Related

Share

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৯তম শ্লোকের বিস্তারিত | ঘোষঃ, অভ্যনুনাদয়ন্ ও ধর্মের জাগরণের প্রতীকী অর্থ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on July 28, 2026


“স ঘোষো ধার্ত্তরাষ্ট্রাণাং হৃদয়ানি ব্যদারয়ৎ। নভশ্চ পৃথিবীঞ্চৈব তুমুলোঽভ্যনুনাদয়ন্॥” 

অনুবাদ: নভশ্চ পৃসিথবীং চ এব (আকাশ ও পৃসিথবীজেক) অভ্য ু াদয়ন্(প্রসিতধ্বসি ত কসিরয়া) সঃ তুমুলঃ গ ার্ষঃ (গসই তুমুল শব্দ) ধাত্তরাষ্ট্রা াং(ধৃতরাষ্ট্র তয়গজেণর) হৃদয়াসি [সিণ?] (হৃদয় সকল) ব্যদারয়ৎ (সিবদীণকসিরল)॥১৯॥

মহাভারতের যুদ্ধবর্ণনার এক অসাধারণ মুহূর্তকে ধারণ করেছে। এই শ্লোকটি কেবল একটি প্রবল শঙ্খধ্বনির বর্ণনা নয়; বরং ধর্ম ও অধর্মের সংঘর্ষ, সত্যের অপ্রতিরোধ্য শক্তি এবং মানুষের অন্তর্জগতের গভীর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার এক অনন্য ভাষ্য। ভাষাগত, দার্শনিক, প্রতীকী ও আধ্যাত্মিক প্রতিটি স্তরেই এই শ্লোক গভীর অর্থবহ।

এখানে “স” (सः) শব্দটি একটি নির্দেশক সর্বনাম, যার অর্থ ‘সেই’ বা ‘উক্ত’। এটি পূর্ববর্তী শ্লোকে বর্ণিত পাণ্ডবদের সম্মিলিত শঙ্খধ্বনির প্রতি ইঙ্গিত করছে। এই ছোট্ট শব্দটি শ্লোকের সঙ্গে পূর্ববর্তী ঘটনার একটি শক্তিশালী সংযোগ স্থাপন করে এবং পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেয় যে যে ধ্বনির কথা এখন বলা হচ্ছে, সেটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়, বরং এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ঘোষণা। এরপর এসেছে “ঘোষঃ” (घोषः) শব্দটি, যা সংস্কৃত √ঘুষ্ (घुष्) ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর মূল অর্থ উচ্চস্বরে ধ্বনিত হওয়া, ঘোষণা করা বা প্রচার করা। এখানে ‘ঘোষ’ বলতে পাণ্ডবদের সম্মিলিত শঙ্খধ্বনিকে বোঝানো হয়েছে, যা ছিল ন্যায়যুদ্ধের সূচনাসূচক এক মহাগম্ভীর আহ্বান। এটি কেবল একটি শব্দতরঙ্গ নয়; এটি সত্যের ঘোষণা, ধর্মের জাগরণ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অদম্য প্রত্যয়ের প্রতীক।

“ধার্ত্তরাষ্ট্রাণাম্” শব্দটির অর্থ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের বা কৌরবদের। এটি ‘ধৃতরাষ্ট্র’ শব্দের অপত্যবাচক রূপ, যার অর্থ ‘ধৃতরাষ্ট্রের বংশধর’। কিন্তু শ্লোকের গভীর অর্থে এই শব্দটি শুধু একটি রাজবংশকে নির্দেশ করে না। ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন জন্মান্ধ, আর সেই অন্ধত্ব এখানে প্রতীক হয়ে উঠেছে নৈতিক অন্ধত্ব, মোহ, আসক্তি এবং ক্ষমতার প্রতি অন্ধ আকর্ষণের। ফলে ‘ধার্ত্তরাষ্ট্র’ বলতে সেই সমস্ত মানসিক প্রবৃত্তিকেও বোঝানো যায়, যা সত্যকে জেনেও গ্রহণ করতে চায় না এবং স্বার্থের অন্ধতায় নিমজ্জিত থাকে।

এরপরের শব্দ “হৃদয়ানি” (हृदयानि)-এর অর্থ হৃদয়সমূহ বা অন্তর। সংস্কৃত ‘হৃদয়’ শব্দটি মানুষের অনুভূতি, সাহস, বিবেক ও চেতনার কেন্দ্রকে নির্দেশ করে। এখানে কৌরবদের শারীরিক হৃদয় নয়, বরং তাদের মানসিক দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস ও অন্তর্লোকের কথা বলা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগেই পাণ্ডবদের শঙ্খধ্বনি তাদের অন্তরে ভয়ের সঞ্চার করেছিল। অর্থাৎ সত্য ও ধর্মের শক্তি মানুষের বাহ্যিক প্রতাপের চেয়ে তার অন্তর্জগতকে অনেক বেশি প্রভাবিত করে।

“ব্যদারয়ৎ” (व्यदारयत्) শব্দটি এসেছে √দর্ (दर्) ধাতু থেকে, যার অর্থ বিদীর্ণ করা, চিরে ফেলা বা ভেঙে দেওয়া। ‘বি’ উপসর্গ যুক্ত হওয়ায় এর অর্থ আরও তীব্র হয়েছে সম্পূর্ণভাবে বিদীর্ণ করে দেওয়া। এখানে বোঝানো হয়েছে যে সেই মহাশঙ্খধ্বনি কৌরবদের হৃদয়কে যেন ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। অবশ্যই এটি আক্ষরিক অর্থে হৃদয় বিদীর্ণ হওয়া নয় বরং তাদের সাহস, আত্মবিশ্বাস ও অহংকারের ভিত কেঁপে ওঠার এক চিত্রময় প্রকাশ। যখন মানুষ সত্যের সম্মুখীন হয়, তখন তার মিথ্যা অহংকার ও অন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ে এই শব্দটি সেই মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকেই প্রকাশ করে।

পরবর্তী অংশে “নভঃ” (नभः) শব্দটির অর্থ আকাশ এবং “পৃথিবীম্” (पृथिवीम्) শব্দটির অর্থ পৃথিবী বা ধরিত্রী। ‘নভঃ’ সীমাহীন বিস্তার ও অসীম সম্ভাবনার প্রতীক, আর ‘পৃথিবী’ স্থিতি, বাস্তবতা ও কর্মক্ষেত্রের প্রতীক। শ্লোকে বলা হয়েছে যে সেই ধ্বনি আকাশ ও পৃথিবী উভয়কেই প্রতিধ্বনিত করছিল। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে ধর্মের আহ্বান কোনো একটি স্থান বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না তার অনুরণন সমগ্র সৃষ্টি ও মানবসমাজে ছড়িয়ে পড়ে। এটি এমন এক সত্য, যা মানুষের অন্তর্জগৎ থেকে শুরু করে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম।

“চৈব” (चैव) শব্দটি ‘চ’ (এবং) ও ‘এব’ (নিশ্চয়ই)-এর সমন্বয়ে গঠিত। এর মাধ্যমে আকাশ ও পৃথিবী উভয় ক্ষেত্রেই সেই ধ্বনির ব্যাপ্তিকে জোর দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। এরপর “তুমুলঃ” (तुमुलः) শব্দটি এসেছে, যার অর্থ প্রচণ্ড, প্রবল, গর্জনময় বা প্রকম্পিতকারী। এটি এমন এক ধ্বনিকে নির্দেশ করে, যা কেবল কর্ণগোচর নয়, হৃদয় ও পরিবেশকে সমানভাবে আলোড়িত করে। এখানে শঙ্খধ্বনি ইতিহাসের এক যুগান্তকারী মুহূর্তের সূচনাস্বরূপ, যা ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অপ্রতিরোধ্য আহ্বান।

শেষে “অভ্যনুনাদয়ন্” (अभ्यनुनादयन्) শব্দটি √নদ্ (नद्) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ধ্বনিত হওয়া বা গর্জন করা। ‘অভি’ ও ‘অনু’ উপসর্গ যুক্ত হওয়ায় এর অর্থ হয়েছে চারদিকে প্রতিধ্বনিত করতে করতে বা সর্বত্র অনুরণিত হতে হতে। অর্থাৎ সেই শঙ্খধ্বনি শুধু একবার উচ্চারিত হয়নি বরং তার প্রতিধ্বনি আকাশ-বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রতীকী অর্থে এটি বোঝায় যে সত্যের শক্তি কখনো ক্ষণস্থায়ী নয় তার অনুরণন যুগে যুগে মানুষের চেতনাকে জাগিয়ে তোলে।

এই সমগ্র শ্লোকটির গভীর দার্শনিক তাৎপর্য হলো মানুষের অন্তরে ধর্ম ও অধর্মের যে চিরন্তন সংগ্রাম চলে, সেখানে সত্যের আহ্বান একসময় অবধারিতভাবে অধর্মকে কাঁপিয়ে তোলে। বাহ্যিকভাবে এটি পাণ্ডবদের শঙ্খধ্বনি এবং কৌরবদের ভীত হয়ে পড়ার বর্ণনা হলেও, অন্তর্লৌকিক অর্থে পাণ্ডবরা মানুষের বিবেক, ন্যায়বোধ ও আত্মজাগরণের প্রতীক আর কৌরবরা লোভ, মোহ, অহংকার ও অন্যায় প্রবৃত্তির প্রতীক। যখন বিবেকের শঙ্খধ্বনি অন্তরে ধ্বনিত হয়, তখন মনের অন্ধকার, মিথ্যা অহংকার ও অধর্মের দুর্গ ভেঙে পড়তে শুরু করে।

বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা সুস্পষ্ট। একজন মানুষ দীর্ঘদিন অন্যায়ের ওপর নিজের জীবন প্রতিষ্ঠা করলেও, একদিন সত্যের মুখোমুখি হলে তার অন্তর কেঁপে ওঠে। একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি যখন অকাট্য প্রমাণের সম্মুখীন হন, অথবা কোনো মানুষ আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজের ভুল উপলব্ধি করেন, তখন তার অন্তরে যে ভাঙন সৃষ্টি হয়, সেটিই এই শ্লোকের “হৃদয়ানি ব্যদারয়ৎ”-এর প্রকৃত প্রতিফলন। আবার সাহিত্যিক অর্থে এটি বজ্রধ্বনির মতো, যা নিস্তব্ধ অরণ্যকে কাঁপিয়ে তোলে; আধ্যাত্মিক অর্থে এটি সেই আত্মজাগরণের আহ্বান, যা মানুষের অজ্ঞানতা দূর করে তাকে সত্যের পথে পরিচালিত করে।

সারসংক্ষেপে বলা যায়, গীতার এই শ্লোকটি একটি যুদ্ধক্ষেত্রের শব্দচিত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভাষাগতভাবে এটি শক্তিশালী ধ্বনি, প্রতিধ্বনি ও মানসিক অভিঘাতের সূক্ষ্ম প্রকাশ। দার্শনিকভাবে এটি ধর্মের জাগরণে অধর্মের ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থার প্রতীক আর আধ্যাত্মিকভাবে এটি মানুষের অন্তরে সত্য, বিবেক ও আত্মজাগরণের চিরন্তন আহ্বান। তাই “স ঘোষো ধার্ত্তরাষ্ট্রাণাং হৃদয়ানি ব্যদারয়ৎ। নভশ্চ পৃথিবীঞ্চৈব তুমুলোঽভ্যনুনাদয়ন্॥” শ্লোকটি আজও আমাদের শিক্ষা দেয় সত্যের ধ্বনি যতই প্রবলভাবে অনুরণিত হয়, অন্যায়, মিথ্যা ও অহংকার ততই নিজের ভিতরে ভেঙে পড়তে বাধ্য হয়।


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ২০তম শ্লোকের বিস্তারিত | অথ, কপিধ্বজ ও অর্জুনের আত্মজিজ্ঞাসার সূচনা

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: July 23, 2026 July 28, 2026

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৯তম শ্লোকের বিস্তারিত | ঘোষঃ, অভ্যনুনাদয়ন্ ও ধর্মের জাগরণের প্রতীকী অর্থ

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৯তম শ্লোকের বিস্তারিত | ঘোষঃ, অভ্যনুনাদয়ন্ ও ধর্মের জাগরণের প্রতীকী অর্থ