সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৫৫ | স্থিতপ্রজ্ঞের প্রথম লক্ষণ ও আত্মতৃপ্তির শিক্ষা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে


প্রজহাতি যদা কামান্ সর্বান্ পার্থ মেনোগতান্। 
আত্মন্যেবাত্মনা তুষ্টঃ স্থিতপ্রজ্ঞস্তদোচ্যতে।।৫৫।।

অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন-হে পার্থ! জীব যখন মানসিক জল্পনা-কল্পনা থেকে উদ্ভুত সমস্ত মনোগত কাম পরিত্যাগ করে এবং তার মন যখন এভাবে পবিত্র হয়ে আত্মাতেই পূর্ণ পরিতৃপ্তি লাভ করে, তখনই তাকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয়। 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের পঞ্চান্নতম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানব জীবনের এক গভীর আধ্যাত্মিক অবস্থার ব্যাখ্যা করেছেন। এই শ্লোকে তিনি অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে, প্রকৃত জ্ঞানী বা স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি কে। মানুষের জীবনে অসংখ্য ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক টানাপোড়েন তাকে অস্থির করে তোলে। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের অন্তরের গভীরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সমস্ত মানসিক কামনা ত্যাগ করতে সক্ষম হন এবং নিজের আত্মার মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পান, তিনিই প্রকৃত অর্থে স্থিতপ্রজ্ঞ।

শ্লোকের প্রথম শব্দ “শ্রীভগবান্ উবাচ” অর্থাৎ “শ্রীভগবান বললেন” নির্দেশ করে যে এখানে সাধারণ কোনো নৈতিক শিক্ষা নয়, বরং পরম সত্যের উপলব্ধি থেকে উৎসারিত জ্ঞান প্রদান করা হচ্ছে। “ভগবান” শব্দের মধ্যে নিহিত রয়েছে ঐশ্বর্য, জ্ঞান, শক্তি, খ্যাতি, সৌন্দর্য ও বৈরাগ্যের পূর্ণতা। আর “উবাচ” শব্দের অর্থ হলো বললেন। অর্থাৎ পরম জ্ঞান ও উপলব্ধির অধিকারী শ্রীকৃষ্ণ এখানে মানুষের চেতনার সর্বোচ্চ বিকাশের পথ নির্দেশ করছেন।

এই শ্লোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “প্রজহাতি”। এটি গঠিত হয়েছে সংস্কৃত “প্র” উপসর্গ এবং “হা” ধাতু থেকে। “প্র” অর্থ সম্পূর্ণভাবে এবং “হা” অর্থ ত্যাগ করা। তাই “প্রজহাতি” বলতে বোঝায় সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা। এখানে সাধারণ ত্যাগের কথা বলা হয়নি, বরং মনের গভীরে জন্ম নেওয়া সমস্ত কামনা ও আকাঙ্ক্ষার বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

“কামান্” শব্দের অর্থ হলো কামনা বা ইচ্ছা। মানুষের জীবন মূলত বিভিন্ন ইচ্ছার দ্বারা পরিচালিত হয়। ধন, সম্মান, সুখ, ক্ষমতা ও ভোগের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে কর্মে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু যখন এই কামনা মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপ ভুলে যায়। গীতার শিক্ষা হলো কামনা থাকা অপরাধ নয়, কিন্তু কামনার দাস হয়ে যাওয়াই মানুষের অশান্তির কারণ।

“মনোগতান্” শব্দটি আরও গভীর অর্থ বহন করে। মন এবং গত এই দুটি অংশ নিয়ে শব্দটি গঠিত। এর অর্থ হলো যা মনের মধ্যে অবস্থান করে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে বাহ্যিক ইচ্ছার কথা বলছেন না, বরং মনের অন্তর্গত সূক্ষ্ম আকাঙ্ক্ষার কথা বলছেন। অনেক সময় মানুষ বাহ্যিকভাবে শান্ত থাকলেও তার মনের মধ্যে অসংখ্য বাসনা লুকিয়ে থাকে। স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি সেই অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষার উপরও জয় লাভ করেন।

এরপর আসে “আত্মন্যেব আত্মনা তুষ্টঃ”। এই অংশটি শ্লোকের সবচেয়ে গভীর দার্শনিক বক্তব্য। এর অর্থ হলো নিজের আত্মার মধ্যেই আত্মার দ্বারা সন্তুষ্ট থাকা। সাধারণ মানুষ আনন্দ খোঁজে বাইরের জগতে। সে মনে করে অর্থ, সম্পদ, সম্পর্ক বা প্রশংসার মাধ্যমে সুখ লাভ করা সম্ভব। কিন্তু গীতা বলছে প্রকৃত আনন্দ মানুষের নিজের মধ্যেই বিদ্যমান। আত্মজ্ঞান লাভকারী ব্যক্তি বাইরের পরিবর্তনশীল জগতের উপর নির্ভর না করে নিজের অন্তরের চেতনায় স্থিত থাকেন।

“স্থিতপ্রজ্ঞ” শব্দটি দুটি অংশে গঠিত। “স্থিত” অর্থ স্থির বা প্রতিষ্ঠিত এবং “প্রজ্ঞা” অর্থ গভীর জ্ঞান বা চেতনা। সুতরাং স্থিতপ্রজ্ঞ মানে এমন ব্যক্তি যার জ্ঞান অটল, যার মন পরিস্থিতির পরিবর্তনে বিচলিত হয় না। সুখে তিনি অহংকারে ভেসে যান না এবং দুঃখে ভেঙে পড়েন না। তিনি জীবনের দ্বন্দ্বের মধ্যেও অন্তরের শান্তি বজায় রাখতে পারেন।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকের গুরুত্ব অপরিসীম। অদ্বৈত বেদান্তের মতে আত্মাই মানুষের প্রকৃত পরিচয়। শরীর, মন ও ইন্দ্রিয় পরিবর্তনশীল, কিন্তু আত্মা চিরস্থায়ী। তাই আত্মার উপলব্ধি হলে মানুষ বাহ্যিক বিষয়ের উপর নির্ভরশীলতা অতিক্রম করতে পারে। সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতে পুরুষ বা চেতনা স্থির, আর প্রকৃতি পরিবর্তনশীল। স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি এই পার্থক্য উপলব্ধি করে চেতনার অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হন।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক মানুষ প্রায়ই অসন্তোষ, উদ্বেগ ও অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষার কারণে মানসিক অশান্তিতে ভোগে। গীতার এই শিক্ষা মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণ, মানসিক ভারসাম্য ও অন্তর্গত শান্তির পথ দেখায়। যে ব্যক্তি নিজের আবেগ ও ইচ্ছাকে পরিচালনা করতে পারেন, তিনি জীবনের প্রতিকূলতার মধ্যেও স্থির থাকতে পারেন।

প্রতীকী অর্থে কামনা হলো মনের অস্থিরতার প্রতীক, আত্মা হলো চিরন্তন সত্যের প্রতীক এবং স্থিতপ্রজ্ঞ হলো আত্মজাগরণের প্রতীক। সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক চিন্তায় এমন মানুষকে গভীর সমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়। যেমন অসংখ্য নদীর জল সমুদ্রে প্রবেশ করলেও সমুদ্র তার সীমা অতিক্রম করে না, তেমনি স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি অসংখ্য অভিজ্ঞতার মধ্যেও নিজের অন্তরের শান্তি হারান না।

বাস্তব জীবনে আমরা এমন অনেক মানুষ দেখতে পাই যারা বাহ্যিক সাফল্যের মাঝেও অশান্ত। আবার এমন মানুষও আছেন যারা সীমিত সম্পদের মধ্যেও গভীর শান্তি অনুভব করেন। পার্থক্যটি বাহ্যিক অবস্থায় নয়, বরং অন্তরের অবস্থায়। যে ব্যক্তি নিজের সুখকে বাইরের জিনিসের উপর নির্ভরশীল করে তোলেন, তিনি সহজেই অশান্ত হন। আর যে ব্যক্তি নিজের অন্তরের শক্তিকে উপলব্ধি করেন, তিনি স্থির ও শান্ত থাকেন।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোক তাই শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, এটি মানব জীবনের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক সত্য প্রকাশ করে। স্থিতপ্রজ্ঞ হওয়া মানে জগত থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং জগতের মধ্যেই থেকেও নিজের চেতনাকে স্থির রাখা। কামনার দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে আত্মার আনন্দে প্রতিষ্ঠিত হওয়াই এই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। ভাষাগত দিক থেকে এটি সংস্কৃতের একটি গভীর অর্থবহ রচনা, দার্শনিক দৃষ্টিতে এটি আত্মজ্ঞান লাভের পথ এবং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে এটি মানুষের অন্তর্নিহিত পূর্ণতার উপলব্ধির ঘোষণা। এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে প্রকৃত শান্তি বাইরে নয়, মানুষের নিজের অন্তরের মধ্যেই নিহিত।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 04, 2026 August 04, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি