শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের অষ্টাবিংশতি (২৮তম) শ্লোকের ব্যাখ্যা ও গভীর বিশ্লেষণ
অব্যক্তাদীনি ভুতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত।
অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা।।২৮।।
অনুবাদঃ হে ভারত! সমস্ত সৃষ্ট জীব উৎপন্ন হওয়ার আগে অপ্রকাশিত ছিল, তাদের স্থিতিকালে প্রকাশিত থাকে এবং বিনাশের পর আবার অপ্রকাশিত হয়ে যায়। সুতরাং, সেই জন্য শোক করার কি কারণ?
অর্থাৎ হে ভারত, সমস্ত জীবের আদি অব্যক্ত, তাদের মধ্যকাল ব্যক্ত বা প্রকাশিত এবং মৃত্যুর পর আবার তারা অব্যক্ত অবস্থায় ফিরে যায়। তাহলে এই স্বাভাবিক পরিবর্তনের জন্য শোক করার কারণ কী?
এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে ভারতীয় দর্শনের এক গভীর তত্ত্ব। এখানে শ্রীকৃষ্ণ শুধু মৃত্যু সম্পর্কে সান্ত্বনা দেননি, বরং সমগ্র অস্তিত্বের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে জীবনের যে অংশ আমরা দেখতে পাই তা সম্পূর্ণ অস্তিত্ব নয়, বরং এক বিশাল অদৃশ্য ধারার একটি ক্ষুদ্র প্রকাশ মাত্র।
অব্যক্ত শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ভাষা থেকে। এটি গঠিত হয়েছে অ এবং ব্যক্ত এই দুটি অংশের সমন্বয়ে। অ অর্থ হলো না বা অনুপস্থিত এবং ব্যক্ত অর্থ হলো প্রকাশিত বা দৃশ্যমান। তাই অব্যক্ত শব্দের অর্থ হলো যা প্রকাশিত নয়, যা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধ হয় না, যা অদৃশ্য অবস্থায় রয়েছে। ভারতীয় দর্শনে অব্যক্ত বলতে সেই সূক্ষ্ম অবস্থাকে বোঝানো হয় যেখান থেকে সমস্ত প্রকাশিত সৃষ্টি উদ্ভূত হয় এবং শেষ পর্যন্ত আবার সেই অবস্থাতেই ফিরে যায়।
ভূতানি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ধাতু ভূ থেকে, যার অর্থ হওয়া বা অস্তিত্ব লাভ করা। ভূতানি বলতে সমস্ত জীব, সমস্ত সৃষ্ট সত্তা বা অস্তিত্বশীল প্রাণীকে বোঝানো হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে পৃথিবীর প্রতিটি জীব একসময় অপ্রকাশিত অবস্থায় ছিল, কিছু সময়ের জন্য প্রকাশিত জীবন লাভ করে এবং পরে আবার অদৃশ্য অবস্থায় ফিরে যায়।
ব্যক্ত শব্দের অর্থ হলো প্রকাশিত, দৃশ্যমান বা উপলব্ধিযোগ্য। মানুষ যখন জন্মগ্রহণ করে তখন তার শরীর, নাম, পরিচয় ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশিত হয়। আমরা এই প্রকাশিত অবস্থাকেই জীবন বলে মনে করি। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে এই প্রকাশিত জীবন অস্তিত্বের সম্পূর্ণ রূপ নয়। এটি কেবল একটি মধ্যবর্তী পর্যায়।
নিধন শব্দের অর্থ হলো শেষ, বিলয় বা লয়। এখানে মৃত্যু বোঝাতে নিধন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে গীতার দৃষ্টিতে মৃত্যু কোনো সম্পূর্ণ ধ্বংস নয়। এটি কেবল একটি রূপান্তর। যেমন একটি প্রদীপের শিখা নিভে গেলে আগুনের শক্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় না, বরং অন্য কোনো অবস্থায় পরিবর্তিত হয়, তেমনি জীবনের প্রকাশিত রূপের অবসান হলেও অস্তিত্বের মূল সত্য বিলীন হয় না।
এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো জীবনের অস্থায়িত্বকে উপলব্ধি করা। মানুষ সাধারণত যা দেখতে পায় তাকেই চূড়ান্ত সত্য মনে করে। জন্মের পর যে শরীর, সম্পর্ক, সম্পদ ও পরিচয় তৈরি হয়, মানুষ তার সঙ্গেই গভীরভাবে নিজেকে যুক্ত করে ফেলে। ফলে যখন কোনো প্রিয় বস্তু বা ব্যক্তি হারিয়ে যায় তখন শোক সৃষ্টি হয়। শ্রীকৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে এই শোক মূলত অজ্ঞতা থেকে আসে, কারণ মানুষ পরিবর্তনশীল বিষয়কে স্থায়ী বলে ধরে নেয়।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক অত্যন্ত গভীর। অদ্বৈত বেদান্তের মতে, প্রকাশিত জগৎ পরিবর্তনশীল এবং চিরন্তন সত্য হলো ব্রহ্ম। যা আজ দেখা যাচ্ছে তা কাল পরিবর্তিত হবে, কিন্তু অস্তিত্বের মূল উৎস অপরিবর্তিত থাকে। তাই ব্যক্ত রূপের পরিবর্তনকে দেখে শোক করা উচিত নয়।
সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতে অব্যক্ত হলো প্রকৃতির সূক্ষ্ম অবস্থা। প্রকৃতি থেকেই প্রকাশিত জগতের সৃষ্টি হয় এবং পরিবর্তনের মাধ্যমে আবার সেই সূক্ষ্ম অবস্থায় ফিরে যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় একটি স্বাভাবিক চক্র।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের আসক্তি ও ভয়ের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করে। মানুষ যখন নিজের পরিচয়কে শুধুমাত্র বাহ্যিক শরীর, সামাজিক অবস্থান বা পার্থিব সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে তখন ক্ষতি ও পরিবর্তন তাকে ভেঙে দেয়। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করে যে জীবন একটি প্রবাহমান যাত্রা, তখন তার মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা ও মানসিক শান্তি জন্মায়।
প্রতীকী অর্থে অব্যক্ত হলো অজানা উৎস, ব্যক্ত হলো জীবনের প্রকাশ এবং নিধন হলো পুনরায় মূল উৎসে প্রত্যাবর্তন। প্রকৃতির দিকে তাকালেও আমরা এই সত্য দেখতে পাই। একটি বীজ মাটির নিচে অদৃশ্য থাকে, পরে গাছ হয়ে প্রকাশিত হয় এবং আবার নতুন বীজের মাধ্যমে সেই ধারায় ফিরে যায়। মেঘ আকাশ থেকে সৃষ্টি হয়, বৃষ্টি হয়ে পৃথিবীতে নামে এবং আবার জলীয় বাষ্প হয়ে আকাশে ফিরে যায়। অস্তিত্বের সব ক্ষেত্রেই এই প্রকাশ ও লয়ের চক্র বিদ্যমান।
এই শ্লোকের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে শেখাচ্ছেন যে মৃত্যু কোনো ভয়ংকর সমাপ্তি নয়, বরং অস্তিত্বের স্বাভাবিক পরিবর্তন। যেমন একজন মানুষ পুরোনো পোশাক ত্যাগ করে নতুন পোশাক গ্রহণ করে, তেমনি জীবনের প্রকাশিত রূপ পরিবর্তিত হয়। তাই জ্ঞানী ব্যক্তি পরিবর্তনের মধ্যে চিরন্তন সত্যকে উপলব্ধি করেন।
বাস্তব জীবনে এই শিক্ষা আমাদের অনেক দুঃখ ও ভয় থেকে মুক্ত করতে পারে। প্রিয়জনের মৃত্যু, জীবনের পরিবর্তন, সম্পর্কের বিচ্ছেদ বা কোনো ক্ষতি আমাদের কষ্ট দেয় কারণ আমরা ধরে নিই যে সবকিছু চিরকাল একই থাকবে। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম হলো পরিবর্তন। এই সত্য গ্রহণ করতে পারলে মানুষের মন স্থির ও শান্ত হতে পারে।
সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক চিন্তাতেও এই ধারণার প্রতিফলন দেখা যায়। বহু কবি ও সাধক জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং চিরন্তন অস্তিত্বের কথা বলেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন যে মানুষ কেবল একটি ক্ষণিক প্রকাশ, কিন্তু তার গভীরে রয়েছে এক অমর সত্যের উপস্থিতি।
অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত এই শ্লোকের সারমর্ম হলো সমস্ত জীবনের উৎস অদৃশ্য, জীবন হলো সেই অদৃশ্য সত্যের সাময়িক প্রকাশ এবং মৃত্যুর মাধ্যমে আবার সেই অদৃশ্য অবস্থায় প্রত্যাবর্তন। তাই পরিবর্তনকে ভয় নয়, বরং অস্তিত্বের স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। এই উপলব্ধিই মানুষকে শোকের ঊর্ধ্বে উঠতে সাহায্য করে এবং তাকে জীবনের গভীরতম সত্যের দিকে নিয়ে যায়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!