Related

Share

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ৯ম শ্লোকের বিস্তারিত | ‘অন্যে’ শব্দের ব্যুৎপত্তি, দর্শন ও প্রতীকী অর্থ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on July 28, 2026


“অন্যে চ বহবঃ শূরা মদর্থে ত্যক্তজীবিতাঃ। নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ সর্ব্বে যুদ্ধবিশারদাঃ॥৯॥”

অনুবাদ : রণসিবজয়ী আপসি , ভীষ্ম, কণ, কৃপাচার্য্য, অশ্বত্থামা, সিবকণ, গসৌমদসিত্ত (ভূ সির বা) ও জয়দ্রথ এবং ইহা ছাড়াও অনেক আছেন ,র্যাঁহারা র্যুদ্ধসিবশারদ, নানাশস্ত্রপ্রহরণধারী, বীরপুরুর্ষ, এবং আমার জন্য প্রাণত্যাজেগ কৃতসংকল

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের নবম শ্লোকটি বাহ্যত কৌরবপক্ষের সেনাবাহিনীর শক্তি, বীরত্ব ও যুদ্ধদক্ষতার বর্ণনা হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ বহুমাত্রিক। এই শ্লোকে দুর্যোধন দ্রোণাচার্যের সামনে নিজের সেনাবাহিনীর আত্মবিশ্বাস ও সামরিক সক্ষমতার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন যে, তাঁর পক্ষে আরও অসংখ্য বীর যোদ্ধা উপস্থিত আছেন, যারা তাঁর স্বার্থে জীবন বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত। তারা নানাবিধ অস্ত্রে সজ্জিত এবং প্রত্যেকেই যুদ্ধকলায় অত্যন্ত পারদর্শী। এই বক্তব্যের মধ্যে যেমন বাহ্যিক শক্তির প্রকাশ রয়েছে, তেমনি মানুষের মানসিকতা, নেতৃত্ব, আনুগত্য এবং নৈতিকতার গভীর প্রশ্নও নিহিত রয়েছে।

শ্লোকের প্রথম শব্দ “অন্যে” (अन्ये) সংস্কৃত “অন্য” শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘অন্য’, ‘ভিন্ন’ বা ‘অন্যান্য’। এখানে এটি বহুবচন রূপে ব্যবহৃত হয়েছে এবং বোঝাচ্ছে পূর্বে উল্লিখিত বীরদের বাইরে আরও অনেক যোদ্ধা উপস্থিত আছেন। “চ” একটি অব্যয়, যার অর্থ ‘এবং’ বা ‘আর’; এটি বাক্যের বিভিন্ন পদকে সংযুক্ত করেছে। “বহবঃ” শব্দটি “বহু” থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘অনেক’ বা ‘অসংখ্য’। “শূরাঃ” শব্দের অর্থ ‘বীর’, ‘সাহসী’ বা ‘পরাক্রমশালী যোদ্ধা’। এই শব্দটি কেবল শারীরিক শক্তিকেই নির্দেশ করে না; বরং বিপদের মুখোমুখি হওয়ার মানসিক দৃঢ়তাকেও প্রকাশ করে।

“মদর্থে” শব্দটি দুটি অংশে বিভক্ত “মদ্” অর্থাৎ ‘আমার’ এবং “অর্থে” অর্থাৎ ‘উদ্দেশ্যে’, ‘জন্য’ বা ‘স্বার্থে’। অর্থাৎ, যোদ্ধারা দুর্যোধনের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য পূরণের জন্য যুদ্ধ করতে এবং প্রয়োজনে প্রাণ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত। “ত্যক্তজীবিতাঃ” শব্দটি গঠিত হয়েছে “ত্যক্ত” (ত্যাগ করা) এবং “জীবিত” (জীবন) শব্দের সমন্বয়ে। এর আক্ষরিক অর্থ ‘যারা জীবন ত্যাগ করেছে’ বা ‘জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত’। এখানে এটি আত্মত্যাগের মানসিকতা প্রকাশ করলেও, সেই আত্মত্যাগ ন্যায়ের জন্য নাকি ব্যক্তিগত আনুগত্যের জন্য এই প্রশ্নটিও শ্লোকটি পাঠকের সামনে উত্থাপন করে।

পরবর্তী অংশে “নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ” শব্দটি একটি সমাসবদ্ধ পদ। “নানা” অর্থ বিভিন্ন, “শস্ত্র” অর্থ অস্ত্র এবং “প্রহরণ” অর্থ আক্রমণের উপকরণ। অর্থাৎ, যোদ্ধারা বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহারে দক্ষ এবং সেসব অস্ত্রে সজ্জিত। “সর্ব্বে” অর্থ ‘সকলেই’, আর “যুদ্ধবিশারদাঃ” শব্দটি “যুদ্ধ” ও “বিশারদ” শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এর অর্থ যুদ্ধে অভিজ্ঞ, কৌশলী এবং পারদর্শী। এই শব্দের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে কৌরবসেনার প্রতিটি যোদ্ধাই যুদ্ধবিদ্যার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সুদক্ষ এবং প্রশিক্ষিত।

এই শ্লোকের সরল বাংলা অর্থ হলো “এছাড়াও আরও বহু বীর যোদ্ধা আছেন, যারা আমার উদ্দেশ্যে প্রাণ দিতেও প্রস্তুত। তারা নানাবিধ অস্ত্রে সজ্জিত এবং সকলেই যুদ্ধবিদ্যায় অত্যন্ত পারদর্শী।” কিন্তু এর প্রাসঙ্গিক অর্থ আরও গভীর। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এটি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পূর্বমুহূর্তে দুর্যোধনের আত্মবিশ্বাস এবং সেনাশক্তির প্রদর্শন। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এমন এক নেতার মানসিকতার প্রতিফলন, যিনি নিজের অনুসারীদের সংখ্যা, দক্ষতা ও আনুগত্যের ওপর নির্ভর করে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী মনে করেন। সামাজিক জীবনে এই শ্লোক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে একটি সংগঠন বা রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার সদস্যরা ঐক্যবদ্ধ, দক্ষ এবং লক্ষ্য অর্জনে নিবেদিতপ্রাণ থাকে।

তবে এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য কেবল বাহ্যিক শক্তির প্রশংসায় সীমাবদ্ধ নয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা নিহিত রয়েছে। মানুষ সাহসী হতে পারে, অত্যন্ত দক্ষ হতে পারে এবং নিজের নেতার জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত হতে পারে; কিন্তু সেই আনুগত্য যদি সত্য, ন্যায় এবং ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে সেই বীরত্ব শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দুর্যোধনের যোদ্ধারা নিঃসন্দেহে বীর ছিলেন, কিন্তু তাঁদের অধিকাংশই অধর্মের পক্ষে যুদ্ধ করছিলেন। ফলে শ্লোকটি শেখায় যে শক্তি, সাহস ও দক্ষতা নিজের মধ্যে মহৎ নয়; এগুলোর প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে সেগুলো কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্যকে প্রকাশ করে। গীতার দর্শনে কর্মের মূল্য কেবল কর্মে নয়, বরং তার নৈতিক ভিত্তিতে। আত্মত্যাগ তখনই মহৎ, যখন তা সত্য, ন্যায় ও মানবকল্যাণের জন্য নিবেদিত হয়। অন্যদিকে অন্ধ আনুগত্য, ব্যক্তিপূজা বা অহংকারের জন্য আত্মবিসর্জন কখনো প্রকৃত ধর্ম হতে পারে না। নৈতিক দর্শনও একই শিক্ষা দেয় বিবেকহীন আনুগত্য মানুষকে অন্যায়ের সহযোগীতে পরিণত করে। অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, মানুষ নিজের নির্বাচিত আদর্শের জন্য জীবন উৎসর্গ করে নিজের অস্তিত্বের অর্থ নির্মাণ করে; কিন্তু সেই আদর্শ যদি নৈতিকভাবে ভ্রান্ত হয়, তবে সেই আত্মত্যাগও অর্থহীন হয়ে পড়ে।

প্রতীকী অর্থে এই শ্লোক মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর রূপক। “বহু শূর” মানুষের অন্তরে থাকা শক্তিশালী কামনা, বাসনা, অহংকার ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক। “মদর্থে ত্যক্তজীবিতাঃ” নির্দেশ করে সেই মানসিক প্রবণতাকে, যা অহংকারের জন্য সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। “নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ” মানুষের বিভিন্ন যুক্তি, কৌশল, ক্ষমতা ও মানসিক অস্ত্রের প্রতীক, আর “যুদ্ধবিশারদাঃ” বোঝায় মানুষের সেই অভ্যাসগত দক্ষতাকে, যা সৎ কিংবা অসৎ উভয় উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হতে পারে। মনোবিজ্ঞানের আলোকে এই শ্লোক আমাদের অন্তরের সেই সংঘাতের প্রতিচ্ছবি, যেখানে বিবেক ও প্রবৃত্তির মধ্যে অবিরাম যুদ্ধ চলতে থাকে।

বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যদি নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করেন, তবে সেটি প্রশংসনীয়; কিন্তু প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য যদি অনৈতিক হয়, তবে সেই নিষ্ঠাও কল্যাণকর নয়। একইভাবে ইতিহাসে বহু যোদ্ধা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের আত্মত্যাগ তখনই মহিমান্বিত হয়েছে, যখন তা স্বাধীনতা, ন্যায় ও মানবমর্যাদা রক্ষার জন্য নিবেদিত ছিল। অন্যায়ের পক্ষে প্রদর্শিত সাহস ইতিহাসে কখনো স্থায়ী সম্মান লাভ করেনি।

সার্বিকভাবে এই শ্লোক আমাদের শিক্ষা দেয় যে মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব কেবল তার বীরত্ব, আনুগত্য, দক্ষতা বা আত্মত্যাগে নয়; বরং সেই শক্তিকে কোন আদর্শের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, তার মধ্যেই তার প্রকৃত মূল্য নিহিত। সাহস যদি সত্যের পক্ষে, দক্ষতা যদি ন্যায়ের সেবায় এবং আত্মত্যাগ যদি মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়, তবেই তা মহিমান্বিত হয়ে ওঠে। অন্যথায় একই শক্তি, একই বীরত্ব এবং একই আত্মনিবেদন ধ্বংস, বিভ্রান্তি ও পতনের কারণ হতে পারে। এই কারণেই গীতার এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকটি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের বিবরণ নয়; এটি মানবচরিত্র, নৈতিকতা, নেতৃত্ব এবং জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এক গভীর ও চিরন্তন দার্শনিক শিক্ষা।

 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১০ম শ্লোকের বিস্তারিত | ‘অপর্যাপ্তং’ ও ‘পর্যাপ্তং’ শব্দের প্রকৃত অর্থ, দর্শন ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষন

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: July 23, 2026 July 28, 2026

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ৯ম শ্লোকের বিস্তারিত | ‘অন্যে’ শব্দের ব্যুৎপত্তি, দর্শন ও প্রতীকী অর্থ

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ৯ম শ্লোকের বিস্তারিত | ‘অন্যে’ শব্দের ব্যুৎপত্তি, দর্শন ও প্রতীকী অর্থ