সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৫৭ | স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষের অনাসক্তি ও মানসিক সমতার শিক্ষা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে


য সর্বত্রানভিস্নেহস্তত্তৎ প্রাপ্য শুভাশুভম্।
নাভিনন্দতি ন দ্বেষ্টি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা।।৫৭।।

অনুবাদঃ জড় জগতে ‍যিনি সমস্ত জড় বিষয়ে আসক্তি রহিত, যিনি প্রিয় বস্তু লাভে আনন্দিত হন না এবং অপ্রিয় বিষয় উপস্থিত হলে দ্বেষ করেন না, তিনি পূর্ণ জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যে স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির লক্ষণ বর্ণনা করেছেন, তার মধ্যে এই শ্লোকটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। মানুষের জীবনে সুখ ও দুঃখ, লাভ ও ক্ষতি, সম্মান ও অপমান, সাফল্য ও ব্যর্থতা সবই অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাধারণ মানুষ এই দ্বন্দ্বের দ্বারা পরিচালিত হয়। ভালো কিছু ঘটলে সে অতিরিক্ত আনন্দিত হয় এবং অপ্রিয় কিছু ঘটলে দুঃখ, রাগ ও হতাশায় ভেঙে পড়ে। কিন্তু যিনি সত্য জ্ঞান লাভ করেছেন, যার বুদ্ধি আত্মার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তিনি জীবনের এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের অন্তরের শান্তি বজায় রাখতে পারেন। এই শ্লোক সেই গভীর মানসিক অবস্থার কথাই প্রকাশ করে।

এই শ্লোকের প্রথম শব্দ হলো যঃ, যার অর্থ হলো যে ব্যক্তি। এখানে এমন একজন মানুষের কথা বলা হয়েছে, যিনি সাধারণ মানসিক অবস্থার ঊর্ধ্বে উঠেছেন। এরপর এসেছে সর্বত্র শব্দটি। সর্বত্র অর্থ হলো সব স্থানে, সব অবস্থায়, জীবনের সকল পরিস্থিতিতে। অর্থাৎ কোনো বিশেষ স্থান বা সময়ে নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একজন স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি সমভাব বজায় রাখেন। তার শান্তি বাইরের ঘটনার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং তার অন্তরের জ্ঞান ও আত্ম উপলব্ধির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

শ্লোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো অনভিস্নেহ। এই শব্দটি সংস্কৃত স্নেহ ধাতু থেকে এসেছে। স্নেহ শব্দের সাধারণ অর্থ হলো ভালোবাসা, মমতা বা আকর্ষণ। কিন্তু এখানে স্নেহ বলতে সাধারণ মানবিক ভালোবাসাকে বোঝানো হয়নি। এখানে বোঝানো হয়েছে এমন এক ধরনের আসক্তি, যেখানে মানুষ কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা পরিস্থিতির সঙ্গে নিজের সুখকে অতিরিক্তভাবে যুক্ত করে ফেলে। অনভিস্নেহ অর্থ হলো সেই অতিরিক্ত আসক্তির অভাব। এর অর্থ এই নয় যে জ্ঞানী ব্যক্তি ভালোবাসাহীন বা হৃদয়হীন হয়ে যান। বরং তিনি ভালোবাসেন, কিন্তু আঁকড়ে ধরেন না। তিনি কর্তব্য করেন, কিন্তু ফলের প্রতি দাসত্ব স্বীকার করেন না।

মানুষের অধিকাংশ দুঃখের মূল কারণ হলো প্রত্যাশা ও আসক্তি। আমরা যখন কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে নিজের সুখের একমাত্র উৎস মনে করি, তখন তার পরিবর্তন বা বিচ্ছেদ আমাদের ভেতরে কষ্ট সৃষ্টি করে। স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি জানেন যে জগতের সবকিছু পরিবর্তনশীল। তাই তিনি কোনো কিছু পেলে অহংকার করেন না এবং হারালে ভেঙে পড়েন না। তার ভালোবাসা থাকে, কিন্তু বন্ধন থাকে না।

শ্লোকে বলা হয়েছে তত্তৎ প্রাপ্য শুভাশুভম্। তত্তৎ অর্থ হলো সেই সেই এবং প্রাপ্য অর্থ হলো লাভ করে বা অর্জন করে। জীবনে মানুষ বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়। কখনো শুভ ঘটনা ঘটে, কখনো অশুভ ঘটনা আসে। কখনো সাফল্য আসে, কখনো ব্যর্থতা আসে। কিন্তু স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি এই দুই অবস্থাকেই সমান দৃষ্টিতে গ্রহণ করেন। কারণ তিনি জানেন যে শুভ ও অশুভ উভয়ই সাময়িক এবং প্রকৃত আত্মসত্তার সঙ্গে এগুলোর কোনো স্থায়ী সম্পর্ক নেই।

নাভিনন্দতি ন দ্বেষ্টি এই অংশটি শ্লোকের মূল শিক্ষা প্রকাশ করে। নাভিনন্দতি অর্থ হলো অতিরিক্তভাবে আনন্দিত হন না এবং ন দ্বেষ্টি অর্থ হলো ঘৃণা বা বিদ্বেষ করেন না। সাধারণ মানুষ সুখকর বিষয়কে আঁকড়ে ধরে এবং দুঃখজনক বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করতে চায়। এই আকর্ষণ ও বিকর্ষণের মধ্যেই মানুষের মন সর্বদা অস্থির থাকে। কিন্তু স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি আনন্দ ও দুঃখের উভয় অবস্থাকে সমভাবে গ্রহণ করেন। তিনি পরিস্থিতির দাস না হয়ে পরিস্থিতির সাক্ষী হয়ে থাকেন।

এই অবস্থাকে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় আবেগীয় ভারসাম্য। একজন মানসিকভাবে পরিণত মানুষ নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করেন না, কিন্তু অনুভূতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিতও হন না। তিনি রাগ অনুভব করতে পারেন, দুঃখ অনুভব করতে পারেন, আনন্দ অনুভব করতে পারেন, কিন্তু কোনো অনুভূতিই তার বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করতে পারে না। গীতার স্থিতপ্রজ্ঞ ধারণা মূলত এই অন্তর্গত স্বাধীনতার কথাই বলে।

শব্দটি প্রজ্ঞা বিশেষভাবে গভীর তাৎপর্য বহন করে। প্রজ্ঞা সাধারণ জ্ঞান নয়, এটি এমন এক উপলব্ধি যা জীবনের প্রকৃত সত্যকে বুঝতে সাহায্য করে। প্রজ্ঞা শব্দটি গঠিত হয়েছে প্র এবং জ্ঞা থেকে। প্র অর্থ উৎকৃষ্ট বা বিশেষ এবং জ্ঞা অর্থ জানা। অর্থাৎ প্রজ্ঞা হলো গভীর ও উচ্চতর জ্ঞান। আর প্রতিষ্ঠিতা অর্থ হলো স্থিরভাবে প্রতিষ্ঠিত। তাই তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা অর্থ হলো তার জ্ঞান অটলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার বুদ্ধি আর বাইরের পরিবর্তনে বিচলিত হয় না।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক অত্যন্ত গভীর। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে মানুষ যখন নিজেকে কেবল শরীর ও মনের সঙ্গে এক করে দেখে, তখন সে সুখ ও দুঃখের দ্বারা প্রভাবিত হয়। কিন্তু যখন সে নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করে, তখন সে বুঝতে পারে যে আত্মা পরিবর্তনশীল জগতের ঊর্ধ্বে। তাই বাহ্যিক ঘটনা তার অন্তরের শান্তিকে নষ্ট করতে পারে না।

সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতে প্রকৃতির গুণসমূহ মানুষের জীবনে বিভিন্ন পরিবর্তন সৃষ্টি করে। কখনো আনন্দ, কখনো দুঃখ, কখনো আকাঙ্ক্ষা, কখনো বিরক্তি সৃষ্টি হয়। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি নিজেকে এই পরিবর্তনের সাক্ষী হিসেবে উপলব্ধি করেন। ফলে তিনি গুণের দ্বারা পরিচালিত না হয়ে নিজের চৈতন্য অবস্থায় স্থির থাকেন।

বৌদ্ধ দর্শনের সঙ্গে এই ভাবনার একটি গভীর মিল দেখা যায়। বৌদ্ধ দর্শনে উপেক্ষা বা সমভাবকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে যে আসক্তি ও বিদ্বেষ উভয়ই দুঃখের কারণ। গীতার এই শ্লোকও একই সত্যের দিকে নির্দেশ করে। তবে গীতার বিশেষত্ব হলো এটি আত্মার স্থায়ী উপলব্ধির মাধ্যমে এই সমতা অর্জনের কথা বলে।

প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকের স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি হলো গভীর সমুদ্রের মতো। সমুদ্রের উপরিভাগে ঢেউ ওঠে, কিন্তু তার গভীর স্তর শান্ত থাকে। তেমনি জীবনের বাহ্যিক ঘটনাগুলো একজন জ্ঞানীর মনকে স্পর্শ করলেও তার অন্তরের শান্তিকে নষ্ট করতে পারে না। তিনি ঝড়ের মধ্যেও স্থির দীপশিখার মতো অবস্থান করেন।

বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার অনেক উদাহরণ দেখা যায়। একজন ব্যক্তি কর্মক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করলে যদি অহংকারে ভেসে না যান এবং ব্যর্থ হলে যদি হতাশ হয়ে নিজের মূল্য ভুলে না যান, তবে তিনি এই শিক্ষার কাছাকাছি অবস্থান করছেন। একজন মা সন্তানের প্রতি গভীর ভালোবাসা রাখেন, কিন্তু সন্তানের জীবনের প্রতিটি ঘটনার ওপর নিজের মানসিক শান্তিকে নির্ভরশীল না করলে তার ভালোবাসা আরও নির্মল হয়। একজন নেতা প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত না হয়ে এবং সমালোচনায় ভেঙে না পড়ে যদি সত্য ও কর্তব্যের পথে থাকেন, তবে তিনিও স্থিতপ্রজ্ঞতার উদাহরণ সৃষ্টি করেন।

সাহিত্য ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেও এই ভাবনার গুরুত্ব অপরিসীম। বহু সাধক, ঋষি ও জ্ঞানী ব্যক্তি জীবনের প্রতিকূলতার মধ্যেও শান্ত থেকেছেন। তাদের শক্তি বাহ্যিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নয়, বরং নিজেদের মনকে নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারা বুঝেছিলেন যে প্রকৃত বিজয় বাইরের জগত জয় করা নয়, বরং নিজের মনকে জয় করা।

এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা বাহ্যিক অর্জনে নয়, বরং অন্তরের স্থিরতায়। যে ব্যক্তি সবকিছুর প্রতি অন্ধ আসক্তি ত্যাগ করে, শুভ ও অশুভ উভয় অবস্থাকে সমভাবে গ্রহণ করতে পারে এবং নিজের জ্ঞানকে আত্মসত্যে প্রতিষ্ঠিত রাখতে পারে, তার প্রজ্ঞাই প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠিত। ভগবদ্গীতার এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবনের পরিবর্তনশীলতার মধ্যেও একটি অপরিবর্তনীয় শান্তির কেন্দ্র রয়েছে। সেই কেন্দ্রকে উপলব্ধি করাই হলো স্থিতপ্রজ্ঞতার পথ এবং আত্মজ্ঞান লাভের অন্যতম প্রধান ধাপ।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 04, 2026 August 04, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি