সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ষোড়শ শ্লোকের ব্যাখ্যা ও গভীর বিশ্লেষণ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে


নাসতো বিদ্যতে ভাবো নাভাবো বিদ্যতে সতঃ।
উভয়োরপি দৃষ্টোঽন্তস্ত্বনয়োস্তত্ত্বদর্শিভিঃ॥১৬।।

অনুবাদঃ যাঁরা তত্ত্বদ্রষ্ট্রা তাঁরা সিদ্ধান্ত করেছেন যে অনিত্য জড় বস্তুর স্থায়িত্ব নেই এবং নিত্য বস্তু আত্মার কখনও বিনাশ হয় না। তাঁরা উভয় প্রকৃতির যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধি করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। 

এর মূল বক্তব্য হলো যা সত্য নয় তার প্রকৃত অস্তিত্ব নেই এবং যা সত্য তার কখনও বিনাশ হয় না। তত্ত্বদর্শী জ্ঞানীরা এই দুইয়ের প্রকৃত সীমা ও পার্থক্য উপলব্ধি করেছেন।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো নাসতঃ। এটি গঠিত হয়েছে ন এবং অসত্ এই দুই অংশ থেকে। সংস্কৃত ভাষায় অসত্ শব্দের অর্থ হলো যা স্থায়ী নয়, যা পরিবর্তনশীল, যা প্রকৃত অর্থে চিরন্তন সত্য নয়। এখানে ন শব্দটি নিষেধ বা অস্বীকার বোঝায়। অর্থাৎ নাসতঃ বলতে বোঝানো হয়েছে অসতের মধ্যে প্রকৃত অস্তিত্ব নেই। অসত্ বলতে সম্পূর্ণ শূন্যতা বোঝানো হয় না, বরং এমন কিছু বোঝানো হয় যার অস্তিত্ব সাময়িক এবং পরিবর্তনের অধীন।

বিদ্যতে শব্দটি এসেছে সংস্কৃত বিদ্ ধাতু থেকে। বিদ্ ধাতুর অর্থ হলো জানা, উপলব্ধি করা বা বিদ্যমান থাকা। এই শব্দের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে কোনো কিছুর সত্যিকার উপস্থিতি বা অস্তিত্ব। শ্রীকৃষ্ণ এখানে অস্তিত্বের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি বাহ্যিক রূপের পরিবর্তনকে প্রকৃত অস্তিত্ব বলে গ্রহণ করেননি।

ভাব শব্দটি এসেছে ভূ ধাতু থেকে, যার অর্থ হওয়া বা অস্তিত্বে আসা। ভাব অর্থ হলো সত্তা, উপস্থিতি বা অস্তিত্বের প্রকাশ। নাসতো বিদ্যতে ভাবো এর অর্থ হলো যা অসত্য বা অনিত্য তার প্রকৃত অস্তিত্ব বা স্থায়ী সত্তা নেই। কোনো বস্তু যদি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে বিলীন হয়ে যায়, তবে তার অস্তিত্ব চিরন্তন সত্য নয়।

এরপর বলা হয়েছে নাভাবো বিদ্যতে সতঃ। এখানে সত্ শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সত্ অর্থ হলো সত্য, চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় এবং নিত্য সত্তা। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন সত্যের কখনও অভাব হয় না। অর্থাৎ যা প্রকৃত সত্য, তা কখনও ধ্বংস হয় না। রূপ পরিবর্তন হতে পারে, প্রকাশের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু মূল সত্তা বিনষ্ট হয় না।

এই শ্লোকের ভাষাগত গঠন অত্যন্ত গভীর। এখানে দুটি বিপরীত ধারণাকে পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে। একটি হলো অসত্ এবং অন্যটি হলো সত্। অসত্ হলো ক্ষণস্থায়ী এবং পরিবর্তনশীল। সত্ হলো নিত্য এবং অপরিবর্তনীয়। এই দুইয়ের প্রকৃত পার্থক্য তত্ত্বদর্শী বা সত্য উপলব্ধিকারী ব্যক্তিরাই বুঝতে পারেন।

বাংলা অর্থে এই শ্লোকের সারমর্ম হলো, অনিত্য বস্তুর কোনো স্থায়ী অস্তিত্ব নেই এবং নিত্য সত্যের কোনো বিনাশ নেই। সাধারণ মানুষ বাহ্যিক পরিবর্তন দেখে বিভ্রান্ত হয়। তারা দেহের জন্ম ও মৃত্যু দেখে মনে করে সবকিছু শেষ হয়ে যায়। কিন্তু জ্ঞানীরা উপলব্ধি করেন যে দেহ পরিবর্তনশীল হলেও আত্মার অস্তিত্ব চিরন্তন।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকটি অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে। মানুষ যুগ যুগ ধরে জানতে চেয়েছে প্রকৃত সত্য কী এবং কোনটি কেবল সাময়িক প্রকাশ। বেদান্ত দর্শন অনুসারে ব্রহ্ম বা পরম সত্যই একমাত্র নিত্য সত্তা। জগতের সমস্ত পরিবর্তনশীল রূপ মায়ার অধীন। এই পরিবর্তনশীল জগতের মধ্যেও একটি অপরিবর্তনীয় সত্য বিদ্যমান, আর সেই সত্য হলো আত্মা।

সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোক প্রকৃতি এবং পুরুষের পার্থক্য নির্দেশ করে। প্রকৃতি পরিবর্তনশীল। তার মধ্যে সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশ ঘটে। কিন্তু পুরুষ বা চৈতন্যস্বরূপ আত্মা অপরিবর্তনীয়। মানুষ যখন নিজেকে শুধুমাত্র দেহ হিসেবে মনে করে তখন সে দুঃখ ও মোহের মধ্যে পড়ে। কিন্তু যখন সে নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করে তখন তার মধ্যে জ্ঞান ও স্থিতি আসে।

প্রতীকী অর্থেও এই শ্লোক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সত্ প্রতীক হিসেবে প্রকাশ করে সত্য, আলো, জ্ঞান এবং চিরন্তন চেতনাকে। অন্যদিকে অসত্ প্রতীক হিসেবে বোঝায় অজ্ঞতা, ভ্রম, ক্ষণস্থায়ী আকর্ষণ এবং বাহ্যিক জগতের পরিবর্তনশীল রূপ। মানুষের জীবনেও এই শিক্ষা প্রযোজ্য। অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতা, সৌন্দর্য এবং সামাজিক পরিচয় সবই পরিবর্তনশীল। কিন্তু মানুষের অন্তর্গত চেতনা ও আত্মিক মূল্যবোধ অধিক গভীর ও স্থায়ী।

বাস্তব জীবনে এর একটি সহজ উদাহরণ হলো মাটির তৈরি পাত্র। একটি পাত্র ভেঙে যেতে পারে, তার আকৃতি পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু মাটি থেকে যায়। পাত্রের রূপ পরিবর্তনশীল, কিন্তু তার মূল উপাদান টিকে থাকে। একইভাবে মানুষের দেহ পরিবর্তিত হয়, শৈশব থেকে যৌবন এবং বার্ধক্য আসে, কিন্তু আত্মার অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে।

আরেকটি উদাহরণ হলো স্বপ্ন। স্বপ্নের মধ্যে অনেক ঘটনা সত্য বলে মনে হয়, কিন্তু জেগে ওঠার পরে বোঝা যায় তা সাময়িক অভিজ্ঞতা ছিল। তেমনি এই জগতের অনেক অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে বাস্তব মনে হলেও গভীর জ্ঞানের আলোকে বোঝা যায় যে সেগুলো পরিবর্তনশীল এবং চিরস্থায়ী নয়।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মানুষের চিন্তা, অনুভূতি এবং আবেগ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। আজ যে দুঃখ প্রবল মনে হচ্ছে, কাল তা আর একই রকম থাকে না। কিন্তু যে সচেতন সত্তা এই পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করে, সেই চেতনার অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্থির।

সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এই ভাবনা বারবার প্রকাশ পেয়েছে। কবি ও দার্শনিকেরা বারবার দেখিয়েছেন যে বাহ্যিক সৌন্দর্য, ক্ষমতা ও গৌরব ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্য, জ্ঞান ও নৈতিক মূল্যবোধ দীর্ঘস্থায়ী। ইতিহাসের বহু সাম্রাজ্য বিলীন হয়েছে, কিন্তু তাদের শিক্ষা ও আদর্শ মানুষের মধ্যে বেঁচে রয়েছে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো মানুষকে বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্যে আটকে না থেকে চিরন্তন সত্যের সন্ধান করতে হবে। জীবনের দুঃখ, ভয় এবং মোহের মূল কারণ হলো অনিত্যকে নিত্য মনে করা। যখন মানুষ বুঝতে পারে কোনটি পরিবর্তনশীল এবং কোনটি অপরিবর্তনীয়, তখন তার মধ্যে প্রকৃত জ্ঞান জন্মায়।

নাসতো বিদ্যতে ভাবো নাভাবো বিদ্যতে সতঃ শ্লোকটি কেবল একটি ধর্মীয় বাণী নয়, এটি অস্তিত্ব, সত্য এবং চেতনার এক গভীর দর্শন। ভাষাগত দিক থেকে এটি সত্ ও অসতের পার্থক্য প্রকাশ করে। দার্শনিক দিক থেকে এটি নিত্য ও অনিত্য সত্যের ব্যাখ্যা দেয়। আধ্যাত্মিক দিক থেকে এটি মানুষকে নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপ উপলব্ধির পথে নিয়ে যায়। এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে যা ক্ষণস্থায়ী তাকে আঁকড়ে ধরে দুঃখ পাওয়ার পরিবর্তে চিরন্তন সত্যকে উপলব্ধি করাই জীবনের প্রকৃত জ্ঞান।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 01, 2026 August 01, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি