Related

Share

ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ৩৪তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: আত্মীয়তার বন্ধন, করুণা ও অর্জুনের নৈতিক সংকট

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on July 28, 2026


মাতুলাঃ শ্বশুরাঃ পৌত্ত্রাঃ শ্যালাঃ সম্বন্ধিনস্তথা। 
এতান্ ন হস্তুমিচ্ছামি ঘ্নতোऽপি মধুসূদন॥

অনুবাদ: হে মধুসূদন! এঁরা আমার মাতুল, শ্বশুর, পৌত্র, শ্যালক এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজন। এরা আমাকে হত্যা করলেও আমি এদের হত্যা করতে চাই না। 

এই শ্লোকটি কেবল আত্মীয়দের একটি তালিকা নয় বরং এটি মানবিক সম্পর্ক, করুণা, নৈতিকতা এবং ধর্মসংকটের এক গভীর দার্শনিক দলিল।

‘মাতুলাঃ’ শব্দটি সংস্কৃত ‘মাতুল’ (मातुल) থেকে উদ্ভূত, যার মূল ভিত্তি ‘মাতৃ’ (मातृ) অর্থাৎ ‘মাতা’। ‘মাতুল’ বলতে মায়ের ভাই বা মাতৃকুলীয় অভিভাবককে বোঝায়। ভাষাগতভাবে এটি এমন এক আত্মীয়কে নির্দেশ করে, যিনি মাতৃস্নেহের সম্প্রসারিত রূপ হিসেবে বিবেচিত। ভারতীয় সংস্কৃতিতে মাতুল কেবল একজন আত্মীয় নন তিনি শৈশবের নিরাপত্তা, স্নেহ ও আশ্রয়ের প্রতীক। অর্জুন যখন যুদ্ধক্ষেত্রে মাতুলদের দেখেন, তখন তাঁর সামনে শত্রুর মুখ নয়, বরং শৈশবের স্মৃতি ও স্নেহময় সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। দার্শনিক দৃষ্টিতে ‘মাতুল’ শব্দটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানুষের পরিচয় কেবল ব্যক্তিসত্তায় সীমাবদ্ধ নয় সে সম্পর্কের মধ্য দিয়েই নিজেকে সম্পূর্ণ করে।

‘শ্বশুরাঃ’ শব্দটি সংস্কৃত ‘শ্বশুর’ (श्वशुर) থেকে এসেছে, যার অর্থ বিবাহসূত্রে প্রাপ্ত পিতৃস্থানীয় ব্যক্তি। এটি এমন একটি সম্পর্কের প্রতীক, যা রক্তের বন্ধনের নয়, বরং সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। ভারতীয় সমাজে বিবাহ কখনোই কেবল দুই ব্যক্তির মিলন নয় এটি দুই পরিবারের, দুই বংশের এবং দুই সংস্কৃতির সংযোগ। সেই কারণেই অর্জুন শ্বশুরদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলতে দ্বিধাগ্রস্ত। এখানে ‘শ্বশুর’ সামাজিক দায়িত্ব, পারিবারিক মর্যাদা এবং গৃহস্থধর্মের প্রতীক হয়ে ওঠে। দর্শনের ভাষায় এটি বোঝায় যে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক অনেক সময় রক্তের সম্পর্কের মতোই গভীর ও অর্থবহ হতে পারে।

‘পৌত্ত্রাঃ’ শব্দটি ‘পুত্র’ (पुत्र) শব্দ থেকে তদ্ধিত প্রত্যয়ের মাধ্যমে গঠিত ‘পৌত্র’ (पौत्र)। এর অর্থ পুত্রের সন্তান বা নাতি। আক্ষরিকভাবে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিনিধিকে নির্দেশ করে। এই শব্দটির মধ্যে বংশধারার ধারাবাহিকতা, উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে। একজন দাদা বা পিতামহের কাছে পৌত্র কেবল পরিবারের একজন সদস্য নয় তিনি ভবিষ্যতের বাহক। অর্জুন যখন ‘পৌত্র’দের কথা উল্লেখ করেন, তখন তিনি উপলব্ধি করেন যে যুদ্ধ কেবল বর্তমানকে ধ্বংস করবে না এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বকেও বিপন্ন করবে। প্রতীকীভাবে ‘পৌত্র’ আশা, ধারাবাহিকতা এবং মানবসভ্যতার অমরত্বের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

‘শ্যালাঃ’ শব্দটি সংস্কৃত ‘শ্যাল’ (श्याल) থেকে এসেছে, যার অর্থ স্ত্রীর ভাই বা শ্যালক। এটি বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এক আত্মীয়তার পরিচয়। যদিও এই সম্পর্ক রক্তের নয়, তবুও সামাজিক জীবনে এটি আন্তরিকতা, সৌহার্দ্য ও পারিবারিক বন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্জুন এই সম্পর্কগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছেন, কারণ তাঁর কাছে যুদ্ধের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিরা কেবল যোদ্ধা নন তাঁরা পারিবারিক জীবনের অংশ। এই শব্দটি প্রতীকীভাবে মানবসমাজে সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক নির্ভরতার প্রতীক।

‘সম্বন্ধিনঃ’ শব্দটি গঠিত হয়েছে ‘সম্’ উপসর্গ এবং √বন্ধ্ (bandh) ধাতু থেকে, যার অর্থ ‘বাঁধা’ বা ‘সংযুক্ত করা’। এর সঙ্গে ‘ইন্’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘সম্বন্ধিন’ শব্দের সৃষ্টি হয়েছে, যার অর্থ সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তি বা আত্মীয়স্বজন। আক্ষরিকভাবে এটি সেই সকল মানুষকে বোঝায়, যারা কোনো না কোনো বন্ধনের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। এই শব্দটির গভীর তাৎপর্য হলো—মানবজীবন মূলত সম্পর্কের জাল দিয়ে নির্মিত। মানুষ কখনোই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সত্তা নয় সে পরিবার, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সংযুক্ত। দর্শনের দৃষ্টিতে এই শব্দটি মানবসমাজের আন্তঃনির্ভরতা এবং সামাজিক অস্তিত্বের সত্যকে তুলে ধরে। প্রতীকী অর্থে এটি ঐক্য, সংহতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতীক।

‘এতান্’ শব্দটি সংস্কৃত ‘এতদ্’ (एतद्) সর্বনাম থেকে এসেছে এবং এর অর্থ ‘এই সকলকে’ বা ‘এদেরকে’। এই একটি ছোট্ট শব্দেই অর্জুনের মানসিক অবস্থার গভীর পরিবর্তন প্রকাশিত হয়েছে। তিনি তাঁদের ‘শত্রু’ বলে সম্বোধন করেননি বরং ‘এরা’ বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ তাঁর কাছে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো প্রথমে আত্মীয়, পরে প্রতিপক্ষ। এই শব্দটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির এক অসাধারণ প্রকাশ।

‘ন হন্তুমিচ্ছামি’ তিনটি অংশে গঠিত—‘ন’ অর্থ ‘না’, ‘হন্তুম্’ এসেছে √হন্ (হন্) ধাতু থেকে, যার অর্থ ‘হত্যা করা’, এবং ‘ইচ্ছামি’ এসেছে √ইষ্ ধাতু থেকে, যার অর্থ ‘আমি ইচ্ছা করি’। পুরো পদটির অর্থ—“আমি হত্যা করতে চাই না।” এটি অর্জুনের অন্তরের নৈতিক প্রতিবাদের ভাষা। এখানে কোনো ভীরুতা নেই বরং আছে করুণা, সহমর্মিতা এবং বিবেকের আর্তনাদ। এই বাক্যাংশটি মানবসভ্যতার অন্যতম গভীর নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে—কর্তব্য কি সর্বদা করুণার ঊর্ধ্বে, নাকি মানবিকতা কখনো কর্তব্যকেও প্রশ্ন করতে পারে?

‘ঘ্নতোऽপি’ শব্দটি ‘ঘ্নতঃ’ (হত্যা করছে) এবং ‘অপি’ (যদিও) এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। এর অর্থ—“তারা আমাকে হত্যা করলেও।” এই অভিব্যক্তি অর্জুনের করুণার চরম প্রকাশ। তিনি আত্মরক্ষার প্রবৃত্তিকেও অতিক্রম করে এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছেন, যেখানে প্রতিশোধ নয়, বরং মানবিকতা তাঁর সিদ্ধান্তকে পরিচালিত করছে। দর্শনের আলোকে এটি অহিংসার মানসিক ভিত্তির প্রতীক, যদিও পরবর্তীতে গীতায় শ্রীকৃষ্ণ ব্যাখ্যা করবেন যে ধর্মরক্ষার জন্য ন্যায়যুদ্ধ কখনো কখনো অপরিহার্য।

‘মধুসূদন’ শব্দটি গঠিত হয়েছে ‘মধু’ এবং ‘সূদন’—এই দুটি অংশ থেকে। ‘মধু’ হলো এক অসুরের নাম এবং ‘সূদন’ অর্থ বিনাশকারী। অর্থাৎ ‘মধুসূদন’ মানে ‘মধু অসুরের বিনাশকারী’, যা শ্রীকৃষ্ণের একটি সুপরিচিত উপাধি। কিন্তু এখানে এই সম্বোধনের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। অর্জুন যেন কৃষ্ণকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন—“আপনি তো অসুরবধকারী কিন্তু এরা তো অসুর নয়, এরা আমার আপনজন।” প্রতীকী অর্থে ‘মধু’ মানুষের অন্তরের অজ্ঞানতা, আসক্তি ও অধর্মের প্রতীক এবং ‘মধুসূদন’ সেই ঈশ্বরীয় শক্তি, যিনি অন্তরের অশুভ প্রবৃত্তিকে বিনাশ করেন।

এই সমগ্র শ্লোকটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এখানে যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের সংঘর্ষ নয় এটি হৃদয় ও কর্তব্যের সংঘর্ষ। অর্জুন উপলব্ধি করেন যে যুদ্ধের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর শৈশব, পরিবার, আত্মীয়তা, স্মৃতি এবং ভালোবাসা। ফলে তাঁর কাছে যুদ্ধ আর কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক বিষয় থাকে না এটি হয়ে ওঠে নৈতিকতার এক কঠিন পরীক্ষা। এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে মানুষকে কেবল শত্রু বা মিত্রের পরিচয়ে বিচার করলে তার প্রকৃত মানবিক পরিচয় আড়াল হয়ে যায়।

বাস্তব জীবনেও আমরা প্রায়ই এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হই, যেখানে কর্তব্য ও সম্পর্কের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়। একজন বিচারককে যদি নিজের আত্মীয়ের বিচার করতে হয়, অথবা একজন প্রশাসককে যদি আপনজনের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে হয়, তবে তাঁর মানসিক অবস্থাও অর্জুনের মতো দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে উঠতে পারে। সাহিত্য, ইতিহাস ও মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এই শ্লোকটি মানবচরিত্রের এক চিরন্তন সত্য প্রকাশ করে—হৃদয়ের করুণা এবং কর্তব্যবোধের সংঘর্ষই মানুষের অন্যতম গভীর অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম।

সারসংক্ষেপে বলা যায়, ভগবদ্গীতার এই শ্লোকটি আত্মীয়তার একটি সাধারণ বর্ণনা নয় এটি মানবজীবনের সম্পর্ক, করুণা, নৈতিকতা এবং ধর্মসংকটের এক অনন্য দার্শনিক দলিল। ‘মাতুল’, ‘শ্বশুর’, ‘পৌত্র’, ‘শ্যাল’ এবং ‘সম্বন্ধী’—এই প্রতিটি শব্দ মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক অস্তিত্বের ভিন্ন ভিন্ন স্তরকে প্রকাশ করে, আর “এতান্ ন হন্তুমিচ্ছামি” বাক্যটি মানবিক বিবেকের সর্বোচ্চ আর্তনাদকে ধারণ করে। এই শ্লোকের মধ্য দিয়ে গীতা আমাদের শেখায় যে সত্যিকারের ধর্ম কেবল বাহ্যিক কর্তব্য নয় তা করুণা, বিবেক, ন্যায় এবং আত্মজ্ঞান—এই চারটির সুষম সমন্বয়ে পরিপূর্ণ হয়।


ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ৩৫তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: ত্রিভুবনের রাজ্যও কেন প্রত্যাখ্যান করলেন অর্জুন?

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: July 24, 2026 July 28, 2026

More insight about ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ৩৪তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: আত্মীয়তার বন্ধন, করুণা ও অর্জুনের নৈতিক সংকট

More insight about ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ৩৪তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: আত্মীয়তার বন্ধন, করুণা ও অর্জুনের নৈতিক সংকট