ভগবদ্গীতা ৯.১ | রাজবিদ্যা রাজগুহ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মোক্ষলাভের গভীর তত্ত্ব
শ্রীভগবানুবাচ
ইদং তু তে গুহ্যতমং প্রবক্ষ্যাম্যনসূয়বে।
জ্ঞানং বিজ্ঞানসহিতং যজজ্ঞাত্বা মোক্ষ্যসেহশুভাৎ।।১।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন-হে অর্জুন! তুমি নির্মৎসর বলে তোমাকে আমি পরম বিজ্ঞান সমন্বিত সবচেয়ে গোপনীয় জ্ঞান উপদেশ করছি। সেই জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে তুমি দুঃখময় সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত হও।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকটি এমন একটি মুহূর্তের সূচনা করে, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের সামনে জ্ঞানের আরও গভীর একটি দ্বার খুলে দেন। অধ্যায়ের প্রচলিত নাম রাজবিদ্যা রাজগুহ্য যোগ। অর্থাৎ এমন এক জ্ঞান যা বিদ্যার মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং রহস্যের মধ্যে গভীরতম। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, তিনি এখন তাকে এমন এক পরম গোপনীয় জ্ঞান প্রকাশ করবেন, যা জ্ঞানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ উপলব্ধিকে যুক্ত করে এবং যা জানতে পারলে মানুষ অশুভ থেকে মুক্ত হতে পারে। এই বক্তব্যের মধ্যে শুধু একটি ধর্মীয় উপদেশ নেই। এখানে মানুষের অজ্ঞতা থেকে জ্ঞান, জ্ঞান থেকে উপলব্ধি এবং উপলব্ধি থেকে মুক্তির একটি গভীর অন্তর্জাগতিক যাত্রার ইঙ্গিত রয়েছে।
শ্লোকের শুরুতেই আছে ইদং তু তে। অর্থাৎ এই বিষয়টি তোমাকে বিশেষভাবে বলা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায় যে কৃষ্ণ কেবল একটি সাধারণ তাত্ত্বিক আলোচনা করতে যাচ্ছেন না। তিনি অর্জুনের সামনে এমন একটি সত্য তুলে ধরতে চলেছেন, যা তার জীবনের সংকটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। মানুষের জীবনে এমন অনেক প্রশ্ন আসে যার উত্তর শুধু বাহ্যিক তথ্য দিয়ে পাওয়া যায় না। আমি কে, আমার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, কেন আমি দুঃখ পাই, কেন আসক্তি আমাকে বেঁধে রাখে এবং কীভাবে সেই বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায়, এই প্রশ্নগুলো মানুষের অন্তরের প্রশ্ন। গীতার এই পর্যায়ে কৃষ্ণ সেই গভীর প্রশ্নগুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
গুহ্যতম শব্দটি এই শ্লোকের একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ। গুহ্য শব্দটি সংস্কৃত গুহ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে লুকানো, আবৃত থাকা এবং গোপন থাকার ভাব রয়েছে। গুহ্যতম অর্থ সবচেয়ে গোপনীয় বা গভীরতম রহস্যময়। তবে এখানে গোপনীয় বলতে এমন কোনো বিষয় বোঝানো হচ্ছে না যা ইচ্ছা করে মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। বরং এটি এমন এক সত্যের কথা বলে যা মানুষের চোখের সামনে থেকেও তার সাধারণ চেতনায় ধরা পড়ে না। যেমন আকাশ আমাদের চারপাশে সর্বদা রয়েছে, কিন্তু তার অসীমতা উপলব্ধি করার জন্য শুধু আকাশের দিকে তাকানো যথেষ্ট নয়। তেমনি আত্মা, ঈশ্বর, চেতনা এবং জীবনের প্রকৃত স্বরূপ মানুষের অস্তিত্বের মধ্যেই উপস্থিত থাকলেও তাকে উপলব্ধি করার জন্য সাধারণ দৃষ্টির বাইরে যেতে হয়।
এরপর আসে প্রবক্ষ্যামি শব্দটি। এর মূল সম্পর্ক সংস্কৃত বচ ধাতুর সঙ্গে, যার অর্থ বলা বা প্রকাশ করা। প্র উপসর্গ যুক্ত হয়ে এর মধ্যে সামনে এনে প্রকাশ করার ভাব তৈরি হয়েছে। কৃষ্ণ এখানে বলছেন যে তিনি সেই গভীর সত্য অর্জুনের কাছে প্রকাশ করবেন। এই প্রকাশের মধ্যে শিক্ষক ও শিষ্যের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। সত্য কেবল বই থেকে পাওয়া যায় না। কখনও কখনও এমন একজন পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন হয় যিনি নিজের উপলব্ধির আলো দিয়ে সত্যের দিকে নির্দেশ করতে পারেন। কৃষ্ণের বক্তব্য সেই অর্থে শুধু তথ্য প্রদান নয়, বরং অর্জুনের চেতনার সামনে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির দরজা খুলে দেওয়া।
অর্জুনকে অনসূয়বে বলে সম্বোধন করাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনসূয়া বলতে এমন মনকে বোঝানো হয় যার মধ্যে ঈর্ষা, বিদ্বেষপূর্ণ দোষদৃষ্টি বা অন্যের উৎকর্ষকে ছোট করে দেখার প্রবণতা নেই। কৃষ্ণ যেন বলতে চাইছেন, গভীর সত্য গ্রহণের জন্য শুধু বুদ্ধি যথেষ্ট নয়, মনের একটি বিশেষ অবস্থাও প্রয়োজন। যে ব্যক্তি মনে করে সে সব জানে, তার শেখার পথ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যে ব্যক্তি প্রশ্ন করতে পারে, নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে পারে এবং সত্যকে আন্তরিকভাবে জানতে চায়, তার কাছে নতুন উপলব্ধির দরজা খুলে যায়। অর্জুনের মধ্যে সেই গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলেই কৃষ্ণ তাকে এই গভীর জ্ঞান প্রকাশ করছেন।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোর একটি হলো জ্ঞানং বিজ্ঞানসহিতম। জ্ঞান শব্দটি সংস্কৃত জ্ঞা ধাতু থেকে এসেছে। এর অর্থ জানা, চিনতে পারা বা উপলব্ধি করা। কিন্তু গীতার জ্ঞান কেবল তথ্য জানা নয়। একজন মানুষ বই পড়ে জানতে পারে যে রাগ মানুষের ক্ষতি করে। কিন্তু সেই জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সে রাগ করতে পারে। সে জানে আসক্তি দুঃখ সৃষ্টি করে, তবুও আসক্ত হয়। সে জানে সব সম্পদ একদিন ছেড়ে যেতে হবে, তবুও সারাজীবন সম্পদের পেছনে ছুটতে পারে। তাই শুধু জানা মানুষের জীবন পরিবর্তন করার জন্য যথেষ্ট নয়।
এই জায়গাতেই বিজ্ঞান শব্দটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিজ্ঞান শব্দটি বি এবং জ্ঞান থেকে গঠিত। এখানে বি উপসর্গ বিশেষভাবে জানা, বিশদভাবে জানা বা প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধির ভাব প্রকাশ করে। গীতার প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞানকে আধুনিক অর্থে শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণা হিসেবে বোঝা উচিত নয়। এখানে বিজ্ঞান হলো এমন জ্ঞান যা জীবন্ত উপলব্ধিতে পরিণত হয়েছে। কেউ আগুনের তাপ সম্পর্কে বই পড়ে জানতে পারে। কিন্তু আগুনের কাছে গিয়ে তার উষ্ণতা অনুভব করা সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। তাত্ত্বিক জ্ঞান আমাদের বলে সত্য কী। প্রত্যক্ষ উপলব্ধি আমাদের জীবনের মধ্যে সেই সত্যকে অনুভব করতে শেখায়। এই কারণে কৃষ্ণ জ্ঞানকে বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
এই পার্থক্য মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বর আছেন এই কথা বিশ্বাস করা এক ধরনের মানসিক ধারণা হতে পারে। ঈশ্বর সম্পর্কে দর্শন পড়া আরেক ধরনের জ্ঞান। কিন্তু জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে নিজের অহংকার, ভয়, আসক্তি এবং সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে সেই পরম সত্যের উপস্থিতি উপলব্ধি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তরের অভিজ্ঞতা। কৃষ্ণ যে জ্ঞানের কথা বলছেন, তা মানুষকে কেবল বিশ্বাসের স্তরে থামিয়ে রাখতে চায় না। সেই জ্ঞানকে এমন উপলব্ধিতে পরিণত করতে চায় যা মানুষের জীবনকে ভিতর থেকে পরিবর্তন করে।
শ্লোকের শেষ অংশে আছে যজ্জ্ঞাত্বা মোক্ষ্যসেহশুভাৎ। অর্থাৎ সেই জ্ঞান লাভ করে তুমি অশুভ থেকে মুক্ত হবে। এখানে অশুভ শব্দটির অর্থ শুধু বাহ্যিক অমঙ্গল নয়। এর গভীরে রয়েছে অজ্ঞতা, অহংকার, আসক্তি, ভয়, দ্বন্দ্ব, কর্মবন্ধন এবং নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে ভুল ধারণা। মানুষ যখন নিজেকে কেবল শরীর, সম্পদ, সামাজিক পরিচয়, পদমর্যাদা বা সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখে, তখন তার মধ্যে নানা ধরনের ভয় এবং আসক্তি জন্ম নেয়। যা পরিবর্তনশীল তাকে স্থায়ী মনে করার ফলে দুঃখ সৃষ্টি হয়। গীতার দৃষ্টিতে এই ভুল পরিচয়ই মানুষের বন্ধনের একটি প্রধান কারণ।
মোক্ষ শব্দটির সঙ্গে সংস্কৃত মুচ ধাতুর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মুচের মূল ভাব হলো ছেড়ে দেওয়া বা বন্ধন থেকে মুক্ত করা। তাই মোক্ষ কেবল মৃত্যুর পর কোনো দূরবর্তী জগতে যাওয়ার ধারণা নয়। দার্শনিক অর্থে মোক্ষ হলো বন্ধনের প্রকৃতি উপলব্ধি করা এবং সেই বন্ধনের ঊর্ধ্বে ওঠা। মানুষ যখন নিজের সুখকে বাইরের পরিস্থিতির হাতে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করে, তখন সে পরিস্থিতির দাস হয়ে যায়। কিন্তু যখন সে নিজের প্রকৃত সত্তা, কর্ম, আসক্তি এবং জীবনের গভীর সত্যকে উপলব্ধি করতে শেখে, তখন তার ভিতরে এক ধরনের স্বাধীনতা জন্ম নেয়। সেই স্বাধীনতার চূড়ান্ত রূপই মোক্ষের দিকে নির্দেশ করে।
এই শ্লোককে মানুষের চেতনার বিবর্তনের একটি সুন্দর মানচিত্র হিসেবেও দেখা যায়। প্রথমে রয়েছে অজ্ঞানতা। মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপ জানে না। তারপর আসে জ্ঞান। সে সত্য সম্পর্কে জানতে শুরু করে। কিন্তু সেখানেই যাত্রা শেষ হয় না। জ্ঞানকে জীবনের অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করতে হয়। তখন জন্ম নেয় বিজ্ঞান বা প্রত্যক্ষ উপলব্ধি। সেই উপলব্ধি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করে। যে মানুষ আগে সামান্য ঘটনায় ভেঙে পড়ত, সে ধীরে ধীরে জীবনের পরিবর্তনশীলতাকে স্বীকার করতে শেখে। যে মানুষ আগে সবকিছুকে নিজের বলে আঁকড়ে ধরত, সে ধীরে ধীরে কর্তব্য ও আসক্তির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে শেখে। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই মুক্তির পথ তৈরি হয়।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোককে আত্মস্বরূপের জ্ঞান হিসেবে দেখা যায়। মানুষের মূল সমস্যা হলো অবিদ্যা। সে নিজের প্রকৃত স্বরূপকে না জেনে শরীর ও মনের সঙ্গে নিজেকে এক করে ফেলে। আত্মজ্ঞান সেই ভুল পরিচয়কে দূর করে। ভক্তির দৃষ্টিতে আবার এই জ্ঞান ঈশ্বরকে জানা এবং ঈশ্বরের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক উপলব্ধি করার পথ। যোগের দৃষ্টিতে এটি চেতনার ওপর জমে থাকা অজ্ঞতা ও আসক্তির আবরণ সরানোর প্রক্রিয়া। দর্শনের বিভিন্ন পথ আলাদা ভাষায় ব্যাখ্যা করলেও একটি জায়গায় তাদের মিল রয়েছে। মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধ পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সত্যকে উপলব্ধি করতে হবে।
এই কারণে শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। গুহ্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে মানুষের অন্তরের সেই সত্যের, যা বাহ্যিক জীবনের কোলাহলের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। জ্ঞান প্রতীক হয়ে ওঠে সত্যকে বোঝার। বিজ্ঞান প্রতীক হয়ে ওঠে সেই সত্যকে নিজের জীবনে অনুভব করার। অনসূয়া প্রতীক হয়ে ওঠে অহংকারমুক্ত গ্রহণক্ষম মনের। অশুভ প্রতীক হয়ে ওঠে অজ্ঞতা, ভয়, আসক্তি এবং ভুল আত্মপরিচয়ের। আর মোক্ষ প্রতীক হয়ে ওঠে সেই স্বাধীনতার, যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্বকে আর কেবল বাহ্যিক পরিস্থিতির দ্বারা নির্ধারিত হতে দেয় না।
আধুনিক জীবনে এই শ্লোকের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন তথ্যের অভাব নেই। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর যেকোনো বিষয়ে অসংখ্য তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু তথ্যের পরিমাণ যত বাড়ছে, মানুষের অন্তরের শান্তি তত বাড়ছে না। কারণ তথ্য এবং প্রজ্ঞা এক জিনিস নয়। কেউ স্বাস্থ্য সম্পর্কে হাজার তথ্য জানতে পারে, কিন্তু নিজের জীবনযাপন পরিবর্তন না করলে সেই জ্ঞান তার জীবনকে বদলাবে না। কেউ নেতৃত্ব সম্পর্কে অসংখ্য বই পড়তে পারে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সেই জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ঠিক তেমনি কেউ আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে অসংখ্য বই পড়তে পারে, কিন্তু নিজের অহংকার, ভয়, আসক্তি এবং দুঃখকে বুঝতে না পারলে সেই জ্ঞান এখনও জীবন্ত হয়ে ওঠেনি।
এই জায়গাতেই গীতার জ্ঞান আজও প্রাসঙ্গিক। কৃষ্ণ যেন আমাদের শেখাচ্ছেন যে সত্যকে শুধু মাথায় ধারণ করলে হবে না। সত্যকে জীবনে ধারণ করতে হবে। জ্ঞানকে আচরণে আনতে হবে। উপলব্ধিকে চরিত্রে রূপ দিতে হবে। তখনই জ্ঞান মুক্তির শক্তিতে পরিণত হয়।
এই শ্লোকের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এখানে মুক্তির সঙ্গে জ্ঞানের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সেই জ্ঞান নিছক তথ্য নয়। এটি এমন এক জ্ঞান যা মানুষের নিজের সম্পর্কে ধারণাকে পরিবর্তন করে। মানুষ যখন বুঝতে শুরু করে যে তার সমস্ত পরিচয় পরিবর্তনশীল, তখন সে পরিবর্তনের মধ্যেও একটি গভীর স্থিরতার সন্ধান করতে পারে। যখন সে বুঝতে পারে যে আসক্তি এবং ভালোবাসা এক জিনিস নয়, তখন তার সম্পর্কগুলোও পরিণত হতে শুরু করে। যখন সে বুঝতে পারে যে কর্তব্য এবং ফলের ওপর অধিকার এক নয়, তখন তার কর্মের মধ্যেও একটি নতুন স্বাধীনতা জন্ম নেয়।
শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক আমাদের একটি সহজ অথচ গভীর সত্যের সামনে দাঁড় করায়। শুধু জানা যথেষ্ট নয়। জ্ঞানকে উপলব্ধিতে পরিণত করতে হয়। শুধু সত্যের কথা শোনা যথেষ্ট নয়। সত্যকে জীবনের মধ্যে অনুভব করতে হয়। শুধু মুক্তির কথা ভাবলেই মুক্তি আসে না। যে অজ্ঞতা, অহংকার, ভয় এবং আসক্তি আমাদের বেঁধে রাখে, তার প্রকৃতি বুঝতে হয়। শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষা তাই কেবল অর্জুনের জন্য একটি যুদ্ধক্ষেত্রের উপদেশ নয়। এটি প্রতিটি মানুষের অন্তরের যুদ্ধের জন্যও একটি নির্দেশনা। মানুষের বাইরের যুদ্ধ যত কঠিনই হোক, তার গভীরতম যুদ্ধ নিজের অজ্ঞতার সঙ্গে। আর সেই অজ্ঞতার অন্ধকারে জ্ঞানের আলো জ্বলে ওঠে যখন জ্ঞান কেবল ধারণা না থেকে প্রত্যক্ষ উপলব্ধিতে পরিণত হয়। তখনই মানুষ ধীরে ধীরে অশুভের বন্ধন অতিক্রম করে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। এই কারণেই গীতার এই শ্লোকের গভীরতম আহ্বান হলো সত্যকে জানো, সত্যকে উপলব্ধি করো এবং সেই উপলব্ধিকে জীবনের রূপান্তরের শক্তিতে পরিণত করো।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!