Related

Share

ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ৪৬তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: অর্জুনের বিষাদ, গাণ্ডীব ত্যাগ ও আত্মজাগরণের সূচনা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on July 27, 2026


এবমুক্ত্বার্জুনঃ সংখ্যে রথোপস্থ উপাবিশৎ। 
বিসৃজ্য সশরং চাপং শোকসংবিগ্নমানসঃ॥৪৬॥

অনুবাদ: সঞ্জয় কহিলেন—অর্জ্জুন এই বলিয়া সেই সংগ্রাম স্থলে ধনুর্ব্বাণ পরিত্যাগ পূর্ব্বক শোকাকুলিত চিত্তে রথোপরি উপবেশন করিলেন॥ ৪৬॥

মহাভারতের যুদ্ধক্ষেত্রের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তকে ধারণ করে। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা নয় বরং মানবমনের গভীর সংকট, নৈতিক দ্বন্দ্ব, কর্তব্যবোধের টানাপোড়েন এবং আত্মজাগরণের সূচনাকে এক অনুপম ভাষায় প্রকাশ করেছে। এই শ্লোকেই প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অমর উপদেশের সূচনা হওয়ার জন্য একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ভূমিকা প্রস্তুত হয়।

শ্লোকের সূচনায় “সঞ্জয় উবাচ”—অর্থাৎ “সঞ্জয় বললেন”—এই বাক্যাংশটি ব্যবহৃত হয়েছে। “সঞ্জয়” শব্দটি সংস্কৃত সম্ (सम्) উপসর্গ এবং √জি (जि) ধাতু থেকে উদ্ভূত। √জি ধাতুর অর্থ “জয় করা” এবং সম্ উপসর্গের অর্থ “সম্পূর্ণরূপে”। ফলে “সঞ্জয়” অর্থ দাঁড়ায়—“যিনি সম্পূর্ণভাবে বিজয়ী”, অথবা যিনি নিজের ইন্দ্রিয়, মন ও বিচারবুদ্ধির উপর বিজয় অর্জন করেছেন। মহাভারতে সঞ্জয় কেবল ধৃতরাষ্ট্রের দূত বা মন্ত্রী নন তিনি নিরপেক্ষ দর্শক, সত্যের বর্ণনাকারী এবং দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন এক জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব। তাঁর “উবাচ” শব্দটি সংস্কৃত √বচ্ (वच्) ধাতু থেকে গঠিত, যার অর্থ “বললেন”। এখানে এটি কেবল একটি সংলাপের সূচনা নয় বরং ঘটনাকে প্রত্যক্ষদর্শীর নিরপেক্ষ বর্ণনায় রূপান্তরিত করে।

পরবর্তী অংশে “এবমুক্ত্বা” শব্দটির অর্থ “এইভাবে বলে” বা “এমন কথা বলার পর”। এটি এবম্ (এইভাবে) এবং উক্ত্বা (বলে) শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। উক্ত্বা শব্দটি √বচ্ ধাতুর ক্রিয়াবাচক অব্যয়, যার দ্বারা বোঝানো হয়—কোনো একটি বক্তব্য শেষ করে পরবর্তী কর্মে প্রবেশ করা। এই একটি শব্দই পূর্ববর্তী সমস্ত শোক, দ্বিধা, অনুশোচনা ও আত্মসংকটকে বর্তমান দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। অর্থাৎ অর্জুন তাঁর সমস্ত যুক্তি, বেদনা ও সংশয় প্রকাশ করার পর যে মানসিক অবস্থায় পৌঁছালেন, সেটিই এই শ্লোকের বিষয়বস্তু।

“অর্জুনঃ” শব্দটি কেবল একজন বীর যোদ্ধার নাম নয় এর মধ্যেও গভীর তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। “অর্জুন” শব্দটি √অর্জ্ (अर्ज्) ধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ অর্জন করা, শুদ্ধ হওয়া কিংবা উজ্জ্বল হওয়া। “অর্জুন” অর্থ নির্মল, বিশুদ্ধ এবং আলোকোজ্জ্বল ব্যক্তি। তিনি আদর্শ ক্ষত্রিয়, মহাবীর এবং ন্যায়পরায়ণ মানবের প্রতীক। কিন্তু এই শ্লোকে সেই মহাবীরই গভীর মানসিক সংকটে ভেঙে পড়েছেন। এখানেই গীতার অসাধারণ মানবিকতা প্রকাশিত হয়েছে—মহান মানুষও কখনও কখনও দুঃখ, দ্বিধা ও হতাশার কাছে নতি স্বীকার করতে পারেন।

“সংখ্যে” শব্দটির অর্থ যুদ্ধক্ষেত্রে বা সমরাঙ্গণে। এখানে এটি কেবল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রকে নির্দেশ করে না বরং মানুষের জীবনের প্রতিটি সংগ্রাম, প্রতিটি নৈতিক পরীক্ষার প্রতীক। প্রত্যেক মানুষ কোনো না কোনো সময় এমন এক “যুদ্ধক্ষেত্রে” উপস্থিত হয়, যেখানে বাহ্যিক শত্রুর চেয়ে অন্তরের সংশয়, ভয় ও দ্বন্দ্বই বড় প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে।

“রথোপস্থ উপাবিশৎ”—অর্থাৎ “রথের আসনে বসে পড়লেন”—এই অংশটিও গভীর প্রতীকী অর্থ বহন করে। “রথোপস্থ” শব্দটি “রথ” এবং “উপস্থ” শব্দের সমন্বয়ে গঠিত, যার অর্থ রথের আসন বা মধ্যভাগ। “উপাবিশৎ” শব্দটি উপ উপসর্গ এবং √বিশ্ (विश्) ধাতু থেকে গঠিত, যার অর্থ “বসে পড়লেন”। বাহ্যিকভাবে এটি একটি সাধারণ ক্রিয়া হলেও দার্শনিক দৃষ্টিতে এটি মানসিক ভেঙে পড়ার চিত্র। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এক বীর যখন দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি হারিয়ে বসে পড়েন, তখন তা তাঁর অন্তরের গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে।

এরপর আসে “বিসৃজ্য সশরং চাপং”—অর্থাৎ “তীরসহ ধনুক ত্যাগ করে”। “বিসৃজ্য” শব্দটি वि + √সৃজ্ (सृज्) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ত্যাগ করা, ছেড়ে দেওয়া বা মুক্ত করা। “সশরং” অর্থ তীরসহ এবং “চাপং” অর্থ ধনুক। ধনুক ও তীর একজন ক্ষত্রিয়ের শক্তি, কর্তব্য ও সংগ্রামের প্রতীক। তাই ধনুক ত্যাগ করা কেবল একটি অস্ত্র ফেলে দেওয়া নয় বরং সাময়িকভাবে কর্তব্যপালনের শক্তি হারিয়ে ফেলা, আত্মবিশ্বাসের ভাঙন এবং মানসিক পরাজয়ের প্রতীক।

শ্লোকের শেষ শব্দ “শোকসংবিগ্নমানসঃ” একটি অত্যন্ত সুন্দর সমাসবদ্ধ শব্দ। এটি “শোক”, “সংবিগ্ন” এবং “মানস” এই তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। এর অর্থ—“যাঁর মন শোকে অত্যন্ত বিচলিত।” এটি কেবল দুঃখ প্রকাশ করে না বরং এমন এক মানসিক অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে বিচারবোধ, সাহস এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সাময়িকভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে গভীর মানসিক চাপ, নৈতিক সংকট বা অস্তিত্বগত বিভ্রান্তির (existential crisis) অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়।

এই শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ হলো—“সঞ্জয় বললেন, এইভাবে কথা বলে অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রে রথের আসনে বসে পড়লেন তিনি তীরসহ ধনুক ত্যাগ করেছিলেন এবং তাঁর মন গভীর শোকে বিচলিত ছিল।” কিন্তু এর প্রকৃত তাৎপর্য আক্ষরিক অর্থের বহু ঊর্ধ্বে। এখানে যুদ্ধক্ষেত্র মানুষের জীবনের সংগ্রামের প্রতীক, রথ মানুষের দেহের প্রতীক, ধনুক ও তীর কর্তব্য ও কর্মশক্তির প্রতীক এবং শোক মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রতীক। ফলে সমগ্র দৃশ্যটি মানুষের আত্মিক সংগ্রামের এক কালজয়ী চিত্র হয়ে ওঠে।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গীতার শিক্ষা শুরু হওয়ার আগে অর্জুনের এই ভেঙে পড়া অপরিহার্য ছিল। কারণ যে ব্যক্তি নিজের অজ্ঞতা, দুর্বলতা ও বিভ্রান্তি উপলব্ধি করতে পারে না, সে কখনো প্রকৃত জ্ঞান লাভ করতে পারে না। তাই অর্জুনের এই মানসিক পতন আসলে তাঁর আধ্যাত্মিক উত্থানের প্রথম ধাপ। যোগদর্শনের ভাষায় বলা যায়, চিত্ত যখন শোক, মোহ ও দ্বন্দ্বে আচ্ছন্ন হয়, তখনই প্রকৃত জ্ঞানলাভের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। আর বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শোকই মানুষকে আত্মসন্ধানের পথে পরিচালিত করে।

প্রতীকী অর্থেও শ্লোকটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। রথ মানুষের শরীর, সারথি শ্রীকৃষ্ণ মানুষের অন্তর্নিহিত ঈশ্বরচেতনা বা প্রজ্ঞা, ধনুক কর্তব্যবোধ, তীর কর্মশক্তি এবং অর্জুন মানবাত্মার প্রতীক। শোক মানুষের অজ্ঞতা ও মোহকে নির্দেশ করে। যখন মানুষ জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে নিজের শক্তি হারিয়ে ফেলে, তখন তার অন্তরের কৃষ্ণ—অর্থাৎ প্রজ্ঞা ও সত্য—তাকে পুনরায় জাগিয়ে তোলার জন্য আহ্বান জানান। এই কারণেই প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি আসলে দ্বিতীয় অধ্যায়ের জ্ঞানোদয়ের সূচনা।

বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের গভীর প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। একজন চিকিৎসক কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে, একজন বিচারক ন্যায়বিচারের জটিল মুহূর্তে, একজন সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্রে কিংবা একজন সাধারণ মানুষ পারিবারিক, সামাজিক বা নৈতিক সংকটে ঠিক অর্জুনের মতোই কখনও মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন। সেই ভেঙে পড়া দুর্বলতার চিহ্ন নয় বরং সঠিক পথের সন্ধান শুরু হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত। যেমন অন্ধকার রাতের শেষে সূর্যোদয় ঘটে, তেমনি গভীর আত্মসংকটের পরেই প্রকৃত জ্ঞানের আলো উদিত হয়।

সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকটি ভগবদ্গীতার এক অনন্য সন্ধিক্ষণ। ভাষাগতভাবে এটি সংস্কৃত সমাস, ধাতু ও ক্রিয়ার সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ সাহিত্যিকভাবে এটি মানবমনের গভীরতম বেদনার জীবন্ত চিত্র দার্শনিকভাবে এটি অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের পথে যাত্রার সূচনা আর আধ্যাত্মিকভাবে এটি শিক্ষা দেয় যে, মানুষের জীবনে শোক, দ্বিধা ও ভাঙন কখনও শেষ কথা নয়। অনেক সময় সেই ভাঙনই আত্মজাগরণ, প্রজ্ঞা ও মুক্তির প্রথম দ্বার হয়ে ওঠে। তাই অর্জুনের রথে বসে পড়া পরাজয়ের প্রতীক নয় বরং চিরন্তন সত্যের দিকে মানবচেতনার প্রথম বিনম্র পদক্ষেপ।

 

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: July 24, 2026 July 27, 2026

More insight about ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ৪৬তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: অর্জুনের বিষাদ, গাণ্ডীব ত্যাগ ও আত্মজাগরণের সূচনা

More insight about ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়, ৪৬তম শ্লোকের ব্যাখ্যা: অর্জুনের বিষাদ, গাণ্ডীব ত্যাগ ও আত্মজাগরণের সূচনা