Related

Share

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ২২তম শ্লোকের বিস্তারিত | অর্জুনের আত্মজিজ্ঞাসা, কর্তব্যবোধ ও নৈতিক সংকটের গভীর বিশ্লেষণ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on July 28, 2026


র্যাবজেদতাসিন্নরীজেক্ষঽহং গর্যাদ্ধুকামা বসিস্থতান্। 
বৈকর্ম্ময়া সহ গর্যাদ্ধব্যমসিস্মন্ রণসমুদ্যজেম॥২২॥

অনুবাদ: র্যাবৎ (গর্য পর্য্যন্ত) অহং (আসিম) গর্যাদ্ধু কামান্ অবসিস্থতান্ এতান্ (র্যুদ্ধাসিভলার্ষী এই সকল বীরগণজেক) সি রীজেক্ষ (সি রীক্ষণ কসির) অসিস্মন্রণসমুদ্যজেম (এই র্যুজেদ্ধ) বৈক সহ (কাহাসিদজেগর সসিহত) ময়া গর্যাদ্ধব্যং (আমাজেক র্যুদ্ধ কসিরজেত হইজেব) অত্র র্যুজেদ্ধ (এই সংগ্রাজেম) দুর্ব্বুজেদ্ধঃ (দুর্ম্মসিত) ধাত্তরাষ্ট্রস্য (দুজের্য্যাধজে র) সিপ্রয়সিচকীর্ষবঃ (সিহদ্বৈতর্ষী) এজেত গর্য সমাগতাঃ (গর্য সকল ব্যসি আসিসয়াজে ) [তান্] (গসই সকল) গর্যাৎস্যমা ান্ (গর্যাদ্ধৃগণজেক) অহং (আসিম) অজেবজেক্ষ (অবজেলাক কসির)॥

এই শ্লোকটি প্রথম অধ্যায়ের এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তকে ধারণ করে। এখানে অর্জুন যুদ্ধ শুরু করার আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে অনুরোধ করছেন, যেন তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত যোদ্ধাদের ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান। প্রথম দর্শনে এটি যুদ্ধের কৌশলগত প্রস্তুতির অংশ বলে মনে হলেও, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এই শ্লোকটি মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা, কর্তব্যবোধ, বিবেক, আত্মপরিচয় এবং নৈতিক সংকটের এক অনন্য দলিল। ভাষাগত সৌন্দর্য, দার্শনিক গভীরতা এবং প্রতীকী তাৎপর্যের দিক থেকে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক।

শ্লোকটির প্রতিটি শব্দের নিজস্ব ব্যাকরণগত ও দার্শনিক গুরুত্ব রয়েছে। ‘যাবৎ’ (यावत्) শব্দটির অর্থ ‘যতক্ষণ’, ‘যে পর্যন্ত’ বা ‘যতদূর’। এটি একটি অব্যয়, যা কোনো কাজ সম্পন্ন হওয়ার সীমা বা সময় নির্দেশ করে। ‘এতান্’ (एतान्) শব্দটি ‘এদেরকে’ বা ‘এই সকলকে’ অর্থে ব্যবহৃত একটি সর্বনাম। ‘নিরীক্ষে’ (निरीक्षे) শব্দটি সংস্কৃত ধাতু √ईक्ष् (ঈক্ষ্) থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ ‘দেখা’ বা ‘পর্যবেক্ষণ করা’। এর সঙ্গে ‘নি’ উপসর্গ যুক্ত হওয়ায় এর অর্থ দাঁড়ায়—গভীরভাবে, মনোযোগ সহকারে বা বিচারবুদ্ধি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা। এটি কেবল বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখা নয় বরং বাস্তবতার গভীরে প্রবেশ করে উপলব্ধি করার ইঙ্গিত বহন করে। ‘অহং’ (अहम्) অর্থ ‘আমি’, যা অর্জুনের ব্যক্তিগত উপলব্ধি ও আত্মসচেতনতার সূচক।

‘যোদ্ধুকামান্’ (योद्धुकामान्) শব্দটি দুটি অংশে গঠিত—‘যোদ্ধু’ (যুদ্ধ করা) এবং ‘কাম’ (ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা)। অর্থাৎ যারা যুদ্ধ করতে আগ্রহী, যুদ্ধেচ্ছু বা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত। এটি কেবল অস্ত্রধারী যোদ্ধাদের বোঝায় না বরং জীবনের প্রতিটি সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক শক্তিরও প্রতীক। ‘অবস্থিতান্’ (अवस्थितान्) শব্দটি √स्था (স্থা) ধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ ‘স্থিত হওয়া’, ‘দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা’ বা ‘প্রস্তুত অবস্থায় থাকা’। এখানে যুদ্ধক্ষেত্রে সুশৃঙ্খলভাবে অবস্থানরত যোদ্ধাদের বোঝানো হয়েছে। ‘কৈঃ’ (कैः) অর্থ ‘কার সঙ্গে’ বা ‘কাদের সঙ্গে’, আর ‘ময়া’ (मया) অর্থ ‘আমার দ্বারা’ বা ‘আমার সঙ্গে’। ‘সহ’ (सह) শব্দের অর্থ ‘সহিত’ বা ‘সঙ্গে’।

শ্লোকটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ‘যোদ্ধব্যম্’ (योद्धव्यम्), যা √युध् (যুধ্) ধাতুর সঙ্গে ‘তব্য’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে গঠিত। সংস্কৃত ব্যাকরণে ‘তব্য’ প্রত্যয় কর্তব্য, আবশ্যকতা বা অনিবার্যতার ধারণা প্রকাশ করে। তাই ‘যোদ্ধব্যম্’-এর অর্থ কেবল ‘যুদ্ধ করা’ নয় বরং ‘যুদ্ধ করা কর্তব্য’, ‘যুদ্ধ করতেই হবে’ বা ‘যুদ্ধ করা অনিবার্য’। এটি কর্তব্যবোধের গভীর দর্শনকে প্রকাশ করে। ‘অস্মিন্’ (अस्मिन्) অর্থ ‘এই’ বা ‘এই পরিস্থিতিতে’। আর ‘রণসমুদ্যমে’ (रणसमुद्यमे) শব্দটি ‘রণ’ (যুদ্ধ) এবং ‘সমুদ্যম’ (মহা উদ্যোগ, প্রবল প্রস্তুতি) এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। এর অর্থ—যুদ্ধের মহা উদ্যোগ, সংঘর্ষের সূচনা বা মহাসংগ্রামের প্রস্তুতি।

বাংলা অর্থে পুরো শ্লোকটির ভাব দাঁড়ায়—“আমি যেন এই যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উপস্থিত যুদ্ধেচ্ছু যোদ্ধাদের ভালোভাবে দেখতে পারি এবং এই মহাযুদ্ধের উদ্যোগে আমাকে কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে তা জানতে পারি।” কিন্তু এই অর্থের অন্তরালে রয়েছে আরও গভীর মানবিক ও আধ্যাত্মিক সত্য। অর্জুন এখানে কেবল শত্রুপক্ষকে দেখতে চান না তিনি নিজের কর্তব্য, নিজের অবস্থান এবং নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে চান। এই ‘দেখা’ আসলে আত্মবিশ্লেষণের সূচনা।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকের গুরুত্ব অপরিসীম। অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে প্রকৃত শত্রু বাহ্যিক মানুষ নয় মানুষের অন্তরের অবিদ্যা, অহংকার, আসক্তি ও মোহই প্রকৃত প্রতিপক্ষ। তাই ‘নিরীক্ষে’ শব্দটি আত্মপর্যবেক্ষণের প্রতীক। সাংখ্য দর্শনে ‘পুরুষ’ কেবল সাক্ষী প্রকৃতি কর্ম সম্পাদন করে। অর্জুনের পর্যবেক্ষণ সেই সাক্ষীভাবেরই প্রকাশ। যোগদর্শনের ভাষায়, কোনো কর্মে প্রবেশ করার আগে মনকে স্থির করে বাস্তবতাকে নিরপেক্ষভাবে দেখা—এটাই যোগের সূচনা। কর্মযোগের দৃষ্টিতে এই শ্লোক শেখায় যে কর্তব্য এড়িয়ে যাওয়া নয়, বরং কর্তব্যকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করে পালন করাই প্রকৃত ধর্ম।

প্রতীকী অর্থে কুরুক্ষেত্র কেবল একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধক্ষেত্র নয় এটি মানবজীবনের প্রতিচ্ছবি। এখানে যুদ্ধেচ্ছু যোদ্ধারা মানুষের অন্তরের কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, অহংকার ও ভয়ের প্রতীক। অর্জুন প্রতীক হয়ে ওঠেন জাগ্রত বিবেকের, শ্রীকৃষ্ণ প্রতীক হন অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা ও ঈশ্বরীয় পথপ্রদর্শনের, আর ‘নিরীক্ষণ’ প্রতীক হয়ে ওঠে আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মসচেতনতার। ‘যোদ্ধব্যম্’ মানুষের সেই অনিবার্য কর্তব্যের প্রতীক, যা থেকে কোনো মানুষ শেষ পর্যন্ত পালাতে পারে না। আর ‘রণসমুদ্যম’ প্রতীক জীবনের সেই সংকটময় মুহূর্তগুলোর, যেখানে সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।

মনোবিজ্ঞানের আলোকে এই শ্লোকটি মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন পরিপক্ব ব্যক্তি প্রথমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন, বাস্তবতা বোঝেন, আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং তারপর কর্মে প্রবৃত্ত হন। অর্জুনও তাই করছেন। তিনি আবেগে অন্ধ হয়ে যুদ্ধ শুরু করেননি বরং বাস্তবতাকে বুঝতে চেয়েছেন। এই প্রবণতাই তাঁকে একজন আদর্শ চিন্তাশীল মানুষের প্রতীক করে তুলেছে।

বাস্তব জীবনেও এই শিক্ষার গভীর প্রয়োগ রয়েছে। একজন চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের আগে রোগীকে গভীরভাবে পরীক্ষা করেন একজন বিচারক রায় দেওয়ার আগে সমস্ত প্রমাণ বিশ্লেষণ করেন একজন দক্ষ সেনাপতি যুদ্ধের আগে শত্রুপক্ষের শক্তি ও অবস্থান বিচার করেন একজন গবেষক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেন। একইভাবে মানুষেরও জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের আগে থেমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা উচিত। এই পর্যবেক্ষণই সঠিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি।

সবশেষে বলা যায়, গীতা ১.২২-এর এই শ্লোক কেবল যুদ্ধের প্রস্তুতির বিবরণ নয় এটি মানুষের আত্মসচেতনতা, নৈতিকতা, কর্তব্যবোধ এবং আত্মঅনুসন্ধানের এক অনন্ত শিক্ষা। ভাষাগতভাবে এটি সংস্কৃত শব্দগঠনের সূক্ষ্ম সৌন্দর্য প্রকাশ করে দার্শনিকভাবে এটি আত্মদর্শন, সাক্ষীভাব ও কর্মযোগের শিক্ষা দেয় প্রতীকীভাবে এটি মানবমনের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও জীবনের সংগ্রামকে চিত্রিত করে। এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে কোনো সংগ্রামে প্রবেশ করার আগে নিজের অবস্থান, নিজের কর্তব্য এবং নিজের প্রকৃত প্রতিপক্ষকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা অপরিহার্য। কারণ প্রজ্ঞাহীন কর্ম মানুষকে বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যায়, আর সচেতন পর্যবেক্ষণই মানুষকে সত্য, কর্তব্য ও বিজয়ের পথে পরিচালিত করে।


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ২৩ তম শ্লোকের বিস্তারিত | যোৎস্যমানান্, আত্মপর্যবেক্ষণ ও নৈতিক বিচারের গভীর তাৎপর্য

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: July 23, 2026 July 28, 2026

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ২২তম শ্লোকের বিস্তারিত | অর্জুনের আত্মজিজ্ঞাসা, কর্তব্যবোধ ও নৈতিক সংকটের গভীর বিশ্লেষণ

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ২২তম শ্লোকের বিস্তারিত | অর্জুনের আত্মজিজ্ঞাসা, কর্তব্যবোধ ও নৈতিক সংকটের গভীর বিশ্লেষণ