শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের বিংশতম শ্লোকের ব্যাখ্যা ও গভীর বিশ্লেষণ
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্
নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণোন
হন্যতে হন্যমানে শরীরে।।২০।।
অনুবাদঃ আত্মার কখনও জন্ম হয় না বা মৃত্যু হয় না, অথবা পুনঃ পুনঃ তাঁর উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না। তিনি জন্মরহিতশাশ্বত, নিত্য এবং পুরাতন হলেও চিরনবীন। শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনও বিনষ্ট হয় না।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের বিশতম শ্লোক মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে। মানুষ যুগ যুগ ধরে জানতে চেয়েছে আমি কে, আমার প্রকৃত স্বরূপ কী, মৃত্যুর পর কি সবকিছুর সমাপ্তি ঘটে, নাকি জীবনের আড়ালে কোনো চিরন্তন সত্য বিদ্যমান। এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে আত্মা এমন এক চিরন্তন সত্তা যার কোনো জন্ম নেই, মৃত্যু নেই এবং কোনো ধ্বংস নেই। শরীরের পরিবর্তন হলেও আত্মার অস্তিত্ব অপরিবর্তিত থাকে।
এই শ্লোকের প্রথম শব্দ “ন” অর্থাৎ “না” একটি গভীর নঞর্থক নির্দেশ বহন করে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে আত্মার ক্ষেত্রে জাগতিক নিয়ম প্রযোজ্য নয়। “জায়তে” শব্দটি সংস্কৃত “জন্” ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ জন্মগ্রহণ করা। কিন্তু আত্মা সম্পর্কে বলা হয়েছে “ন জায়তে” অর্থাৎ আত্মার কোনো জন্ম নেই। জন্ম হলো সেই বস্তুর যা পূর্বে ছিল না এবং পরে অস্তিত্ব লাভ করেছে। কিন্তু আত্মা এমন কোনো সৃষ্টি নয় যা কোনো সময়ে শুরু হয়েছে। এটি সর্বদা বিদ্যমান।
“ম্রিয়তে” শব্দটি সংস্কৃত “মৃ” ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ মৃত্যু বা বিলুপ্ত হওয়া। শ্লোকে বলা হয়েছে “ন ম্রিয়তে” অর্থাৎ আত্মার কোনো মৃত্যু নেই। মৃত্যু সাধারণত কোনো পরিবর্তনশীল দেহ বা বস্তুর ক্ষেত্রে ঘটে। যা সৃষ্টি হয়েছে তার বিনাশ হয়, কিন্তু আত্মা যেহেতু সৃষ্ট কোনো বস্তু নয় তাই তার বিনাশও সম্ভব নয়। এই ধারণার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ মানুষকে বোঝাতে চেয়েছেন যে প্রকৃত আত্মপরিচয় দেহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
“অয়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ” অংশে বলা হয়েছে আত্মা এমন নয় যে আগে ছিল না, পরে সৃষ্টি হলো এবং আবার একসময় থাকবে না। আত্মা কোনো সাময়িক অস্তিত্ব নয়। এটি কোনো ঘটনার ফল নয়, বরং সমস্ত অভিজ্ঞতার অন্তর্নিহিত চেতন সত্তা। মানুষ সাধারণত নিজের পরিচয়কে শরীর, নাম, পরিচয় ও সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করে। কিন্তু গীতার শিক্ষা হলো, এগুলো পরিবর্তনশীল বাহ্যিক পরিচয়। প্রকৃত পরিচয় হলো আত্মা।
“অজঃ” শব্দের অর্থ হলো যার জন্ম নেই। এটি গঠিত হয়েছে “অ” এবং “জ” থেকে। “অ” অর্থ না এবং “জ” অর্থ জন্মগ্রহণকারী। তাই অজ অর্থ জন্মহীন। আত্মাকে অজ বলা হয়েছে কারণ এটি কোনো সময়ে সৃষ্টি হয়নি। “নিত্য” শব্দের অর্থ চিরস্থায়ী। যা সব সময় বিদ্যমান এবং যার অস্তিত্ব কখনো পরিবর্তিত হয় না তাকে নিত্য বলা হয়। “শাশ্বত” শব্দটি বোঝায় চিরকাল ধরে অব্যাহত থাকা। “পুরাণ” শব্দের অর্থ প্রাচীন বা আদি। এখানে পুরাণ বলতে পুরনো বা ক্ষয়প্রাপ্ত নয়, বরং সেই আদি সত্যকে বোঝানো হয়েছে যা সৃষ্টির শুরু থেকেও পূর্ববর্তী।
শ্লোকের শেষ অংশ “ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে” আত্মার প্রকৃত অবস্থাকে আরও স্পষ্ট করে। এর অর্থ হলো শরীর ধ্বংস হলেও আত্মা ধ্বংস হয় না। যেমন মানুষ পুরনো পোশাক পরিবর্তন করে নতুন পোশাক ধারণ করে, তেমনই আত্মা এক শরীর ত্যাগ করে অন্য শরীর গ্রহণ করে। শরীর হলো আত্মার বাহন, কিন্তু আত্মা শরীরের দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়।
ভাষাগত দৃষ্টিতে এই শ্লোক সংস্কৃত শব্দের অসাধারণ শক্তির পরিচয় বহন করে। অল্প কয়েকটি শব্দের মাধ্যমে এখানে জন্ম, মৃত্যু, অস্তিত্ব, পরিবর্তন এবং চিরন্তনতার মতো গভীর বিষয় প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিটি শব্দের মধ্যে রয়েছে দার্শনিক অর্থের বিশাল জগৎ। “অজ”, “নিত্য”, “শাশ্বত” এবং “পুরাণ” শব্দগুলো শুধু বিশেষণ নয়, বরং আত্মার প্রকৃত স্বরূপের বিভিন্ন দিক প্রকাশ করে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক অদ্বৈত বেদান্তের মূল ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। অদ্বৈত দর্শন অনুযায়ী আত্মা ও পরম সত্যের মধ্যে মূলত কোনো ভেদ নেই। আত্মা হলো সেই চেতনা যা সব পরিবর্তনের সাক্ষী। শরীর পরিবর্তিত হয়, মন পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয়, কিন্তু যে সত্তা এই সব পরিবর্তনকে উপলব্ধি করে সে অপরিবর্তনীয়। সাংখ্য দর্শনেও পুরুষ বা চেতন সত্তাকে অবিনশ্বর বলা হয়েছে এবং প্রকৃতিকে পরিবর্তনশীল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের ভয় ও দুঃখকে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করে। মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় হলো মৃত্যু। কিন্তু যদি মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে তার প্রকৃত সত্তা কেবল দেহ নয়, তাহলে মৃত্যুভয় অনেকাংশে দূর হতে পারে। এই উপলব্ধি মানুষকে জীবনের প্রতি আরও গভীর, শান্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে আত্মার অমরত্ব একটি চিরন্তন প্রতীক। আত্মা এখানে আশা, সত্য, আলো এবং অবিনশ্বরতার প্রতীক। দেহের ক্ষয় হলেও মূল্যবোধ, জ্ঞান, কর্ম এবং চেতনার ধারাবাহিকতা মানুষের জীবনে অমরত্বের অনুভূতি সৃষ্টি করে। একজন মহান ব্যক্তির শরীর একদিন বিলীন হয়, কিন্তু তার আদর্শ ও কর্ম যুগের পর যুগ মানুষের মধ্যে জীবিত থাকে।
বাস্তব জীবনের একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একটি গাছের পাতা ঝরে যায়, কিন্তু গাছের জীবনধারা চলতে থাকে। আবার নদীর জল প্রতিক্ষণ পরিবর্তিত হলেও নদীর প্রবাহ অব্যাহত থাকে। তেমনি শরীরের পরিবর্তন হলেও চেতনার ধারাবাহিকতাকে আত্মার প্রতীক হিসেবে বোঝানো হয়েছে।
এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষ যেন নিজের পরিচয়কে কেবল শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না করে। শরীর জন্মগ্রহণ করে এবং একদিন বিলীন হয়, কিন্তু আত্মা চিরন্তন। “ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্” কেবল একটি ধর্মীয় বক্তব্য নয়, এটি মানব অস্তিত্বের গভীরতম সত্য অনুসন্ধানের একটি দার্শনিক ঘোষণা। এটি মানুষকে শেখায় যে জীবনের প্রকৃত ভিত্তি বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্যে নয়, বরং সেই অপরিবর্তনীয় চেতনার মধ্যে যা সকল অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়ে চিরকাল বিরাজমান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!