Related

Share

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৪তম শ্লোকের বিস্তারিত | শ্বেতৈর্হয়ৈঃ, মাধব ও পাণ্ডব শব্দের ব্যুৎপত্তি, দর্শন ও প্রতীকী অর্থ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on July 28, 2026


ততঃ শ্বেতৈর্হয়ৈর্যুক্তে মহতি স্যন্দনে স্থিতৌ। মাধবঃ পাণ্ডবশ্চৈব দিব্যৌ শঙ্খৌ প্রদধ্মতুঃ॥১৪॥

অনুবাদ : ততঃ (তৎপজের) গশ্বদ্বৈতঃ হদ্বৈয়ঃ র্যুজে (গশ্বতবণ অশ্ব-র্যু ) মহসিত স্যন্দজে (মহন্রজেথ) সিস্থজেতৌ (অবসিস্থত) মাধবঃ পাণ্ডবশ্চ এব (শ্রীকৃষ্ণ ও অজ্জু উভজেয়ই) সিদজেব্যৌ শজেঙ্খৌ (অজেলৌসিকক শঙ্খয়) প্রদ তুঃ (বাজাইজেল )॥১৪॥

ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের এই শ্লোকটি আপাতদৃষ্টিতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সূচনালগ্নে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের শঙ্খধ্বনির একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ বহুমাত্রিক, গভীর এবং দার্শনিক তাৎপর্যে সমৃদ্ধ। এখানে প্রতিটি শব্দ কেবল একটি দৃশ্য বর্ণনা করে না বরং মানবজীবনের নৈতিক সংগ্রাম, আত্মিক জাগরণ এবং ঈশ্বরীয় নির্দেশনার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।

শ্লোকের সূচনায় ‘ততঃ’ শব্দটির অর্থ ‘এরপর’ বা ‘অতঃপর’। এটি সংস্কৃত ‘তদ্’ সর্বনাম থেকে উদ্ভূত, যা ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে। ভীষ্মের প্রবল শঙ্খধ্বনির পর যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়, ‘ততঃ’ সেই পরিবর্তনের সংকেত বহন করে। এটি কেবল সময়গত পরিবর্তন নয়, বরং শক্তির অহংকার থেকে ধর্মের আত্মবিশ্বাসে উত্তরণেরও প্রতীক। এরপর ব্যবহৃত ‘শ্বেতৈর্হয়ৈঃ’ শব্দযুগল দুটি অংশে বিভক্ত ‘শ্বেত’ অর্থ সাদা বা নির্মল এবং ‘হয়’ অর্থ অশ্ব বা ঘোড়া। শ্বেতবর্ণের অশ্ব ভারতীয় দর্শনে পবিত্রতা, সত্য, সংযম ও সত্ত্বগুণের প্রতীক। উপনিষদীয় রথোপমায় ঘোড়াকে মানুষের ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে অতএব এখানে শ্বেত অশ্ব বলতে এমন ইন্দ্রিয়কে বোঝায়, যা শুদ্ধ, নিয়ন্ত্রিত এবং ধর্মমুখী।

‘যুক্তে’ শব্দটি সংস্কৃত ‘যুজ্’ ধাতু থেকে গঠিত, যার অর্থ সংযুক্ত বা জোতা। একই ধাতু থেকেই ‘যোগ’ শব্দের উৎপত্তি। এখানে ‘যুক্ত’ শব্দটি বাহ্যিকভাবে রথের সঙ্গে অশ্বের সংযোগ বোঝালেও অন্তর্নিহিতভাবে মানুষের শক্তি, মন, ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধির সমন্বিত অবস্থাকে নির্দেশ করে। সংযমহীন শক্তি ধ্বংস ডেকে আনে, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত শক্তি কল্যাণের পথ নির্মাণ করে। এরপর ‘মহতি স্যন্দনে’ অর্থাৎ ‘মহান রথে’। ‘মহতি’ শব্দটি ‘মহৎ’ থেকে এসেছে, যার অর্থ বিশাল, মহান ও গৌরবময়। ‘স্যন্দন’ শব্দটি ‘স্যন্দ্’ ধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ প্রবাহিত হওয়া বা চলমান থাকা। তাই স্যন্দন বলতে রথকে বোঝানো হয়েছে, যা জীবনের চলমান যাত্রার প্রতীক। এই মহান রথ কেবল যুদ্ধযানের পরিচয় বহন করে না এটি মানবদেহ ও মানবজীবনের এক প্রতীকী রূপ, যেখানে আত্মা যাত্রী, বুদ্ধি সারথি এবং ইন্দ্রিয় তার বাহন।

‘স্থিতৌ’ শব্দটি ‘স্থা’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ স্থিত হওয়া বা প্রতিষ্ঠিত থাকা। এখানে কৃষ্ণ ও অর্জুনের রথে অবস্থান করাকে বোঝালেও গভীরতর অর্থে এটি স্থিরচিত্ততা, আত্মসংযম ও মানসিক দৃঢ়তার প্রতীক। যুদ্ধের সূচনালগ্নেও তাঁদের মন বিচলিত নয় তাঁরা কর্তব্যবোধে অবিচল। এরপর এসেছে ‘মাধবঃ’, যা শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম প্রসিদ্ধ নাম। এর বিভিন্ন ব্যুৎপত্তিগত ব্যাখ্যা রয়েছে। একদিকে তিনি মধু বংশের বংশধর, অন্যদিকে ‘মা’ (লক্ষ্মী) ও ‘ধব’ (স্বামী) থেকে ‘মাধব’ অর্থ লক্ষ্মীপতি। আবার ‘মধুরতার আধার’ হিসেবেও এই নাম ব্যবহৃত হয়। এই শ্লোকে মাধব কেবল একজন সারথি নন তিনি ঈশ্বরীয় জ্ঞান, চিরন্তন সত্য, করুণা ও প্রজ্ঞার প্রতীক। তাঁর উপস্থিতি বোঝায় যে জীবনের রথে যখন ঈশ্বরীয় জ্ঞান সারথি হয়, তখন মানুষ সঠিক পথ খুঁজে পায়।

‘পাণ্ডবঃ’ শব্দটির অর্থ পাণ্ডুর পুত্র; এখানে বিশেষভাবে অর্জুনকে নির্দেশ করা হয়েছে। অর্জুন কেবল একজন মহাবীর নন, তিনি মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব, নৈতিক সংশয় এবং সত্য অনুসন্ধানী আত্মার প্রতীক। জীবনের প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনো সময় অর্জুনের মতো দ্বিধাগ্রস্ত হয় এবং তখন তার প্রয়োজন হয় একজন ‘মাধব’-এর অর্থাৎ প্রজ্ঞা, বিবেক বা ঈশ্বরীয় নির্দেশনার। ‘চৈব’ শব্দটি ‘চ’ ও ‘এব’ এই দুই অব্যয়ের সমন্বয়ে গঠিত, যার অর্থ ‘এবং অবশ্যই’। এটি কৃষ্ণ ও অর্জুনের ঐক্যবদ্ধ উপস্থিতিকে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরে।

এরপর ‘দিব্যৌ শঙ্খৌ’ অর্থাৎ ‘দিব্য দুইটি শঙ্খ’। ‘দিব্য’ শব্দটি ‘দিব্’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ দীপ্ত হওয়া বা স্বর্গীয় হওয়া। এই শঙ্খ সাধারণ যুদ্ধের বাদ্যযন্ত্র নয়; এটি ধর্ম, জাগরণ, সাহস ও শুভশক্তির প্রতীক। ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতিতে শঙ্খধ্বনি অশুভ শক্তি দূর করে শুভশক্তির আবাহন করে। তাই কৃষ্ণ ও অর্জুনের শঙ্খধ্বনি কেবল যুদ্ধের সূচনা নয়। এটি সত্য, ন্যায় ও ধর্ম প্রতিষ্ঠার ঘোষণা। শেষ শব্দ ‘প্রদধ্মতুঃ’ এসেছে ‘প্র’ উপসর্গ ও ‘ধ্মা’ ধাতু থেকে, যার অর্থ প্রবলভাবে ফুঁ দেওয়া বা উচ্চধ্বনিতে বাজানো। এই ধ্বনি কেবল বাহ্যিক শব্দ নয়; এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, কর্তব্যের আহ্বান এবং আত্মজাগরণের এক মহাসংকেত।

এই শ্লোকের দার্শনিক ব্যাখ্যা অত্যন্ত গভীর। অদ্বৈত বেদান্ত মতে, কৃষ্ণ পরম ব্রহ্ম এবং অর্জুন জীবাত্মার প্রতীক; তাঁদের শঙ্খধ্বনি আত্মজ্ঞান লাভের সূচনা নির্দেশ করে। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে কৃষ্ণ জীবের আশ্রয়দাতা, আর অর্জুন তাঁর কৃপাপ্রার্থী ভক্ত। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীব পৃথক সত্তা হলেও জীবের কল্যাণ ঈশ্বরের নির্দেশনাতেই সম্ভব। যোগদর্শনের আলোকে শ্বেত অশ্ব নিয়ন্ত্রিত ইন্দ্রিয়ের প্রতীক, যা সংযম ও একাগ্রতার মাধ্যমে মুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

প্রতীকী দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটি অসাধারণ। শ্বেত অশ্ব মানুষের শুদ্ধ ইন্দ্রিয়, মহৎ রথ মানবদেহ, কৃষ্ণ বিবেক ও ঈশ্বরীয় চেতনা, অর্জুন মানবমন এবং দিব্য শঙ্খ আত্মজাগরণের আহ্বানকে প্রতিনিধিত্ব করে। এই প্রতীকগুলো একত্রে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানুষের প্রকৃত যুদ্ধ বাইরের শত্রুর সঙ্গে নয়; বরং অজ্ঞতা, ভয়, লোভ, মোহ ও অধর্মের বিরুদ্ধে নিজের অন্তর্জগতে। যখন মানুষের জীবনরথে প্রজ্ঞা সারথি হয়, ইন্দ্রিয় সংযত থাকে এবং লক্ষ্য থাকে ধর্ম প্রতিষ্ঠা, তখনই জীবনের প্রতিটি কর্ম পবিত্র হয়ে ওঠে।

এই শ্লোকের ভাবার্থকে আরও স্পষ্ট করে কঠোপনিষদের রথোপমা, যেখানে দেহকে রথ, আত্মাকে রথারোহী, বুদ্ধিকে সারথি, মনকে লাগাম এবং ইন্দ্রিয়কে অশ্বের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। সেই আলোকে এই শ্লোকটি মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্যকে প্রকাশ করে জীবনের রথ সঠিক পথে চলতে পারে তখনই, যখন তার সারথি হয় প্রজ্ঞা, তার লাগাম থাকে সংযমে এবং তার গন্তব্য হয় সত্য ও ধর্ম।

সারসংক্ষেপে বলা যায়, “ততঃ শ্বেতৈর্হয়ৈর্যুক্তে মহতি স্যন্দনে স্থিতৌ। মাধবঃ পাণ্ডবশ্চৈব দিব্যৌ শঙ্খৌ প্রদধ্মতুঃ॥” শ্লোকটি কেবল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সূচনার বিবরণ নয়। এটি মানবজীবনের এক অনন্ত আধ্যাত্মিক উপমা। এখানে শ্বেত অশ্ব শুদ্ধতার, মহৎ রথ জীবনের, কৃষ্ণ ঈশ্বরীয় প্রজ্ঞার, অর্জুন সংগ্রামরত মানবাত্মার এবং শঙ্খধ্বনি আত্মজাগরণের প্রতীক। এই শ্লোক আমাদের শিক্ষা দেয় যে জীবনের প্রতিটি সংগ্রামে সত্য, সংযম, প্রজ্ঞা ও ঈশ্বরবিশ্বাসকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলাই প্রকৃত বিজয়ের পথ। বাহ্যিক যুদ্ধ একদিন শেষ হয়, কিন্তু অন্তর্জগতের ধর্মযুদ্ধ চলতে থাকে সারাজীবন আর সেই যুদ্ধে বিজয়ী হয় কেবল সেই মানুষ, যার জীবনের রথে সারথি হয়ে বিরাজ করেন ‘মাধব’।

 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৫তম শ্লোকের বিস্তারিত | পাঞ্চজন্য, দেবদত্ত ও পৌণ্ড্র শঙ্খের প্রতীকী অর্থ ও দর্শন

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: July 23, 2026 July 28, 2026

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৪তম শ্লোকের বিস্তারিত | শ্বেতৈর্হয়ৈঃ, মাধব ও পাণ্ডব শব্দের ব্যুৎপত্তি, দর্শন ও প্রতীকী অর্থ

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৪তম শ্লোকের বিস্তারিত | শ্বেতৈর্হয়ৈঃ, মাধব ও পাণ্ডব শব্দের ব্যুৎপত্তি, দর্শন ও প্রতীকী অর্থ