শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ২৫তম শ্লোকের বিস্তারিত | ভীষ্মদ্রোণপ্রমুখতঃ, পার্থ ও আত্মজাগরণের সূচনার গভীর তাৎপর্য
ভীষ্মজেদ্রাণপ্রমুখতঃ সজের্ব্বর্ষা মহীসিক্ষতাম্।
উবাচ পাথ পদ্বৈশ্যতান্ সমজেবতান্ কুরূসি সিত॥২৫॥
অনুবাদ: সঞ্জয় কসিহজেল—গহ ভারত! গুড়াজেকশ অজ্জু এইকথা বসিলজেল, (সজের্ব্বসিন্দ্রয় সি য়ন্তা) শ্রীকৃষ্ণ, উভয় গস ার মধ্যস্থজেল ভীষ্ম, গদ্রাণ ও সমুদয় রাজ ্যবজেগর সর্ম্মুজেখ গসই উত্তম রথ স্থাপ পূর্ব্বক কসিহজেল , গহ পাথ! র্যুদ্ধাথ সমজেবত এই গকৌরবগণজেক সি রীক্ষণ কর॥
ভীষ্ম ও দ্রোণের সম্মুখে এবং অন্যান্য সকল রাজাদের সামনে রথ স্থাপন করার পর শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে উদ্দেশ করে বললেন—“হে পার্থ! এই সমবেত কুরুবংশীয়দের দেখো।” এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যেই গীতার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক অধ্যায়ের সূচনা নিহিত রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কেবল শত্রুসেনা দেখার নির্দেশ দেননি তিনি তাঁকে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলেন, যেখানে কর্তব্য, আত্মীয়তা, ন্যায়, ধর্ম ও মানবিক আবেগ একসঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। এই কারণেই শ্লোকটি বাহ্যত একটি সাধারণ নির্দেশ হলেও অন্তর্নিহিত অর্থে এটি অর্জুনের অন্তর্জাগতিক জাগরণের প্রথম ধাপ।
‘ভীষ্মদ্রোণপ্রমুখতঃ’ শব্দটি নির্দেশ করে—ভীষ্ম ও দ্রোণকে প্রধান করে তাঁদের সম্মুখে। এখানে ভীষ্ম ছিলেন অর্জুনের পিতামহতুল্য অভিভাবক এবং দ্রোণ ছিলেন তাঁর অস্ত্রশিক্ষার গুরু। যুদ্ধক্ষেত্রে এই দুই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে শত্রুপক্ষের অগ্রভাগে দেখে অর্জুনের হৃদয়ে কর্তব্য ও স্নেহের এক তীব্র সংঘাতের জন্ম হয়। শ্রীকৃষ্ণ ইচ্ছাকৃতভাবেই রথটি তাঁদের সম্মুখে স্থাপন করেন, কারণ তিনি জানতেন যে অর্জুনের অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকাশ না পেলে ধর্ম, কর্ম ও আত্মজ্ঞান সম্পর্কে গীতার মহাশিক্ষার সূচনা ঘটবে না। তাই এই অবস্থান কেবল যুদ্ধকৌশল নয়, বরং এক গভীর আধ্যাত্মিক পরিকল্পনার অংশ।
‘সর্ব্বেষাঞ্চ মহীক্ষিতাম্’ পদটির অর্থ—“এবং সকল রাজাদের সম্মুখে।” ‘মহীক্ষিত’ বলতে পৃথিবীর রক্ষক বা রাজাদের বোঝায়। এই রাজারা কেবল রাজনৈতিক শাসক নন তাঁরা নিজ নিজ রাজ্যের প্রতিনিধি এবং তাঁদের মাধ্যমে সমগ্র সমাজব্যবস্থার নৈতিক অবস্থানও প্রতিফলিত হয়। কুরুক্ষেত্রের এই সমাবেশ তাই দুই পরিবারের ব্যক্তিগত বিরোধ নয় এটি ছিল সমগ্র ভারতবর্ষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক শক্তির এক ঐতিহাসিক সমাবেশ, যেখানে ধর্ম ও অধর্মের প্রকৃত পরীক্ষা সংঘটিত হতে চলেছে।
‘উবাচ’ শব্দের অর্থ—“বললেন।” এটি √বচ্ (বলা) ধাতু থেকে গঠিত এবং এখানে শ্রীকৃষ্ণের উক্তিকে নির্দেশ করছে। লক্ষণীয় যে, তিনি কোনো দীর্ঘ বক্তৃতা দেননি মাত্র একটি শব্দ—‘পশ্য’ (দেখো)—উচ্চারণ করেই অর্জুনকে গভীর আত্মসমীক্ষার পথে পরিচালিত করেন। প্রকৃত জ্ঞানদাতা কখনোই প্রথমে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন না তিনি শিষ্যকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন, যাতে সত্যের উপলব্ধি তার নিজের অন্তর থেকেই জন্ম নেয়। শ্রীকৃষ্ণের এই সংক্ষিপ্ত নির্দেশ সেই শিক্ষাপদ্ধতিরই এক অনন্য উদাহরণ।
‘পার্থ’ শব্দটি অর্জুনের এক স্নেহময় সম্বোধন। ‘পৃথা’ বা কুন্তীর পুত্র বলেই অর্জুন ‘পার্থ’ নামে পরিচিত। এই সম্বোধনের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ যেন তাঁকে তাঁর মানবিক পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক এবং জীবনের বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি শুধু একজন মহাবীর নন তিনি একজন পুত্র, শিষ্য, ভ্রাতা, পৌত্র এবং আত্মীয়ও। এই সম্বোধনের মধ্য দিয়ে অর্জুনের হৃদয়ের কোমল দিকটি আরও স্পষ্টভাবে জাগ্রত হয়।
‘পশ্য’ শব্দটি শ্লোকটির প্রাণ। সাধারণ অর্থে এর মানে ‘দেখো’, কিন্তু গীতার প্রেক্ষাপটে এটি কেবল চোখে দেখা নয় বরং বাস্তবতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা, সত্যকে নিরপেক্ষভাবে বিচার করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সমস্ত পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করা। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধের উত্তেজনায় অন্ধ না হয়ে বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র দেখতে বলছেন। এই ‘দেখা’ থেকেই পরবর্তীকালে অর্জুনের বিষাদ, প্রশ্ন, সংশয় এবং শেষ পর্যন্ত আত্মজ্ঞান লাভের পথ উন্মুক্ত হয়।
‘এতান্ সমবেতান্ কুরূন্’—এই অংশের অর্থ, “এই সমবেত কুরুবংশীয়দের দেখো।” এখানে ‘সমবেত’ শব্দটি বোঝায় একত্রিত, সমবায়ভাবে উপস্থিত। কিন্তু এই সমাবেশ কেবল সৈন্যদের সমাবেশ নয় এটি ইতিহাস, ভাগ্য, কর্মফল এবং মানবজীবনের নৈতিক দ্বন্দ্বেরও সমাবেশ। ‘কুরূন্’ বলতে কুরুবংশীয়দের বোঝানো হয়েছে, যাঁরা প্রকৃতপক্ষে অর্জুনের আত্মীয়স্বজন। তাই তিনি শত্রুদের নয়, নিজের পরিবারকেই যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। এই উপলব্ধিই তাঁর হৃদয়কে বিচলিত করে এবং পরবর্তী শ্লোকগুলিতে যে বিষাদ ও মোহের প্রকাশ ঘটে, তার বীজ এই মুহূর্তেই রোপিত হয়।
সমগ্র শ্লোকটির মূল শিক্ষা হলো—জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে বাস্তবতাকে সম্পূর্ণরূপে দেখা ও উপলব্ধি করা অপরিহার্য। শ্রীকৃষ্ণ প্রথমেই যুদ্ধের নির্দেশ দেননি তিনি অর্জুনকে সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছেন। কারণ প্রকৃত ধর্মাচরণ কখনো অন্ধ আবেগ, পক্ষপাত বা তাড়াহুড়োর উপর প্রতিষ্ঠিত হয় না তা প্রতিষ্ঠিত হয় সত্যদর্শন, বিবেক, আত্মসমীক্ষা এবং ন্যায়বোধের উপর। তাই এই শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে, জীবনের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে প্রথম কর্তব্য হলো—বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে দেখা, আবেগের পরিবর্তে বিবেককে জাগ্রত করা এবং তারপর ধর্মসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। এই ‘পশ্য’ বা ‘দেখো’—শব্দটিই তাই সমগ্র গীতার জ্ঞানযাত্রার প্রথম আহ্বান এবং আত্মজাগরণের সূচনাবিন্দু।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ২৬তম শ্লোকের বিস্তারিত | অর্জুনের আত্মীয়-স্বজন দর্শন, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও মানবিকতার গভীর তাৎপর্য
Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.
30 Day Money-Back Guarantee
Say goodbye to your low online sales rate!