ভগবদ্গীতা ৮.৭ | অভ্যাসযোগ, একাগ্র চেতনা ও পরম পুরুষের উপলব্ধির আধ্যাত্মিক পথ
তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু মামনুষ্মর যুধ্য চ।
ময্যর্পিতমনোবুদ্ধির্মামেবৈষ্যস্যসংশয়ঃ।।৭।।
অনুবাদঃ অতএব, হে অর্জুন! সর্বদা আমাকে স্মরণ করে তোমার স্বভাব বিহিত যুদ্ধ কর, তা হলে আমাতে তোমার মন ও বুদ্ধি অর্পিত হবে এবং নিঃসন্দেহে তুমি আমাকেই লাভ করবে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ের অষ্টম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের চেতনা, অভ্যাস, একাগ্রতা এবং পরমসত্তার উপলব্ধির মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছেন।
এই শ্লোকের মূল বক্তব্য হল যে মানুষ যদি নিয়মিত সাধনার দ্বারা নিজের মনকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে পারে যাতে সেই মন অন্য কোনো বিষয়ের দিকে বিচ্যুত না হয়ে পরম দিব্য পুরুষকে নিরন্তর চিন্তা করে, তবে সে সেই পরম পুরুষকে লাভ করে। এখানে শুধু ঈশ্বরের কথা চিন্তা করার নির্দেশ নেই। বরং মনকে অভ্যাসের মাধ্যমে রূপান্তরিত করে তাকে একাগ্র, অনন্যগামী এবং পরম সত্যমুখী করার একটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে।
এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দের মধ্যে একটি করে গভীর সাধনামার্গ নিহিত রয়েছে। অভ্যাসযোগ আমাদের বলে মনকে কীভাবে প্রস্তুত করতে হয়। যুক্তেন আমাদের জানায় সেই সাধনার সঙ্গে চেতনাকে কীভাবে যুক্ত রাখতে হয়। চেতসা নির্দেশ করে উপলব্ধির কেন্দ্রে মন ও চেতনাকে স্থাপন করতে। নান্যগামিনা জানায় চেতনার বিচ্ছিন্নতা দূর করে তাকে অন্যদিকে না যেতে দেওয়ার কথা। পরমং পুরুষং দিব্যং নির্দেশ করে সেই চূড়ান্ত লক্ষ্যকে। আর অনুচিন্তয়ন্ প্রকাশ করে অবিচ্ছিন্ন স্মরণ ও গভীর ধ্যানের প্রক্রিয়াকে।
শব্দটির মূল উৎপত্তি
এই শ্লোকের প্রধান পদটি হল অভ্যাসযোগযুক্তেন। এটি একটি যৌগিক সংস্কৃত পদ। এর মধ্যে রয়েছে অভ্যাস, যোগ এবং যুক্ত এই তিনটি ধারণা।
অভ্যাস শব্দটির মূল সংস্কৃত ধাতু √অস্। এই ধাতুর সঙ্গে উপসর্গীয় ব্যবহারের মাধ্যমে বারবার করা, অনুশীলন করা এবং পুনরাবৃত্তির ধারণা বিকশিত হয়েছে। সংস্কৃত অভ্যাস শব্দের মধ্যে নিয়মিত পুনরাবৃত্তি, অনুশীলন এবং কোনো একটি কর্ম বা চিন্তাকে বারবার চর্চার মাধ্যমে স্বভাবের অংশে পরিণত করার ধারণা নিহিত।
যোগ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত √যুজ্ ধাতু থেকে। √যুজ্ ধাতুর প্রধান অর্থ হল যুক্ত করা, সংযোগ করা, একত্র করা অথবা মনকে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে সংযুক্ত করা। ভারতীয় দর্শনে যোগ শব্দটি শুধু শারীরিক ব্যায়াম বোঝায় না। এর গভীরতর অর্থ হল বিচ্ছিন্ন চেতনাকে তার প্রকৃত কেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্ত করা।
যুক্ত শব্দটি √যুজ্ ধাতু থেকেই এসেছে। যুক্ত অর্থ সংযুক্ত, নিবিষ্ট, সমন্বিত অথবা কোনো কিছুর সঙ্গে একাত্মভাবে সম্পর্কিত। এখানে যুক্তেন শব্দটি তৃতীয়া একবচন রূপে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ অভ্যাসযোগের দ্বারা যুক্ত বা সংযুক্ত এমন চেতনা দিয়ে।
চেতসা শব্দটি এসেছে চেতস্ শব্দ থেকে। এর অর্থ মন, চিত্ত, চেতনা, অন্তঃকরণ বা মানসিক সত্তা। গীতার ভাষায় চেতস্ শুধু চিন্তার যান্ত্রিক ক্ষমতা নয়। এটি মানুষের অন্তর্গত মনোজগতের সেই ক্ষেত্র যেখানে চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা এবং মনোযোগের প্রবাহ সংঘটিত হয়।
নান্যগামিনা পদটি ন এবং অন্যগামিন্ এর সমন্বয়ে গঠিত। অন্য অর্থ ভিন্ন বা অপর এবং গামিন্ অর্থ যে যায় বা অগ্রসর হয়। নান্যগামিনা অর্থ এমন যা অন্যদিকে যায় না। এই শব্দটি এখানে এমন চেতনাকে বোঝায় যা পরম লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্য কোনো বিষয়ের দিকে প্রবাহিত হয় না।
পরমং শব্দটি এসেছে পরম থেকে। এর অর্থ সর্বোচ্চ, চূড়ান্ত, অতুলনীয়, শ্রেষ্ঠ অথবা সমস্ত সীমার অতীত।
পুরুষং শব্দটি পুরুষ শব্দের দ্বিতীয়া একবচন। পুরুষের বহুমাত্রিক অর্থ রয়েছে। সাধারণ অর্থে মানুষ বা ব্যক্তি হলেও উপনিষদীয় এবং গীতার দর্শনে পুরুষ বলতে চৈতন্যসত্তা, পরম আত্মসত্তা অথবা সর্বোচ্চ ঈশ্বরীয় সত্তাকে বোঝানো হতে পারে।
দিব্যং শব্দটি দিব্য থেকে এসেছে। এর মূল অর্থ স্বর্গীয়, আলোকময়, দেবতুল্য, অতীন্দ্রিয় বা সাধারণ জাগতিক অভিজ্ঞতার অতীত।
যাতি এসেছে √যা ধাতু থেকে। √যা অর্থ যাওয়া, গমন করা বা পৌঁছানো। এখানে যাতি শুধু স্থান পরিবর্তনের অর্থে ব্যবহৃত নয়। আধ্যাত্মিক অর্থে এটি অর্জন, উপলব্ধি বা পরম অবস্থায় পৌঁছানোর অর্থ বহন করে।
অনুচিন্তয়ন্ পদটি অনু উপসর্গ এবং √চিত্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত চিন্তার ধারণা থেকে গঠিত। অনু অর্থ অনুসরণ করে, ধারাবাহিকভাবে বা ক্রমানুসারে। চিন্তা অর্থ ভাবা, স্মরণ করা বা মননে স্থাপন করা। অনুচিন্তয়ন্ অর্থ ধারাবাহিকভাবে চিন্তা করতে করতে, বারবার স্মরণ করতে করতে অথবা অবিচ্ছিন্নভাবে ধ্যান করতে করতে।
শব্দ গঠনের প্রক্রিয়া
অভ্যাসযোগযুক্তেন শব্দটির মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দার্শনিক কাঠামো রয়েছে। অভ্যাস হল পুনরাবৃত্ত অনুশীলন। যোগ হল সংযোগ। যুক্ত হল সেই সংযোগের বাস্তব অবস্থা। অর্থাৎ বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে মন যখন একটি নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় তখন সেই মন অভ্যাসযোগযুক্ত হয়ে ওঠে।
চেতসা নান্যগামিনা বলতে বোঝানো হচ্ছে এমন মন বা চেতনা যা অন্যদিকে চলে যায় না। মানুষের স্বাভাবিক মন ক্রমাগত বিষয় থেকে বিষয়ে ছুটে বেড়ায়। কখনো অতীতের স্মৃতি, কখনো ভবিষ্যতের কল্পনা, কখনো ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণ, কখনো ভয়, কখনো কামনা, কখনো সামাজিক চিন্তা মানুষের মনকে এক কেন্দ্র থেকে অন্য কেন্দ্রে নিয়ে যায়। শ্লোকটি সেই বিচ্ছিন্নতার বিপরীতে একাগ্র চেতনার কথা বলছে।
পরমং পুরুষং দিব্যং হল সেই চেতনার চূড়ান্ত লক্ষ্য। এখানে পরম অর্থ সর্বোচ্চ, পুরুষ অর্থ চৈতন্যসত্তা এবং দিব্য অর্থ জাগতিক সীমার অতীত ঈশ্বরীয় সত্তা। তাই তিনটি শব্দ একত্রে এমন এক সর্বোচ্চ চৈতন্যসত্তাকে নির্দেশ করে যিনি জাগতিক পরিবর্তনশীলতার অতীত।
অনুচিন্তয়ন্ যাতি পদদ্বয় সাধনা ও ফলের সম্পর্ককে প্রকাশ করে। অনুচিন্তয়ন্ হল সাধকের কর্ম বা সাধনার ধারা এবং যাতি হল তার ফলস্বরূপ গন্তব্যে পৌঁছানো। অর্থাৎ নিরন্তর ঈশ্বরচিন্তা মানুষকে ঈশ্বরীয় উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়।
বাংলা অর্থ
সহজ বাংলায় শ্লোকটির অর্থ হল
হে পার্থ, যে ব্যক্তি অভ্যাসযোগের দ্বারা যুক্ত এবং অন্য কোনো বিষয়ে বিচরণ করে না এমন চিত্তের মাধ্যমে সেই পরম দিব্য পুরুষকে নিরন্তর চিন্তা করতে থাকে, সে সেই পরম পুরুষকে লাভ করে।
আরও ভাবগভীরভাবে বলা যায়, যে ব্যক্তি নিয়মিত আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে নিজের মনকে পরম সত্যের সঙ্গে যুক্ত করে এবং সেই মনকে অন্য কোনো আকর্ষণের দিকে বিচ্যুত হতে না দিয়ে সর্বোচ্চ দিব্য সত্তাকে অবিচ্ছিন্নভাবে স্মরণ করে, সে সেই পরম সত্তার উপলব্ধিতে পৌঁছে যায়।
আক্ষরিক অর্থ
অভ্যাস অর্থ বারবার অনুশীলন।
যোগ অর্থ সংযোগ বা যুক্ত হওয়া।
যুক্তেন অর্থ যুক্ত বা সংযুক্ত অবস্থায়।
চেতসা অর্থ চিত্ত বা মন দ্বারা।
নান্যগামিনা অর্থ অন্যদিকে না গমনকারী।
পরমং অর্থ সর্বোচ্চ।
পুরুষং অর্থ পুরুষ বা পরম চৈতন্যসত্তাকে।
দিব্যং অর্থ দিব্য বা অতীন্দ্রিয়।
যাতি অর্থ পৌঁছে যায় বা লাভ করে।
পার্থ অর্থ হে পৃথার পুত্র।
অনুচিন্তয়ন্ অর্থ ধারাবাহিকভাবে চিন্তা করতে করতে বা নিরন্তর স্মরণ করতে করতে।
সমগ্র বাক্যটির আক্ষরিক ভাব হল অভ্যাসযোগে যুক্ত, অন্যদিকে না যাওয়া চিত্ত দ্বারা পরম দিব্য পুরুষকে অনুচিন্তা করতে করতে হে পার্থ, সে তাঁকে লাভ করে।
প্রাসঙ্গিক অর্থ ও ব্যবহার
অভ্যাস শব্দটি সাধারণ জীবনে একটি কাজ বারবার করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে অভ্যাস শুধু পুনরাবৃত্তি নয়। এখানে অভ্যাস হল চেতনাকে বারবার তার প্রকৃত লক্ষ্যে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া। মন বিচ্যুত হবে। কিন্তু সাধক বারবার তাকে ঈশ্বরের দিকে ফিরিয়ে আনবে। এই পুনরাগমনই অভ্যাস।
যোগ শব্দটি এখানে কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক আসনের অর্থ বহন করে না। এটি চেতনার সঙ্গে পরম সত্যের সংযোগ বোঝায়। তাই অভ্যাসযোগ হল এমন সাধনা যার মাধ্যমে বারবার অনুশীলন করে মনকে পরম সত্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
চেতসা শব্দটি দেখায় যে আধ্যাত্মিক সাধনার মূল ক্ষেত্র মানুষের অন্তর্জগৎ। বাহ্যিক আচরণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও গীতার দৃষ্টিতে চেতনার রূপান্তর ছাড়া প্রকৃত আধ্যাত্মিক অগ্রগতি সম্পূর্ণ হয় না।
নান্যগামিনা শব্দটি একাগ্রতার বিশেষ তাৎপর্য প্রকাশ করে। এর অর্থ এই নয় যে মানুষ পৃথিবীর অন্য কোনো কাজ করবে না। বরং এর গভীর অর্থ হল সমস্ত কর্মের অন্তর্গত চেতনার কেন্দ্র যেন পরম সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়।
অনুচিন্তয়ন্ শব্দটি সাধারণ চিন্তার চেয়ে গভীর। সাধারণ চিন্তা বিচ্ছিন্ন, অস্থায়ী এবং উদ্দেশ্যহীন হতে পারে। অনুচিন্তন হল কোনো সত্যকে বারবার স্মরণ, মনন এবং অন্তরে ধারণ করা। তাই এটি ধ্যান, স্মরণ এবং আত্মসচেতনতার মধ্যবর্তী একটি গভীর আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া।
অভ্যাসের গভীর তাৎপর্য
গীতার এই শ্লোক মানুষের মন সম্পর্কে একটি অত্যন্ত বাস্তব সত্য প্রকাশ করে। মন যা বারবার চিন্তা করে, ধীরে ধীরে তার স্বভাব সেই দিকে গড়ে ওঠে। মানুষের অভ্যাস তার চরিত্রকে নির্মাণ করে এবং চরিত্র তার জীবনকে পরিচালনা করে।
একজন মানুষ যদি ক্রমাগত ভয় চিন্তা করে তবে তার চেতনা ভয়ের দ্বারা সংগঠিত হয়। যদি ক্রমাগত ক্রোধকে পুষ্ট করে তবে ক্রোধ তার স্বভাবের অংশ হয়ে ওঠে। যদি লোভকে বারবার প্রশ্রয় দেয় তবে লোভ তার মানসিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে। বিপরীতে যদি সত্য, প্রেম, আত্মসংযম, ঈশ্বরস্মরণ এবং আত্মজিজ্ঞাসাকে বারবার চর্চা করা হয় তবে চেতনা ধীরে ধীরে সেই গুণগুলির দিকে রূপান্তরিত হয়।
অতএব অভ্যাস এখানে শুধু একটি পদ্ধতি নয়। অভ্যাস হল চেতনার পুনর্গঠন।
নান্যগামিনা এবং একাগ্রতার শিক্ষা
মানুষের মন স্বভাবতই বহির্মুখী। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সে অসংখ্য বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। ফলে তার মন এক মুহূর্তে একটি বিষয়ে এবং পরের মুহূর্তে অন্য বিষয়ে চলে যায়।
নান্যগামিনা শব্দটি এই বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে এক গভীর আধ্যাত্মিক আদর্শ স্থাপন করে। চিত্তকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করতে হবে যাতে তার অন্তর্গত আকর্ষণের কেন্দ্র একটিই থাকে। সেই কেন্দ্র হল পরম সত্য।
এখানে একাগ্রতা মানে চিন্তার জোর করে দমন নয়। বরং দীর্ঘ সাধনার মাধ্যমে এমন একটি অন্তর্গত আকর্ষণ তৈরি করা, যার ফলে মন স্বাভাবিকভাবেই পরমের দিকে ফিরে আসে।
পরম পুরুষের ধারণা
পরম পুরুষ শব্দটি গীতার অন্যতম গভীর দার্শনিক ধারণা। পুরুষ শব্দের অর্থ এখানে সাধারণ মানব ব্যক্তি নয়। এটি এমন এক চৈতন্যসত্তার প্রতি নির্দেশ করতে পারে যিনি জগতের অন্তর্নিহিত ভিত্তি এবং সমস্ত সত্তার চূড়ান্ত আশ্রয়।
পরম শব্দটি এই পুরুষের সর্বোচ্চ অবস্থাকে প্রকাশ করে। তিনি সীমাবদ্ধ কোনো ব্যক্তিগত সত্তা নন। দিব্য শব্দটি আবার তাঁকে জাগতিক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার ঊর্ধ্বে স্থাপন করে।
বৈষ্ণব ব্যাখ্যায় পরম পুরুষকে সর্বোচ্চ ভগবান হিসেবে উপলব্ধি করা হয়। বেদান্তীয় ব্যাখ্যায় এটি পরম চৈতন্য বা ব্রহ্মসত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভক্তিমার্গে তিনি প্রেম ও আশ্রয়ের চূড়ান্ত অবলম্বন। যোগদর্শনের দৃষ্টিতে এটি চেতনার সর্বোচ্চ উপলব্ধির সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে ব্যাখ্যাত হতে পারে।
দার্শনিক অর্থ
এই শ্লোকের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের চেতনা কোথায় স্থাপিত হবে সেই প্রশ্ন। মানুষ তার চিন্তার সমষ্টি নয় শুধু, কিন্তু তার চিন্তার প্রবাহ তার আত্মপরিচয়কে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই গীতা চেতনার দিক পরিবর্তনের কথা বলছে।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে পরম পুরুষের চিন্তা শেষ পর্যন্ত আত্মস্বরূপের উপলব্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে। বাহ্যিক জগতের পরিবর্তনশীল পরিচয় অতিক্রম করে সাধক নিজের চৈতন্যস্বরূপকে উপলব্ধি করতে পারে।
বিশিষ্টাদ্বৈত দৃষ্টিতে পরম পুরুষ হলেন সর্বোচ্চ ঈশ্বর এবং জীব তাঁর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কযুক্ত। তাই নিরন্তর স্মরণ ঈশ্বরের সঙ্গে জীবের স্বাভাবিক সম্পর্ককে জাগ্রত করে।
দ্বৈত দর্শনে জীব এবং ঈশ্বর চিরতরে পৃথক সত্তা। সেখানে পরম পুরুষ হলেন সর্বোচ্চ ভগবান এবং তাঁর স্মরণ ও ভক্তি জীবকে ঈশ্বরলাভের দিকে নিয়ে যায়।
এই ভিন্ন ব্যাখ্যাগুলির মধ্যে একটি সাধারণ সত্য রয়েছে। মানুষের চেতনা যখন ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্ন আকর্ষণ থেকে উঠে একটি সর্বোচ্চ সত্যের দিকে নিবদ্ধ হয় তখন তার অস্তিত্বের অর্থ ও অভিমুখ পরিবর্তিত হয়।
প্রতীকী অর্থ
অভ্যাসযোগ এখানে প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় আত্মরূপান্তরের। এটি বোঝায় যে কোনো উচ্চতর সত্যকে উপলব্ধি করতে আকস্মিক আবেগ যথেষ্ট নয়। ধারাবাহিক অনুশীলন প্রয়োজন।
চেতসা প্রতীক অন্তর্জগতের। বাহ্যিক পৃথিবী পরিবর্তন করার আগে মানুষকে নিজের চেতনার প্রকৃতি বুঝতে হয়।
নান্যগামিনা প্রতীক একনিষ্ঠতার। জীবনের বহু আকর্ষণের মধ্যেও একটি সর্বোচ্চ মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে জীবনকে সংগঠিত করার শিক্ষা এখানে রয়েছে।
পরম পুরুষ প্রতীক চূড়ান্ত সত্যের। মানুষের সমস্ত অনুসন্ধান, জ্ঞান, প্রেম ও সাধনার যে সর্বোচ্চ কেন্দ্র হতে পারে, পরম পুরুষ সেই কেন্দ্রের প্রতীক।
দিব্য প্রতীক জাগতিক সীমা অতিক্রমের। মানুষ যখন নিজের ক্ষুদ্র অহং, কামনা ও ভয়ের বাইরে বৃহত্তর কোনো সত্যের সন্ধান করে তখন তার চেতনার মধ্যে এক ধরনের দিব্যতার বিকাশ ঘটে।
মনোবৈজ্ঞানিক তাৎপর্য
আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায়ও এই শ্লোকের একটি তাৎপর্যপূর্ণ পাঠ সম্ভব। মানুষের মন পুনরাবৃত্ত চিন্তা ও আচরণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মানসিক প্রবণতা শক্তিশালী করে। মনোযোগ যেখানে বারবার স্থাপিত হয়, মানসিক অভ্যাসও ধীরে ধীরে সেই দিকে গড়ে ওঠে।
এই দৃষ্টিতে অভ্যাসযোগ হল মনোযোগের প্রশিক্ষণ। নান্যগামিতা হল মনোযোগের বিচ্ছিন্নতা কমানোর আদর্শ। অনুচিন্তন হল একটি নির্বাচিত উচ্চতর ভাবের ধারাবাহিক স্মরণ।
তবে গীতার উদ্দেশ্য কেবল মানসিক দক্ষতা অর্জন নয়। এর লক্ষ্য আরও গভীর। মনকে প্রশিক্ষিত করে মানুষ যেন নিজের অস্তিত্বের সর্বোচ্চ সত্যের দিকে অগ্রসর হয়।
বাস্তব জীবনের উদাহরণ
একজন সংগীতশিল্পী প্রতিদিন একই সুর বারবার অনুশীলন করেন। প্রথমদিকে তার আঙুল ভুল করে। পরে পুনরাবৃত্তির ফলে সেই সুর তার শরীর ও মনে স্বাভাবিক হয়ে যায়। একইভাবে একজন সাধক যখন প্রতিদিন ঈশ্বরের নাম স্মরণ করেন, ধ্যান করেন এবং নিজের মনকে বারবার সেই চিন্তার দিকে ফিরিয়ে আনেন, তখন ঈশ্বরস্মরণ ধীরে ধীরে তার চেতনার স্বাভাবিক প্রবাহে পরিণত হয়।
একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন একটি বিষয় অধ্যয়ন করলে তার জ্ঞান গভীর হয়। কিন্তু যদি প্রতিদিন নতুন নতুন বিষয়ে লাফিয়ে বেড়ায় এবং কোনো বিষয়েই মন স্থির না করে তবে গভীরতা অর্জন কঠিন হয়। নান্যগামিনা এই গভীরতারই আধ্যাত্মিক রূপ।
একজন মানুষ জীবনের নানা দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সংসার করতে পারেন, কাজ করতে পারেন, সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। তবু তাঁর অন্তরের মূল্যবোধ যদি সত্য, ঈশ্বরস্মরণ এবং আত্মজিজ্ঞাসাকে কেন্দ্র করে থাকে তবে বাহ্যিক কর্মের মধ্যেও তাঁর চেতনা পরম লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত হতে পারে।
পূর্ববর্তী শ্লোকের সঙ্গে সম্পর্ক
এই শ্লোকটি অষ্টম অধ্যায়ের পূর্ববর্তী শিক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সপ্তম শ্লোকে ভগবান বলেছেন যে সমস্ত কর্মের মধ্যেও তাঁকে স্মরণ করতে হবে এবং কর্তব্যকর্মও সম্পাদন করতে হবে। অষ্টম শ্লোক সেই স্মরণের পদ্ধতি আরও স্পষ্ট করে। শুধু স্মরণ করার ইচ্ছা যথেষ্ট নয়। অভ্যাসের মাধ্যমে মনকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যাতে সে অন্যদিকে না যায়।
এই কারণে অভ্যাসযোগ এবং অনুচিন্তন পরস্পর সম্পর্কিত। অভ্যাস মনকে প্রস্তুত করে এবং অনুচিন্তন সেই প্রস্তুত মনকে পরম পুরুষের দিকে নিবদ্ধ রাখে।
মানবজীবনের জন্য শিক্ষা
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল মানুষের অন্তর্গত প্রবাহ পরিবর্তনযোগ্য। মন যেমন এখন আছে তেমনই থাকবে, এমন কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে মনকে প্রশিক্ষিত করা যায়।
দ্বিতীয় শিক্ষা হল আধ্যাত্মিক উপলব্ধি আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। তার জন্য ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।
তৃতীয় শিক্ষা হল জীবনের প্রকৃত রূপান্তর বাহ্যিক পরিবর্তনের চেয়ে অন্তর্গত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে নিহিত।
চতুর্থ শিক্ষা হল একাগ্রতা শুধু কর্মজীবনের সাফল্যের জন্য নয়। এটি আত্মজ্ঞান এবং ঈশ্বরসাধনারও মৌলিক শক্তি।
পঞ্চম শিক্ষা হল মানুষের জীবনে সর্বোচ্চ একটি লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন। যে চেতনার কোনো কেন্দ্র নেই, সে সহজেই অসংখ্য আকর্ষণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর যে চেতনার একটি পরম কেন্দ্র আছে, তার জীবন ধীরে ধীরে অর্থপূর্ণ ও সুসংহত হয়।
সাহিত্যিক তাৎপর্য
শ্লোকটির ভাষায় একটি সুন্দর গতিশীলতা রয়েছে। প্রথমে আসে অভ্যাসযোগ। তারপর আসে চেতনা। তারপর আসে অন্যদিকে না যাওয়ার সংকল্প। এরপর প্রকাশ পায় পরম পুরুষের লক্ষ্য। শেষে অনুচিন্তনের মাধ্যমে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর কথা বলা হয়।
অর্থাৎ শ্লোকটি যেন মানুষের অন্তর্জগতের একটি যাত্রাপথ নির্মাণ করে। অনুশীলন থেকে সংযোগ, সংযোগ থেকে একাগ্রতা, একাগ্রতা থেকে স্মরণ, স্মরণ থেকে উপলব্ধি এবং উপলব্ধি থেকে পরম গন্তব্য।
একটি গভীর উপমা
মানুষের মনকে যদি একটি নদীর সঙ্গে তুলনা করা হয় তবে সাধারণ অবস্থায় সেই নদী অসংখ্য শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। ইন্দ্রিয়, কামনা, ভয়, স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা এবং বাহ্যিক বিষয় তার প্রবাহকে বিভিন্ন দিকে নিয়ে যায়।
অভ্যাসযোগ হল সেই নদীর প্রবাহকে ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করা। নান্যগামিতা হল তার অপ্রয়োজনীয় শাখাগুলি থেকে বিচ্যুতি বন্ধ করা। অনুচিন্তন হল সেই প্রবাহকে নিরন্তর পরম সমুদ্রের দিকে নিয়ে যাওয়া। আর পরম পুরুষ হল সেই চূড়ান্ত মহাসাগর যেখানে ব্যক্তিগত চেতনার সমস্ত অনুসন্ধান তার সর্বোচ্চ অর্থ খুঁজে পায়।
সারসংক্ষেপ
অভ্যাসযোগযুক্তেন চেতসা নান্যগামিনা। পরমং পুরুষং দিব্যং যাতি পার্থানুচিন্তয়ন্ এই শ্লোকটি মূলত মানুষের চেতনাকে একটি নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক অভিমুখ দেওয়ার শিক্ষা। অভ্যাসযোগ নির্দেশ করে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে মনকে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। চেতসা নির্দেশ করে অন্তর্জগতকে সাধনার কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করার কথা। নান্যগামিনা নির্দেশ করে একাগ্র ও অবিচল চেতনার আদর্শ। পরমং পুরুষং দিব্যং নির্দেশ করে সর্বোচ্চ ঈশ্বরীয় বা পরম চৈতন্যসত্তাকে। আর অনুচিন্তয়ন্ নির্দেশ করে সেই পরম সত্যের ধারাবাহিক স্মরণ, মনন ও ধ্যানকে।
শব্দগতভাবে এটি একটি সংস্কৃত সাধনাবাক্য। দার্শনিকভাবে এটি চেতনার চূড়ান্ত অভিমুখের শিক্ষা। মনোবৈজ্ঞানিকভাবে এটি অভ্যাস ও মনোযোগের শক্তির একটি গভীর উপলব্ধি। সাহিত্যিকভাবে এটি মানুষের অন্তর্জগতের একটি ঊর্ধ্বমুখী যাত্রার চিত্র। আধ্যাত্মিকভাবে এটি জানায় যে মানুষ তার চেতনার ধারাকে যেদিকে নিয়মিত পরিচালিত করে, তার জীবনও ধীরে ধীরে সেই দিকেই রূপান্তরিত হয়।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর সত্য সম্ভবত এখানেই যে পরম সত্যের দিকে একবার তাকানোই যথেষ্ট নয়। তাকে জীবনের চেতনার কেন্দ্র করে তুলতে হয়। মন বারবার বিচ্যুত হলেও তাকে আবার ফিরিয়ে আনতে হয়। এই ফিরে আসার ধারাবাহিকতাই অভ্যাস। সেই অভ্যাস যখন যোগে পরিণত হয়, তখন চেতনা অন্যদিকে না গিয়ে পরমের দিকে প্রবাহিত হয়। আর সেই অবিচ্ছিন্ন অনুচিন্তনের মধ্য দিয়েই সাধকের জীবনে পরম দিব্য পুরুষের উপলব্ধির দ্বার উন্মুক্ত হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!