Related

Share

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৩তম শ্লোকের বিস্তারিত | ‘ততঃ’ ও ‘শঙ্খ’ শব্দের ব্যুৎপত্তি, দর্শন ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on July 28, 2026


ততঃ শঙ্খাশ্চ ভের্য্যশ্চ পণবানকগোমুখাঃ।
সহসৈবাভ্যহন্যন্ত স শব্দস্তুমুলোঽভবৎ॥১৩

বাংলা অনুবাদ: এরপর শঙ্খ, ভেরী, পণব, আনক এবং গোমুখ প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র একযোগে বেজে উঠল। এবং সেই শব্দ ভীষণ গর্জনময় ও তুমুল হয়ে উঠল।

আপাতদৃষ্টিতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত ধ্বনির একটি বর্ণনা হলেও, এর অন্তর্নিহিত অর্থ ভাষাতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক সব দিক থেকেই অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ। এই শ্লোকটি কেবল যুদ্ধের সূচনাকালীন এক তুমুল শব্দমালার বিবরণ নয়; বরং এটি মানবজীবনের সংগ্রাম, কর্তব্যবোধ, জাগরণ এবং পরিবর্তনের এক চিরন্তন প্রতীক।

শ্লোকের প্রথম শব্দ ‘ততঃ’ (ततः) সংস্কৃত ‘তদ্’ সর্বনাম থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ “এরপর”, “তারপর” বা “সেই ঘটনার পর”। এটি কেবল সময়ের ধারাবাহিকতাই নির্দেশ করে না, বরং এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় উত্তরণেরও ইঙ্গিত বহন করে। পূর্ববর্তী শ্লোকে কৌরবপক্ষের শঙ্খধ্বনির পর এই শব্দটি যুদ্ধের আবহকে আরও তীব্র করে তোলে। এখানে ‘ততঃ’ জীবনের সেই সন্ধিক্ষণের প্রতীক, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আর ফিরে যাওয়ার পথ থাকে না।

এরপর এসেছে ‘শঙ্খাঃ’, অর্থাৎ শঙ্খসমূহ। ‘শঙ্খ’ প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় ধর্ম, সংস্কৃতি ও যুদ্ধপরম্পরার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর ধ্বনি শুভতার আহ্বান, অশুভ শক্তির বিনাশ এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। বৈদিক যুগে যজ্ঞের সূচনা, পূজা, মন্দিরের আরতি কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের উদ্দীপ্ত করার জন্য শঙ্খ ব্যবহৃত হতো। তাই শঙ্খ কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র নয়; এটি জাগরণ, সাহস, ধর্ম এবং ঈশ্বরীয় শক্তির প্রতীক।

‘ভেরী’ (ভের্য্যশ্চ) ছিল বৃহৎ যুদ্ধঢাক, যার গম্ভীর ও দূরপ্রসারী ধ্বনি সৈন্যদের সংগঠিত করত এবং শত্রুর মনে ভীতি সৃষ্টি করত। ‘পণব’ ছিল তুলনামূলক ছোট আকারের ঢোল, যা যুদ্ধ ও উৎসব উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতো। ‘আনক’ ছিল রাজকীয় কেটল-ড্রাম, যা বিজয়, শক্তি ও রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। অপরদিকে ‘গোমুখ’ শব্দটি ‘গো’ (গরু) এবং ‘মুখ’ (মুখমণ্ডল) এই দুই অংশে গঠিত; অর্থাৎ গরুর মুখের আকৃতিবিশিষ্ট শিঙ্গা বা তূর্য। এর ধ্বনি ছিল তীক্ষ্ণ, দূরগামী এবং উদ্দীপনামূলক। এই সব বাদ্যযন্ত্র একত্রে উল্লেখ করার মাধ্যমে শ্লোকটি কেবল শব্দের বহুমাত্রিকতা নয়, বরং ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছে।

‘সহসৈবাভ্যহন্যন্ত’ শব্দটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ‘সহসা’ (একযোগে, হঠাৎ) এবং ‘অভি + হন্’ (আঘাত করা বা বাজানো) ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত। এর অর্থ “সব বাদ্যযন্ত্র একসঙ্গে বাজানো হলো।” এই সম্মিলিত ধ্বনি বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত শক্তির নয় বরং সংগঠিত সম্মিলিত শক্তির প্রতীক। মানবসভ্যতার ইতিহাসে বারবার দেখা যায়, যখন বহু মানুষের ইচ্ছাশক্তি, সংকল্প ও কর্ম একত্রিত হয়, তখনই প্রকৃত পরিবর্তনের সূচনা ঘটে।

শ্লোকের শেষাংশে বলা হয়েছে “স শব্দস্তুমুলোঽভবৎ”, অর্থাৎ সেই শব্দ তুমুল হয়ে উঠল। ‘তুমুল’ শব্দের অর্থ প্রচণ্ড, গর্জনময়, প্রবল এবং সর্বত্র প্রতিধ্বনিত। এখানে এই তুমুল ধ্বনি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের কর্ণবিদারী আওয়াজ নয়; এটি মানুষের অন্তর্জগতের আন্দোলনেরও প্রতীক। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে, যখন মানুষ কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে যায়, তখন তার মনে ভয়, আশা, দায়িত্ব, সংশয়, সাহস ও কর্তব্যবোধ একসঙ্গে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই মানসিক আলোড়নই যেন এই তুমুল শব্দের রূপক।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে শ্লোকটির ব্যাখ্যা আরও গভীর। বেদান্ত দর্শন বলে, বাহ্যিক শব্দ ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু সেই শব্দ মানুষকে অন্তরের নীরবতার সন্ধানে নিয়ে যায়। যুদ্ধের এই প্রচণ্ড কোলাহলের মধ্যেও আত্মার সত্য অবিচল ও শান্ত। সাংখ্য দর্শনের আলোকে এই তুমুল ধ্বনি প্রকৃতির রজোগুণের উচ্ছ্বাস, যা কর্ম, সংগ্রাম ও পরিবর্তনের শক্তিকে জাগ্রত করে। যোগদর্শন শিক্ষা দেয় বাহ্যিক কোলাহলের মাঝেও যার মন স্থির থাকে, সেই প্রকৃত যোগী। অর্থাৎ জীবনের অশান্ত পরিস্থিতির মধ্যেও আত্মসংযম ও স্থিতপ্রজ্ঞা বজায় রাখাই প্রকৃত সাধনা।

প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকের প্রতিটি বাদ্যযন্ত্র মানবজীবনের এক একটি শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। শঙ্খ ধর্ম ও চেতনার জাগরণ, ভেরী সংগ্রামের আহ্বান, পণব জীবনযাত্রার ছন্দ, আনক ঐক্যবদ্ধ শক্তি ও কর্তৃত্ব, আর গোমুখ প্রকৃতির আদিম প্রাণশক্তির প্রতীক। এই সবকটির সম্মিলিত ধ্বনি বোঝায় জীবনের বড় পরিবর্তন কখনও নিঃশব্দে আসে না বরং তা আসে প্রবল আলোড়ন, চ্যালেঞ্জ এবং আত্মসংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের গভীর প্রয়োগ রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে প্রবেশের আগে, একজন সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার পূর্বে, একজন চিকিৎসক জটিল অস্ত্রোপচারের আগে কিংবা একজন নেতা জাতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের মুহূর্তে যে মানসিক চাপ ও উদ্দীপনার সম্মুখীন হন, তা যেন এই তুমুল বাদ্যধ্বনিরই আধুনিক প্রতিফলন। বাহ্যিক নীরবতার আড়ালেও মানুষের অন্তরে তখন অসংখ্য শঙ্খ, ভেরী ও আনক একসঙ্গে বেজে ওঠে।

সার্বিকভাবে এই শ্লোকটি ভাষার দিক থেকে প্রাচীন ভারতীয় সামরিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল, দর্শনের দিক থেকে মানবজীবনের কর্তব্য, সংগ্রাম ও আত্মজাগরণের শিক্ষা, আর প্রতীকী অর্থে পরিবর্তন, সাহস ও ঐক্যবদ্ধ শক্তির এক অনন্য প্রকাশ। তাই “ততঃ শঙ্খাশ্চ ভের্য্যশ্চ পণবানকগোমুখাঃ” কেবল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সূচনাবাণী নয় এটি প্রতিটি মানুষের জীবনের সেই মুহূর্তের প্রতীক, যখন তাকে ভয় ও সংশয় অতিক্রম করে সত্য, ন্যায় ও কর্তব্যের পথে দৃঢ়চিত্তে অগ্রসর হতে হয়। বাহ্যিক তুমুল শব্দের মধ্য দিয়েই অন্তরের প্রকৃত জাগরণ শুরু হয় এই চিরন্তন সত্যই শ্লোকটির সর্বাপেক্ষা গভীর শিক্ষা।

 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৪তম শ্লোকের বিস্তারিত | শ্বেতৈর্হয়ৈঃ, মাধব ও পাণ্ডব শব্দের ব্যুৎপত্তি, দর্শন ও প্রতীকী অর্থ

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: July 23, 2026 July 28, 2026

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৩তম শ্লোকের বিস্তারিত | ‘ততঃ’ ও ‘শঙ্খ’ শব্দের ব্যুৎপত্তি, দর্শন ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৩তম শ্লোকের বিস্তারিত | ‘ততঃ’ ও ‘শঙ্খ’ শব্দের ব্যুৎপত্তি, দর্শন ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য