Related

Share

ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ৩৬তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: পাপ, স্বজনবধ ও অর্জুনের নৈতিক দ্বন্দ্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on July 28, 2026


পাপমেবাশ্রয়েদস্মান্ হত্বৈতানাততায়িনঃ। 
তস্মান্নার্হা বয়ং হন্তুং ধার্ত্তরাষ্ট্রান্ স্ববান্ধবান্। 
স্বজনং হি কথং হত্বা সুখিনঃ স্যাম মাধব॥৩৬।।

অনুবাদ: এই আততায়ীদের হত্যা করলেও পাপই আমাদের গ্রাস করবে। অতএব ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের—যারা আমাদেরই আত্মীয়—হত্যা করা আমাদের উচিত নয়। হে মাধব! নিজের স্বজনদের হত্যা করে আমরা কীভাবে সুখী হতে পারি?

এই শ্লোকটি কেবল যুদ্ধের প্রসঙ্গ নয় এটি মানুষের বিবেক, কর্তব্য, আত্মীয়তা, নৈতিকতা এবং অন্তর্জগতের গভীর দ্বন্দ্বের এক অনন্য দলিল।

শ্লোকটির সূচনায় ‘পাপমেবাশ্রয়েদস্মান্’ শব্দবন্ধটি ব্যবহৃত হয়েছে। এটি চারটি অংশে গঠিত— পাপम् (পাপ) + এব (নিশ্চয়ই) + আশ্রয়েত্ (আশ্রয় করবে বা গ্রাস করবে) + অস্মান্ (আমাদের)। ‘আশ্রয়েত্’ শব্দটি সংস্কৃত √श्रि (শ্রি) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ আশ্রয় নেওয়া, নির্ভর করা বা গ্রাস করা। এখানে ‘এব’ অব্যয়টি নিশ্চিততার ভাব প্রকাশ করেছে। আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায়— “পাপই নিশ্চিতভাবে আমাদের গ্রাস করবে।” প্রচলিত অর্থে এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে, এমন একটি কর্ম যা ধর্মবিরুদ্ধ এবং যার ফলে আত্মগ্লানি ও নৈতিক অবক্ষয় অনিবার্য। অর্জুনের বক্তব্যে যুদ্ধ কেবল একটি রাজনৈতিক সংঘর্ষ নয় বরং এমন একটি নৈতিক সিদ্ধান্ত, যার ফল তার আত্মাকে ভারাক্রান্ত করবে। এখানে ‘পাপ’ কেবল ধর্মীয় অপরাধ নয়, বরং বিবেকের বিরুদ্ধে পরিচালিত কর্মের প্রতীক।

এরপর এসেছে ‘হত্বৈতানাততায়িনঃ’ শব্দটি। এটি তিনটি অংশে বিভক্ত— হত্বা (হত্যা করে) + এতান্ (এদেরকে) + আততায়িনঃ (আততায়ীদের)। ‘হত্বা’ শব্দটি √হन् (হन्) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হত্যা করা। ‘আততায়ী’ শব্দটির উৎপত্তি ‘আতত’ এবং ‘আয়িন’ থেকে। ‘আতত’ অর্থ প্রসারিত বা প্রস্তুত, বিশেষত ধনুক টেনে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হওয়া। ফলে ‘আততায়ী’ বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যে বিনা প্ররোচনায় প্রাণ, সম্পদ, ভূমি বা সম্মানের ওপর আক্রমণ করে। ধর্মশাস্ত্রে ছয় প্রকার আততায়ীর উল্লেখ রয়েছে— অগ্নিসংযোগকারী, বিষপ্রয়োগকারী, অস্ত্রধারী আক্রমণকারী, ধনলুণ্ঠনকারী, ভূমি দখলকারী এবং স্ত্রী অপহরণকারী। কৌরবরা পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে বহুবার এ ধরনের অন্যায় করেছিল তবুও অর্জুন তাঁদের কেবল শত্রু হিসেবে দেখছেন না, বরং আত্মীয় হিসেবেও অনুভব করছেন। এই দ্বৈত উপলব্ধিই তাঁর মানসিক সংকটের মূল কারণ।

পরবর্তী অংশ ‘তস্মান্নার্হা বয়ং হন্তুম্’-এর অর্থ— “অতএব আমাদের হত্যা করা উচিত নয়।” এখানে ‘তস্মাত্’ অর্থ ‘অতএব’, ‘ন’ অর্থ ‘নয়’, ‘অর্হাঃ’ শব্দটি √अर्ह् (অর্হ্) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ যোগ্য হওয়া বা কর্তব্যসঙ্গত হওয়া। ‘বয়ম্’ অর্থ ‘আমরা’ এবং ‘হন্তুম্’ অর্থ ‘হত্যা করা’। অর্জুনের এই বক্তব্যে কর্তব্যবোধের চেয়ে নৈতিক করুণা অধিক প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি মনে করছেন, শাস্ত্রসম্মত বা ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ হলেও, যদি তার ফলে আপনজনের বিনাশ ঘটে, তবে সেই কর্ম তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

‘ধার্ত্তরাষ্ট্রান্’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো— “ধৃতরাষ্ট্রের বংশধর” বা “ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ”। এটি ‘ধৃতরাষ্ট্র’ শব্দের সঙ্গে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে। যদিও এর প্রত্যক্ষ অর্থ কৌরবগণ, তবু প্রতীকী অর্থে এটি অন্ধ ক্ষমতালিপ্সা, নৈতিক অন্ধত্ব এবং অন্যায়ের উত্তরাধিকারকে নির্দেশ করে। ধৃতরাষ্ট্র নিজে যেমন শারীরিকভাবে অন্ধ ছিলেন, তেমনি তাঁর পুত্রদের চরিত্রে ন্যায়বোধের অন্ধতাও প্রতিফলিত হয়েছে।

‘স্ববান্ধবান্’ শব্দটি ‘স্ব’ (নিজের) এবং ‘বান্ধব’ (আত্মীয় বা সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তি) থেকে গঠিত। এর অর্থ— নিজের আত্মীয়স্বজন, নিকটজন বা আপনজন। এই শব্দটি মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক পরিচয়ের গভীর ভিত্তিকে নির্দেশ করে। অর্জুনের কাছে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো কেবল প্রতিপক্ষ নয় তারা তাঁর জীবনের স্মৃতি, সম্পর্ক এবং পারিবারিক বন্ধনের অংশ। এই উপলব্ধিই তাঁর অস্ত্রধারণের শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে।

এরপর এসেছে ‘স্বজনম্’ শব্দটি, যা ‘স্ব’ এবং ‘জন’ থেকে গঠিত। আক্ষরিক অর্থ— “নিজের মানুষ”। সাধারণ অর্থে এটি আত্মীয়স্বজন, পরিবার বা নিকট সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিদের বোঝায়। তবে এর প্রতীকী অর্থ আরও গভীর। মানুষের পরিচয়, নিরাপত্তা, আবেগ ও ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘স্বজন’। তাই স্বজনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মানে নিজের অস্তিত্বের একটি অংশের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করা। এই কারণেই অর্জুনের প্রশ্ন— “নিজেদের মানুষদের হত্যা করে আমরা কীভাবে সুখী হব?”

‘সুখিনঃ স্যাম’ শব্দবন্ধের অর্থ— “আমরা সুখী হব।” ‘সুখিনঃ’ অর্থ সুখী এবং ‘স্যাম’ শব্দটি √अस् (অস্তিত্ব থাকা) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ “হতে পারি” বা “হব”। এখানে অর্জুন বাহ্যিক জয়ের চেয়ে অন্তরের শান্তিকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, যদি বিজয়ের মূল্য হয় আত্মীয়দের রক্ত এবং অন্তহীন আত্মগ্লানি, তবে সেই বিজয়ে প্রকৃত সুখের কোনো অস্তিত্ব নেই।

শ্লোকের শেষে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে ‘মাধব’ বলে সম্বোধন করেছেন। ‘মাধব’ শব্দটির একাধিক ব্যুৎপত্তিগত অর্থ রয়েছে। এক ব্যাখ্যায় ‘মা’ অর্থ লক্ষ্মী এবং ‘ধব’ অর্থ স্বামী সুতরাং ‘মাধব’ অর্থ লক্ষ্মীপতি বা শ্রীকৃষ্ণ। অন্য ব্যাখ্যায় এটি মধুবংশের উত্তরাধিকারী। আবার আধ্যাত্মিক অর্থে ‘মাধব’ হলেন সেই চিরকল্যাণময় সত্তা, যিনি জীবনের তিক্ততার মাঝেও মাধুর্য ও সত্যের পথ দেখান। সংকটের মুহূর্তে অর্জুন এই নামেই কৃষ্ণকে সম্বোধন করেছেন, কারণ তিনি জানেন, তাঁর বিভ্রান্তির সমাধান কেবল করুণাময় ও সর্বজ্ঞ কৃষ্ণই দিতে পারেন।

এই শ্লোকের প্রাসঙ্গিক অর্থ বহুমাত্রিক। নৈতিক স্তরে এটি প্রশ্ন তোলে— অন্যায়কারী হলেও যদি সে আত্মীয় হয়, তবে তার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ কি ন্যায়সঙ্গত? পারিবারিক স্তরে এটি আত্মীয়তার বন্ধন ও কর্তব্যের সংঘাতকে তুলে ধরে। আধ্যাত্মিক স্তরে এটি আসক্তি ও ধর্মবোধের সূক্ষ্ম পার্থক্যকে উন্মোচন করে। অর্জুনের দৃষ্টিতে আত্মীয়তা এতটাই প্রবল যে তা তাঁর ক্ষত্রিয়ধর্ম পালনেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দার্শনিকভাবে এই শ্লোক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেদান্তের আলোকে অর্জুন দেহগত সম্পর্ককে চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করছেন, অথচ পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে শ্রীকৃষ্ণ শিক্ষা দেবেন যে আত্মা অবিনশ্বর এবং দেহগত সম্পর্ক ক্ষণস্থায়ী। নীতিদর্শনের দৃষ্টিতে এখানে সম্পর্কভিত্তিক নৈতিকতা (Care Ethics) এবং কর্তব্যভিত্তিক নৈতিকতার (Duty Ethics) মধ্যে সংঘাত দেখা যায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি এক ধরনের নৈতিক আঘাত (Moral Injury)-এর পূর্বাভাস, যেখানে মানুষ আশঙ্কা করে যে কোনো কর্ম বাহ্যিকভাবে সফল হলেও তা তার অন্তরের শান্তিকে চিরতরে ধ্বংস করতে পারে।

প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকের প্রতিটি চরিত্র মানুষের অন্তর্জগতের একেকটি শক্তির প্রতীক। অর্জুন বিবেকের প্রতীক, কৌরবগণ লোভ, ক্রোধ ও অহংকারের প্রতীক, স্বজন মানুষের আসক্তির প্রতীক, কুরুক্ষেত্র জীবনের সংগ্রামের প্রতীক এবং শ্রীকৃষ্ণ অন্তর্নিহিত জ্ঞান ও ঈশ্বরীয় প্রজ্ঞার প্রতীক। পাপ এখানে কেবল ধর্মীয় অপরাধ নয় বরং আত্মবিরোধী কর্মের ফল, যা মানুষের অন্তঃকরণকে অশান্ত করে তোলে।

বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের তাৎপর্য অপরিসীম। যেমন, একজন বিচারক যদি নিজের আত্মীয়ের অপরাধের বিচার করতে বাধ্য হন, তবে তাঁর মধ্যেও একই ধরনের নৈতিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে— একদিকে রক্তের সম্পর্ক, অন্যদিকে ন্যায়বিচারের কর্তব্য। তেমনি একজন প্রশাসক, শিক্ষক বা সমাজনেতার ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও ন্যায়ের সংঘর্ষ প্রায়ই দেখা যায়। সাহিত্যেও বহু ট্র্যাজেডির নায়ক এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, যেখানে ন্যায়ের পথ হৃদয়ের পক্ষে অসহনীয় হয়ে ওঠে। আধ্যাত্মিক অর্থে মানুষের অন্তরে যখন সত্য ও আসক্তির মধ্যে সংগ্রাম শুরু হয়, তখনই তার জীবনে এক অদৃশ্য ‘কুরুক্ষেত্র’ সৃষ্টি হয়।

সবশেষে বলা যায়, ভগবদ্গীতার এই শ্লোক মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্যকে প্রকাশ করে। ভাষাগতভাবে এটি পাপ, আত্মীয়তা, কর্তব্য, সুখ ও বিবেকের গভীর সম্পর্ককে ধারণ করেছে দার্শনিকভাবে এটি মোহ ও ধর্মের সংঘর্ষের সূচনা মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি আত্মগ্লানি, করুণা ও নৈতিক দ্বিধার এক অসাধারণ প্রতিচ্ছবি আর প্রতীকীভাবে এটি মানুষের অন্তর্জগতের অনিবার্য সংগ্রামের রূপক। এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে প্রকৃত সুখ কখনো অন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না এবং সত্যিকার ধর্ম কেবল বাহ্যিক কর্মে নয়, বরং বিশুদ্ধ বিবেক, ন্যায়বোধ ও আত্মিক প্রজ্ঞার সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্জুনের এই প্রশ্ন তাই কেবল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয় এটি প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে ন্যায় ও মমতার সংঘর্ষে প্রতিনিয়ত উচ্চারিত এক চিরন্তন মানবিক প্রশ্ন।


ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ৩৭তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: লোভে আচ্ছন্ন চেতনা, কুলক্ষয় ও নৈতিক বিবেকের শিক্ষা

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: July 24, 2026 July 28, 2026

More insight about ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ৩৬তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: পাপ, স্বজনবধ ও অর্জুনের নৈতিক দ্বন্দ্ব

More insight about ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ৩৬তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: পাপ, স্বজনবধ ও অর্জুনের নৈতিক দ্বন্দ্ব