সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৫৯ | ইন্দ্রিয় সংযম ও পরম আনন্দের উপলব্ধির শিক্ষা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে


 বিষয়া বিনিবর্তস্তে নিরাহারস্য দেহিনঃ।
রসবর্জং রসোহপস্য পরং দৃষ্ট্বা নিবর্ততে।।৫৯।।

অনুবাদঃ দেহবিশিষ্ট জীব ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ থেকে নিবৃত্ত হতে পারে, কিন্তু তবুও ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের আসক্তি থেকে যায়। কিন্তু উচ্চতর স্বাদ আস্বাদন করার ফলে তিনি সেই বিষয়তৃষ্ণা থেকে চিরতরে নিবৃত্ত হন। 

এর প্রথম শব্দ “বিষয়া” অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ। সংস্কৃত “বিষয়” শব্দটি এমন সমস্ত বস্তু বা অভিজ্ঞতাকে বোঝায় যা মানুষের চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও স্পর্শেন্দ্রিয়কে আকর্ষণ করে। জাগতিক সুখ, ভোগের বস্তু, ইন্দ্রিয়ের আনন্দ এবং বাহ্যিক আকর্ষণ সবই বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। মানুষ জন্মের পর থেকেই এই বিষয়গুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং জীবনের অধিকাংশ সময় এগুলোর অনুসন্ধানে ব্যয় করে।

“বিনিবর্ত্তন্তে” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ধাতু √বৃত থেকে, যার অর্থ ফিরে আসা বা সরে যাওয়া। এর সঙ্গে উপসর্গ যুক্ত হয়ে এর অর্থ হয়েছে সম্পূর্ণভাবে ফিরে যাওয়া বা দূরে সরে যাওয়া। এই শব্দ দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে যখন একজন মানুষ ইন্দ্রিয় সংযমের অনুশীলন করে, তখন বাহ্যিক ভোগের বস্তু তার জীবন থেকে কিছুটা দূরে সরে যায়।

“নিরাহারস্য” শব্দটি অত্যন্ত গভীর অর্থ বহন করে। এখানে আহার বলতে শুধু খাদ্য গ্রহণ বোঝানো হয়নি। বরং ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যে সকল বস্তু মন গ্রহণ করে, তাকেও আহার বলা হয়েছে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়ের ভোগ থেকে নিজেকে বিরত রাখে, তাকে নিরাহার বলা হয়েছে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ দেখাচ্ছেন যে শুধু ইন্দ্রিয়ের বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়, কারণ মনের গভীরে সেই ভোগের আকর্ষণ থেকে যেতে পারে।

“দেহিনঃ” শব্দের অর্থ হলো দেহধারী জীব। এখানে মানুষকে শুধু শরীর হিসেবে দেখা হয়নি, বরং শরীরের মধ্যে অবস্থানকারী চৈতন্য বা আত্মার দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। ভগবদ্গীতার মূল শিক্ষা হলো মানুষ কেবল দেহ নয়, সে চিরন্তন আত্মা। তাই প্রকৃত পরিবর্তন বাহ্যিক দেহে নয়, অন্তরের চেতনার স্তরে ঘটতে হবে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “রস”। সংস্কৃতে রস শব্দের অর্থ স্বাদ, আনন্দ, অনুভূতি বা আকর্ষণ। এখানে রস বলতে শুধু কোনো বস্তু উপভোগের স্বাদ বোঝানো হয়নি, বরং সেই বস্তুর প্রতি মনের গভীর আকর্ষণকে বোঝানো হয়েছে। একজন মানুষ কোনো অভ্যাস ত্যাগ করলেও তার মনের মধ্যে সেই অভ্যাসের স্মৃতি ও আকর্ষণ থেকে যেতে পারে। সেই সূক্ষ্ম আকর্ষণই হলো রস।

শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে বাহ্যিক বিষয় থেকে দূরে থাকা সম্ভব, কিন্তু অন্তরের রস সহজে দূর হয় না। যেমন একজন ব্যক্তি ধূমপান ত্যাগ করতে পারে, কিন্তু অনেকদিন পর্যন্ত তার মনে ধূমপানের আকাঙ্ক্ষা থেকে যেতে পারে। একজন ব্যক্তি অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ বন্ধ করতে পারে, কিন্তু মনের মধ্যে সেই খাবারের প্রতি আকর্ষণ থাকতে পারে। এই অন্তরের আকর্ষণ দূর না হলে প্রকৃত মুক্তি আসে না।

এই শ্লোকের গভীর শিক্ষা হলো মানুষকে শুধু কোনো কিছু থেকে বিরত থাকতে হবে না, বরং তার চেতনার স্তরকে উন্নত করতে হবে। নিম্নতর আনন্দকে জোর করে দমন করলে তা আবার ফিরে আসতে পারে। কিন্তু যখন মানুষ উচ্চতর আনন্দ লাভ করে, তখন নিম্নতর আনন্দের প্রতি আকর্ষণ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।

এখানে “পরং দৃষ্ট্বা” শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ হলো পরমকে দর্শন করা বা উচ্চতর সত্য উপলব্ধি করা। মানুষ যখন আত্মার আনন্দ, ঈশ্বরের উপলব্ধি বা পরম সত্যের স্বাদ পায়, তখন জাগতিক আকর্ষণ তার কাছে ছোট হয়ে যায়। যেমন একটি শিশু খেলনার প্রতি আকৃষ্ট থাকে, কিন্তু বড় হয়ে যখন জীবনের গভীর আনন্দ ও দায়িত্ব উপলব্ধি করে, তখন সেই খেলনার আকর্ষণ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জগতের বিবর্তনের কথা বলে। বেদান্ত দর্শন অনুসারে মানুষের প্রকৃত স্বরূপ হলো আত্মা, যা চিরন্তন আনন্দের আধার। জাগতিক বস্তু থেকে পাওয়া আনন্দ ক্ষণস্থায়ী, কারণ তা পরিবর্তনশীল। কিন্তু আত্মিক আনন্দ স্থায়ী। তাই মানুষ যখন নিজের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করে, তখন বাহ্যিক আনন্দের প্রতি তার নির্ভরতা কমে যায়।

যোগ দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোক মন নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়। যোগের উদ্দেশ্য শুধু শরীর নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং মন ও ইন্দ্রিয়কে উচ্চতর চেতনার দিকে পরিচালিত করা। ইন্দ্রিয়কে জোর করে দমন করা নয়, বরং তাদের সঠিক পথে পরিচালনা করাই প্রকৃত যোগ।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলে যে কোনো অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য শুধু আচরণ বন্ধ করা যথেষ্ট নয়, বরং মনের গভীরে থাকা আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক পুরস্কারের ধারণা পরিবর্তন করতে হয়। শ্রীকৃষ্ণ বহু পূর্বেই এই সত্য প্রকাশ করেছেন যে বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণের চেয়ে অভ্যন্তরীণ রূপান্তর বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতীকী অর্থে এই শ্লোক মানুষের আত্মিক যাত্রার প্রতিচ্ছবি। “বিষয়” হলো বাইরের জগতের আকর্ষণ, “নিরাহার” হলো আত্মসংযমের পথ, “রস” হলো মনের গভীর আসক্তি এবং “পরং দর্শন” হলো চূড়ান্ত জ্ঞান লাভ। এটি মানুষের ভিতরের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রার প্রতীক।

ইতিহাস ও জীবনের বহু উদাহরণ এই সত্যকে প্রকাশ করে। অনেক সাধক ও জ্ঞানী ব্যক্তি জাগতিক ভোগ ত্যাগ করেছেন, কারণ তারা উচ্চতর কোনো আনন্দের সন্ধান পেয়েছিলেন। তাদের ত্যাগ কষ্টের কারণে নয়, বরং বৃহত্তর আনন্দের উপলব্ধির কারণে সম্ভব হয়েছে।

এই শ্লোককে একটি উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। একটি নদীর জল যদি অন্যদিকে প্রবাহিত করা হয়, তবে পুরনো পথ শুকিয়ে যায়। একইভাবে মানুষের মন যখন উচ্চতর সত্য ও আনন্দের দিকে প্রবাহিত হয়, তখন নিম্নতর আকর্ষণ ধীরে ধীরে শক্তি হারায়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে প্রকৃত সংযম মানে শুধু নিজেকে বঞ্চিত করা নয়, বরং নিজের চেতনার উন্নতি ঘটানো। মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত বাহ্যিক আনন্দের উপর নির্ভরশীল থাকে, ততক্ষণ তার মধ্যে আসক্তি থাকে। কিন্তু যখন সে নিজের অন্তরের চিরন্তন আনন্দ উপলব্ধি করে, তখন জাগতিক আকর্ষণ স্বাভাবিকভাবেই ক্ষীণ হয়ে যায়।

সার্বিকভাবে বলা যায়, “বিষয়া বিনিবর্ত্তন্তে নিরাহারস্য দেহিনঃ” শ্লোকটি মানব জীবনের এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করে। এটি শেখায় যে ইন্দ্রিয় দমন প্রকৃত মুক্তির প্রথম ধাপ হলেও শেষ ধাপ নয়। প্রকৃত মুক্তি আসে তখনই, যখন মানুষ পরম সত্যের আনন্দ উপলব্ধি করে এবং তার অন্তরের রস উচ্চতর চেতনার মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। এই শিক্ষা শুধু ধর্মীয় নয়, বরং মানব মন, আত্মোন্নতি ও জীবনের গভীর উপলব্ধির এক চিরন্তন পথনির্দেশ।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 04, 2026 August 04, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি