সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৫৮ | কূর্মের ন্যায় ইন্দ্রিয় সংযম ও স্থিতপ্রজ্ঞের শিক্ষা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে


 যদা সংহরতে চায়ং কূর্মোহঙ্গানীব সর্বশঃ।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্টিতা।।৫৮।।

অনুবাদঃ কুর্ম যেমন তার অঙ্গসমূহ তার কঠিন বহিরাবরণের মধ্যে সঙ্কুচিত করে, তেমনই যে ব্যক্তি তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে প্রত্যাহার করে নিতে পারেন, তাঁর চেতনা চিন্ময় জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত। 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের এই অমর শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জীবনের এক গভীর সত্যকে প্রকাশ করে। শ্লোকে বলা হয়েছে, “যদা সংহরতে চায়ং কূর্ম্মোঽঙ্গানীব সর্ব্বশঃ। ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা।” অর্থাৎ যখন মানুষ কচ্ছপের মতো নিজের ইন্দ্রিয়সমূহকে তাদের বিষয় থেকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করতে পারে, তখনই তার প্রজ্ঞা বা জ্ঞান স্থির ও প্রতিষ্ঠিত হয়। এই শ্লোক শুধু ইন্দ্রিয় দমন করার কথা বলে না, বরং মানুষের মন, বুদ্ধি ও চেতনার উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব অর্জনের এক গভীর আধ্যাত্মিক পথ নির্দেশ করে।

এই শ্লোকের মূল শব্দ “সংহরতে” এসেছে সংস্কৃত ধাতু √হৃ থেকে, যার অর্থ হলো গ্রহণ করা, টেনে নেওয়া বা সরিয়ে আনা। এর সঙ্গে “সম্” উপসর্গ যুক্ত হয়ে শব্দটির অর্থ হয়েছে সম্পূর্ণভাবে নিজের মধ্যে ফিরিয়ে আনা বা প্রত্যাহার করা। এখানে প্রত্যাহার বলতে জোর করে কোনো কিছু দমন করা বোঝানো হয়নি, বরং নিজের চেতনার শক্তিকে বাইরের আকর্ষণ থেকে ফিরিয়ে এনে অন্তরের দিকে স্থাপন করাকে বোঝানো হয়েছে। “কূর্ম” শব্দের অর্থ কচ্ছপ। কচ্ছপ যেমন বিপদের সময় নিজের অঙ্গসমূহ খোলের মধ্যে গুটিয়ে নিয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখে, তেমনি জ্ঞানী ব্যক্তি বাইরের ইন্দ্রিয় বিষয়ের আকর্ষণ থেকে নিজের মনকে সরিয়ে আত্মসচেতনতার মধ্যে স্থাপন করেন।

“ইন্দ্রিয়াণি” শব্দটি মানুষের পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়কে নির্দেশ করে। চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বকের মাধ্যমে মানুষ বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। এই ইন্দ্রিয়গুলো নিজে খারাপ নয়, বরং এগুলো জ্ঞান লাভের মাধ্যম। কিন্তু যখন ইন্দ্রিয়গুলি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তখন মানুষের মন অস্থির হয়ে ওঠে। গীতা শিক্ষা দেয় যে সমস্যা ইন্দ্রিয়ের মধ্যে নয়, সমস্যা হলো ইন্দ্রিয়ের প্রতি মানুষের অতিরিক্ত আসক্তি। যে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়ের দাস হয়ে যায়, সে নিজের স্বাধীনতা হারায়। আর যে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়কে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখে, সে প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা”। প্রজ্ঞা অর্থ সাধারণ জ্ঞান নয়, বরং গভীর উপলব্ধি, আত্মজ্ঞান ও স্থির বুদ্ধি। প্রতিষ্ঠিতা অর্থ স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত বা অটল। অর্থাৎ যার মন বাইরের আকর্ষণ, সুখ, দুঃখ, লাভ, ক্ষতি বা প্রশংসা ও নিন্দার দ্বারা সহজে বিচলিত হয় না, তার মধ্যেই প্রকৃত প্রজ্ঞার উদয় হয়। এমন ব্যক্তি পরিস্থিতির দ্বারা পরিচালিত হন না, বরং নিজের অন্তর্গত জ্ঞান দ্বারা পরিচালিত হন।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক আত্মসংযমের একটি সর্বজনীন শিক্ষা বহন করে। যোগ দর্শনে ইন্দ্রিয় প্রত্যাহারকে আত্মউন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলা হয়েছে। যোগসূত্রে প্রত্যাহার হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে ইন্দ্রিয়সমূহ তাদের নিজ নিজ বিষয় থেকে সরে এসে মনের অনুসরণ করে। এর ফলে মানুষ ধীরে ধীরে বাইরের জগতের প্রভাব অতিক্রম করে নিজের অন্তরের সত্য উপলব্ধি করতে পারে। সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত স্বরূপ হলো চৈতন্য বা পুরুষ, কিন্তু ইন্দ্রিয় ও মন তাকে প্রকৃত জ্ঞান থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। তাই ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আত্মার প্রকৃত অবস্থাকে উপলব্ধি করা সম্ভব।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এই শিক্ষার গভীর গুরুত্ব রয়েছে। আধুনিক জীবনে মানুষ অসংখ্য উদ্দীপনা বা আকর্ষণের মধ্যে বসবাস করে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভোগের আকাঙ্ক্ষা ও বাহ্যিক সাফল্যের প্রতিযোগিতা মানুষের মনকে ক্রমাগত অস্থির করে তোলে। এই পরিস্থিতিতে কূর্মের মতো নিজের মনকে প্রয়োজনের সময় প্রত্যাহার করার ক্ষমতা মানসিক শান্তি ও একাগ্রতা বৃদ্ধি করে। যে ব্যক্তি নিজের মনোযোগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে নিজের জীবনকেও অধিকতর সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে পারে।

প্রতীকী অর্থে কচ্ছপ এখানে আত্মরক্ষা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতীক। কচ্ছপের খোল তার নিরাপদ আশ্রয়। মানুষের জন্য সেই আশ্রয় হলো তার অন্তরের স্থির চেতনা। বাইরের পৃথিবীতে যতই পরিবর্তন আসুক, যে ব্যক্তি নিজের অন্তরের শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে, সে জীবনের ঝড়ে সহজে ভেঙে পড়ে না। কচ্ছপ ধীরে চলে, কিন্তু স্থিরভাবে এগিয়ে যায়। একইভাবে আত্মসংযমী ব্যক্তি ধীর গতিতে হলেও নিশ্চিতভাবে জ্ঞান ও শান্তির পথে অগ্রসর হন।

বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার অনেক উদাহরণ দেখা যায়। একজন শিক্ষার্থী যদি পড়াশোনার সময় মোবাইল, বিনোদন বা অন্যান্য আকর্ষণ থেকে নিজের মন সরিয়ে নিতে পারে, তবে সে গভীর মনোযোগ অর্জন করতে পারে। একজন সাধক ধ্যানের সময় বাইরের শব্দ ও অনুভূতি উপেক্ষা করে নিজের চেতনার মধ্যে স্থিত হন। একজন সফল ব্যক্তি প্রলোভনের মুহূর্তে নিজের নীতি ও লক্ষ্যকে স্মরণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এসব ক্ষেত্রেই কূর্মের মতো ইন্দ্রিয় প্রত্যাহারের শিক্ষা কার্যকর হয়।

এই শ্লোকের গভীর বার্তা হলো মানুষের প্রকৃত শক্তি বাহ্যিক জগতকে জয় করার মধ্যে নয়, বরং নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে জয় করার মধ্যে নিহিত। যে ব্যক্তি নিজের আকাঙ্ক্ষা, আবেগ ও ইন্দ্রিয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তার বুদ্ধি স্থির হয় এবং সে জীবনের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। ইন্দ্রিয় সংযম কোনো নেতিবাচক দমন নয়, এটি আত্মশক্তির জাগরণ। কচ্ছপ যেমন নিজের অঙ্গকে নিজের মধ্যে ফিরিয়ে এনে নিরাপদ থাকে, তেমনি মানুষ যখন নিজের চেতনাকে অন্তরের সত্যের দিকে ফিরিয়ে আনে, তখন তার মধ্যে স্থির প্রজ্ঞা, শান্তি ও আত্মজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কারণেই ভগবদ্গীতার এই শিক্ষা শুধু আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য নয়, বরং প্রত্যেক মানুষের সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ জীবনের জন্য এক চিরন্তন পথনির্দেশ।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 04, 2026 August 04, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি