শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ২০তম শ্লোকের বিস্তারিত | অথ, কপিধ্বজ ও অর্জুনের আত্মজিজ্ঞাসার সূচনা
অথ ব্যবসিস্থতান্ দৃ ্বা ধাত্তরাষ্ট্রান্ কসিপধ্বজঃ।
প্রবৃজেত্ত শস্ত্রসম্পাজেত ধ ু রুদ্যম্য পাণ্ডবঃ।
হৃর্ষীজেকশং তদা বাক্যসিমদমাহ মহীপজেত॥২০॥
অনুবাদ : [হে] মহীপজেত! (গহ মহারাজ!) অথ (অন্তর) শাস্ত্র-সম্পাজেত (অস্ত্রাসিদ সি জেক্ষপ) প্রবৃজেত্ত [সসিত] (আরম্ভ কাজেল) কসিপধ্বজঃ পাণ্ডবঃ (বা রধ্বজ অজ্জু ) ধাত্তরাষ্ট্রান্ (ধৃতরাষ্ট্র পুৎত্রগণজেক) ব্যবসিস্থতান্ দৃ ্বা (র্যুজেদ্ধাজেদ্যাজেগ অবসিস্থত গদসিখয়া) ধ ু ঃ উদ্যম্য (ধ ু উজেত্তাল পূর্ব্বক) তদা (তৎকাজেল) হৃর্ষীজেকশং (শ্রীকৃষ্ণজেক) ইদং বাক্যম্ (এই বাক্য) আহ (বসিলয়াসি জেল )॥২০॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের এই শ্লোকটি সমগ্র গীতার একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণকে নির্দেশ করে। বাহ্যিকভাবে এটি যুদ্ধ শুরুর পূর্বমুহূর্তের একটি বর্ণনা হলেও অন্তর্নিহিতভাবে এটি মানবচেতনার এক গভীর রূপান্তরের সূচনা। এই মুহূর্তে অর্জুন কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষকে দেখছেন না তিনি নিজের জীবন, কর্তব্য, সম্পর্ক, নৈতিকতা এবং মানবিকতার মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছেন। এই শ্লোক থেকেই গীতার প্রকৃত শিক্ষা শুরু হয়, কারণ এখান থেকেই বাহ্যিক যুদ্ধ ধীরে ধীরে অন্তর্জগতের আধ্যাত্মিক যুদ্ধে রূপান্তরিত হতে থাকে।
শ্লোকটির প্রথম শব্দ ‘অথ’ সংস্কৃত ভাষায় একটি অব্যয়, যার অর্থ ‘তখন’, ‘অতঃপর’ বা ‘এরপর’। প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রসমূহে ‘অথ’ শব্দটি কেবল একটি কালবাচক অব্যয় নয় এটি নতুন জ্ঞান, নতুন অধ্যায় বা নতুন উপলব্ধির সূচনাও নির্দেশ করে। এখানে যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর অর্জুনের অন্তর্জগতে যে গভীর পরিবর্তনের সূচনা হচ্ছে, ‘অথ’ সেই পরিবর্তনের দ্বার উন্মোচন করছে। মানুষের জীবনেও এমন বহু ‘অথ’ আসে যখন বাহ্যিক ঘটনাবলি তাকে নিজের অন্তরের দিকে তাকাতে বাধ্য করে এবং আত্মজিজ্ঞাসার পথ খুলে যায়।
‘ব্যবস্থিতান্’ (व्यवस्थितान्) শব্দটি ‘वि + अव + √स्था’ ধাতু থেকে গঠিত। এর অর্থ যথাযথভাবে অবস্থানকারী, সুসংগঠিত, সুসজ্জিত বা সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিষ্ঠিত। এখানে শব্দটি কৌরবসেনার সুসংগঠিত যুদ্ধবিন্যাসকে নির্দেশ করছে। কিন্তু এর দার্শনিক তাৎপর্য আরও গভীর। মানুষের মনেও অসংখ্য প্রবৃত্তি, কামনা, ভয়, লোভ ও আকাঙ্ক্ষা একেকটি সুশৃঙ্খল ব্যূহের মতো সংগঠিত হয়ে থাকে। বাহ্যিক যুদ্ধক্ষেত্রের মতোই মানুষের অন্তর্জগতেও এক বিশাল ব্যূহ রচিত হয়, যেখানে শুভ ও অশুভ প্রবৃত্তি মুখোমুখি অবস্থান করে।
পরবর্তী শব্দ ‘দৃষ্ট্বা’ (दृष्ट्वा) এসেছে ‘√দৃশ্’ ধাতু থেকে, যার অর্থ ‘দেখা’। ক্ত্বা-প্রত্যয়যুক্ত এই অব্যয়টির আক্ষরিক অর্থ ‘দেখিবার পর’। কিন্তু এখানে ‘দেখা’ বলতে কেবল চক্ষুদ্বারা দেখা বোঝায় না বরং বাস্তবতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা বোঝায়। মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত সত্যকে কেবল বাহ্যিকভাবে দেখে, ততক্ষণ সে নির্লিপ্ত থাকতে পারে। কিন্তু যখন সে বাস্তবতার অন্তর্নিহিত অর্থ উপলব্ধি করতে শুরু করে, তখনই তার মধ্যে প্রশ্ন, দ্বিধা ও আত্মসংঘাতের জন্ম হয়। অর্জুনের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটিই ঘটেছিল।
‘ধার্ত্তরাষ্ট্রান্’ (धार्तराष्ट्रान्) শব্দটি ‘ধৃতরাষ্ট্র’ নাম থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ বা কৌরবেরা। ভাষাগতভাবে এটি একটি বংশবাচক শব্দ হলেও দার্শনিক ব্যাখ্যায় ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ আসক্তির প্রতীক। তিনি জন্মান্ধ ছিলেন সেই অন্ধত্ব এখানে কেবল শারীরিক নয়, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অন্ধত্বেরও প্রতীক। ফলে ‘ধার্ত্তরাষ্ট্র’ বলতে সেই সমস্ত প্রবৃত্তিকে বোঝানো যায়, যেগুলি অন্ধ আসক্তি, অহংকার, লোভ, স্বার্থপরতা ও মোহ থেকে জন্ম নেয় এবং মানুষের বিবেককে আচ্ছন্ন করে।
এরপর আসে ‘কপিধ্বজঃ’ (कपिध्वजः) একটি অত্যন্ত প্রতীকবহ শব্দ। ‘কপি’ অর্থ বানর এবং ‘ধ্বজ’ অর্থ পতাকা। অর্থাৎ যাঁর পতাকায় বানরচিহ্ন রয়েছে। এটি অর্জুনের একটি বিশেষ উপাধি, কারণ তাঁর রথের পতাকায় মহাবীর হনুমান বিরাজমান ছিলেন। আক্ষরিকভাবে এটি একটি পরিচয়সূচক শব্দ হলেও প্রতীকী অর্থে এটি অসীম শক্তি, অটল ভক্তি, সাহস, ধৈর্য এবং ঈশ্বরনিষ্ঠার প্রতীক। হনুমানের উপস্থিতি যেন এই বার্তাই দেয় যে, যেখানে সত্য, কর্তব্য ও ধর্ম আছে, সেখানে ঈশ্বরীয় শক্তিও বিরাজমান।
‘প্রবৃত্তে শস্ত্রসম্পাতে’ অংশটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘প্রবৃত্তে’ এসেছে ‘প্র + √বৃত্’ ধাতু থেকে, যার অর্থ শুরু হওয়া বা সক্রিয় হয়ে ওঠা। ‘শস্ত্রসম্পাত’ শব্দটি ‘শস্ত্র’ (অস্ত্র) এবং ‘সম্পাত’ (সংঘর্ষ বা পতন) থেকে গঠিত, যার অর্থ অস্ত্রসংঘর্ষ বা যুদ্ধের সূচনা। এখানে যুদ্ধের সেই সংকটময় মুহূর্তকে নির্দেশ করা হয়েছে, যখন আর ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই এমন সময় আসে, যখন দ্বন্দ্ব এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না তখন সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই একমাত্র পথ।
‘ধনুরুদ্যম্য’ (धनुरुद्यम्य) শব্দটির অর্থ ধনুক উত্তোলন করে। এটি ‘ধনুস্’ এবং ‘উদ্ + √যম্’ ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত। বাহ্যিকভাবে এটি যুদ্ধের প্রস্তুতির চিহ্ন হলেও গভীর অর্থে এটি কর্তব্য গ্রহণের প্রতীক। জীবনের সংগ্রামে অস্ত্র বলতে কেবল যুদ্ধাস্ত্র নয় জ্ঞান, ন্যায়, সততা ও দৃঢ়সংকল্পও একেকটি অস্ত্র। ধনুক উত্তোলন মানে নিজের দায়িত্ব থেকে পলায়ন না করে সচেতনভাবে তাকে গ্রহণ করা।
‘পাণ্ডবঃ’ শব্দটির অর্থ পাণ্ডুর পুত্র। এখানে এটি বিশেষভাবে অর্জুনকে নির্দেশ করছে। কিন্তু প্রতীকী ব্যাখ্যায় পাণ্ডব মানে ধর্ম, সত্য, বিবেক ও নৈতিক শক্তির প্রতিনিধি। মানুষের অন্তর্জগতে যখন বিবেক অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন সেই বিবেকই অর্জুনরূপে প্রকাশিত হয়।
এরপর শ্লোকে এসেছে ‘হৃষীকেশং’ (हृषीकेशम्) ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এক অনন্য নাম। ‘হৃষীক’ অর্থ ইন্দ্রিয়সমূহ এবং ‘ঈশ’ অর্থ প্রভু বা অধিপতি। অর্থাৎ যিনি সমস্ত ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্তা। এই নামের মধ্যেই গীতার একটি মৌলিক শিক্ষা নিহিত রয়েছে। মানুষ তখনই সত্যিকারভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যখন তার ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি নিয়ন্ত্রিত থাকে। কৃষ্ণ তাই কেবল অর্জুনের সারথি নন তিনি মানুষের অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা, আত্মসচেতনতা ও ঈশ্বরীয় চেতনার প্রতীক।
সবশেষে ‘মহীপতে’ শব্দটি এসেছে ‘মহী’ (পৃথিবী) এবং ‘পতি’ (প্রভু) থেকে, যার অর্থ ‘হে পৃথিবীর অধিপতি’ বা ‘হে মহারাজ’। এটি ধৃতরাষ্ট্রকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে। কিন্তু এই সম্বোধনের মধ্যেও একটি সূক্ষ্ম ব্যঙ্গাত্মক তাৎপর্য রয়েছে। পৃথিবীর অধিপতি হয়েও ধৃতরাষ্ট্র নিজের মন, আসক্তি ও পক্ষপাতকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। বাহ্যিক ক্ষমতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা অন্তর্দৃষ্টি ও নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকে।
এই শ্লোকটির গভীর দার্শনিক তাৎপর্য হলো মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ বাইরের নয়, ভেতরের। অর্জুন যখন যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজন, গুরুজন ও প্রিয়জনদের দেখলেন, তখন তাঁর মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলো, সেটিই মানবজীবনের চিরন্তন সংকট। কর্তব্য ও মমতা, ন্যায় ও সম্পর্ক, আদর্শ ও আবেগ এই দুইয়ের সংঘর্ষই মানুষের প্রকৃত কুরুক্ষেত্র। এই কারণেই গীতার শিক্ষা যুদ্ধের আহ্বান নয় বরং সঠিক জ্ঞান, সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আত্মবোধের আহ্বান।
প্রতীকী অর্থে কুরুক্ষেত্র হলো মানুষের হৃদয়, অর্জুন হলো বিবেক, কৃষ্ণ হলো অন্তর্নিহিত পরমচেতনা, ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ আসক্তির প্রতীক, ধার্ত্তরাষ্ট্ররা মানুষের নেতিবাচক প্রবৃত্তির প্রতীক এবং হনুমানচিহ্নিত পতাকা অটল বিশ্বাস, ভক্তি ও আত্মশক্তির প্রতীক। যুদ্ধের অস্ত্রসংঘর্ষ আসলে শুভ ও অশুভ, জ্ঞান ও অজ্ঞান, সত্য ও মায়ার মধ্যকার অনন্ত সংঘাতের রূপক।
বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা সমানভাবে প্রযোজ্য। একজন বিচারক যখন নিজের আত্মীয়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার করতে বাধ্য হন, একজন চিকিৎসক যখন নিজের প্রিয়জনের কঠিন রোগের চিকিৎসার দায়িত্ব নেন, অথবা একজন সৎ প্রশাসক যখন আপনজনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তখন তাঁরাও অর্জুনের মতোই গভীর মানসিক কুরুক্ষেত্রের মধ্যে প্রবেশ করেন। সেই মুহূর্তে বাহ্যিক শক্তির চেয়ে অন্তরের প্রজ্ঞা, আত্মসংযম ও নৈতিক সাহসই প্রকৃত পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, গীতার এই শ্লোকটি কেবল যুদ্ধের সূচনার বর্ণনা নয় এটি মানবচেতনার এক অসাধারণ জাগরণের সূচনা। এখানে অর্জুনের চোখে কেবল শত্রুসৈন্য ধরা পড়ে না, ধরা পড়ে নিজের অন্তরের দ্বন্দ্ব, কর্তব্যের কঠিন সত্য এবং জীবনের গভীর প্রশ্ন। এই ‘দেখা’ থেকেই জন্ম নেয় বিষাদ, বিষাদ থেকেই আত্মঅনুসন্ধান, আর আত্মঅনুসন্ধান থেকেই উদ্ভাসিত হয় গীতার অমর জ্ঞান। তাই এই শ্লোক আমাদের শেখায় জীবনের প্রতিটি সংকটই প্রকৃতপক্ষে আত্মজাগরণের একটি সম্ভাবনা, যদি আমরা বাহ্যিক ঘটনাকে অতিক্রম করে তার অন্তর্নিহিত সত্যকে উপলব্ধি করতে পারি।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ২১তম শ্লোকের বিস্তারিত | অর্জুন, অচ্যুত ও আত্মজিজ্ঞাসার সূচনার গভীর তাৎপর্য
Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.
30 Day Money-Back Guarantee
Say goodbye to your low online sales rate!