শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের সাতাশতম শ্লোকের ব্যাখ্যা ও গভীর বিশ্লেষণ
জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ।
তস্মাদপরিহার্যেহর্থে ন ত্বং শোচিতুমর্হসি।।২৭।।
অনুবাদঃ যার জন্ম হয়েছে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এবং যার মৃত্যু হয়েছে তার জন্মও অবশ্যম্ভাবী। অতেএব অপরিহার্য কর্তব্য সম্পাদন করার সময় তোমার শোক করা উচিত নয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ২৭তম শ্লোকটি মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্যকে প্রকাশ করে। এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে জন্ম এবং মৃত্যু প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য নিয়ম। যে জীব জন্মগ্রহণ করেছে তার মৃত্যু একদিন নিশ্চিত এবং যে দেহ মৃত্যুবরণ করেছে তার পুনরায় জন্ম গ্রহণও এই জগতের স্বাভাবিক ধারার অন্তর্ভুক্ত। তাই যে বিষয় অনিবার্য, যে বিষয়কে কোনো শক্তি দ্বারা পরিবর্তন করা যায় না, সেই বিষয়ে অতিরিক্ত শোক করা জ্ঞানীর কাজ নয়।
এই শ্লোকের প্রথম শব্দ হলো জাতস্য। এটি সংস্কৃত জন্ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ জন্ম নেওয়া বা প্রকাশিত হওয়া। জাতস্য অর্থ হলো যে জন্মগ্রহণ করেছে তার। এখানে শ্রীকৃষ্ণ কেবল মানুষের জন্মের কথা বলছেন না, বরং সমগ্র সৃষ্টির নিয়মের কথা বলছেন। এই জগতে যা কিছু প্রকাশিত হয়েছে, তার একটি নির্দিষ্ট সময়ে পরিবর্তন ও বিলয় ঘটবেই। জন্ম মানেই পরিবর্তনের সূচনা এবং পরিবর্তনের মধ্যেই জীবনের গতি প্রবাহিত হয়।
ধ্রুব শব্দটি এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। এর অর্থ হলো নিশ্চিত, স্থির, অবশ্যম্ভাবী বা অপরিবর্তনীয়। শ্রীকৃষ্ণ যখন বলেন জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুঃ তখন তিনি বোঝাচ্ছেন যে জন্ম নেওয়ার পর মৃত্যু এমন একটি সত্য যা কোনো জীব এড়াতে পারে না। ধন, ক্ষমতা, জ্ঞান বা পার্থিব কোনো সম্পদ মানুষকে এই নিয়মের বাইরে নিয়ে যেতে পারে না। মৃত্যু এখানে ধ্বংস নয়, বরং জীবনের একটি স্বাভাবিক রূপান্তর।
মৃত্যু শব্দটি সংস্কৃত মৃত্ ধাতু থেকে উৎপন্ন হয়েছে, যার অর্থ ক্ষয় হওয়া বা বিলীন হওয়া। সাধারণ মানুষ মৃত্যুকে শেষ বলে মনে করে, কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে মৃত্যু হলো একটি পরিবর্তনের ধাপ। যেমন পুরোনো পোশাক ত্যাগ করে মানুষ নতুন পোশাক গ্রহণ করে, তেমনি আত্মা পুরোনো দেহ ত্যাগ করে নতুন দেহ গ্রহণ করে। এই ধারণা গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের আত্মার অমরত্বের শিক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
শ্লোকের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ। এর অর্থ হলো মৃতের পুনর্জন্মও নিশ্চিত। এখানে শ্রীকৃষ্ণ জীবনের একটি চক্রাকার ধারার কথা তুলে ধরেছেন। জন্ম, বৃদ্ধি, পরিবর্তন, মৃত্যু এবং পুনরায় প্রকাশ এই ধারাই প্রকৃতির নিয়ম। যেমন ঋতুর পরিবর্তনে পুরোনো পাতা ঝরে যায় এবং নতুন পাতা জন্ম নেয়, তেমনি জীবনের প্রকাশ বিভিন্ন রূপে চলমান থাকে।
তস্মাৎ শব্দের অর্থ হলো অতএব বা সেই কারণে। এই শব্দের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ পূর্বের যুক্তির ভিত্তিতে একটি সিদ্ধান্ত প্রদান করছেন। যেহেতু জন্ম ও মৃত্যু অনিবার্য, তাই অপরিহার্য বিষয়ে শোক করে মানুষের নিজের কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হওয়া উচিত নয়। এখানে তিনি অর্জুনকে অনুভূতির পরিবর্তে জ্ঞান দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করতে শিক্ষা দিচ্ছেন।
অপরিহার্য শব্দটির মধ্যেও গভীর অর্থ রয়েছে। এটি গঠিত হয়েছে অ উপসর্গ এবং পরিহার্য শব্দের সমন্বয়ে। পরিহার্য অর্থ এড়ানো যায় এমন কিছু এবং অপরিহার্য অর্থ যা কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়। মানুষের জীবনে অনেক ঘটনা ইচ্ছা অনুযায়ী পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু জন্ম ও মৃত্যু সেই সীমার বাইরে। এই সত্য উপলব্ধি করলে মানুষের মনে গ্রহণযোগ্যতা এবং মানসিক স্থিরতা আসে।
শোচিতুমর্হসি শব্দের অর্থ হলো শোক করা তোমার উচিত নয়। এখানে শ্রীকৃষ্ণ অনুভূতিহীন হতে বলেননি। তিনি বলেননি যে প্রিয়জনের বিচ্ছেদে মানুষের হৃদয়ে কষ্ট থাকবে না। বরং তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে জ্ঞানী ব্যক্তি শোককে এমন পর্যায়ে নিয়ে যান না যেখানে তা কর্তব্য, বিবেক এবং সত্য উপলব্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। প্রকৃত জ্ঞান শোককে ধ্বংস করে না, বরং তাকে সঠিক উপলব্ধির মাধ্যমে শান্তিতে রূপান্তরিত করে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক অত্যন্ত গভীর। সাংখ্য দর্শনের মতে, আত্মা চিরন্তন এবং দেহ পরিবর্তনশীল। দেহ প্রকৃতির অংশ হওয়ায় তার জন্ম ও বিনাশ আছে, কিন্তু আত্মা চেতনার মূল উৎস হওয়ায় তার কোনো ধ্বংস নেই। বেদান্ত দর্শনেও একই শিক্ষা পাওয়া যায় যে আত্মা নিত্য, শাশ্বত এবং অবিনশ্বর। মানুষের প্রকৃত পরিচয় দেহ নয়, বরং দেহের মধ্যে অবস্থানকারী চৈতন্য।
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের গুরুত্ব অনেক। মানুষ সাধারণত পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে পারে না বলেই দুঃখ ও ভয়ের মধ্যে পড়ে। মৃত্যু সম্পর্কে অজ্ঞতা মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করে। কিন্তু যখন মানুষ উপলব্ধি করে যে পরিবর্তন জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম, তখন তার মধ্যে মানসিক শক্তি ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায়।
প্রতীকী অর্থে জন্ম হলো নতুন সম্ভাবনার প্রতীক এবং মৃত্যু হলো পরিবর্তনের প্রতীক। মৃত্যু কোনো চূড়ান্ত অন্ধকার নয়, বরং একটি নতুন অবস্থায় প্রবেশের দ্বার। সাহিত্য, ধর্ম এবং আধ্যাত্মিক চিন্তায় মৃত্যু বারবার রূপান্তরের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। একটি বীজ মাটির নিচে বিলীন হয়ে যায়, কিন্তু সেই বিলীনতার মধ্য থেকেই নতুন বৃক্ষের জন্ম হয়। ঠিক তেমনি জীবনের প্রতিটি সমাপ্তির মধ্যেও নতুন সূচনার সম্ভাবনা থাকে।
বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার প্রয়োগ দেখা যায়। একজন মানুষ যখন প্রিয়জনকে হারায়, তখন তার হৃদয়ে স্বাভাবিকভাবেই কষ্ট জন্মায়। কিন্তু যদি সে উপলব্ধি করে যে জীবন একটি বৃহত্তর নিয়মের অংশ এবং প্রত্যেক সত্তার একটি নির্দিষ্ট যাত্রাপথ রয়েছে, তখন তার শোক ধীরে ধীরে শান্তিতে পরিণত হয়। একইভাবে জীবনের ব্যর্থতা, পরিবর্তন বা বিচ্ছেদকেও মানুষ নতুন অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখে।
এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষকে জীবনের অনিবার্য সত্যকে জ্ঞান দিয়ে উপলব্ধি করতে হবে। জন্ম এবং মৃত্যু প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম। দেহের পরিবর্তন ঘটলেও আত্মার অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে। তাই জ্ঞানী ব্যক্তি পরিবর্তনের মধ্যে স্থিরতা খুঁজে পান এবং অনিবার্য বিষয় নিয়ে অকারণ শোকে নিমজ্জিত হন না।
সবশেষে বলা যায়, জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ শ্লোকটি শুধু জন্ম ও মৃত্যুর ব্যাখ্যা নয়, এটি মানুষের চেতনার উন্নতির একটি শিক্ষা। এটি শেখায় যে জীবনকে গভীরভাবে বুঝতে হলে পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে হবে, আত্মার সত্য উপলব্ধি করতে হবে এবং অনিবার্য নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্তব্যের পথে অগ্রসর হতে হবে। এই উপলব্ধিই মানুষকে ভয়, শোক ও অস্থিরতার ঊর্ধ্বে তুলে প্রকৃত শান্তির দিকে নিয়ে যায়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!