ভগবদ্গীতা ৮.৬ | অন্তিম স্মরণ, চেতনার অভ্যাস ও মৃত্যুকালে পরবর্তী গতি
যং যং বাপি স্মরন্ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্।
তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতঃ।।৬।।
অনুবাদঃ অন্তিমকালে যিনি যে ভাব স্মরণ করে দেহত্যাগ করেন, তিনি সেই ভাবে ভাবিত তত্ত্বকেই লাভ করেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ের ষষ্ঠ শ্লোকটি মানুষের চিন্তা, স্মৃতি, অভ্যাস, চেতনা এবং মৃত্যুর মধ্যকার এক গভীর সম্পর্ককে প্রকাশ করে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, যং যং বাপি স্মরণ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্ তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতঃ। অর্থাৎ মানুষ অন্তিম সময়ে যে ভাব স্মরণ করতে করতে দেহ ত্যাগ করে, সে সেই ভাবকেই লাভ করে, কারণ সে সারাজীবন সেই ভাব দ্বারা ভাবিত বা অভ্যস্ত ছিল। এই শ্লোকের মধ্যে মৃত্যু সম্পর্কে একটি শিক্ষা থাকলেও এর প্রকৃত বিষয় কেবল মৃত্যুকাল নয়। এর গভীরে রয়েছে মানুষের সমগ্র জীবন কীভাবে তার অন্তিম চেতনাকে গঠন করে তার এক অসাধারণ আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা।
যং যং শব্দদ্বয় সংস্কৃত যৎ সর্বনাম থেকে উদ্ভূত। যৎ শব্দের অর্থ যে, যাকে বা যে বিষয়কে। এখানে এর পুনরুক্তি ব্যাপকতা এবং বিভিন্ন সম্ভাবনাকে নির্দেশ করেছে। যং যং অর্থ যে যে বা যে কোনো ভাব। অর্থাৎ মানুষের মন যে কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে পারে। তার চিন্তা যেমন হতে পারে, তার চেতনার প্রবাহও তেমন হতে পারে। এই পুনরুক্তির মধ্যে একটি গভীর শিক্ষা নিহিত আছে। মানুষের অন্তর্জগৎ একটিমাত্র চিন্তার দ্বারা গঠিত হয় না। জীবনের দীর্ঘ অভ্যাস, আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা, ভয়, আসক্তি এবং সাধনা মিলিত হয়ে তার চেতনার একটি বিশেষ প্রবণতা সৃষ্টি করে।
বাপি শব্দটি বা এবং অপি এর সন্ধিবদ্ধ রূপ। বা অর্থ অথবা এবং অপি অর্থও, এমনকি বা যে কোনো। যং যং বাপি একত্রে বোঝায় যে যে ভাবই হোক না কেন। এর মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ কোনো একটি বিশেষ বিষয়ের মধ্যে এই সত্যকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মানুষের মন যে বিষয়কে দীর্ঘকাল ধারণ করবে, সেই বিষয়ই তার চেতনার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এখানে মানুষের মানসিক স্বাধীনতার পাশাপাশি তার মানসিক দায়িত্বও প্রকাশিত হয়েছে। মানুষ যা ভাববে, যা ভালোবাসবে এবং যা নিয়ে বারবার চিন্তা করবে, তা ধীরে ধীরে তার অন্তরের অংশ হয়ে উঠবে।
স্মরণ শব্দটি সংস্কৃত স্মৃ ধাতু থেকে এসেছে। স্মৃ ধাতুর অর্থ স্মরণ করা, মনে রাখা এবং চেতনার মধ্যে কোনো বিষয়কে ধারণ করা। শ্লোকে স্মরণ করার অর্থ কেবল কোনো বিষয়কে একবার মনে পড়া নয়। এখানে এমন একটি স্মৃতি বা চেতনার কথা বলা হয়েছে যা অন্তরের গভীরে প্রতিষ্ঠিত। মানুষ জীবনে যে বিষয়কে বারবার স্মরণ করে, তা তার মানসিক সংস্কারে পরিণত হয়। তাই স্মরণ এখানে একটি সক্রিয় মানসিক শক্তি। মানুষের স্মৃতি তার পরিচয়কে যেমন প্রভাবিত করে, তেমনি তার ভবিষ্যৎ মানসিক প্রবণতাকেও নির্মাণ করে।
ভাব শব্দটি এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শব্দগুলোর একটি। ভাব শব্দটি সংস্কৃত ভূ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ভূ অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়া। সেই অর্থে ভাব বলতে কোনো মানসিক অবস্থা, অনুভূতি, প্রবণতা, অস্তিত্বের রূপ বা চেতনার একটি বিশেষ অবস্থাকে বোঝানো যায়। এখানে ভাব কেবল একটি সাধারণ চিন্তা নয়। যে চিন্তা মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তার জীবনকে প্রভাবিত করছে, সেটিই এখানে ভাবের অন্তর্ভুক্ত। কারও কাছে অর্থ হতে পারে প্রধান ভাব, কারও কাছে ক্ষমতা, কারও কাছে পরিবার, কারও কাছে জ্ঞান এবং কারও কাছে ঈশ্বর। মানুষ যে ভাবকে নিজের জীবনের কেন্দ্র করে তোলে, সেই ভাব ধীরে ধীরে তার চেতনার গভীরে প্রবেশ করে।
ত্যজত্যন্তে শব্দের মধ্যে ত্যজ এবং অন্তে এই দুই অর্থ নিহিত। ত্যজ ধাতুর অর্থ ত্যাগ করা বা ছেড়ে দেওয়া এবং অন্তে অর্থ শেষে বা অন্তিম সময়ে। কলেবরম্ শব্দের অর্থ দেহ বা শরীর। সুতরাং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্ অর্থ অন্তিম সময়ে দেহ ত্যাগ করা। গীতার দর্শনে দেহ নশ্বর হলেও আত্মা নশ্বর নয়। তাই এখানে দেহত্যাগ বলতে আত্মার বিনাশ বোঝানো হয় না। বরং এটি এক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং অন্য অস্তিত্বগত অবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রসঙ্গকে নির্দেশ করে।
তং তমেবৈতি অংশটি শ্লোকের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য। তং তম্ অর্থ সেই সেই এবং এব অর্থ সেই বা ঠিক সেই। এতি শব্দটি ই ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ যাওয়া বা গমন করা। ফলে তং তমেবৈতি অর্থ সেই সেই ভাবকেই লাভ করা বা সেই ভাবের দিকে গমন করা। এর মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে মানুষের চেতনার যে অভিমুখ জীবনের শেষ মুহূর্তে সক্রিয় থাকে, তার সঙ্গে তার পরবর্তী গতি গভীরভাবে সম্পর্কিত।
কৌন্তেয় শব্দটি কুন্তীর পুত্র অর্থাৎ অর্জুনকে বোঝায়। কুন্তী থেকে কৌন্তেয় শব্দের উৎপত্তি। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এই নামে সম্বোধন করে যে শিক্ষা দিয়েছেন, তা কেবল অর্জুনের জন্য নয়। অর্জুন এখানে মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। জীবনের সংকট, মৃত্যু, কর্তব্য, আত্মা এবং ঈশ্বর সম্পর্কে যে প্রশ্ন মানুষের মনে জাগে, অর্জুন সেই প্রশ্নগুলোর প্রতীক। তাই কৌন্তেয় সম্বোধনের মাধ্যমে এই শিক্ষা সমগ্র মানবজাতির উদ্দেশে প্রসারিত হয়েছে।
শ্লোকের শেষ অংশ সদা তদ্ভাবভাবিতঃ এর মধ্যেই মূল ব্যাখ্যাটি নিহিত। সদা অর্থ সর্বদা। তদ্ভাব অর্থ সেই ভাব এবং ভাবিত অর্থ সেই ভাব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত বা পরিপূর্ণ। অর্থাৎ মানুষ অন্তিম মুহূর্তে যে ভাব স্মরণ করে, তা সাধারণত আকস্মিকভাবে জন্ম নেওয়া কোনো চিন্তা নয়। তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের মানসিক অভ্যাস। মানুষ সারাজীবন যা চিন্তা করেছে, যা অনুভব করেছে এবং যা নিজের চেতনার মধ্যে বারবার স্থাপন করেছে, অন্তিম সময়ে সেই প্রবণতাই স্বাভাবিকভাবে প্রকাশিত হতে পারে।
এই কারণে শ্লোকটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো মানুষের শেষ চিন্তা তার সমগ্র জীবনের চিন্তার পরিণতি। মৃত্যুর সময় হঠাৎ ঈশ্বরকে স্মরণ করার চেষ্টা করার চেয়ে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ঈশ্বরকে স্মরণ করা অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ যে মন সারাজীবন জাগতিক আসক্তিতে নিমগ্ন থেকেছে, তার পক্ষে অন্তিম মুহূর্তে সম্পূর্ণ বিপরীত একটি চেতনা স্বাভাবিকভাবে ধারণ করা কঠিন হতে পারে। বিপরীতে যে মানুষ প্রতিদিন ঈশ্বরের নাম স্মরণ করেছে, ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি রেখেছে, নিজের কর্মকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছে এবং অন্তরকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করেছে, তার চেতনা ধীরে ধীরে ঈশ্বরমুখী হয়ে উঠতে পারে।
এই শ্লোকের দার্শনিক তাৎপর্য বেদান্ত দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বেদান্তের মতে দেহ পরিবর্তনশীল এবং আত্মা নিত্য। মানুষ নিজেকে যদি কেবল দেহ হিসেবে দেখে, তাহলে জন্ম এবং মৃত্যুর ঘটনাই তার অস্তিত্বের সম্পূর্ণ সীমা বলে মনে হয়। কিন্তু আত্মতত্ত্ব উপলব্ধি করলে বোঝা যায় যে দেহের পরিবর্তন আত্মার প্রকৃত স্বরূপকে বিনষ্ট করে না। কলেবর ত্যাগ তাই আত্মার মৃত্যু নয়। বরং দেহের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার একটি প্রসঙ্গ।
ভক্তি দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের শিক্ষা আরও হৃদয়গ্রাহী। যে ব্যক্তি সর্বদা ভগবানকে স্মরণ করে, তার কাছে ঈশ্বরস্মরণ কোনো কৃত্রিম অনুশীলন থাকে না। তা ধীরে ধীরে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে যায়। ভক্তের জন্য ঈশ্বর কোনো দূরবর্তী ধারণা নন। তিনি জীবনের কেন্দ্র। তাই জীবনের প্রতিটি কাজ, সম্পর্ক এবং অনুভূতিকে ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে চেতনা ঈশ্বরমুখী হতে পারে।
যোগ দর্শনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকটির গভীর তাৎপর্য রয়েছে। যোগদর্শনে চিত্তের প্রবাহ এবং সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো চিন্তা বা অভিজ্ঞতা মানুষের মনে একটি ছাপ সৃষ্টি করে। সেই ছাপ আবার ভবিষ্যৎ চিন্তা ও আচরণকে প্রভাবিত করে। ফলে একটি চিন্তার পুনরাবৃত্তি ধীরে ধীরে একটি মানসিক প্রবণতায় পরিণত হয়। গীতার সদা তদ্ভাবভাবিতঃ এই ধারণার সঙ্গে এই মানসিক সংস্কারের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানের আলোতেও শ্লোকটির একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা করা যায়। মানুষের মস্তিষ্ক এবং মন অভ্যাসের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। কোনো চিন্তা বারবার করলে তা সহজে সক্রিয় হয়। কোনো আবেগ বারবার অনুভব করলে তা মানসিক প্রবণতায় পরিণত হতে পারে। কোনো কাজ দীর্ঘদিন করলে তা অভ্যাসে পরিণত হয়। সেই অভ্যাস আবার ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে ওঠে। এই দৃষ্টিতে মৃত্যুকালের চেতনা হলো জীবনের দীর্ঘ মানসিক অনুশীলনের একটি চূড়ান্ত প্রকাশ।
এই সত্য বোঝার জন্য একটি সহজ উপমা দেওয়া যায়। একটি পাত্রে যদি দীর্ঘদিন সুগন্ধি রাখা হয়, পরে সেই পাত্র খালি করলেও কিছু সময় তার মধ্যে সুগন্ধ থেকে যায়। মানুষের মনও তেমন। জীবনের প্রতিদিনের চিন্তা, অনুভূতি এবং আকাঙ্ক্ষা মনের মধ্যে ছাপ রেখে যায়। তাই অন্তিম মুহূর্তে সেই পুরোনো ছাপগুলোই শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। আবার নদীর প্রবাহের কথাও ভাবা যায়। একটি নদী দীর্ঘদিন যে দিকে প্রবাহিত হয়েছে, তার গতির একটি স্বাভাবিক দিক তৈরি হয়। মানুষের চেতনার ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের চিন্তা ও অভ্যাস এমন একটি প্রবাহ তৈরি করে।
এই শ্লোক আমাদের নৈতিক জীবন সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। আমরা অনেক সময় মনে করি বাহ্যিক আচরণই মানুষের প্রকৃত পরিচয়। কিন্তু গীতা মনে করিয়ে দেয় যে অন্তরের প্রবণতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে ভালো কাজ করতে পারে, কিন্তু যদি তার অন্তর সর্বদা লোভ, অহংকার, ক্রোধ এবং হিংসায় পূর্ণ থাকে, তাহলে সেই প্রবণতাগুলো তার চেতনার ওপর প্রভাব ফেলবে। আবার যে ব্যক্তি সত্য, প্রেম, করুণা, সংযম এবং ঈশ্বরচিন্তার চর্চা করে, তার অন্তর ধীরে ধীরে সেই গুণগুলোর দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এই কারণে গীতার এই শিক্ষা মূলত মৃত্যুর শিক্ষা নয়, বরং জীবনের শিক্ষা। মৃত্যুর সময় কী স্মরণ করব তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার আগে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত আমরা প্রতিদিন কী স্মরণ করছি। আমাদের অবসর সময়ের চিন্তা কী, আনন্দের সময় আমরা কী চাই, দুঃখের সময় আমরা কাকে স্মরণ করি, সাফল্যের সময় আমাদের মন কোথায় থাকে এবং একাকিত্বের সময় আমাদের অন্তর কোন বিষয়ের দিকে আকৃষ্ট হয়। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের প্রকৃত মানসিক অবস্থার পরিচয় দেয়।
শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। এখানে মৃত্যু জীবনের একটি চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রতীক। যখন মানুষের বাহ্যিক পরিচয়, সম্পদ, ক্ষমতা এবং সামাজিক মর্যাদা একে একে অর্থহীন হয়ে যায়, তখন তার অন্তরের প্রকৃত আকর্ষণ প্রকাশিত হয়। সেই অর্থে মৃত্যুর মুহূর্ত একটি আয়নার মতো। সেখানে মানুষের দীর্ঘদিনের অন্তর্জীবন প্রতিফলিত হয়।
এই শিক্ষা আমাদের বর্তমান জীবনকেও পরিবর্তন করতে পারে। যদি আমরা বুঝতে পারি যে চিন্তা আমাদের চেতনাকে গঠন করে, তাহলে চিন্তার প্রতি আমাদের দায়িত্বশীল হতে হবে। ক্রোধকে বারবার পোষণ করলে ক্রোধ শক্তিশালী হয়। লোভকে বারবার পোষণ করলে লোভ গভীর হয়। প্রেমকে চর্চা করলে প্রেম বৃদ্ধি পায়। করুণাকে চর্চা করলে হৃদয় কোমল হয়। সত্যকে ধারণ করলে সত্যচেতনা শক্তিশালী হয়। ঈশ্বরকে স্মরণ করলে ঈশ্বরস্মৃতি ধীরে ধীরে অন্তরের স্বাভাবিক প্রবণতায় পরিণত হতে পারে।
এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা কেবল মৃত্যুকালে ঈশ্বরকে স্মরণ করার নির্দেশ নয়। এটি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে ঈশ্বরস্মরণের মাধ্যমে অর্থপূর্ণ করার আহ্বান। মানুষ যেন কর্মের মধ্যে থেকেও ঈশ্বরকে স্মরণ করে, দায়িত্ব পালন করেও ঈশ্বরকে ভুলে না যায় এবং সংসারের মধ্যে থেকেও নিজের চেতনার কেন্দ্রকে পরম সত্যের দিকে স্থাপন করতে পারে। এই ধারাবাহিক সাধনাই অন্তিম স্মৃতিকে স্বাভাবিকভাবে পবিত্র করে তুলতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, যং যং বাপি স্মরণ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্ শ্লোকটি মানুষের চিন্তা এবং অস্তিত্বের সম্পর্ক সম্পর্কে এক চিরন্তন সত্য প্রকাশ করে। মানুষ যাকে বারবার স্মরণ করে, যার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয় এবং যে ভাবকে প্রতিদিন নিজের মধ্যে পুষ্ট করে, সেই ভাব ধীরে ধীরে তার চেতনার অংশ হয়ে ওঠে। তাই অন্তিম স্মৃতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সমগ্র জীবনের মানসিক ও আধ্যাত্মিক যাত্রার একটি পরিণতি। মানুষের শেষ মুহূর্তকে পবিত্র করতে হলে তার সমগ্র জীবনকে পবিত্র করতে হবে। অন্তিম সময়ে ঈশ্বরকে স্মরণ করতে চাইলে জীবনের প্রতিটি সময়ে ঈশ্বরকে স্মরণ করতে হবে। এই গভীর সত্যের কারণেই গীতার এই শ্লোক শুধু মৃত্যু সম্পর্কে একটি শিক্ষা নয়, বরং সচেতনভাবে জীবনযাপন, চিন্তাকে শুদ্ধ করা, চেতনাকে উন্নত করা এবং পরম সত্যের দিকে নিজের অন্তরকে পরিচালিত করার এক অনন্ত আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!