Related

Share

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৭তম শ্লোকের বিস্তারিত | কাশ্যঃ ও পাণ্ডব বীরদের প্রতীকী অর্থ, দর্শন ও ব্যুৎপত্তি

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on July 28, 2026


কাশ্যশ্চ পরমেষ্বাসঃ শিখণ্ডী চ মহারথঃ। 
ধৃষ্টদ্যুম্নো বিরাটশ্চ সাত্যকিশ্চাপরাজিতঃ॥ (ভগবদ্গীতা ১.১৭)

 অনুবাদ: [গহ] পৃসিথবীপজেত! (গহ পৃসিথবী াথ ধৃতরাষ্ট্র!) পরজেমষ্বাসঃ (মহাধ ুদ্ধারী) কাশ্যশ্চ (কাশীরাজ) মহারথঃ সিশখণ্ডী চ (মহারথ সিশখণ্ডী) ধৃ দু্যম্নঃ সিবরাটশ্চ (ধৃ দু্যম্ন ও সিবরাট রাজা) অপরাসিজতঃ (রণসিবজয়ী) সাত্যসিকশ্চ (সাত্যসিক) দ্রুপদঃ (দ্রুপদ রাজা) গদ্রৌপজেদয়াশ্চ (গদ্রৌপদীর তয়গণ) মহাবাহুঃ গসৌভদ্রশ্চ (এবং মহাবাহু অসিভম ু ্য) সর্ব্বশঃ (সকজেলই) পৃথক্ পৃথক্ শঙ্খান্ (পৃথক্ পৃথক্ শঙ্খ সকল) দ ু ঃ (বাজাইজেল )॥১৭॥

ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের সপ্তদশ শ্লোকে দুর্যোধন পাণ্ডবপক্ষের আরও কয়েকজন বিশিষ্ট যোদ্ধার পরিচয় তুলে ধরেছেন। এই শ্লোকটি আপাতদৃষ্টিতে কেবল কয়েকজন বীরের নামের তালিকা হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ অনেক গভীর। এখানে প্রতিটি নাম একটি বিশেষ গুণ, আদর্শ এবং মানবিক শক্তির প্রতীক। শব্দগুলোর ব্যুৎপত্তি, আক্ষরিক অর্থ, দার্শনিক তাৎপর্য এবং প্রতীকী ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, এই শ্লোক কেবল যুদ্ধের বর্ণনা নয়, বরং মানুষের চরিত্রগঠন ও আত্মবিকাশের এক অনন্য দিকনির্দেশনা।

শ্লোকের প্রথম শব্দ ‘কাশ্যঃ’ (काश्यः)। এটি ‘কাশী’ শব্দ থেকে উৎপন্ন, যার মূল ধাতু ‘কাশ্ (काश्)’, অর্থাৎ ‘জ্বলা’, ‘প্রকাশিত হওয়া’ বা ‘আলোকিত হওয়া’। ‘কাশী’ অর্থ সেই স্থান যেখানে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আলোর বিকাশ ঘটে। ‘কাশ্য’ অর্থ কাশীরাজ বা কাশীর অধিপতি। ভাষাগতভাবে এটি কাশী শব্দের সঙ্গে সম্পর্কসূচক প্রত্যয় যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে। প্রচলিত অর্থে তিনি কাশীরাজ, কিন্তু গভীর অর্থে তিনি আলোকিত নেতৃত্ব, জ্ঞানসম্পন্ন শাসন এবং নৈতিক শক্তির প্রতীক। কাশী যেমন ভারতীয় সভ্যতায় জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, তেমনি ‘কাশ্য’ শব্দটিও এমন এক ব্যক্তিত্বকে নির্দেশ করে যিনি জ্ঞান ও নৈতিকতার আলো দ্বারা অন্যদের পথ দেখান। মানবজীবনে এই শব্দ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত নেতৃত্ব শক্তির মাধ্যমে নয়, প্রজ্ঞা ও ন্যায়বোধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।

পরবর্তী শব্দ ‘পরমেষ্বাসঃ’ (परमेष्वासः) একটি সমাসবদ্ধ শব্দ। এটি ‘পরম’ অর্থাৎ ‘সর্বোচ্চ’ এবং ‘ইষ্বাস’ অর্থাৎ ‘ধনুর্ধর’ বা ‘তীরন্দাজ’ এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। আক্ষরিক অর্থে এর অর্থ ‘শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর’ বা ‘অতুলনীয় তীরন্দাজ’। যুদ্ধক্ষেত্রে এটি অসাধারণ দক্ষতা ও লক্ষ্যভেদের প্রতীক। কিন্তু এর দার্শনিক ব্যাখ্যা আরও গভীর। ধনুক মানুষের সাধনা, তীর মানুষের সংকল্প এবং লক্ষ্য মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যকে নির্দেশ করে। যে ব্যক্তি নিজের মনকে একাগ্র করে সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে এবং বিচ্যুত না হয়ে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়ে যায়, তিনিই প্রকৃত অর্থে ‘পরমেষ্বাস’। অতএব, এই শব্দটি কেবল যুদ্ধকৌশলের উৎকর্ষ নয়, বরং একাগ্রতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতীক।

এরপর আসে ‘শিখণ্ডী’ (शिखण्डी)। ‘শিখণ্ড’ শব্দের অর্থ মস্তকের অলংকার, পালক বা শিরোভূষণ; এর সঙ্গে ‘ঈ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘শিখণ্ডী’ শব্দের সৃষ্টি হয়েছে। মহাভারতের ইতিহাসে শিখণ্ডী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। পূর্বজন্মে তিনি ছিলেন অম্বা, যিনি ভীষ্মের প্রতি অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার সংকল্পে পুনর্জন্ম গ্রহণ করেন। তাই শিখণ্ডী কেবল একজন যোদ্ধা নন; তিনি ন্যায়বিচারের জন্য অবিচল সংগ্রামের প্রতীক। তাঁর জীবন সমাজের প্রচলিত পরিচয় ও সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার শিক্ষা দেয়। দার্শনিকভাবে শিখণ্ডী প্রমাণ করেন যে আত্মার কোনো লিঙ্গ, জাতি বা সামাজিক পরিচয় নেই; সত্য ও ন্যায়ের জন্য সংগ্রামই মানুষের প্রকৃত পরিচয়। সাহিত্য ও মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও শিখণ্ডী সামাজিক রূপান্তর, আত্মপরিচয়ের পুনর্নির্মাণ এবং অবদমিত সত্যের বিজয়ের প্রতীক।

‘মহারথঃ’ (महारथः) শব্দটি ‘মহা’ এবং ‘রথ’ এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। আক্ষরিক অর্থে এর অর্থ ‘মহান রথে আরোহণকারী’। প্রাচীন ভারতীয় যুদ্ধবিদ্যায় মহারথ সেই যোদ্ধাকে বলা হতো যিনি একাই বহু সহস্র যোদ্ধার মোকাবিলা করতে সক্ষম। কিন্তু উপনিষদীয় দর্শনে ‘রথ’ মানবদেহের প্রতীক। কঠোপনিষদে দেহকে রথ, আত্মাকে রথের অধিপতি, বুদ্ধিকে সারথি এবং মনকে লাগাম হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেই অর্থে ‘মহারথ’ সেই ব্যক্তি যিনি নিজের ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম। বাহ্যিক শক্তির চেয়ে আত্মসংযমই প্রকৃত মহত্ত্ব এই গভীর শিক্ষাই শব্দটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য।

‘ধৃষ্টদ্যুম্নঃ’ (धृष्टद्युम्नः) শব্দটি ‘ধৃষ্ট’ অর্থাৎ ‘সাহসী’, ‘নির্ভীক’ এবং ‘দ্যুম্ন’ অর্থাৎ ‘জ্যোতি’, ‘মহিমা’ বা ‘গৌরব’ এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। এর আক্ষরিক অর্থ ‘সাহসের দীপ্তিতে উজ্জ্বল ব্যক্তি’। মহাভারতের কাহিনিতে ধৃষ্টদ্যুম্নের জন্মই হয়েছিল দ্রোণাচার্যকে বধ করার উদ্দেশ্যে। তাই তিনি এক সুস্পষ্ট নিয়তি ও দায়িত্বের প্রতীক। তাঁর চরিত্র শেখায় যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য কেবল শক্তি নয়, সাহস এবং নৈতিক দৃঢ়তাও অপরিহার্য। প্রতীকী অর্থে তিনি প্রতিবাদ, ন্যায়সংগ্রাম এবং আত্মবিশ্বাসের উজ্জ্বল প্রতিমূর্তি।

‘বিরাটঃ’ (विराटः) শব্দের অর্থ বিশাল, মহান বা ব্যাপক। এটি এমন এক ব্যক্তিত্বকে নির্দেশ করে যার মন, হৃদয় এবং দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। মহাভারতে বিরাট ছিলেন মৎস্যরাজ, যিনি পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তাই তিনি উদারতা, সহমর্মিতা এবং রক্ষাকর্তার প্রতীক। দর্শনের ভাষায় ‘বিরাট’ শব্দটি ‘বিরাট পুরুষ’-এর ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে এক মহাসত্তার প্রকাশ হিসেবে কল্পনা করা হয়। মানুষের জীবনে ‘বিরাট’ হওয়া মানে কেবল ক্ষমতাবান হওয়া নয়, বরং বৃহৎ হৃদয় ও উদার মানসিকতার অধিকারী হওয়া।

এরপর আসে ‘সাত্যকিঃ’ (सात्यकिः)। সাত্যকি ছিলেন যাদববংশীয় এক বীর যোদ্ধা এবং অর্জুনের শিষ্য। তাঁর আরেক নাম ‘যুযুধান’। শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত সম্পর্ক ‘সত্য’ শব্দের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়। তাই সাত্যকি সত্যনিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা এবং ধর্মের প্রতি অবিচল আনুগত্যের প্রতীক। তিনি ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের অনুগত এবং ধর্মপক্ষের অকুতোভয় যোদ্ধা। তাঁর চরিত্র শেখায় যে প্রকৃত শক্তি কেবল যুদ্ধজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং সত্যের পাশে অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যেই প্রকৃত বীরত্ব নিহিত।

সবশেষে ‘অপরাজিতঃ’ (अपराजितः) শব্দটি ‘অ’ (না) + ‘পরাজিত’ (পরাভূত) থেকে গঠিত। আক্ষরিক অর্থে এর অর্থ ‘যিনি কখনও পরাজিত হননি’ বা ‘অপরাজেয়’। এই বিশেষণটি সাত্যকির বীরত্বকে নির্দেশ করলেও এর দার্শনিক তাৎপর্য বহুমাত্রিক। বাহ্যিক জয়-পরাজয় সাময়িক প্রকৃত অপরাজেয় সেই ব্যক্তি, যিনি লোভ, ভয়, ক্রোধ, মোহ ও অন্যায়ের কাছে পরাজিত হন না। আত্মসংযম, নৈতিক দৃঢ়তা এবং সত্যনিষ্ঠাই মানুষকে প্রকৃত অর্থে অপরাজিত করে তোলে। আধ্যাত্মিক অর্থে অপরাজিত হওয়া মানে নিজের অন্তরের অন্ধকারকে জয় করা।

এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দ এক একটি চরিত্রের পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি এক একটি মানবিক গুণের প্রতিনিধিত্ব করে। কাশ্য আমাদের জ্ঞানের আলো ও নৈতিক নেতৃত্বের শিক্ষা দেন; পরমেষ্বাস একাগ্রতা ও লক্ষ্যভেদের প্রতীক শিখণ্ডী অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের স্বাধীনতার প্রতীক; মহারথ আত্মসংযম ও অন্তর্নিয়ন্ত্রণের প্রতীক ধৃষ্টদ্যুম্ন সাহস ও ন্যায়ের জন্য আত্মত্যাগের প্রতীক। বিরাট উদারতা ও আশ্রয়দানের প্রতীক; সাত্যকি সত্যনিষ্ঠ আনুগত্যের প্রতীক এবং অপরাজিত আত্মিক শক্তি ও নৈতিক বিজয়ের প্রতীক।

বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একজন শিক্ষক যদি জ্ঞানের আলো ছড়ান তবে তিনি কাশ্যের আদর্শ ধারণ করেন। একজন গবেষক বা বিজ্ঞানী যদি একাগ্রচিত্তে সত্যের অনুসন্ধান করেন তবে তিনি পরমেষ্বাসের গুণ প্রকাশ করেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী মানুষ শিখণ্ডীর চেতনা বহন করেন। আত্মসংযমী ও বিচক্ষণ ব্যক্তি মহারথের আদর্শ অনুসরণ করেন; সাহসী সমাজসংস্কারক ধৃষ্টদ্যুম্নের প্রতিচ্ছবি। উদার হৃদয়ের মানুষ বিরাটের আদর্শে অনুপ্রাণিত বিশ্বস্ত বন্ধু বা ন্যায়ের পক্ষে অবিচল সহযোদ্ধা সাত্যকির প্রতীক আর যিনি প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নৈতিকতা বিসর্জন দেন না, তিনিই প্রকৃত অপরাজিত।

সার্বিকভাবে এই শ্লোকটি কেবল পাণ্ডবপক্ষের যোদ্ধাদের নামোল্লেখ নয়। এটি মানবচরিত্রের উৎকৃষ্ট গুণাবলির এক অনন্য রূপকচিত্র। এখানে জ্ঞান, একাগ্রতা, ন্যায়বোধ, আত্মসংযম, সাহস, উদারতা, সত্যনিষ্ঠা এবং অদম্য আত্মশক্তি এই আটটি মৌলিক গুণ একত্রে প্রকাশিত হয়েছে। তাই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কেবল বাহ্যিক সংঘর্ষের ইতিহাস নয় এটি মানুষের অন্তর্জগতের যুদ্ধেরও প্রতীক। যে ব্যক্তি নিজের জীবনে এই গুণগুলোর বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হন, তিনিই প্রকৃত অর্থে ধর্মের পথে অগ্রসর হন এবং জীবনের সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্যিকার বিজয় অর্জন করেন।

 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৮তম শ্লোকের বিস্তারিত | ‘দ্রুপদ’, ‘দ্রৌপদেয়’ ও ‘পৃথিবীপতে’ শব্দের ব্যুৎপত্তি, দর্শন ও প্রতীকী

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: July 23, 2026 July 28, 2026

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৭তম শ্লোকের বিস্তারিত | কাশ্যঃ ও পাণ্ডব বীরদের প্রতীকী অর্থ, দর্শন ও ব্যুৎপত্তি

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ১৭তম শ্লোকের বিস্তারিত | কাশ্যঃ ও পাণ্ডব বীরদের প্রতীকী অর্থ, দর্শন ও ব্যুৎপত্তি