শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের সপ্তদশ শ্লোকের ব্যাখ্যা ও গভীর বিশ্লেষণ
অবিনাশি তু তদ্বিদ্ধি যেন সর্বমিদং ততম্।
বিনাশশমব্যয়স্যাস্য ন কশ্চিৎ কর্তুমর্হতি।।১৭।।
অনুবাদঃ যা সমগ্র শরীরে পরিব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে, তাকে তুমি অবিনাশী বলে জানবে। সেই অব্যয় আত্মাকে কেউ বিনাশ করতে সক্ষম নয়।
এর মূল বক্তব্য হলো যে যে চিরন্তন সত্তা সমগ্র জগতকে পরিব্যাপ্ত করে আছে তাকে অবিনাশী বলে জানো। সেই অক্ষয় ও অপরিবর্তনীয় সত্তার বিনাশ করার ক্ষমতা কারও নেই। এই শিক্ষা শুধু আত্মার অমরত্বের ঘোষণা নয়, বরং এটি মানুষের জীবন, মৃত্যু, পরিবর্তন ও অস্তিত্ব সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধি প্রদান করে।
সংস্কৃত ভাষার দৃষ্টিতে এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দের মধ্যে গভীর অর্থ নিহিত রয়েছে। “অবিনাশি” শব্দটি গঠিত হয়েছে “অ” এবং “বিনাশী” শব্দের সমন্বয়ে। এখানে “অ” একটি নিষেধসূচক উপসর্গ, যার অর্থ নয় বা অনুপস্থিত। “বিনাশী” শব্দের অর্থ হলো যা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ফলে “অবিনাশি” অর্থ দাঁড়ায় যা কখনও ধ্বংস হয় না বা যার কোনো বিনাশ নেই। “তৎ” শব্দের অর্থ হলো সেই বা সেই সত্য সত্তা। “বিদ্ধি” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “বিদ্” ধাতু থেকে, যার অর্থ জানা বা উপলব্ধি করা। তাই “তদ্বিদ্ধি” অর্থ হলো তুমি সেই সত্যকে জানো বা উপলব্ধি করো।
“যেন সর্ব্বমিদং ততম্” অংশে বলা হয়েছে যে এই অবিনাশী সত্তা সমগ্র জগতকে পরিব্যাপ্ত করে আছে। “ততম্” শব্দটি এসেছে “তন্” ধাতু থেকে, যার অর্থ প্রসারিত হওয়া বা বিস্তৃত হওয়া। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে আত্মা বা চেতনা কোনো সীমাবদ্ধ বস্তু নয়, বরং সমস্ত জীবনের অন্তর্নিহিত ভিত্তি। “অব্যয়” শব্দের অর্থ হলো যার ক্ষয় নেই, যা পরিবর্তনের দ্বারা নষ্ট হয় না। এই শব্দের মাধ্যমে আত্মার অপরিবর্তনীয় প্রকৃতি প্রকাশ করা হয়েছে।
আক্ষরিক অর্থে শ্লোকটির অর্থ হলো যে যে সত্তা সমগ্র জগতকে ধারণ করে আছে তাকে অবিনাশী বলে জানো। সেই অক্ষয় সত্তাকে কেউ ধ্বংস করতে পারে না। এখানে শ্রীকৃষ্ণ দেহ এবং আত্মার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরেছেন। দেহ জন্মগ্রহণ করে, পরিবর্তিত হয় এবং একসময় বিনষ্ট হয়। কিন্তু আত্মা জন্মহীন, মৃত্যুহীন এবং চিরস্থায়ী।
এই শ্লোকের প্রাসঙ্গিক অর্থ বুঝতে হলে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরিস্থিতি মনে রাখতে হয়। অর্জুন যখন নিজের আত্মীয়, গুরু ও প্রিয়জনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন, তখন তার মূল সংকট ছিল মৃত্যু নিয়ে। তিনি মনে করেছিলেন যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি আপনজনদের ধ্বংস করবেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ তাকে বোঝালেন যে প্রকৃত আত্মার কখনও বিনাশ হয় না। যা ধ্বংস হয় তা হলো কেবল দেহ, আত্মা নয়।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক অত্যন্ত গভীর। অদ্বৈত বেদান্তের মতে আত্মা ও ব্রহ্ম এক এবং অভিন্ন। ব্রহ্ম হলো চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় এবং সর্বব্যাপী সত্য। জগতের সমস্ত পরিবর্তনের পেছনে যে স্থায়ী ভিত্তি রয়েছে সেটিই হলো সেই পরম সত্য। মানুষের দুঃখের মূল কারণ হলো সে নিজেকে কেবল দেহ হিসেবে মনে করে। যখন মানুষ নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করে তখন সে জন্ম ও মৃত্যুর ভয় অতিক্রম করতে পারে।
সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতে পুরুষ বা চেতনা চিরস্থায়ী এবং প্রকৃতি পরিবর্তনশীল। শরীর, মন, অনুভূতি ও জগতের সমস্ত উপাদান পরিবর্তনের অধীন হলেও চৈতন্য বা আত্মা অপরিবর্তিত থাকে। এই শ্লোক সেই চৈতন্যের অক্ষয় প্রকৃতিকেই প্রকাশ করে।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শিক্ষার গুরুত্ব রয়েছে। মানুষের জীবনে বাহ্যিক পরিবর্তন সবসময় ঘটে। শৈশব থেকে যৌবন, যৌবন থেকে বার্ধক্য, সুখ থেকে দুঃখ, সাফল্য থেকে ব্যর্থতা সবকিছুই পরিবর্তনশীল। কিন্তু মানুষের অন্তরের গভীরে এমন একটি চেতনা থাকে যা এই সমস্ত পরিবর্তনের সাক্ষী। এই সাক্ষীস্বরূপ অবস্থার উপলব্ধিই মানুষকে মানসিক স্থিরতা প্রদান করে।
প্রতীকী অর্থে “অবিনাশি” শব্দটি চিরন্তন সত্য, অমর চেতনা এবং স্থায়ী মূল্যবোধের প্রতীক। মানুষের দেহ ক্ষণস্থায়ী হলেও তার জ্ঞান, প্রেম, আদর্শ ও সত্যের অনুসন্ধান দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে। যেমন একটি প্রদীপের শিখা একটি প্রদীপ থেকে অন্য প্রদীপে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি চেতনার আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়।
বাস্তব জীবনে এর উদাহরণ দেখা যায়। একটি গাছের পাতা ঝরে যায়, কিন্তু গাছের জীবনধারা অব্যাহত থাকে। নদীর জল প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়, কিন্তু নদীর প্রবাহ বজায় থাকে। একইভাবে মানুষের শরীর পরিবর্তিত হয়, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত চেতনা সেই পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকে। একটি শিশুর দেহ, একজন যুবকের দেহ এবং একজন বৃদ্ধের দেহ আলাদা হলেও তার নিজের অস্তিত্বের অনুভূতি একই থাকে। এই অনুভূতির ধারাবাহিকতাই আত্মার স্থায়িত্বের একটি প্রতীক।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও অবিনাশী ধারণার প্রকাশ দেখা যায়। প্রেম, সত্য, ন্যায়, ত্যাগ ও মানবতার মতো মূল্যবোধ সময়ের পরিবর্তনেও টিকে থাকে। অনেক মানুষ দেহে পৃথিবীতে না থাকলেও তাদের আদর্শ ও কর্ম যুগ যুগ ধরে মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকে। এই অর্থেও অবিনাশী ধারণাটি মানব সভ্যতার গভীরতম আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে জীবনের বাহ্যিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত শোক বা ভয় করা উচিত নয়। পরিবর্তন প্রকৃতির নিয়ম, কিন্তু পরিবর্তনের মধ্যেও একটি অপরিবর্তনীয় সত্য বিদ্যমান। মানুষ যখন সেই সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে তখন তার মধ্যে জ্ঞান, সাহস ও শান্তি জন্ম নেয়।
পরিশেষে বলা যায়, “অবিনাশি তু তদ্বিদ্ধি যেন সর্ব্বমিদং ততম্” শ্লোকটি কেবল আত্মার অমরত্বের একটি ধর্মীয় শিক্ষা নয়, এটি মানব অস্তিত্বের এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধি। ভাষাগতভাবে এটি সংস্কৃতের সূক্ষ্ম অর্থবহ প্রকাশ, দার্শনিকভাবে এটি চিরন্তন সত্যের ঘোষণা এবং প্রতীকীভাবে এটি মানুষের অন্তর্গত অমর চেতনার পরিচয়। এই শ্লোক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে যা সত্য, যা চিরন্তন এবং যা সমস্ত অস্তিত্বের মূল ভিত্তি, তাকে কোনো শক্তিই ধ্বংস করতে পারে না।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!