সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৫৬ | স্থিতধী মুনির মহত্ত্ব, সুখ-দুঃখে সমত্ববোধের শিক্ষা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
 দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ।বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে।।৫৬।।
 দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ।
বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে।।৫৬।।

অনুবাদঃ ত্রিতাপ দুঃখ উপস্থিত হলেও যাঁর মন উদ্ভিগ্ন হয় না, সুখ উপস্থিত হলেও যাঁর স্পৃহা হয় না এবং যিনি রাগ, ভয় ও ক্রোধ থেকে মুক্ত, তিনিই স্থিতধী অর্থাৎ স্থিতপ্রজ্ঞ।

এই শ্লোকে ভগবান এমন এক ব্যক্তির পরিচয় দিয়েছেন যিনি জীবনের সুখ ও দুঃখের দ্বন্দ্ব অতিক্রম করে অন্তরের স্থিরতা লাভ করেছেন। এই অবস্থাকেই বলা হয়েছে স্থিতধী বা স্থির প্রজ্ঞার অবস্থা। এটি কেবল আবেগহীনতার শিক্ষা নয়, বরং আত্মজ্ঞান, মানসিক ভারসাম্য ও চেতনার সর্বোচ্চ বিকাশের একটি পথ।

দুঃখেষু শব্দটি এসেছে সংস্কৃত দুঃখ শব্দ থেকে। দুঃখ বলতে বোঝায় জীবনের কষ্ট, প্রতিকূলতা, বেদনা বা অপ্রিয় অভিজ্ঞতা। অনুদ্বিগ্নমনাঃ শব্দের অর্থ হলো এমন মন যা দুঃখের মধ্যেও বিচলিত হয় না। এখানে অনুদ্বিগ্ন শব্দটি বোঝায় এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে বাইরের পরিস্থিতি মানুষের অন্তরের শান্তিকে নষ্ট করতে পারে না। সাধারণ মানুষ দুঃখ এলে হতাশ হয়ে পড়ে, নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। কিন্তু স্থিতধী ব্যক্তি দুঃখকে জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং জ্ঞানের মাধ্যমে তার মোকাবিলা করেন।

সুখেষু বিগতস্পৃহঃ অংশে মানুষের আরেকটি গভীর দুর্বলতার কথা বলা হয়েছে। সুখ বা আনন্দ সাধারণত মানুষের মনে আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে। মানুষ সুখের অভিজ্ঞতাকে ধরে রাখতে চায় এবং বারবার তা পাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ভগবান বলছেন যে জ্ঞানী ব্যক্তি সুখের মধ্যেও অতিরিক্ত আসক্ত হন না। এর অর্থ এই নয় যে তিনি সুখ অনুভব করেন না, বরং তিনি সুখের দাস হয়ে পড়েন না। তিনি জানেন যে সুখও ক্ষণস্থায়ী এবং পরিবর্তনশীল।

বীতরাগভয়ক্রোধঃ শব্দটির মধ্যে মানুষের অন্তর্জগতের তিনটি প্রধান বন্ধনের কথা বলা হয়েছে। রাগ বা আসক্তি মানুষকে কোনো বস্তু, ব্যক্তি বা পরিস্থিতির সঙ্গে অতিরিক্তভাবে বেঁধে ফেলে। ভয় মানুষের স্বাধীনতাকে নষ্ট করে এবং ক্রোধ মানুষের বিবেককে আচ্ছন্ন করে দেয়। যিনি এই তিনটি দুর্বলতা অতিক্রম করতে পারেন, তিনি প্রকৃত আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারী হন। এখানে রাগ, ভয় ও ক্রোধকে শুধু আবেগ হিসেবে নয়, আত্মিক উন্নতির পথে বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

স্থিতধী শব্দটি দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। স্থিত অর্থ স্থির বা অবিচল এবং ধী অর্থ বুদ্ধি, জ্ঞান বা প্রজ্ঞা। অর্থাৎ স্থিতধী হলেন সেই ব্যক্তি যার বুদ্ধি বাহ্যিক পরিবর্তনের দ্বারা পরিবর্তিত হয় না। তিনি পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন না, বরং নিজের অন্তরের সত্য উপলব্ধির মাধ্যমে সবকিছুকে বিচার করেন। তাঁর মন শান্ত, চিন্তা পরিষ্কার এবং সিদ্ধান্ত সুসংগঠিত হয়।

মুনি শব্দের অর্থ সাধারণত ঋষি বা সাধক বোঝানো হলেও এখানে এর অর্থ আরও গভীর। মুনি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি নিজের অন্তরের সত্য অনুসন্ধান করেন। তিনি শুধু বাহ্যিক জ্ঞান অর্জন করেন না, বরং নিজের মন, ইন্দ্রিয় ও চেতনার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তাই ভগবান বলেছেন যে স্থির প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তিকেই প্রকৃত মুনি বলা হয়।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের মুক্তির পথ নির্দেশ করে। যোগ দর্শনের মতে, মন যখন বাইরের বিষয়ের দ্বারা ক্রমাগত প্রভাবিত হয় না এবং নিজের স্বরূপে স্থিত হয়, তখনই প্রকৃত যোগের সূচনা হয়। সাংখ্য দর্শনের মতে, ব্যক্তি যখন প্রকৃতির পরিবর্তনশীল গুণাবলি থেকে নিজেকে পৃথকভাবে উপলব্ধি করতে পারেন, তখন তিনি আত্মজ্ঞান লাভ করেন। বেদান্ত দর্শনে এই অবস্থাকে আত্মার সঙ্গে নিজের প্রকৃত সম্পর্ক উপলব্ধির ফল হিসেবে দেখা হয়।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এই শিক্ষার গভীর মূল্য রয়েছে। আধুনিক জীবনে মানুষ প্রায়ই প্রশংসা, সাফল্য, ব্যর্থতা, ভয় ও হতাশার দ্বারা পরিচালিত হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের আবেগকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখেন এবং আবেগের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়ে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তিনি মানসিকভাবে অধিক শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। স্থিতধী অবস্থাকে এক ধরনের উচ্চতর মানসিক স্থিতিশীলতা বলা যায়।

প্রতীকী অর্থে দুঃখ ও সুখ হলো জীবনের দুই বিপরীত তরঙ্গ। সাধারণ মানুষ এই তরঙ্গের সঙ্গে ওঠানামা করে, কিন্তু স্থিতধী ব্যক্তি সমুদ্রের গভীরতার মতো স্থির থাকেন। সমুদ্রের উপরে ঢেউ উঠলেও তার গভীরতা যেমন অপরিবর্তিত থাকে, তেমনি জ্ঞানীর অন্তর সুখ ও দুঃখের পরিবর্তনে অস্থির হয় না।

বাস্তব জীবনে এমন মানুষের উদাহরণ দেখা যায় যারা কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধরে থাকেন। একজন চিকিৎসক রোগীর সংকটের সময় আবেগে ভেঙে না পড়ে শান্তভাবে সিদ্ধান্ত নেন। একজন মহান নেতা কঠিন সময়ে ভয় বা ক্রোধের দ্বারা পরিচালিত না হয়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে পথ দেখান। একজন সাধক জীবনের পরিবর্তনকে গ্রহণ করেন এবং অন্তরের শান্তি বজায় রাখেন।

এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত শক্তি বাহ্যিক সাফল্যে নয়, বরং নিজের মনের উপর নিয়ন্ত্রণে। সুখ এলে উচ্ছ্বসিত হয়ে নিজের ভারসাম্য হারানো এবং দুঃখ এলে ভেঙে পড়া উভয়ই অজ্ঞতার লক্ষণ। জ্ঞানী ব্যক্তি জানেন যে জীবনের সব অভিজ্ঞতাই পরিবর্তনশীল। তাই তিনি কোনো কিছুর প্রতি অন্ধ আসক্ত হন না এবং কোনো পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হন না।

সারসংক্ষেপে বলা যায়, দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জগতের সর্বোচ্চ পরিপক্বতার পরিচয় বহন করে। এটি শেখায় যে প্রকৃত শান্তি বাহ্যিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে নয়, বরং নিজের চেতনার স্থিরতায় নিহিত। যে ব্যক্তি দুঃখে বিচলিত হন না, সুখে আসক্ত হন না এবং রাগ, ভয় ও ক্রোধকে অতিক্রম করেন, তিনিই প্রকৃত অর্থে জ্ঞানী, শান্ত ও মুক্ত মানুষের প্রতীক।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 04, 2026 August 04, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি