শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের দ্বাদশ শ্লোকের গভীর তাৎপর্য
ন ত্বেবাহং জাতু নাসং ন ত্বং নেমে জনাধিপাঃ।
ন চৈব ন ভবিষ্যামঃ সর্বে বয়মতঃপরম্।।১২।।
অনুুবাদঃ এমন কোন সময় ছিল না যখন আমি, তুমি ও এই সমস্ত রাজারা ছিলেন না এবং ভবিষ্যতেও কখনও আমাদের অস্তিত্ব বিনষ্ট হবে না।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের দ্বাদশ শ্লোকটি মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে গভীর ও রহস্যময় সত্যকে প্রকাশ করে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে যখন অর্জুন আপনজনদের হত্যা করার চিন্তায় ভেঙে পড়েছিলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে জ্ঞান প্রদান করেন। এই শ্লোকে ভগবান ঘোষণা করেন যে আত্মার অস্তিত্ব কখনো ছিল না এমন নয়, বর্তমানেও নেই এমন নয় এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না এমন নয়। অর্থাৎ আত্মা কখনো বিনষ্ট হয় না। জন্ম ও মৃত্যু কেবল দেহের পরিবর্তন, আত্মার নয়।
শ্লোকটির প্রথম শব্দ “ন” যার অর্থ না বা অস্বীকার, এটি সমগ্র বক্তব্যের ভিত্তি তৈরি করেছে। এরপর “ত্ব” শব্দ থেকে এসেছে “তুমি” এবং “অহং” শব্দের অর্থ “আমি”। এখানে আমি ও তুমি বলতে কেবল পার্থিব দেহকে বোঝানো হয়নি, বরং দেহের অন্তর্গত চিরন্তন আত্মাকে বোঝানো হয়েছে। “জাতু” শব্দের অর্থ কখনো বা কোনো সময়ে। “নাসং” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “অস্” ধাতু থেকে যার অর্থ হওয়া বা অস্তিত্ব থাকা। “ন ভবিষ্যামঃ” শব্দের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের কথা বলা হয়েছে। এই শব্দগুলোর সমন্বয়ে শ্রীকৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে আত্মার অস্তিত্ব কালের দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়।
এই শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ হলো, আমি কখনো ছিলাম না এমন নয়, তুমি কখনো ছিলে না এমন নয় এবং এই সমস্ত রাজাগণও কখনো অস্তিত্বহীন ছিলেন না। ভবিষ্যতেও আমরা কেউ অস্তিত্বহীন হয়ে যাব না। এখানে “ছিলাম”, “আছি” এবং “থাকব” এই তিনটি কালকে একত্রে ব্যবহার করে বোঝানো হয়েছে যে আত্মা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সীমার বাইরে অবস্থান করে।
সংস্কৃত দর্শনে আত্মাকে বলা হয় নিত্য, শাশ্বত ও অবিনাশী। দেহের জন্ম আছে এবং দেহের মৃত্যু আছে, কিন্তু আত্মার কোনো জন্ম নেই এবং কোনো মৃত্যু নেই। যেমন একটি মানুষ পুরোনো পোশাক ত্যাগ করে নতুন পোশাক গ্রহণ করে, তেমনি আত্মাও একটি দেহ ত্যাগ করে অন্য দেহ গ্রহণ করে। দেহের পরিবর্তনকে মৃত্যু বলা হলেও আত্মার দৃষ্টিতে এটি কেবল একটি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া।
এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য মানুষের জীবন দর্শনকে পরিবর্তন করতে পারে। সাধারণ মানুষ নিজেকে শরীর, নাম, পরিচয় ও সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। ফলে দেহের ক্ষয়, মৃত্যু বা বিচ্ছেদ তাকে ভয় ও দুঃখে আচ্ছন্ন করে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ শেখাচ্ছেন যে মানুষের প্রকৃত পরিচয় দেহ নয়, বরং তার অন্তর্গত চৈতন্য বা আত্মা। যখন মানুষ নিজেকে আত্মা হিসেবে উপলব্ধি করে, তখন তার মধ্যে মৃত্যুভয় কমে যায় এবং জীবনের প্রতি একটি গভীর শান্ত ও স্থির দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকের ব্যাখ্যা বিভিন্নভাবে করা হয়েছে। অদ্বৈত বেদান্ত মতে আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে মূলত কোনো ভেদ নেই। আত্মা হলো সেই চিরন্তন চৈতন্য যা সমস্ত সৃষ্টির অন্তরে বিরাজমান। শরীর ও মন পরিবর্তনশীল হলেও আত্মা অপরিবর্তনীয়। সাংখ্য দর্শনের মতে, পুরুষ বা চেতন সত্তা প্রকৃতির পরিবর্তনের সাক্ষী মাত্র। প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়, কিন্তু পুরুষ অপরিবর্তিত থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আত্মা হলো সেই স্থায়ী সত্য যা জগতের সকল পরিবর্তনের মধ্যেও অক্ষুণ্ণ থাকে।
প্রতীকী অর্থে এই শ্লোক মানুষের ভেতরের অমর আলোকে নির্দেশ করে। দেহ হলো একটি অস্থায়ী আবরণ, আর আত্মা হলো সেই আলো যা দেহকে জীবন্ত করে তোলে। যেমন একটি প্রদীপের পাত্র ভেঙে গেলেও আগুনের শক্তি অন্যত্র প্রকাশিত হতে পারে, তেমনি দেহের পরিবর্তন হলেও আত্মার অস্তিত্ব অব্যাহত থাকে। সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক চিন্তায় এই ধারণা মানুষের চিরন্তন অনুসন্ধানের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বাস্তব জীবনের একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একটি শিশু জন্মের পর ধীরে ধীরে বড় হয়। তার শরীর, চিন্তা ও অনুভূতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। শৈশব, কৈশোর ও বার্ধক্যে দেহের পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু মানুষ নিজের ভেতরে একটি ধারাবাহিক “আমি” অনুভব করে। এই অপরিবর্তিত অনুভূতিই আত্মার অস্তিত্বের একটি ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
আরেকটি উপমা হলো সমুদ্র ও ঢেউ। ঢেউয়ের জন্ম হয়, কিছু সময় স্থায়ী থাকে এবং পরে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু ঢেউ যে জল দিয়ে তৈরি, সেই জল কখনো ধ্বংস হয় না। তেমনি দেহের পরিবর্তন হলেও আত্মার মূল অস্তিত্ব অক্ষয় থাকে।
এই শ্লোক শুধু মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্বের শিক্ষা দেয় না, বরং জীবনের প্রতি একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। এটি শেখায় যে মানুষের প্রকৃত পরিচয় বাহ্যিক শরীর, সম্পদ বা সামাজিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের গভীরতম সত্তা হলো চিরন্তন চেতনা। এই উপলব্ধি মানুষকে অহংকার, ভয় ও অতিরিক্ত আসক্তি থেকে মুক্ত করে এবং জীবনে জ্ঞান, শান্তি ও স্থিতি আনতে সাহায্য করে।
সার্বিকভাবে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোক মানব অস্তিত্বের এক চিরন্তন সত্য ঘোষণা করে। ভাষাগতভাবে এটি অস্তিত্বের তিন কালকে অতিক্রমকারী এক ধারণা প্রকাশ করে। দার্শনিকভাবে এটি আত্মার অমরত্ব ও চিরন্তন চেতনার ব্যাখ্যা প্রদান করে। প্রতীকীভাবে এটি মানুষের অন্তর্গত সেই অবিনাশী শক্তির কথা বলে, যা দেহের পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষ কেবল ক্ষণস্থায়ী দেহ নয়, বরং সে এক চিরন্তন আত্মিক সত্তা, যার প্রকৃত স্বরূপ কখনো ধ্বংস হয় না।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!