ভগবদ্গীতা ৮.৯ | সর্বজ্ঞ, অনাদি, সূক্ষ্মতম ও জ্যোতির্ময় পরম সত্তার গভীর পরিচয়
কবিং পুরাণমনুশাসিতারম্
অণোরণীয়াংসমনুস্মরেদ্ যঃ।
সর্বস্য ধাতারমচিন্ত্যরূপম্
আদত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ।।৯।।
অনুবাদঃ সর্বজ্ঞ, সনাতন, নিয়ন্তা, সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর, সকলের বিধাতা, জড় বুদ্ধির অতীত, অচিন্ত্য ও পুরুষরূপে পরমেশ্বর ভগবানের ধ্যান করা উচিত। তিনি সূর্যের মতো জ্যোতির্ময় এবং এই জড়া প্রকৃতির অতীত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ের নবম শ্লোকটি পরম সত্যের এক অসাধারণ এবং গভীর পরিচয় তুলে ধরে। এখানে শ্রীকৃষ্ণ এমন এক পরম সত্তার কথা বলেছেন যিনি সর্বজ্ঞ, অনাদি, বিশ্বজগতের নিয়ন্তা, অণুর চেয়েও সূক্ষ্ম, সকল সত্তার ধারক, সাধারণ চিন্তার অতীত, সূর্যের ন্যায় জ্যোতির্ময় এবং সমস্ত অন্ধকারের অতীত। শ্লোকটির প্রতিটি শব্দের মধ্যে ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শনের একটি করে মৌলিক ধারণা নিহিত রয়েছে। এই কারণে শ্লোকটি কেবল ঈশ্বরের প্রশংসা নয়, বরং পরম বাস্তবতা কী, মানুষের চেতনার প্রকৃতি কী এবং জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কোথায়, সেই প্রশ্নগুলোরও একটি গভীর উত্তর।
শ্লোকটির সূচনা হয়েছে কবিং শব্দ দিয়ে। কবি শব্দের সাধারণ অর্থ কবিতা রচনাকারী হলেও বৈদিক ও উপনিষদীয় ব্যবহারে কবি শব্দের অর্থ অনেক বিস্তৃত। কবি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি গভীরভাবে দেখেন, যিনি বাহ্যিক ঘটনার অন্তরালে থাকা সত্য উপলব্ধি করতে পারেন। সেই কারণে পরম সত্তাকে কবি বলা হয়েছে সর্বদ্রষ্টা ও সর্বজ্ঞ অর্থে। মানুষ সীমিত ইন্দ্রিয় ও সীমিত বুদ্ধির দ্বারা জগতকে উপলব্ধি করে। সে কোনো ঘটনার একটি অংশ দেখতে পারে, অতীত সম্পর্কে অনুমান করতে পারে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা করতে পারে। কিন্তু পরম সত্তার জ্ঞান কোনো সীমিত সময় বা দৃষ্টিকোণের দ্বারা আবদ্ধ নয়। তাই কবিং শব্দের মধ্যে সর্বজ্ঞতা এবং সর্বদর্শিতার ধারণা প্রকাশিত হয়েছে।
এরপর এসেছে পুরাণম্ শব্দ। পুরাণ শব্দের মূল ভাব প্রাচীনতা এবং প্রাচীন হওয়ার সঙ্গে এর একটি গভীরতর অর্থ যুক্ত হয়েছে অনাদিত্বের। এখানে পরম সত্তাকে কেবল বহু পুরোনো কোনো সত্তা বলা হয়নি। কারণ যে বস্তু সময়ের মধ্যে জন্ম নেয় তার একটি সূচনা থাকে এবং যা সময়ের অধীন তার পরিবর্তন ও ক্ষয় ঘটে। কিন্তু পরম সত্যকে বলা হচ্ছে পুরাণম্ অর্থাৎ এমন এক চিরন্তন বাস্তবতা যার কোনো ঐতিহাসিক সূচনা নেই। সমস্ত পরিবর্তনশীল জগতের পেছনে যে অপরিবর্তনীয় সত্য অবস্থান করে, পুরাণম্ সেই চিরন্তনতার প্রতীক। মানুষ সময়ের প্রবাহে জন্ম নেয়, বেড়ে ওঠে, পরিবর্তিত হয় এবং একদিন বিলীন হয়। কিন্তু পরম সত্য সময়ের পরিবর্তনের মধ্যে আবদ্ধ নয়। তাই পুরাণম্ শব্দ আমাদের ক্ষণস্থায়ী জীবনের মধ্যে চিরন্তন সত্যের অনুসন্ধান করতে শেখায়।
অনুশাসিতারম্ শব্দটি এই পরম সত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ করে। এর সঙ্গে শাস ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে এবং শাসের অর্থ শাসন করা, নির্দেশ দেওয়া, পরিচালনা করা এবং নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা। অনুশাসিতারম্ তাই সেই সত্তাকে নির্দেশ করে যিনি সমগ্র ব্যবস্থাকে নিয়মের মধ্যে পরিচালিত করেন। এখানে শাসন বলতে মানুষের মতো কোনো বাহ্যিক কর্তৃত্ব বোঝানো হয়নি। বরং প্রকৃতির নিয়ম, কর্মের ফল, নৈতিকতার বিধান এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার অন্তর্নিহিত ভিত্তিকে বোঝানো হয়েছে। মানুষ নিজের ইচ্ছামতো কাজ করতে পারে, কিন্তু কর্মের ফল থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। এই কারণেই অনুশাসিতারম্ শব্দের মধ্যে বিশ্বজগতের একটি গভীর নৈতিক ও মহাজাগতিক শৃঙ্খলার ধারণা প্রকাশিত হয়েছে।
অণোরণীয়াংসম্ শব্দটি শ্লোকটির অন্যতম গভীর দার্শনিক প্রকাশ। অণু শব্দের অর্থ ক্ষুদ্র এবং অণীয়ান অর্থ আরও সূক্ষ্ম বা ক্ষুদ্রতর। অণোরণীয়াংসম্ অর্থ অণুর চেয়েও সূক্ষ্ম। এখানে পরম সত্তার সূক্ষ্মতা কোনো সাধারণ ভৌত ক্ষুদ্রতার অর্থে বোঝানো হয়নি। পরম সত্য এমন কোনো বস্তু নয় যাকে চোখে দেখা বা হাতে ধরা যায়। তিনি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের একটি সীমিত বস্তু নন। বরং সমস্ত অভিজ্ঞতার অন্তর্নিহিত চৈতন্যস্বরূপ। মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি ও জ্ঞান প্রত্যক্ষভাবে দৃশ্যমান নয়, অথচ সেগুলো ছাড়া মানুষের জীবন কল্পনা করা যায় না। তেমনি পরম সত্তার সূক্ষ্মতা তাঁর অদৃশ্য অথচ সর্বব্যাপী অস্তিত্বের প্রতীক।
এই সূক্ষ্ম পরম সত্তাকে স্মরণ করার কথা বলা হয়েছে অনুস্মরেদ্ যঃ এর মাধ্যমে। অনুস্মরণ অর্থ কেবল একবার কোনো নাম উচ্চারণ করা নয়। এর মধ্যে রয়েছে বারবার স্মরণ করা, গভীরভাবে মনে রাখা এবং চেতনার মধ্যে কোনো সত্যকে স্থায়ীভাবে ধারণ করা। মানুষের মন যে বিষয়কে বারবার চিন্তা করে তার দ্বারা ধীরে ধীরে প্রভাবিত হয়। অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতা, ভয় বা আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে জীবন পরিচালিত হলে মানুষের চেতনাও সেই বিষয়গুলোর দ্বারা আবদ্ধ হয়ে পড়ে। বিপরীতে পরম সত্যের স্মরণ মানুষের মনকে উচ্চতর আদর্শের দিকে পরিচালিত করে। তাই এখানে স্মরণ একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন এবং চেতনার রূপান্তরের পথ।
সর্বস্য ধাতারম্ পদটি পরম সত্তার সর্বধারক রূপ প্রকাশ করে। সর্বস্য অর্থ সকলের এবং ধাতারম্ অর্থ যিনি ধারণ করেন, ধরে রাখেন বা অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেন। পৃথিবীর প্রতিটি সত্তা অন্য কোনো বৃহত্তর ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। মানুষের শরীর খাদ্য, জল ও বায়ুর উপর নির্ভর করে। জীবনের অস্তিত্ব প্রকৃতির উপর নির্ভর করে। প্রকৃতি বৃহত্তর মহাজাগতিক ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। এই নির্ভরতার সর্বশেষ ভিত্তি কোথায়, সেই প্রশ্নের উত্তর হিসেবেই ধাতারম্ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরম সত্তা নিজে অন্য কিছুর দ্বারা ধারণকৃত নন, বরং সমস্ত কিছুর অস্তিত্ব তাঁর উপর নির্ভরশীল। এই ভাবনা মানুষের অহংকারকে বিনম্র করে এবং তাকে উপলব্ধি করতে শেখায় যে ব্যক্তিসত্তা বৃহত্তর অস্তিত্বের একটি অংশ।
অচিন্ত্যরূপম্ শব্দটি পরম সত্যের রহস্যময় স্বরূপ প্রকাশ করে। অচিন্ত্য অর্থ সাধারণ চিন্তার দ্বারা সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধ করা যায় না এবং রূপ অর্থ স্বরূপ বা প্রকাশের ধরন। অর্থাৎ পরম সত্য এমন এক বাস্তবতা যাকে সীমিত মানসিক ধারণার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ করা যায় না। এর অর্থ এই নয় যে ঈশ্বর সম্পর্কে কোনো জ্ঞান লাভ সম্ভব নয়। বরং এর অর্থ হলো মানুষের বুদ্ধি সীমিত এবং পরম বাস্তবতা অসীম। একটি সীমিত পাত্র যেমন সমুদ্রকে সম্পূর্ণ ধারণ করতে পারে না, তেমনি সীমিত বুদ্ধি অসীম সত্যকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে না। মানুষ সেই সত্য সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারে, তার দিকে অগ্রসর হতে পারে এবং তার সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে, কিন্তু তাকে একটি সীমিত সংজ্ঞার মধ্যে আবদ্ধ করতে পারে না।
এরপর আসে আদিত্যবর্ণম্। আদিত্য অর্থ সূর্য এবং বর্ণ অর্থ আভা, দীপ্তি বা প্রকাশ। তাই আদিত্যবর্ণম্ অর্থ সূর্যের ন্যায় জ্যোতির্ময়। ভারতীয় আধ্যাত্মিক সাহিত্যে সূর্য কেবল একটি জ্যোতিষ্ক নয়। সূর্য আলো, জীবন, জ্ঞান এবং প্রকাশের প্রতীক। অন্ধকারে যা অদৃশ্য থাকে, আলো তাকে প্রকাশ করে। একইভাবে অজ্ঞতার অন্ধকারে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ আচ্ছন্ন থাকে এবং জ্ঞানের আলো সেই আবরণ দূর করে। তাই আদিত্যবর্ণম্ পরম সত্যের জ্ঞানময় এবং চৈতন্যময় প্রকৃতিকে নির্দেশ করে। এই আলো কোনো বাহ্যিক আলো নয়। এটি অন্তরের জ্ঞানপ্রকাশের প্রতীক।
এই ধারণার সঙ্গে তমসঃ পরস্তাৎ শব্দের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। তমসঃ অর্থ অন্ধকারের এবং পরস্তাৎ অর্থ তার ওপারে বা অতীত। অর্থাৎ পরম সত্য অন্ধকারের অতীত। ভারতীয় দর্শনে অন্ধকার কেবল আলো না থাকার অবস্থা নয়। তমস্ অজ্ঞতা, মোহ, জড়তা এবং সত্য সম্পর্কে অচেতনতার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে তখন সে বাহ্যিক পরিচয়কে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় মনে করে। সে শরীর, সম্পদ, ক্ষমতা, সম্পর্ক এবং সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে নিজের অস্তিত্ব নির্ধারণ করে। জ্ঞানের আলো যখন সেই অজ্ঞতার আবরণ দূর করে তখন মানুষ নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে গভীরতর সত্য উপলব্ধি করতে শুরু করে। তমসঃ পরস্তাৎ তাই কেবল অন্ধকারের বাইরে অবস্থান করার কথা নয়, বরং অজ্ঞতার সীমা অতিক্রম করার আধ্যাত্মিক আহ্বান।
সমগ্র শ্লোকটি একত্রে দেখলে দেখা যায়, এখানে পরম সত্তাকে একই সঙ্গে সর্বজ্ঞ এবং সূক্ষ্ম, অনাদি এবং বর্তমান, নিয়ন্তা এবং ধারক, চিন্তার অতীত এবং স্মরণযোগ্য, আলো এবং অন্ধকারের অতীত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এগুলো পরম সত্যের অসীমতার বিভিন্ন দিক প্রকাশ করে। তিনি অণুর চেয়েও সূক্ষ্ম অথচ সমস্ত বিশ্বকে ধারণ করেন। তিনি চিন্তার অতীত অথচ গভীর ধ্যানের বিষয়। তিনি অনাদি অথচ প্রতিটি বর্তমান অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত ভিত্তি। তিনি আলোস্বরূপ অথচ কোনো সীমিত ভৌত আলোর মধ্যে আবদ্ধ নন।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক ভারতীয় দর্শনের একটি মৌলিক প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়। জগতের পরিবর্তনশীলতার পেছনে কি কোনো অপরিবর্তনীয় সত্য রয়েছে। অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শ্লোককে ব্রহ্মের চৈতন্যস্বরূপের সঙ্গে সম্পর্কিত করা যায়। ব্রহ্ম ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কোনো বস্তু নয়। তিনি সমস্ত অভিজ্ঞতার অন্তর্নিহিত চৈতন্য। বিশিষ্টাদ্বৈত দৃষ্টিতে পরম সত্তা হলেন সর্বশক্তিমান ব্যক্তিগত ঈশ্বর যিনি সমগ্র জগতের অন্তর্যামী ও ধারক। দ্বৈত দর্শনে জীব ও ঈশ্বরের মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখেও এই শ্লোকের মাধ্যমে ঈশ্বরের সর্বজ্ঞতা, সর্বনিয়ন্ত্রণ এবং পরম শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও সব দৃষ্টিভঙ্গির একটি অভিন্ন শিক্ষা হলো মানুষের সীমিত অস্তিত্বের ঊর্ধ্বে একটি পরম সত্য রয়েছে এবং সেই সত্যের উপলব্ধি মানুষের জীবনকে রূপান্তরিত করতে পারে।
সাহিত্যিক ও প্রতীকী দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে আলো এবং অন্ধকারের প্রতীক মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন প্রতীক হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। আলো জ্ঞানের প্রতীক এবং অন্ধকার অজ্ঞতার প্রতীক। সূর্য সত্যের প্রকাশকে নির্দেশ করে। অণুর চেয়েও সূক্ষ্মতা নির্দেশ করে যে সত্য বাহ্যিক আকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পুরাণম্ চিরন্তনতার প্রতীক। সর্বস্য ধাতারম্ অস্তিত্বের নিরাপদ ভিত্তির প্রতীক। অনুশাসিতারম্ মহাজাগতিক শৃঙ্খলার প্রতীক এবং অচিন্ত্যরূপম্ মানুষের বুদ্ধির সীমাবদ্ধতার প্রতীক। এই সমস্ত প্রতীক একত্রে মানুষের অন্তর্জগতের একটি আধ্যাত্মিক মানচিত্র তৈরি করে।
মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের শিক্ষা গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। মানুষ সাধারণত বাহ্যিক পরিবর্তনকে নিজের জীবনের কেন্দ্র মনে করে। সম্পদ বাড়লে আনন্দিত হয়, সম্পদ কমলে দুঃখিত হয়। প্রশংসা পেলে নিজের মূল্য বাড়ে বলে মনে করে এবং অপমান পেলে নিজের অস্তিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত মনে করে। কিন্তু এই সমস্ত পরিচয় পরিবর্তনশীল। শ্লোকটি মানুষের দৃষ্টি পরিবর্তন করে তাকে চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় সত্যের দিকে তাকাতে শেখায়। জীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতার বাইরে একটি গভীরতর অস্তিত্ব রয়েছে। সেই অস্তিত্বকে স্মরণ করলে মানুষের মধ্যে স্থিরতা, আত্মসংযম, বিনয় এবং অন্তর্দৃষ্টি জন্ম নিতে পারে।
একটি অন্ধকার ঘরের কথা ভাবা যেতে পারে। ঘরের মধ্যে অসংখ্য বস্তু রয়েছে, কিন্তু আলো না থাকলে সেগুলো দেখা যায় না। আলো কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর আকৃতি নয়, কিন্তু আলো ছাড়া কোনো বস্তুর দৃশ্যমানতা সম্ভব হয় না। তেমনি চৈতন্যকে কোনো দৃশ্যমান বস্তু হিসেবে ধরা যায় না, কিন্তু চৈতন্য ছাড়া মানুষের সমস্ত অভিজ্ঞতা অর্থহীন হয়ে যায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আদিত্যবর্ণম্ শব্দটি মানুষের অন্তর্নিহিত জ্ঞানের আলোর একটি শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে।
আবার মহাসাগরের সঙ্গে ঢেউয়ের উপমাও এখানে প্রাসঙ্গিক। একটি ঢেউ নিজেকে পৃথক বলে মনে করতে পারে, কিন্তু তার অস্তিত্ব সমুদ্রের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। ঢেউয়ের জন্ম হয়, পরিবর্তন ঘটে এবং একসময় তা সমুদ্রেই মিলিয়ে যায়। মানুষের ব্যক্তিসত্তার ক্ষেত্রেও অনুরূপ একটি ভাবনা দেখা যায়। আমরা নিজেদের পৃথক ব্যক্তি হিসেবে অনুভব করি, কিন্তু আমাদের অস্তিত্ব বৃহত্তর প্রকৃতি, সমাজ এবং মহাজাগতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সর্বস্য ধাতারম্ এই নির্ভরতার সত্যকে স্মরণ করায়।
শ্লোকটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মৃত্যুকালের স্মরণ। অষ্টম অধ্যায়ের আলোচনায় জীবনের শেষ মুহূর্তে চেতনার অবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর মুহূর্তে হঠাৎ করে কোনো উচ্চতর সত্যকে স্মরণ করা সহজ নয়। মানুষের চেতনা দীর্ঘদিনের অভ্যাস দ্বারা গঠিত হয়। যে ব্যক্তি সারাজীবন ভোগ, ভয়, আকাঙ্ক্ষা এবং অহংকারকে কেন্দ্র করে চিন্তা করেছে, তার মন শেষ মুহূর্তেও সেই প্রবণতার দিকে আকৃষ্ট হতে পারে। বিপরীতে যে ব্যক্তি নিয়মিতভাবে পরম সত্যকে স্মরণ করেছে, তার চেতনা ধীরে ধীরে সেই সত্যের দিকে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। তাই অনুস্মরণ এখানে একটি জীবনব্যাপী সাধনা।
এই শ্লোকের আধ্যাত্মিক শিক্ষা শেষ পর্যন্ত মানুষকে নিজের অন্তর্গত অন্ধকার অতিক্রম করার আহ্বান জানায়। অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানে, অস্থিরতা থেকে স্থিরতায়, অহংকার থেকে বিনয়ে এবং বাহ্যিক আসক্তি থেকে অন্তর্গত সত্যের দিকে যাত্রাই এর মূল সুর। পরম সত্তাকে স্মরণ করা মানে কেবল কোনো ধর্মীয় নাম উচ্চারণ করা নয়। এর অর্থ নিজের চেতনার কেন্দ্রকে এমন এক সত্যের সঙ্গে যুক্ত করা যা পরিবর্তনশীল জগতের ঊর্ধ্বে।
সুতরাং কবিং পুরাণমনুশাসিতারম্ অণোরণীয়াংসমনুস্মরেদ্ যঃ সর্বস্য ধাতারমচিন্ত্যরূপম্ আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ এই শ্লোকটি মানুষের সামনে পরম সত্যের এক পূর্ণাঙ্গ প্রতিচিত্র তুলে ধরে। এখানে পরম সত্তা সর্বদ্রষ্টা, অনাদি, বিশ্বনিয়ন্তা, অতিসূক্ষ্ম, সর্বধারক, চিন্তার অতীত, জ্যোতির্ময় এবং অজ্ঞতার অন্ধকারের অতীত। ভাষার দিক থেকে প্রতিটি শব্দের নিজস্ব গভীর অর্থ রয়েছে এবং দর্শনের দিক থেকে প্রতিটি শব্দ মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। সাহিত্যিকভাবে এটি আলো ও অন্ধকারের চিরন্তন প্রতীকের মাধ্যমে সত্য ও অজ্ঞতার পার্থক্য প্রকাশ করে। আধ্যাত্মিকভাবে এটি মানুষকে নিজের চেতনার গভীরে প্রবেশ করে সেই পরম আলোর সন্ধান করতে আহ্বান জানায়। এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো মানুষ যেন ক্ষণস্থায়ী পরিচয় ও পরিবর্তনশীল জগতের মধ্যে আবদ্ধ না থেকে সেই চিরন্তন সত্যকে স্মরণ করে যার উপর সমস্ত অস্তিত্ব নির্ভরশীল। সেই সত্যের স্মরণই অজ্ঞতার অন্ধকার অতিক্রম করে জ্ঞানের আলোয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!