Related

Share

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ২৩ তম শ্লোকের বিস্তারিত | যোৎস্যমানান্, আত্মপর্যবেক্ষণ ও নৈতিক বিচারের গভীর তাৎপর্য

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on July 28, 2026


যোৎস্যমানানবেক্ষেঽহং য এতেঽত্র সমাগতাঃ।
 ধার্ত্তরাষ্ট্রস্য দুর্ব্বুদ্ধের্যুদ্ধে প্রিয়চিকীর্ষবঃ॥

—শুধু একটি যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্যবর্ণনা নয় এটি মানুষের নৈতিক বিচারবোধ, বিবেক, আনুগত্য এবং আত্মপর্যবেক্ষণের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক দলিল। ভাষাগত দিক থেকে শ্লোকটি যেমন অত্যন্ত সমৃদ্ধ, তেমনি এর প্রতিটি শব্দ বহন করে বহুমাত্রিক অর্থ ও তাৎপর্য। এই শ্লোকে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে অনুরোধ করছেন, তিনি যেন রথটিকে দুই সেনাদলের মাঝখানে স্থাপন করেন, কারণ তিনি দেখতে চান—কারা যুদ্ধের জন্য এখানে সমবেত হয়েছে এবং কারা দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন ধৃতরাষ্ট্রপুত্র দুর্যোধনের প্রিয়সাধনের উদ্দেশ্যে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। এই অনুরোধের মধ্যেই অর্জুনের অন্তর্দ্বন্দ্ব, নৈতিক অনুসন্ধান এবং মানবিক সংবেদনশীলতার সূচনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ “যোৎস্যমানান্”। এর মূল ধাতু √যুধ্ (युध्), যার অর্থ যুদ্ধ করা বা সংগ্রাম করা। এই ধাতুর ভবিষ্যৎ ইচ্ছাসূচক রূপ থেকে “যোৎস্যমান” শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ—‘যারা যুদ্ধ করতে উদ্যত’ বা ‘যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত’। ভাষাগতভাবে এটি একটি বর্তমান ক্রিয়াবাচক বিশেষণ হলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের চিরন্তন সংগ্রামের প্রতীক। জীবনের প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনো সংগ্রামে নিয়োজিত—কখনও বাহ্যিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে, কখনও নিজের লোভ, ক্রোধ, ভয়, অহংকার কিংবা দুর্বলতার বিরুদ্ধে। তাই “যোৎস্যমানান্” শব্দটি কেবল যোদ্ধাদের নয়, সমগ্র মানবজীবনের সংগ্রামী চরিত্রকে প্রকাশ করে।

এরপর আসে “অবেক্ষে” শব্দটি। এটি “অব” উপসর্গ এবং √ঈক্ষ্ (ईक्ष्) ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত, যার অর্থ গভীরভাবে দেখা, পর্যবেক্ষণ করা বা বিচার-বিশ্লেষণ করা। অর্জুন এখানে কেবল চোখে দেখার কথা বলছেন না; তিনি জানতে, বুঝতে এবং উপলব্ধি করতে চান। এই শব্দটি আমাদের শেখায় যে সত্যকে উপলব্ধি করতে হলে কেবল বাহ্যিক দৃশ্য দেখা যথেষ্ট নয় তার অন্তর্নিহিত কারণ, উদ্দেশ্য এবং নৈতিক ভিত্তিকেও বিচার করতে হয়। দর্শনশাস্ত্রে এই পর্যবেক্ষণই আত্মজ্ঞান অর্জনের প্রথম ধাপ। যে ব্যক্তি নিজেকে, নিজের পরিবেশকে এবং নিজের কর্মের উদ্দেশ্যকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে, তিনিই প্রকৃত জ্ঞানলাভের পথে অগ্রসর হতে পারেন।

“অহং” অর্থাৎ ‘আমি’ শব্দটি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ সর্বনাম হলেও ভারতীয় দর্শনে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সাধারণ অর্থে এটি ব্যক্তিসত্তার পরিচয় বহন করে, কিন্তু উপনিষদীয় দর্শনে “অহং” কখনও অহংকারের প্রতীক, আবার কখনও আত্মস্বরূপের পরিচয়। এই শ্লোকে অর্জুনের “অহং” ব্যক্তিগত উপলব্ধির প্রতীক। তিনি অন্যের মতামতের উপর নির্ভর না করে নিজেই বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করতে চান। এখানেই আত্মজিজ্ঞাসার সূচনা ঘটে।

পরবর্তী শব্দ “যে”, “এতে” এবং “অত্র” যথাক্রমে ‘যারা’, ‘এই ব্যক্তিরা’ এবং ‘এখানে’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ভাষাগতভাবে এগুলি সাধারণ সর্বনাম ও অব্যয় হলেও শ্লোকের প্রেক্ষাপটে এদের তাৎপর্য গভীর। অর্জুন দূরের কোনো অজানা শত্রুকে নয়, নিজের পরিচিত আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, গুরু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের দেখছেন। “অত্র”—অর্থাৎ ‘এইখানে’—শুধু কুরুক্ষেত্র নয় এটি বর্তমান মুহূর্তের প্রতীক। মানুষের জীবনেও এমন বহু মুহূর্ত আসে যখন তাকে এখানেই, এই মুহূর্তেই, নিজের বিবেকের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়।

“সমাগতাঃ” শব্দটি “সম্”, “আ” উপসর্গ এবং √গम् (যাওয়া) ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত। এর অর্থ—একত্রিত হওয়া, সমবেত হওয়া বা উপস্থিত হওয়া। আক্ষরিকভাবে এটি যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের সমাবেশ নির্দেশ করলেও প্রতীকী অর্থে এটি মানুষের অন্তর্জগতের বহুবিধ প্রবৃত্তির সমাবেশকে নির্দেশ করে। সংকটের মুহূর্তে মানুষের মনে যেমন সাহস, ভয়, ভালোবাসা, ক্রোধ, দয়া, লোভ ও কর্তব্যবোধ একসঙ্গে উপস্থিত হয়, তেমনি কুরুক্ষেত্রেও ধর্ম ও অধর্মের বিভিন্ন শক্তি মুখোমুখি সমবেত হয়েছে।

এরপরের গুরুত্বপূর্ণ শব্দ “ধার্ত্তরাষ্ট্রস্য”, যার অর্থ ‘ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রের’ বা ‘ধৃতরাষ্ট্রবংশীয়ের’। এখানে মূলত দুর্যোধনকে বোঝানো হয়েছে। ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন শারীরিকভাবে অন্ধ, কিন্তু গীতার প্রতীকী ভাষায় তাঁর অন্ধত্ব নৈতিক অন্ধত্বেরও প্রতীক। সেই অন্ধতার উত্তরাধিকার বহনকারী দুর্যোধনের প্রতি ইঙ্গিত করেই এই শব্দের ব্যবহার। অর্থাৎ জন্মগত পরিচয়ের পাশাপাশি এটি নৈতিক অবক্ষয়ের ধারাবাহিকতাকেও নির্দেশ করে।

শ্লোকের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ “দুর্বুদ্ধেঃ”। এটি “দুর্” উপসর্গ এবং “বুদ্ধি” শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এর অর্থ—যার বিচারশক্তি বিকৃত, যে সৎ ও অসতের পার্থক্য করতে অক্ষম, যে লোভ, অহংকার ও স্বার্থের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অর্জুন এখানে দুর্যোধনকে কেবল শত্রু হিসেবে নয়, নৈতিক বিচারে ‘দুর্বুদ্ধি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই শব্দটি মানবমনের একটি চিরন্তন দুর্বলতাকে তুলে ধরে। যখন বুদ্ধি কামনা, লোভ, ক্ষমতার মোহ কিংবা অহংকার দ্বারা আচ্ছন্ন হয়, তখন তা সত্যকে আর সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি আত্মপ্রবঞ্চনা এবং নৈতিক বিভ্রান্তির প্রতীক।

“যুদ্ধে” শব্দটি √যুধ্ ধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ সংগ্রাম বা যুদ্ধ। কিন্তু গীতার ভাষায় যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের সংঘর্ষ নয় এটি ধর্ম ও অধর্ম, জ্ঞান ও অজ্ঞান, ন্যায় ও অন্যায়, বিবেক ও প্রবৃত্তির চিরন্তন সংঘাত। প্রত্যেক মানুষের জীবনই এক একটি কুরুক্ষেত্র, যেখানে প্রতিনিয়ত সঠিক ও ভুলের মধ্যে নির্বাচন করতে হয়। এই অর্থে “যুদ্ধে” শব্দটি মানুষের নৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতাকে প্রকাশ করে।

সবশেষে আসে “প্রিয়চিকীর্ষবঃ” শব্দটি। এটি “প্রিয়” এবং √কৃ (করা) ধাতুর ইচ্ছাসূচক রূপ “চিকীর্ষা” থেকে গঠিত। এর অর্থ—যারা কারও প্রিয়সাধন করতে চায়, কাউকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কাজ করে। এখানে তা দুর্যোধনের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের নির্দেশ করছে। এই শব্দটির গভীর তাৎপর্য হলো—মানুষ প্রায়ই নিজের বিবেকের নির্দেশ অনুসরণ না করে ক্ষমতাবান ব্যক্তি, পরিবার, দল বা সমাজের মনোরঞ্জনের জন্য অন্যায় কাজেও অংশগ্রহণ করে। অন্ধ আনুগত্যের এই প্রবণতাই ইতিহাসে অসংখ্য অন্যায়, যুদ্ধ ও ধ্বংসের কারণ হয়েছে।

এই শ্লোকের সামগ্রিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। অর্জুন কেবল জানতে চান না কারা তাঁর প্রতিপক্ষ তিনি বুঝতে চান তারা কেন এসেছে, তাদের উদ্দেশ্য কী এবং তারা ধর্মের জন্য যুদ্ধ করছে, নাকি দুর্বুদ্ধির অনুসারী হয়ে অন্যায়কে সমর্থন করছে। এই অনুসন্ধান মানুষের জীবনের এক চিরন্তন প্রশ্নকে সামনে আনে—“আমি কার পক্ষে দাঁড়িয়ে আছি, এবং কেন দাঁড়িয়ে আছি?” জীবনে অনেক সময় বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা, ভয়, স্বার্থ কিংবা সামাজিক চাপের কারণে মানুষ অন্যায়ের পক্ষেও অবস্থান নেয়। তাই কোনো কর্মে অংশ নেওয়ার আগে তার নৈতিক ভিত্তি যাচাই করা অপরিহার্য।

দার্শনিকভাবে এই শ্লোক বেদান্ত, সাংখ্য এবং যোগ—তিনটি দর্শনের সঙ্গেই গভীরভাবে সম্পর্কিত। বেদান্ত মতে কুরুক্ষেত্র মানুষের অন্তঃকরণ, যেখানে আত্মজ্ঞান ও অজ্ঞানতার সংগ্রাম চলে। সাংখ্য মতে এটি সত্ত্ব, রজস ও তমোগুণের পারস্পরিক সংঘর্ষ। আর যোগদর্শনে “অবেক্ষে” শব্দটি সাক্ষীভাব বা নিরপেক্ষ আত্মপর্যবেক্ষণের শিক্ষা দেয়। সত্য উপলব্ধি করতে হলে প্রথমে নিজের মন, উদ্দেশ্য এবং কর্মকে নিরপেক্ষভাবে দেখতে শিখতে হয়।

প্রতীকী দৃষ্টিতে “যোৎস্যমানান্” মানুষের সংগ্রামী সত্তার প্রতীক, “অবেক্ষে” আত্মপর্যবেক্ষণের প্রতীক, “সমাগতাঃ” অন্তরের বিভিন্ন প্রবৃত্তির সমাবেশের প্রতীক, “দুর্বুদ্ধি” নৈতিক অন্ধত্বের প্রতীক এবং “প্রিয়চিকীর্ষবঃ” অন্ধ আনুগত্যের প্রতীক। বাস্তব জীবনেও আমরা প্রায়ই দেখি—কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তি যদি অন্যায়ের পথে পরিচালিত হন, তবুও ব্যক্তিগত লাভ, ভয় বা আনুগত্যের কারণে অনেক মানুষ তাঁর পক্ষেই অবস্থান নেয়। ইতিহাসে বহু অত্যাচারী শাসক তাঁদের অনুগামীদের এই অন্ধ আনুগত্যের কারণেই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পেরেছেন। একইভাবে মানুষের অন্তর্জগতেও লোভ, ভয়, বিবেক, ভালোবাসা ও কর্তব্যবোধ একসঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় সেই অন্তর্দ্বন্দ্বই ব্যক্তিগত কুরুক্ষেত্র।

সবশেষে বলা যায়, গীতার এই শ্লোক বাহ্যিক যুদ্ধের বর্ণনার আড়ালে মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের এক গভীর সত্যকে উদ্ঘাটন করে। এটি শেখায়, জীবনের কোনো সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার আগে প্রতিপক্ষকে বিচার করার চেয়ে নিজের উদ্দেশ্য, বিবেক, আনুগত্য এবং নৈতিক অবস্থানকে বিচার করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রকৃত যুদ্ধ বাইরের পৃথিবীতে শুরু হওয়ার আগেই মানুষের অন্তরে শুরু হয়, এবং সেই অন্তর্দ্বন্দ্বে যে ব্যক্তি সত্য, ন্যায় ও বিবেকের পক্ষে অবস্থান করতে পারে, প্রকৃত বিজয় শেষ পর্যন্ত তারই হয়।


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ২৪ তম শ্লোকের বিস্তারিত | সঞ্জয়, ‘হৃষীকেশ, পার্থ ও ঈশ্বরীয় পথনির্দেশের গভীর তাৎপর্য

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: July 23, 2026 July 28, 2026

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ২৩ তম শ্লোকের বিস্তারিত | যোৎস্যমানান্, আত্মপর্যবেক্ষণ ও নৈতিক বিচারের গভীর তাৎপর্য

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ২৩ তম শ্লোকের বিস্তারিত | যোৎস্যমানান্, আত্মপর্যবেক্ষণ ও নৈতিক বিচারের গভীর তাৎপর্য