনেক সময় মনে করে অবসর সময়ে সাধনা করবে, বার্ধক্যে ঈশ্বরকে স্মরণ করবে অথবা জীবনের শেষ পর্যায়ে আত্মিক সত্য অনুসন্ধান করবে। কিন্তু কৃষ্ণের নির্দেশ তার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি বলেন, সকল সময়ে যোগে যুক্ত থাকো। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই সাধনার ক্ষেত্র। আনন্দের মুহূর্তে অহংকার না করা, দুঃখের মুহূর্তে ভেঙে না পড়া, সাফল্যে নিজেকে হারিয়ে না ফেলা এবং ব্যর্থতায় নিজের মূল্যকে অস্বীকার না করা, সবই যোগচেতনার অংশ।

সবশেষে বলা যায়, “নৈতে সৃতী পার্থ জানন্ যোগী মুহ্যতি কশ্চন” শ্লোকটি মানুষের জীবনযাত্রাকে জ্ঞান, সচেতনতা এবং যোগের আলোকে দেখতে শেখায়। সৃতি আমাদের চলমান অস্তিত্বের কথা বলে। জানন্ আমাদের সত্যকে জানার আহ্বান জানায়। যোগী আমাদের সেই সত্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার আদর্শ দেখায়। মুহ্যতি আমাদের অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির বিপদ স্মরণ করিয়ে দেয়। আর সর্বেষু কালেষু যোগযুক্তো ভব আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সচেতনতার সাধনায় পরিণত করার নির্দেশ দেয়। এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো, মানুষ যদি জীবনের পথ ও তার অন্তর্নিহিত সত্যকে বুঝতে পারে, তবে বাহ্যিক পরিবর্তন তাকে সহজে বিভ্রান্ত করতে পারে না। জীবন ও মৃত্যু, সুখ ও দুঃখ, লাভ ও ক্ষতি সবকিছুর মধ্য দিয়েই সে নিজের অন্তর্গত কেন্দ্রকে ধরে রাখতে পারে। তাই যোগ কোনো নির্দিষ্ট সময়ের অনুশীলন নয়। যোগ হলো এমন এক জীবনচেতনা যেখানে মানুষ সর্বকালে সত্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং পরিবর্তনশীল জগতের মধ্যেও নিজের গভীরতম অস্তিত্বকে ভুলে যায় না।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 18, 2026 August 18, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি