সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের বাহান্নতম (৫২তম) শ্লোকের ব্যাখ্যা ও গভীর বিশ্লেষণ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে


যদা তে মোহকলিলং বুদ্ধির্ব্যতিতরিষ্যতি।
তদা গন্তাসি নির্বেদং শ্রোতব্যস্য শ্রুতস্য চ।।৫২।।

অনুবাদঃ এভাবে পরমেশ্বর ভগবানে অর্পিত নিষ্কাম কর্ম অভ্যাস করতে করতে যখন তোমার বুদ্ধি মোহরূপ গভীর অরণ্যকে সম্পূর্ণরূপে অতিক্রম করবে,তখন তুমি যা কিছু শুনেছ এবং যা কিছু শ্রবণীয়, সেই সবের প্রতি সম্পূর্ণরুপে নিরপেক্ষ হতে পারবে। 

ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৫২তম শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর পরিবর্তনের কথা প্রকাশ করে। এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে, যখন মানুষের বুদ্ধি মোহের ঘন অন্ধকার অতিক্রম করে সত্যের আলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সে জীবনের বাহ্যিক আকর্ষণ, শোনা কথা এবং ভবিষ্যতে শোনার বিষয়ের প্রতিও এক ধরনের গভীর অনাসক্তি লাভ করে। এই শিক্ষা কেবল ধর্মীয় উপদেশ নয়, বরং মানুষের চেতনার বিবর্তনের এক চিরন্তন সত্য।

শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “মোহকলিল”। সংস্কৃত “মোহ” শব্দটি এসেছে “মুহ্” ধাতু থেকে, যার অর্থ হলো বিভ্রান্ত হওয়া, চেতনাকে আচ্ছন্ন করা বা সত্যকে ভুলভাবে উপলব্ধি করা। আর “কলিল” শব্দের অর্থ হলো ঘন জটিলতা, কাদা বা এমন একটি আবরণ যা স্বচ্ছতাকে ঢেকে রাখে। তাই “মোহকলিল” বলতে বোঝায় এমন এক মানসিক অন্ধকার, যেখানে মানুষ প্রকৃত সত্যকে দেখতে পারে না। কামনা, ভয়, অহংকার, আসক্তি এবং ভুল ধারণা মানুষের বুদ্ধিকে এই মোহের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখে।

এরপর আসে “বুদ্ধি” শব্দটি। সংস্কৃত “বুদ্ধি” শব্দটি “বুধ্” ধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ জাগ্রত হওয়া, জানা বা উপলব্ধি করা। বুদ্ধি হলো মানুষের সেই অন্তর্নিহিত শক্তি যা তাকে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। সাধারণ জ্ঞান এবং প্রকৃত বুদ্ধির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ জ্ঞান বাহ্যিক তথ্য সংগ্রহ করে, কিন্তু প্রকৃত বুদ্ধি জীবনের গভীর সত্য উপলব্ধি করে। যখন এই বুদ্ধি মোহের আবরণ থেকে মুক্ত হয়, তখন মানুষ নিজের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হয়।

“ব্যতিতরিষ্যতি” শব্দটি নির্দেশ করে অতিক্রম করার প্রক্রিয়াকে। এটি কেবল মোহের মধ্যে সাময়িকভাবে কমে যাওয়া নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে তার ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়া। যেমন একটি নৌকা নদীর স্রোত অতিক্রম করে অন্য পারে পৌঁছে যায়, তেমনি জ্ঞানী ব্যক্তি অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির স্রোত অতিক্রম করে আত্মজ্ঞান লাভ করেন।

শ্লোকের দ্বিতীয় অংশে “নির্বেদ” শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ অর্থে নির্বেদ মানে অনাসক্তি, বৈরাগ্য বা কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষণহীনতা। তবে এটি হতাশা বা বিরক্তি নয়। এটি হলো গভীর উপলব্ধির ফলে জন্ম নেওয়া এক ধরনের শান্ত অবস্থা, যেখানে মানুষ বাহ্যিক বিষয়ের ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতি বুঝতে পারে। সে আর বাহ্যিক অর্জন, প্রশংসা বা ইন্দ্রিয়সুখের মধ্যে চূড়ান্ত আনন্দ খোঁজে না।

“শ্রোতব্যস্য শ্রুতস্য চ” অংশটি আরও গভীর অর্থ বহন করে। এখানে বলা হয়েছে যা শোনা হয়েছে এবং যা ভবিষ্যতে শোনা হবে তার প্রতিও মানুষ নির্বেদ লাভ করবে। এর অর্থ এই নয় যে জ্ঞান বা শিক্ষা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। বরং এর অর্থ হলো সত্য উপলব্ধির পর মানুষ আর কেবল তথ্য সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সে জ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য উপলব্ধি করে। যেমন একজন ব্যক্তি মানচিত্র দেখে পথ সম্পর্কে ধারণা লাভ করে, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর আর মানচিত্র আঁকড়ে ধরে থাকে না। তেমনি আত্মজ্ঞান লাভের পর মানুষ বাহ্যিক জ্ঞানের সীমা অতিক্রম করে অভিজ্ঞতার জগতে প্রবেশ করে।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকটি মানুষের চেতনার উত্তরণের কথা বলে। অদ্বৈত বেদান্তের মতে, মোহ হলো অজ্ঞানতার প্রকাশ। মানুষ যখন নিজেকে কেবল দেহ, মন ও ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে এক করে দেখে, তখন সে মায়ার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু যখন বুদ্ধি পরিশুদ্ধ হয়, তখন সে নিজের আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করে। সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতে বুদ্ধির পরিশুদ্ধির মাধ্যমে পুরুষ ও প্রকৃতির পার্থক্য উপলব্ধি হয়। যোগ দর্শনে এই অবস্থাকে চিত্তের স্থিরতা ও অন্তরের বিশুদ্ধতার সঙ্গে তুলনা করা হয়।

প্রতীকী অর্থে “মোহকলিল” হলো জীবনের কুয়াশা, যা সত্যের পথকে আড়াল করে রাখে। “বুদ্ধি” হলো সেই আলো, যা কুয়াশা দূর করে পথ দেখায়। “অতিক্রম করা” হলো আত্মজাগরণের প্রতীক। আর “নির্বেদ” হলো সেই শান্ত অবস্থার প্রতীক যেখানে মানুষ বাহ্যিক নির্ভরতা থেকে মুক্ত হয়ে অন্তরের আনন্দে প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাস্তব জীবনে এর উদাহরণ দেখা যায়। একজন মানুষ যখন জীবনের শুরুতে অর্থ, সম্মান, প্রশংসা ও বাহ্যিক সাফল্যকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য মনে করে, তখন সে মোহের দ্বারা পরিচালিত হয়। কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতা ও গভীর চিন্তার মাধ্যমে যখন সে উপলব্ধি করে যে প্রকৃত শান্তি বাইরের অর্জনে নয়, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে। সে কাজ করে, দায়িত্ব পালন করে, কিন্তু ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত থাকে না।

এই শ্লোককে সূর্যের সঙ্গে তুলনা করা যায়। মেঘে ঢাকা থাকলে সূর্য দেখা যায় না, কিন্তু সূর্য কখনো অদৃশ্য হয় না। মেঘ সরে গেলে সূর্যের প্রকাশ ঘটে। তেমনি আত্মজ্ঞান মানুষের মধ্যে সবসময় বিদ্যমান থাকে, কিন্তু মোহের আবরণ তা ঢেকে রাখে। বুদ্ধির জাগরণের মাধ্যমে সেই আবরণ দূর হয়।

সুতরাং “যদা তে মোহকলিলং বুদ্ধির্ব্যতিতরিষ্যতি” শ্লোকটি মানুষের অন্তরের এক মহান যাত্রার কথা বলে। এটি অজ্ঞতা থেকে জ্ঞান, বিভ্রান্তি থেকে স্পষ্টতা, আসক্তি থেকে স্বাধীনতা এবং বাহ্যিক নির্ভরতা থেকে আত্মোপলব্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষা দেয়। এর মূল বার্তা হলো, প্রকৃত জ্ঞান তখনই প্রকাশিত হয় যখন বুদ্ধি মোহের সীমা অতিক্রম করে সত্যের আলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন মানুষ জগতকে ত্যাগ করে না, বরং জগতের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করে শান্তি ও প্রজ্ঞার সঙ্গে জীবনযাপন করে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 04, 2026 August 04, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি