Related

Share

ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ২৮ তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: অর্জুনের করুণা, আত্মসমীক্ষা ও নৈতিক দ্বন্দ্বের সূচনা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on July 28, 2026


তান্ সমীক্ষ্য স কৌন্তেয়ঃ সর্ব্বান্ বন্ধূনবস্থিতান্।
 কৃপয়া পরয়াবিষ্টো বিষীদন্নিদমব্রবীৎ॥

অনুবাদ:  কুন্তীপুত্র অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থানরত সমস্ত আত্মীয়-স্বজনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে পরম করুণায় অভিভূত হলেন এবং গভীর বিষাদে নিমজ্জিত হয়ে এই কথাগুলি বলতে শুরু করলেন। এই শ্লোকটি কেবল একটি ঘটনার বর্ণনা নয় বরং এটি মানবহৃদয়ের করুণা, সম্পর্ক, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং আত্মজাগরণের সূচনার এক অনন্য দলিল।

শ্লোকের প্রথম শব্দ ‘তান্’ (तान्) সংস্কৃত সর্বনাম ‘তদ্’ (तद्)-এর বহুবচন দ্বিতীয়া বিভক্তি, যার অর্থ ‘তাঁদের’ বা ‘সেই সকলকে’। এখানে শব্দটি কেবল কিছু ব্যক্তিকে নির্দেশ করছে না বরং অর্জুনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর আপনজনদের প্রতি তাঁর প্রত্যক্ষ উপলব্ধিকে প্রকাশ করছে। যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত মানুষগুলো তাঁর কাছে আর শত্রু নয় তাঁরা হয়ে উঠেছেন ‘তাঁরা’—নিজের রক্তের সম্পর্ক, স্নেহের বন্ধন এবং জীবনের স্মৃতিবাহী মানুষ। এই একটি শব্দেই যুদ্ধের নিষ্ঠুর বাস্তবতা মানবিক অনুভূতির সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে।

পরবর্তী শব্দ ‘সমীক্ষ্য’ (समीक्ष्य) গঠিত হয়েছে ‘সম্’ উপসর্গ এবং ‘ঈক্ষ্’ ধাতুর সমন্বয়ে, যার অর্থ ‘সম্পূর্ণরূপে দেখা’, ‘গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা’ বা ‘মনোযোগ সহকারে নিরীক্ষণ করা’। এটি সাধারণভাবে দেখা নয় বরং এমন এক দৃষ্টি, যা বাহ্যিক রূপের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা সত্যকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। অর্জুন কেবল সৈন্যবাহিনী দেখেননি তিনি দেখেছিলেন নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য সম্পর্ক, স্মৃতি, স্নেহ এবং কর্তব্যের বন্ধন। এই শব্দটি আত্মসমীক্ষারও প্রতীক, কারণ বাহ্যিক দৃশ্যের মধ্য দিয়েই তাঁর অন্তর্জগতে এক গভীর সংকটের সূচনা হয়।

‘স কৌন্তেয়ঃ’ (स कौन्तेयः) শব্দবন্ধে অর্জুনকে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়ের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘কৌন্তেয়’ অর্থ কুন্তীর পুত্র। এখানে তাঁকে ‘মহাবীর’, ‘ধনুর্ধর’ বা ‘পাণ্ডব’ না বলে ‘কৌন্তেয়’ বলা হয়েছে, যাতে তাঁর মানবিক ও পারিবারিক পরিচয়টি বিশেষভাবে উদ্ভাসিত হয়। যুদ্ধের মুহূর্তে একজন বীরযোদ্ধার চেয়ে একজন মায়ের সন্তানের হৃদয়ই বেশি জেগে উঠেছে। এই শব্দটি মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পরিচয় কেবল পেশা বা কর্তব্যে সীমাবদ্ধ নয় তার গভীরে থাকে পরিবার, সম্পর্ক ও অনুভূতির বন্ধন।

‘সর্ব্বান্ বন্ধূন্’ (सर्वान् बन्धून्)—এই দুটি শব্দ শ্লোকটির আবেগময় কেন্দ্রবিন্দু। ‘সর্ব্বান্’ অর্থ ‘সকলকে’, আর ‘বন্ধূন্’ শব্দটি এসেছে ‘বন্ধ্’ (बन्ध्) ধাতু থেকে, যার অর্থ ‘বন্ধন সৃষ্টি করা’, ‘সংযুক্ত করা’। ‘বন্ধু’ বা ‘বন্ধুজন’ বলতে এখানে রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়, পরিবার, স্বজন এবং হৃদয়ের বন্ধনে আবদ্ধ মানুষদের বোঝানো হয়েছে। অর্জুনের দৃষ্টিতে যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিকেরা আর প্রতিপক্ষ নয় তাঁরা সবাই তাঁর জীবনের অংশ। এই উপলব্ধি তাঁকে যুদ্ধজয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে সরিয়ে এনে মানবিক করুণার গভীরে পৌঁছে দেয়। এই শব্দ আমাদের শেখায় যে মানুষের প্রকৃত পরিচয় সংঘাতে নয়, সম্পর্কে।

‘অবস্থিতান্’ (अवस्थितान्) শব্দটির উৎপত্তি ‘অব’ উপসর্গ এবং ‘स्था’ (স্থ) ধাতু থেকে, যার অর্থ ‘দাঁড়িয়ে থাকা’, ‘প্রতিষ্ঠিত থাকা’ বা ‘নিজ নিজ অবস্থানে অবিচল থাকা’। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রত্যেকে নিজের কর্তব্যের স্থানে দাঁড়িয়ে আছে। বাহ্যিকভাবে সবাই দৃঢ় ও স্থির, কিন্তু অর্জুনের অন্তরে তখন শুরু হয়েছে ভয়াবহ আলোড়ন। এই শব্দটি প্রতীকী অর্থে বোঝায় যে জীবনের মঞ্চে প্রত্যেক মানুষ নিজ নিজ ভূমিকা পালন করছে, কিন্তু সেই ভূমিকার অন্তরালে প্রত্যেকেরই রয়েছে অনুভূতি, সম্পর্ক এবং নৈতিক দ্বন্দ্ব।

এরপর আসে শ্লোকটির সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অংশ—‘কৃপয়া পরয়াবিষ্টঃ’ (कृपया परयाविष्टः)। ‘কৃপা’ অর্থ দয়া, করুণা বা অন্যের দুঃখে হৃদয়ের গভীর সহানুভূতি। ‘পরয়া’ অর্থ সর্বোচ্চ বা পরম, আর ‘আবিষ্ট’ অর্থ সম্পূর্ণরূপে আচ্ছন্ন বা অভিভূত। অর্থাৎ, অর্জুন সামান্য সহানুভূতিতে নয়, পরম করুণায় সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছেন। এই করুণা দুর্বলতার প্রকাশ নয় এটি একজন সংবেদনশীল মানুষের স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া। ধর্মীয় ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও করুণা সর্বোচ্চ গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বৌদ্ধ দর্শনে করুণা মুক্তির অন্যতম পথ, বৈষ্ণব দর্শনে ঈশ্বরের কৃপাই জীবের মুক্তির কারণ, আবার যোগদর্শনে করুণার চর্চা মনকে নির্মল ও শান্ত করে। তবে গীতা এখানেই একটি সূক্ষ্ম শিক্ষা দেয়—করুণা মহৎ, কিন্তু করুণার সঙ্গে যদি মোহ বা আসক্তি মিশে যায়, তবে তা কর্তব্যবোধকে দুর্বল করে দিতে পারে।

‘বিষীদন্’ (विषीदन्) শব্দটি এসেছে ‘वि’ উপসর্গ ও ‘ষদ্’ ধাতু থেকে, যার অর্থ ‘অন্তরে ভেঙে পড়া’, ‘গভীর শোকে নিমজ্জিত হওয়া’ বা ‘মনোবল হারিয়ে ফেলা’। অর্জুনের এই বিষাদই গীতার প্রকৃত সূচনা। তিনি যুদ্ধের শক্তি হারাননি বরং তিনি নিজের অস্তিত্ব, কর্তব্য ও জীবনের অর্থ সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন। এই বিষাদ ধ্বংসের নয়, আত্মজাগরণের পূর্বভূমিকা। মানুষের জীবনে অনেক সময় গভীর সংকট, হতাশা বা দুঃখই সত্য অনুসন্ধানের দ্বার খুলে দেয়। অন্ধকারের গভীর থেকেই যেমন সূর্যোদয়ের প্রত্যাশা জন্মায়, তেমনি অর্জুনের বিষাদ থেকেই গীতার অমর জ্ঞানধারা প্রবাহিত হয়েছে।

শেষে ‘ইদমব্রবীত্’ (इदमब्रवीत्) অর্থাৎ ‘এই কথা বললেন’—এই শব্দবন্ধটি বাহ্যিকভাবে সাধারণ হলেও এর তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। এটি কেবল কথা বলা নয় বরং অন্তরের দ্বন্দ্ব, যন্ত্রণা ও প্রশ্নকে ভাষায় প্রকাশ করার মুহূর্ত। মানুষের আত্মোন্নয়নের প্রথম ধাপ হলো নিজের বিভ্রান্তি ও দুর্বলতাকে স্বীকার করা। অর্জুন সেই সাহসই দেখিয়েছিলেন। তাঁর প্রশ্নই শ্রীকৃষ্ণের উপদেশের দ্বার উন্মুক্ত করে।

সমগ্র শ্লোকটির দার্শনিক তাৎপর্য অত্যন্ত বিস্তৃত। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে অর্জুনের শোক অবিদ্যা থেকে উৎপন্ন, কারণ আত্মা অবিনশ্বর বিশিষ্টাদ্বৈত মতে করুণা মহৎ, কিন্তু ঈশ্বরনির্দিষ্ট কর্তব্য ত্যাগ করা উচিত নয় দ্বৈত দর্শন অনুযায়ী এই সংকটের সমাধান ঈশ্বরের শরণ গ্রহণেই নিহিত। বৌদ্ধ দর্শন বলবে, করুণা মহৎ হলেও আসক্তিই দুঃখের মূল কারণ। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি নৈতিক দ্বন্দ্ব (moral conflict)-এর এক অনবদ্য উদাহরণ, যেখানে কর্তব্য ও আবেগ পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়ায়।

প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকে কুরুক্ষেত্র মানবজীবনের প্রতীক, অর্জুন প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষের প্রতীক, আত্মীয়স্বজন আমাদের আসক্তি ও সম্পর্কের প্রতীক, করুণা মানবিকতার প্রতীক এবং বিষাদ আত্মজাগরণের সূচনার প্রতীক। জীবনের প্রতিটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুহূর্তেই মানুষ একবার না একবার অর্জুন হয়ে ওঠে। যখন কর্তব্য ও সম্পর্ক, যুক্তি ও আবেগ, ন্যায় ও মমতা মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য নতুন করে উপলব্ধি হয়।

সারসংক্ষেপে বলা যায়, ভগবদ্গীতার এই শ্লোকটি কেবল যুদ্ধের পূর্বমুহূর্তের একটি মানসিক অবস্থার বর্ণনা নয় এটি মানবচেতনার গভীরতম স্তরের এক অনুপম বিশ্লেষণ। ভাষাগতভাবে প্রতিটি শব্দ সুপরিকল্পিত ও অর্থবহ দার্শনিকভাবে এটি কর্তব্য, করুণা, আত্মপরিচয় ও আত্মজ্ঞান সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে আর প্রতীকীভাবে এটি শেখায় যে সত্যিকারের জ্ঞান প্রায়ই জন্ম নেয় গভীর মানবিক বেদনা ও আত্মসমীক্ষার মধ্য দিয়ে। অর্জুনের বিষাদ তাই দুর্বলতার প্রতীক নয় বরং তা মানবতার, আত্মজিজ্ঞাসার এবং পরম সত্যের পথে যাত্রার প্রথম আলোকরেখা।


ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ২৯তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: অর্জুনের মানসিক সংকট, শরীরের কম্পন ও নৈতিক দ্বন্দ্ব

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: July 24, 2026 July 28, 2026

More insight about ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ২৮ তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: অর্জুনের করুণা, আত্মসমীক্ষা ও নৈতিক দ্বন্দ্বের সূচনা

More insight about ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ২৮ তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: অর্জুনের করুণা, আত্মসমীক্ষা ও নৈতিক দ্বন্দ্বের সূচনা