Related

Share

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১২তম শ্লোকের বিস্তারিত | ‘তস্য’, ‘সংজনয়ন্’ ও ভীষ্মের শঙ্খধ্বনির গভীর তাৎপর্য

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on October 13, 2026


“তস্য সংজনয়ন্ হর্ষং কুরুবৃদ্ধঃ পিতামহঃ।
সিংহনাদং বিনদ্যোচ্চৈঃ শঙ্খং দধ্মৌ প্রতাপবান্॥১২॥”

বাংলা অনুবাদ: "তখন কুরুবংশের প্রবীণ পিতামহ প্রতাপশালী ভীষ্ম, দুর্যোধনের মনে উৎসাহ ও আনন্দ সঞ্চার করার জন্য সিংহের ন্যায় উচ্চস্বরে গর্জন করে তাঁর শঙ্খধ্বনি করলেন।"

ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের দ্বাদশ শ্লোক “তস্য সংজনয়ন্ হর্ষং কুরুবৃদ্ধঃ পিতামহঃ। সিংহনাদং বিনদ্যোচ্চৈঃ শঙ্খং দধ্মৌ প্রতাপবান্॥” কেবল যুদ্ধের সূচনাকালীন একটি ঘটনার বর্ণনা নয়; এটি নেতৃত্ব, সাহস, কর্তব্যবোধ এবং মানবমনের গভীর মনস্তত্ত্বের এক অনন্য প্রকাশ। শ্লোকটি সেই মুহূর্তকে চিত্রিত করে যখন কৌরব সেনাপতি ও কুরুবংশের শ্রেষ্ঠ প্রবীণ ভীষ্ম পিতামহ দুর্যোধনের মনে সাহস ও উৎসাহ সঞ্চার করার উদ্দেশ্যে সিংহের ন্যায় গর্জন করে তাঁর শঙ্খধ্বনি করেন। এই একটি দৃশ্যের মধ্যেই সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণিক সৌন্দর্য, মহাকাব্যিক আবেগ এবং আধ্যাত্মিক প্রতীকের এক অসাধারণ সমন্বয় লক্ষ করা যায়।

শ্লোকের প্রতিটি শব্দের নিজস্ব ভাষাগত ইতিহাস রয়েছে। ‘তস্য’ শব্দটি সংস্কৃত তদ্ (तद्) সর্বনাম থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘তার’ বা ‘তাহার’; এখানে তা দুর্যোধনকে নির্দেশ করছে। ‘সংজনয়ন্’ শব্দটি সম্ উপসর্গ এবং জন্ (जन्) ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত। জন্ ধাতুর অর্থ জন্ম দেওয়া বা সৃষ্টি করা, আর সম্ উপসর্গ সম্পূর্ণতা বা সমন্বয়ের ভাব প্রকাশ করে। ফলে ‘সংজনয়ন্’ অর্থ দাঁড়ায় সম্পূর্ণভাবে জাগিয়ে তোলা, সৃষ্টি করা বা উদ্দীপ্ত করা। ‘হর্ষং’ শব্দটি হৃষ্ (हृष्) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ আনন্দে রোমাঞ্চিত হওয়া তাই এর অর্থ আনন্দ, উৎসাহ বা উল্লাস। ‘কুরুবৃদ্ধঃ’ শব্দটি ‘কুরু’ ও ‘বৃদ্ধ’ এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত, যার অর্থ কুরুবংশের প্রবীণ বা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। ‘পিতামহঃ’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ পিতার পিতা হলেও মহাভারতের প্রেক্ষাপটে এটি ভীষ্মের প্রতি সম্মানসূচক উপাধি, কারণ তিনি সমগ্র কুরুবংশের অভিভাবকতুল্য। ‘সিংহনাদং’ শব্দটি ‘সিংহ’ ও ‘নাদ’ শব্দের সমাস; এর অর্থ সিংহের গর্জনের মতো প্রবল ধ্বনি। ‘বিনদ্য’ শব্দটি নদ্ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ শব্দ করা বা গর্জন করা, আর ‘উচ্চৈঃ’ অর্থ উচ্চস্বরে। ‘শঙ্খং’ বলতে বোঝায় শঙ্খ, যা ভারতীয় সংস্কৃতিতে শুভ সূচনা, ধর্মরক্ষা এবং যুদ্ধের আহ্বানের প্রতীক। ‘দধ্মৌ’ শব্দটি ধ্মা ধাতুর পরিপূর্ণ (Perfect) রূপ, যার অর্থ ‘ফুঁ দিলেন’ বা ‘বাজালেন’। আর ‘প্রতাপবান্’ শব্দটি ‘প্রতাপ’ ও ‘মতুপ্’ প্রত্যয়ের সমন্বয়ে গঠিত এর অর্থ বীরত্ব, তেজ ও প্রভাবসম্পন্ন ব্যক্তি।

শব্দগঠনের দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে ‘সংজনয়ন্’, ‘কুরুবৃদ্ধঃ’, ‘সিংহনাদং’ এবং ‘প্রতাপবান্’ প্রতিটি শব্দই সমাস ও প্রত্যয়ের মাধ্যমে এমনভাবে গঠিত হয়েছে, যা অল্প শব্দে গভীর অর্থ প্রকাশের সংস্কৃত ভাষার অসাধারণ ক্ষমতাকে তুলে ধরে। এই ধরনের শব্দগঠন শুধু ভাষার সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করে না, বরং ভাবের শক্তিকেও বহুগুণে গভীর করে তোলে।

বাংলা অর্থে শ্লোকটির সারমর্ম হলো দুর্যোধনের মনে সাহস ও আনন্দ সঞ্চার করার উদ্দেশ্যে কুরুবংশের প্রবীণ ও প্রতাপশালী ভীষ্ম পিতামহ সিংহের মতো গর্জন করে উচ্চস্বরে তাঁর শঙ্খধ্বনি করলেন। আক্ষরিকভাবে এটি যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত অর্থ কেবল একটি যুদ্ধের সূচনা নয়, বরং ভীত হৃদয়ে সাহস জাগিয়ে তোলার এক প্রতীকী মুহূর্ত।

প্রাসঙ্গিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকের গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। দুর্যোধন তখন পাণ্ডবদের বিশাল ও সুসংগঠিত সেনাবাহিনী দেখে অন্তরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। ভীষ্ম তাঁর সেই মানসিক অবস্থা উপলব্ধি করেন এবং একজন প্রকৃত নেতার মতো কোনো দীর্ঘ বক্তৃতা না দিয়ে একটি দৃঢ়, প্রতীকী ও অনুপ্রেরণামূলক কর্মের মাধ্যমে পুরো সেনাবাহিনীর মনোবল পুনরুজ্জীবিত করেন। তাঁর শঙ্খধ্বনি শুধু যুদ্ধের সূচনাই ঘোষণা করেনি, বরং সৈন্যদের মনে আত্মবিশ্বাস, ঐক্য এবং অগ্রসর হওয়ার সাহসও জাগিয়ে তুলেছিল।

এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য নেতৃত্বের প্রকৃত স্বরূপকে উন্মোচন করে। একজন প্রকৃত নেতা কেবল নির্দেশ প্রদান করেন না; তিনি নিজের দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস এবং কর্মের মাধ্যমে অন্যের হৃদয়ে সাহস সঞ্চার করেন। ভয় মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি, কিন্তু সেই ভয়কে শক্তিতে রূপান্তরিত করার ক্ষমতাই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়। ভীষ্মের শঙ্খধ্বনি আমাদের শেখায় যে সংকটের মুহূর্তে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ, একটি অনুপ্রেরণামূলক আহ্বান কিংবা একটি আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বর অসংখ্য মানুষের মানসিক অবস্থাকে পরিবর্তন করতে পারে।

দার্শনিক অর্থে এই শ্লোক বহুস্তরীয়। বেদান্তীয় দৃষ্টিতে ভীষ্ম কর্তব্যনিষ্ঠার প্রতীক। তিনি জানতেন কৌরবদের অনেক কর্মই ন্যায়সঙ্গত নয়, তবুও নিজের আজীবনের অঙ্গীকার ও দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হননি। কর্মযোগের আলোকে এই শ্লোক শেখায় যে মানুষকে নিজের কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে; ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হওয়া উচিত নয়। মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ভীষ্মের শঙ্খধ্বনি এক ধরনের মানসিক পুনর্জাগরণ যেখানে ভয় আত্মবিশ্বাসে, সংশয় দৃঢ়তায় এবং দুর্বলতা শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। অস্তিত্ববাদী ব্যাখ্যায়ও এই শ্লোক গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সংকটের মুহূর্তেই মানুষের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায় ভীষ্ম সেই পরীক্ষায় অবিচল কর্তব্যপরায়ণতার পরিচয় দিয়েছেন।

প্রতীকী অর্থেও শ্লোকটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ভীষ্ম প্রতীক হয়ে ওঠেন অঙ্গীকার, অভিজ্ঞতা, কর্তব্য ও নৈতিক দৃঢ়তার। শঙ্খ প্রতীক শুভ সূচনা, জাগরণ, ধর্মরক্ষা ও চেতনার আহ্বানের। সিংহনাদ প্রতীক নির্ভীকতা, আত্মবিশ্বাস ও অপ্রতিরোধ্য শক্তির। আর উচ্চস্বরে ধ্বনিত সেই শঙ্খ যেন মানুষের অন্তর্নিহিত সাহসকে জাগিয়ে তোলার এক চিরন্তন আহ্বান। বাহ্যিক যুদ্ধের পাশাপাশি এটি অন্তর্জগতের ভয়, সংশয় ও দুর্বলতার বিরুদ্ধে সংগ্রামেরও প্রতীক।

বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা সমানভাবে প্রযোজ্য। যেমন একজন শিক্ষক পরীক্ষার আগে তাঁর ছাত্রদের কয়েকটি অনুপ্রেরণামূলক বাক্যের মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারেন, একজন সেনাপতি যুদ্ধের আগে সৈন্যদের সাহস জাগিয়ে তুলতে পারেন, কিংবা একজন দক্ষ নেতা সংকটকালে তাঁর দৃঢ় উপস্থিতির মাধ্যমে সমগ্র দলকে নতুন উদ্যমে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, নেতার একটি দৃঢ় আহ্বান বা প্রতীকী পদক্ষেপ পুরো জাতির মনোবল পরিবর্তন করে দিয়েছে। ভীষ্মের শঙ্খধ্বনি সেই সর্বজনীন সত্যেরই এক চিরন্তন রূপক।

সার্বিকভাবে এই শ্লোকটি ভাষাতাত্ত্বিক সৌন্দর্য, দার্শনিক গভীরতা, মনস্তাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি এবং প্রতীকী ব্যঞ্জনার এক অনন্য সমন্বয়। এটি কেবল মহাভারতের যুদ্ধক্ষেত্রের একটি মুহূর্তকে চিত্রিত করে না। বরং মানবজীবনের প্রতিটি সংকটময় অবস্থায় সাহস, নেতৃত্ব, কর্তব্য এবং আত্মবিশ্বাসের অপরিহার্যতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ভীষ্মের শঙ্খধ্বনি আজও আমাদের অন্তরে প্রতিধ্বনিত হয় ভয়কে জয় করে কর্তব্যের পথে অটল থাকার, দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করার এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবনের প্রতিটি সংগ্রামের মুখোমুখি হওয়ার এক অনন্ত আহ্বান হিসেবে।

 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৩তম শ্লোকের বিস্তারিত | ‘ততঃ’ ও ‘শঙ্খ’ শব্দের ব্যুৎপত্তি, দর্শন ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: July 23, 2026 October 13, 2026

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১২তম শ্লোকের বিস্তারিত | ‘তস্য’, ‘সংজনয়ন্’ ও ভীষ্মের শঙ্খধ্বনির গভীর তাৎপর্য

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১২তম শ্লোকের বিস্তারিত | ‘তস্য’, ‘সংজনয়ন্’ ও ভীষ্মের শঙ্খধ্বনির গভীর তাৎপর্য