সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের পঞ্চদশ শ্লোকের ব্যাখ্যা ও গভীর বিশ্লেষণ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে


যং হি ন ব্যথয়ন্ত্যেতে পুরুষং পুরুষর্ষভ। 
সমদুঃখসুখং ধীরং সোহমৃতত্বায় কল্পতে।।১৫।। 

অনুবাদঃ হে পুরুষশ্রেষ্ঠ (অর্জুন)! যে জ্ঞানী ব্যক্তি সুখ ও দুঃখকে সমান জ্ঞান করেন এবং শীত ও উষ্ণ আদি দ্বন্দ্বে বিচলিত হন না, তিনিই মুক্তি লাভের প্রকৃত অধিকারী। 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের পঞ্চদশ শ্লোকটি মানবজীবনের এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্যকে প্রকাশ করে। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে, যে ব্যক্তি সুখ ও দুঃখ উভয় অবস্থায় সমভাব বজায় রাখতে পারেন, যিনি বাহ্যিক পরিবর্তনের দ্বারা অন্তরে বিচলিত হন না, তিনিই প্রকৃত ধীর ব্যক্তি এবং তিনিই অমৃতত্ব লাভের যোগ্য হন। এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দের মধ্যে মানুষের মন, আত্মা ও জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে এক গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে।

শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো “সমদুঃখসুখং ধীরং”। এখানে “সম” শব্দের অর্থ হলো সমান, স্থির বা পক্ষপাতহীন। “দুঃখ” শব্দটি জীবনের কষ্ট, বেদনা ও প্রতিকূলতার প্রতীক। অন্যদিকে “সুখ” শব্দটি আনন্দ, প্রাপ্তি ও অনুকূল অবস্থাকে বোঝায়। “ধীর” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ধাতু থেকে, যার অর্থ হলো স্থির বুদ্ধিসম্পন্ন, জ্ঞানী ও আত্মসংযমী ব্যক্তি। অর্থাৎ সমদুঃখসুখং ধীরং বলতে এমন একজন মানুষকে বোঝানো হয়েছে, যিনি সুখ পেলে অহংকারে ভেসে যান না এবং দুঃখ এলে হতাশ হয়ে ভেঙে পড়েন না। তিনি উভয় অবস্থাকে জীবনের স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবে গ্রহণ করেন।

“ব্যথয়ন্তি” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “ব্যথ” ধাতু থেকে, যার অর্থ হলো কষ্ট দেওয়া বা বিচলিত করা। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যাঁকে সুখ ও দুঃখের অভিজ্ঞতাগুলো অন্তরের গভীরে আঘাত করতে পারে না, তিনিই প্রকৃত স্থিতপ্রজ্ঞ। এর অর্থ এই নয় যে তিনি অনুভূতিহীন বা হৃদয়হীন হয়ে যান। বরং তিনি অনুভূতির ঊর্ধ্বে উঠে নিজের চেতনার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। সাধারণ মানুষ সুখকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায় এবং দুঃখকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি জানেন যে উভয়ই ক্ষণস্থায়ী। তাই তিনি কোনো অবস্থার দ্বারাই নিজের প্রকৃত সত্তাকে নির্ধারণ করেন না।

এই শ্লোকে “পুরুষর্ষভ” শব্দটির মধ্যেও গভীর অর্থ রয়েছে। “পুরুষ” অর্থ হলো চেতনাসম্পন্ন জীব এবং “ঋষভ” অর্থ হলো শ্রেষ্ঠ বা সর্বোত্তম। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে পুরুষর্ষভ বলে সম্বোধন করে বোঝাচ্ছেন যে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার বাহ্যিক শক্তিতে নয়, বরং তার অন্তরের স্থিরতা ও আত্মজ্ঞান লাভের ক্ষমতায়। যে ব্যক্তি নিজের মনকে জয় করতে পারে, সেই প্রকৃত অর্থে শ্রেষ্ঠ মানুষ।

“অমৃতত্বায় কল্পতে” অংশটি এই শ্লোকের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক শিক্ষা বহন করে। “অমৃত” শব্দের অর্থ হলো মৃত্যুহীন বা চিরস্থায়ী। এখানে অমৃতত্ব বলতে শুধু শারীরিক অমরত্ব বোঝানো হয়নি, বরং আত্মার উপলব্ধি, মোক্ষ বা জন্মমৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তিকে বোঝানো হয়েছে। যে ব্যক্তি সুখ ও দুঃখের দ্বন্দ্ব অতিক্রম করে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারেন, তিনি অমৃত অবস্থার যোগ্য হন।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক সাংখ্য, যোগ ও বেদান্ত দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সাংখ্য দর্শন অনুসারে আত্মা বা পুরুষ চিরস্থায়ী, অপরিবর্তনীয় এবং সাক্ষীস্বরূপ। সুখ ও দুঃখ প্রকৃতির পরিবর্তনশীল গুণের প্রকাশ মাত্র। তাই আত্মাকে যখন মানুষ শরীর ও মনের পরিবর্তনের সঙ্গে এক করে দেখে, তখনই সে সুখ ও দুঃখের দ্বারা আবদ্ধ হয়। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করে যে তার প্রকৃত পরিচয় হলো চিরন্তন আত্মা, তখন সে সমভাব লাভ করে।

যোগ দর্শনে এই শিক্ষাকে মানসিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়। যোগের উদ্দেশ্য হলো মনের চঞ্চলতা নিয়ন্ত্রণ করা। যে ব্যক্তি বাহ্যিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে নিজের অন্তরের শান্তি হারায় না, সে প্রকৃত যোগী। শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষা পরবর্তীকালে কর্মযোগের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। কারণ কর্ম করতে হলে মানুষের প্রয়োজন ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করা এবং সাফল্য ও ব্যর্থতাকে সমভাবে গ্রহণ করা।

প্রতীকী অর্থে সুখ ও দুঃখ হলো জীবনের দুই বিপরীত স্রোত। এগুলো দিনের আলো ও রাতের অন্ধকারের মতো। যেমন একটি বৃক্ষ ঝড়, বৃষ্টি ও রৌদ্র সবকিছু সহ্য করে নিজের স্থানে স্থির থাকে, তেমনি ধীর ব্যক্তি জীবনের পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের অন্তরের ভারসাম্য বজায় রাখেন। এই স্থিরতাই প্রকৃত শক্তির প্রতীক।

মানবজীবনের বাস্তব ক্ষেত্রেও এই শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। একজন ছাত্র পরীক্ষায় সফল হলে যদি অহংকারে ভেসে যায় এবং ব্যর্থ হলে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে, তবে সে পরিস্থিতির দাস হয়ে যায়। কিন্তু যে ছাত্র সফলতাকে বিনয়ের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়, সে ধীরতার পরিচয় দেয়। একজন ব্যবসায়ী লাভ ও ক্ষতিকে সমভাবে গ্রহণ করে নতুন প্রচেষ্টা চালিয়ে গেলে এই শ্লোকের শিক্ষা অনুসরণ করেন। একজন সাধক প্রশংসা ও নিন্দা উভয়কেই সমানভাবে গ্রহণ করে আত্মিক উন্নতির পথে এগিয়ে যান।

সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও এই ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায়। মহাভারতের বহু চরিত্রের মধ্যে এই গুণের বিভিন্ন প্রকাশ দেখা যায়। যিনি নিজের কর্তব্য পালন করেন এবং ব্যক্তিগত লাভ বা ক্ষতির ঊর্ধ্বে উঠে ধর্মের পথে চলেন, তিনি এই ধীরতার আদর্শ প্রকাশ করেন।

আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই শিক্ষাকে বলা যায় আবেগীয় ভারসাম্য বা মানসিক স্থিতিশীলতা। মানুষ যখন নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে এবং বাইরের ঘটনার উপর নিজের শান্তিকে নির্ভরশীল না করে, তখন সে মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই শ্লোক তাই শুধু ধর্মীয় উপদেশ নয়, বরং সুস্থ ও পরিপূর্ণ জীবনের একটি মনস্তাত্ত্বিক নির্দেশনাও।

সবশেষে বলা যায়, “যং হি ন ব্যথয়ন্ত্যেতে পুরুষং পুরুষর্ষভ। সমদুঃখসুখং ধীরং সোঽমৃতত্বায় কল্পতে” শ্লোকটি মানুষের অন্তর্গত শক্তি ও আত্মজাগরণের এক চিরন্তন বাণী। এটি শেখায় যে জীবনের প্রকৃত বিজয় বাহ্যিক সাফল্যে নয়, বরং নিজের মনকে জয় করার মধ্যে নিহিত। সুখ ও দুঃখের দ্বন্দ্ব অতিক্রম করে যে ব্যক্তি আত্মার স্থির সত্য উপলব্ধি করতে পারেন, তিনিই প্রকৃত ধীর, প্রকৃত জ্ঞানী এবং তিনিই অমৃতত্বের পথে অগ্রসর হন।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 01, 2026 August 01, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি