ভগবদ্গীতা ৮.৪ | অধিভূত, অধিদৈব ও অধিযজ্ঞ তত্ত্বে জগত, চৈতন্য ও পরমাত্মার সম্পর্ক
অধিভুতং ক্ষরো ভাবঃ পুরুষশ্চাধিদৈবতম্।
অধিযজ্ঞোহহমেবাত্র দেহে দেহভৃতাং বর।।৪।।
অনুবাদঃ হে দেহধারীশ্রেষ্ঠ! নশ্বর জড়া প্রকৃতি অধিভূত। সূর্য, চন্দ্র আদি সমস্ত দেবতাদের সমষ্টিরূপ বিরাট পুরুষকে অধিদৈব বলা হয়। আর দেহীদের দেহান্তরগত অন্তর্যামী রূপে আমিই অধিযজ্ঞ।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ের চতুর্থ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের সামনে অস্তিত্বের এক গভীর রহস্য উন্মোচন করেছেন। শ্লোকটি হলো অধিভূতং ক্ষরো ভাবঃ পুরুষশ্চাধিদৈবতম্ অধিযজ্ঞোহমেবাত্র দেহে দেহভৃতাং বর। হে দেহধারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ অর্জুন, সমস্ত ক্ষয়শীল ভাব বা পরিবর্তনশীল প্রকাশই অধিভূত, পুরুষই অধিদৈব এবং এই দেহের মধ্যেই আমিই অধিযজ্ঞ। এই একটি শ্লোকের মধ্যে জগত, জীব, চৈতন্য, দেবতাতত্ত্ব, দেহ, কর্ম এবং পরমাত্মার পারস্পরিক সম্পর্ককে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীরভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
এই শ্লোকের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে প্রথমে অধিভূত শব্দটির দিকে তাকাতে হয়। অধিভূত শব্দটি গঠিত হয়েছে অধি এবং ভূত এই দুটি অংশের সমন্বয়ে। অধি অর্থ উপর, অধিকারে, সম্বন্ধে, আশ্রয়ে অথবা কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে। ভূত শব্দটি এসেছে ভূ ধাতু থেকে, যার মূল অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা, প্রকাশিত হওয়া বা উৎপন্ন হওয়া। সুতরাং অধিভূত বলতে প্রকাশিত বা অস্তিত্বপ্রাপ্ত জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়কে বোঝায়। কিন্তু কৃষ্ণ এখানে অধিভূতকে কেবল জগতের নাম হিসেবে ব্যবহার করেননি। তিনি বলেছেন অধিভূতং ক্ষরো ভাবঃ। অর্থাৎ যে সমস্ত প্রকাশিত ভাব ক্ষয়শীল, পরিবর্তনশীল এবং অনিত্য, সেগুলিই অধিভূত।
ক্ষর শব্দটি এসেছে ক্ষর্ ধাতু থেকে। এর মধ্যে ঝরে পড়া, ক্ষয় হওয়া, প্রবাহিত হওয়া এবং ধীরে ধীরে বিনষ্ট হওয়ার অর্থ রয়েছে। তাই ক্ষর হলো এমন কিছু যা স্থির নয় এবং চিরস্থায়ী নয়। ভাব শব্দের অর্থ অস্তিত্ব, অবস্থা, প্রকাশ বা কোনো নির্দিষ্ট রূপে বিদ্যমান থাকা। ফলে ক্ষরো ভাবঃ বলতে ক্ষয়শীল অস্তিত্ব বা পরিবর্তনশীল প্রকাশকে বোঝানো হয়েছে। আমাদের দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, আবেগ, চিন্তা, সম্পদ, সামাজিক পরিচয়, প্রকৃতি এবং দৃশ্যমান জগতের সমস্ত রূপ এই ক্ষর ভাবের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো জন্ম লাভ করে, বিকশিত হয়, পরিবর্তিত হয় এবং একসময় বিলীন হয়ে যায়।
এই সত্যটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনেই স্পষ্ট। একটি শিশু ধীরে ধীরে তরুণ হয় এবং পরে বৃদ্ধ হয়। শরীরের পরিবর্তন ঘটে, চিন্তার পরিবর্তন ঘটে, অনুভূতির পরিবর্তন ঘটে এবং মানুষের সামাজিক অবস্থানও পরিবর্তিত হয়। যে বাড়ি একসময় নতুন ছিল তা পুরোনো হয়। যে সভ্যতা একসময় শক্তিশালী ছিল তা একদিন ইতিহাসে পরিণত হয়। এমনকি পর্বত, নদী, নক্ষত্র এবং মহাজাগতিক ব্যবস্থাও পরিবর্তনের নিয়মের বাইরে নয়। এই পরিবর্তনশীলতার মধ্যেই ক্ষর ভাবের সত্য নিহিত। গীতা আমাদের জগতকে অস্বীকার করতে বলে না, বরং তার প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে শেখায়। যা পরিবর্তনশীল তাকে পরিবর্তনশীল হিসেবেই গ্রহণ করতে হবে এবং তাকে চিরস্থায়ী আশ্রয় মনে করা উচিত নয়।
এরপর আসে অধিদৈব শব্দটি। অধিদৈব শব্দের মধ্যে অধি এবং দৈবত এই দুটি ভাব রয়েছে। দৈবত শব্দটি দেব শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। দেব শব্দের মধ্যে দীপ্তি, আলো, জ্ঞান, ঐশ্বরিক শক্তি এবং প্রকাশের ভাব নিহিত। অধিদৈব তাই সেই স্তরকে নির্দেশ করে যা দেবতাত্মক বা বিশ্বব্যাপী নিয়ামক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃষ্ণ বলেন পুরুষশ্চাধিদৈবতম্। অর্থাৎ পুরুষই অধিদৈব। এখানে পুরুষ কোনো সাধারণ ব্যক্তি বা পুরুষজাতীয় মানুষকে বোঝায় না। ভারতীয় দর্শনে পুরুষ একটি গভীর চৈতন্যতাত্ত্বিক ধারণা। পুরুষ হলো সেই চৈতন্যসত্তা যার উপস্থিতিতে প্রকৃতির সমস্ত পরিবর্তন উপলব্ধ হয়।
সাংখ্য দর্শনে পুরুষ এবং প্রকৃতি দুটি মৌলিক তত্ত্ব। প্রকৃতি পরিবর্তনশীল, আর পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ এবং সাক্ষী। প্রকৃতির মধ্যে দেহ, মন, ইন্দ্রিয় এবং সমস্ত পরিবর্তনশীল প্রকাশ অন্তর্ভুক্ত। পুরুষ নিজে পরিবর্তিত না হয়ে সেই পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করে। গীতার দৃষ্টিতে পুরুষতত্ত্ব আরও গভীর হয়ে সর্বব্যাপী ঈশ্বরীয় চৈতন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছে। ফলে অধিদৈবকে এমন এক চৈতন্যগত নীতি হিসেবে বোঝা যায় যা দৃশ্যমান জগতের অন্তরালে অবস্থান করে এবং সমগ্র অস্তিত্বকে গভীর অর্থ প্রদান করে।
মানুষ চোখ দিয়ে দেখে, কান দিয়ে শোনে, মন দিয়ে অনুভব করে এবং বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে। কিন্তু চোখ নিজে দেখে না, কান নিজে শোনে না এবং মস্তিষ্কের জৈবিক কার্যকলাপ নিজে অভিজ্ঞতার পূর্ণ ব্যাখ্যা দেয় না। এই সমস্ত অভিজ্ঞতার পেছনে চেতনার উপস্থিতি রয়েছে। সেই চেতনা ছাড়া বাহ্যিক জগতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অর্থপূর্ণ হয় না। অধিদৈব ধারণা আমাদের সেই গভীরতর চৈতন্যের দিকে দৃষ্টি ফেরায়।
এরপর শ্লোকটি পৌঁছে যায় সবচেয়ে অন্তর্মুখী ধারণা অধিযজ্ঞের কাছে। অধিযজ্ঞ শব্দটি গঠিত হয়েছে অধি এবং যজ্ঞ থেকে। যজ্ঞ শব্দটি এসেছে যজ্ ধাতু থেকে। যজ্ ধাতুর অর্থ উপাসনা করা, পূজা করা, সম্মান করা, নিবেদন করা এবং অর্পণ করা। বৈদিক ঐতিহ্যে যজ্ঞ বলতে অগ্নির মধ্যে আহুতি দেওয়ার ধর্মীয় অনুষ্ঠান বোঝানো হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ অনেক গভীর। যজ্ঞ হলো নিজের সীমিত সত্তা ও কর্মকে বৃহত্তর সত্যের উদ্দেশ্যে সমর্পণ করা।
কৃষ্ণ এখানে একটি অসাধারণ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন অধিযজ্ঞোহমেবাত্র দেহে। অর্থাৎ এই দেহের মধ্যেই আমিই অধিযজ্ঞ। এখানে অহম্ অর্থ আমি এবং এব অর্থ কেবল আমিই বা নিশ্চয়ই আমিই। অত্র অর্থ এখানে এবং দেহে অর্থ দেহের মধ্যে। অর্থাৎ যে পরম সত্তা সমস্ত যজ্ঞের অন্তর্নিহিত অধিষ্ঠাতা, সেই পরম সত্তা মানুষের দেহের মধ্যেই অবস্থান করেন। ঈশ্বরকে কেবল দূরবর্তী কোনো মহাজাগতিক শক্তি হিসেবে অনুসন্ধান করার পরিবর্তে নিজের অন্তরের মধ্যেও তাঁর উপস্থিতি অনুভব করার শিক্ষা এখানে দেওয়া হয়েছে।
এই বক্তব্যের মধ্যে গীতার একটি মৌলিক আধ্যাত্মিক শিক্ষা নিহিত আছে। মানুষের জীবন নিজেই একটি যজ্ঞ। শ্বাস গ্রহণ এবং ত্যাগ, জ্ঞান অর্জন, কর্ম সম্পাদন, সেবা, ভালোবাসা, ত্যাগ এবং কর্তব্য পালন সবই যজ্ঞে পরিণত হতে পারে, যদি তা বৃহত্তর সত্যের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়। একজন শিক্ষক যখন নিষ্ঠার সঙ্গে জ্ঞান দান করেন, একজন চিকিৎসক যখন মানুষের সেবা করেন, একজন কৃষক যখন খাদ্য উৎপাদন করেন এবং একজন মানুষ যখন নিজের স্বার্থের বাইরে অন্যের কল্যাণে কাজ করেন, তখন তাদের কর্মকে যজ্ঞের প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। কর্মের বাহ্যিক রূপ নয়, কর্মের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যই তাকে যজ্ঞের মর্যাদা দেয়।
দেহভৃতাং বর শব্দের মাধ্যমে কৃষ্ণ অর্জুনকে সম্বোধন করেছেন। দেহভৃত অর্থ দেহধারী এবং বর অর্থ শ্রেষ্ঠ। তাই দেহভৃতাং বর অর্থ দেহধারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এই সম্বোধনের মধ্যেও একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। মানুষ দেহ ধারণ করে, কিন্তু তার পরিচয় কেবল দেহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেহ পরিবর্তনশীল হলেও মানুষের মধ্যে একটি গভীর আত্মসত্তার অনুভূতি থাকে। এই অনুভূতিই মানুষকে বাহ্যিক পরিবর্তনের অতীত সত্য অনুসন্ধানে পরিচালিত করতে পারে।
এই তিনটি ধারণাকে একত্রে দেখলে শ্লোকটির একটি অসাধারণ দার্শনিক কাঠামো স্পষ্ট হয়। অধিভূত হলো পরিবর্তনশীল জগত। অধিদৈব হলো সেই জগতের অন্তর্নিহিত চৈতন্যের নীতি। অধিযজ্ঞ হলো সেই পরম চৈতন্যের অন্তর্নিহিত উপস্থিতি, যিনি মানুষের দেহ ও জীবনের মধ্যেই যজ্ঞের অধিষ্ঠাতা। অর্থাৎ প্রথমে মানুষ বাহ্য জগতকে দেখে। তারপর সে উপলব্ধি করে যে জগত পরিবর্তনশীল। এরপর সে সেই পরিবর্তনের অন্তরালে চৈতন্যের অনুসন্ধান করে। অবশেষে সে আবিষ্কার করে যে সেই চৈতন্য কোনো দূরবর্তী বাস্তবতা নয়, বরং নিজের অস্তিত্বের গভীরতম স্তরেও তার উপস্থিতি রয়েছে।
এই শিক্ষা মানবজীবনের ভয় ও আসক্তি বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যখন ক্ষয়শীল জিনিসকে চিরস্থায়ী মনে করে তখন তার মধ্যে ভয় জন্মায়। সম্পদ হারানোর ভয়, দেহের পরিবর্তনের ভয়, সম্পর্ক হারানোর ভয়, সম্মান নষ্ট হওয়ার ভয় এবং মৃত্যুর ভয় অনেকাংশে পরিবর্তনশীল জগতকে স্থায়ী আশ্রয় মনে করার ফল। কিন্তু মানুষ যখন উপলব্ধি করে যে সমস্ত বাহ্যিক প্রকাশ ক্ষর ভাবের অন্তর্ভুক্ত, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়। সে জগত থেকে পালিয়ে যায় না, বরং জগতের প্রকৃতি বুঝে জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে শেখে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি সুন্দর উপমা হতে পারে নদী। নদীর জল প্রতিমুহূর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে। একই জল এক মুহূর্তে নদীর যে স্থানে রয়েছে, পরের মুহূর্তে সেখানে থাকে না। তবুও আমরা একই নদীকে চিনতে পারি। নদীর প্রবাহ ক্ষর ভাবের প্রতীক। কিন্তু নদীর ধারাবাহিক অস্তিত্বের ধারণা আমাদের পরিবর্তনের মধ্যেও একটি গভীর ঐক্য অনুভব করতে সাহায্য করে। মানুষের জীবনও তেমন। শরীর পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয়, আবেগ পরিবর্তিত হয়, কিন্তু মানুষ নিজের মধ্যে একটি ধারাবাহিক চৈতন্যের অনুভূতি বহন করে।
প্রদীপের শিখাও আরেকটি সুন্দর উপমা। শিখা মুহূর্তে মুহূর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে, তবুও আমরা তাকে একই প্রদীপের আলো হিসেবে অনুভব করি। দৃশ্যমান প্রকাশ পরিবর্তনশীল হলেও তার মধ্যে একটি ধারাবাহিকতার অনুভূতি থাকে। গীতার অনুসন্ধান সেই ধারাবাহিকতার আরও গভীর উৎসের দিকে নিয়ে যায়। পরিবর্তনশীল দেহ ও জগতের অন্তরালে যে চৈতন্যের উপলব্ধি হয়, সেই চৈতন্যই পুরুষতত্ত্বের দিকে আমাদের নিয়ে যায়।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের শিক্ষা আরও গভীর। অধিভূত হলো নাম ও রূপের পরিবর্তনশীল জগত। অধিদৈব হলো সেই জগতের অন্তর্নিহিত চৈতন্য। অধিযজ্ঞ হলো জীবনের অন্তরে অবস্থিত ঈশ্বরীয় উপস্থিতি। শেষ পর্যন্ত জ্ঞানী উপলব্ধি করেন যে বিভিন্ন স্তরে প্রকাশ পেলেও পরম সত্য এক। পরিবর্তনশীল জগতের অন্তরালে যে চৈতন্য এবং সেই চৈতন্যের অন্তরালে যে পরম ব্রহ্ম, তাদের মধ্যে মৌলিক ঐক্য রয়েছে।
ভক্তির দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও হৃদয়গ্রাহী। কৃষ্ণ নিজেকে অধিযজ্ঞ বলে ঘোষণা করছেন। অর্থাৎ মানুষের সমস্ত কর্ম, উপাসনা, ত্যাগ এবং সমর্পণের চূড়ান্ত আশ্রয় হলেন ঈশ্বর। তাই জীবনের কোনো কাজই ঈশ্বর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষ যদি নিজের কর্মকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করে, তাহলে তার সাধারণ জীবনও আধ্যাত্মিক সাধনায় পরিণত হতে পারে। তখন কাজ কেবল জীবিকা বা ব্যক্তিগত সাফল্যের উপায় থাকে না, বরং তা আত্মসমর্পণের একটি রূপ হয়ে ওঠে।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। অধিভূত প্রতীক হয়ে ওঠে বাহ্য জগতের। অধিদৈব প্রতীক হয়ে ওঠে বিশ্বচেতনার। অধিযজ্ঞ প্রতীক হয়ে ওঠে মানুষের অন্তর্লীন ঈশ্বরীয় উপস্থিতির। এই তিনটি স্তর যেন মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রার তিনটি ধাপ। প্রথমে মানুষ জগতকে দেখে। তারপর জগতের পরিবর্তনশীলতা উপলব্ধি করে। এরপর সে জগতের অন্তরালে চৈতন্যের অনুসন্ধান করে। শেষে সে নিজের অন্তরের মধ্যে সেই পরম সত্যকে উপলব্ধি করার দিকে অগ্রসর হয়।
সুতরাং অধিভূতং ক্ষরো ভাবঃ পুরুষশ্চাধিদৈবতম্ অধিযজ্ঞোহমেবাত্র দেহে দেহভৃতাং বর শ্লোকটি কেবল কয়েকটি সংস্কৃত শব্দের সমষ্টি নয়। এটি মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটি গভীর দর্শন। অধিভূত আমাদের শেখায় যে দৃশ্যমান জগতের সবকিছু পরিবর্তনশীল। ক্ষরো ভাবঃ আমাদের অনিত্যতার সত্য উপলব্ধি করায়। অধিদৈব আমাদের পরিবর্তনশীল জগতের অন্তরালে অবস্থানকারী চৈতন্যের সন্ধান দেয়। আর অধিযজ্ঞোহমেবাত্র দেহে আমাদের জানায় যে সেই পরম ঈশ্বরীয় সত্য মানুষের নিজের দেহ ও জীবনের মধ্যেই উপস্থিত।
এই উপলব্ধির চূড়ান্ত শিক্ষা হলো পরিবর্তনশীল জগতের মধ্যে থেকেও অপরিবর্তনীয় সত্যকে অনুসন্ধান করা। দেহকে অবহেলা নয়, কিন্তু দেহকেই চূড়ান্ত সত্য মনে না করা। কর্মকে ত্যাগ নয়, বরং কর্মকে যজ্ঞে পরিণত করা। জগতকে অস্বীকার নয়, বরং তার অনিত্য প্রকৃতি উপলব্ধি করা। আর ঈশ্বরকে দূরে অনুসন্ধান নয়, নিজের অন্তরের গভীরে তাঁর উপস্থিতি অনুভব করা। এইভাবে অধিভূত, অধিদৈব এবং অধিযজ্ঞ শেষ পর্যন্ত তিনটি বিচ্ছিন্ন ধারণা থাকে না। তারা এক পরম সত্যের তিনটি ভিন্ন দিক হয়ে ওঠে। বাহ্য জগতের ক্ষয়শীলতা, বিশ্বচেতনার উপস্থিতি এবং মানুষের অন্তরে ঈশ্বরের অবস্থান এই তিনের সমন্বয়েই গীতার এই শ্লোক মানবজীবনের জন্য এক গভীর আত্মজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক জাগরণের আহ্বান হয়ে ওঠে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!