ভগবদ্গীতা দ্বিতীয় অধ্যায়, ৬ষ্ঠ শ্লোকের ব্যাখ্যা: অর্জুনের নৈতিক সংকট, কর্তব্যের দ্বন্দ্ব ও শ্রেয় পথের অনুসন্ধান
ন বৈচতসি দ্মঃ কতরজেম্না গরীজেয়া র্য া জজেয়ম র্যসিদ বা গ া জজেয়য়ুঃ
র্যাজে ব হত্বা সিজজীসিবর্ষামস্ গতঽবসিস্থতাঃ প্রমুজেখ ধাত্তরাষ্ট্রাঃ॥৬॥
অনুবাদ : গকাসি গক গকা সিট আমাজেদর অসিধক গ য় তাহা বুসি জেতসি া। া, জয় পরাজয় র্যাহাই হউক, র্যাহাসিদগজেক বধ কসিরয়া আমরা বাঁসিচজেতও ইচ্ছা কসির া, গসই ধৃতরাষ্ট্র পুৎত্রগণ র্যুদ্ধাথ পুজেরাভাজেগ অবসিস্থত রসিহয়াজে ॥৬॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের ষষ্ঠ শ্লোকটি মানব মনের এক গভীর দ্বন্দ্ব ও নৈতিক সংকটের অসাধারণ প্রকাশ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে অর্জুন যখন নিজের আত্মীয়, গুরু, বন্ধু ও স্বজনদের বিপক্ষে যুদ্ধ করার পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, তখন তাঁর অন্তরে এক ভয়াবহ দ্বিধার সৃষ্টি হয়। তিনি উপলব্ধি করেন যে এই যুদ্ধের জয়ও হয়তো তাঁর জন্য প্রকৃত সুখ বয়ে আনবে না। কারণ যে বিজয় আপনজনের বিনাশের মাধ্যমে অর্জিত হয়, সেই বিজয়ের মূল্য কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটিই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এই শ্লোকের মাধ্যমে অর্জুন শুধু একজন যোদ্ধার দ্বিধা প্রকাশ করেননি, বরং সমগ্র মানবজাতির চিরন্তন নৈতিক সংকটকে প্রকাশ করেছেন।
এই শ্লোকের প্রথম অংশ হলো “ন চৈতদ্বিদ্মঃ কতরম্নো গরীয়ো”। এখানে “ন” শব্দের অর্থ হলো না, “চৈতৎ” অর্থ হলো এবং এটি, আর “বিদ্মঃ” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ধাতু √বিদ্ থেকে, যার অর্থ জানা। অর্থাৎ “আমরা জানি না”। “কতরম্” অর্থ কোনটি এবং “গরীয়ঃ” শব্দের অর্থ অধিক শ্রেষ্ঠ বা অধিক কল্যাণকর। সব মিলিয়ে এই অংশের অর্থ দাঁড়ায়, আমরা জানি না কোন পথটি আমাদের জন্য অধিক শ্রেয়। এই বাক্যের মধ্যে অর্জুনের মানসিক অবস্থার গভীর প্রকাশ রয়েছে। তিনি শক্তিশালী যোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও নিজের কর্তব্য ও হৃদয়ের অনুভূতির মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে পাচ্ছেন না।
“যদ্বা জয়েম যদি বা নো জয়েয়ুঃ” অংশে অর্জুন আরও গভীর প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। এখানে “জয়েম” শব্দটি এসেছে √জি ধাতু থেকে, যার অর্থ জয় করা। “জয়েয়ুঃ” অর্থ তারা জয়ী হবে। অর্জুন বলছেন, আমরা জয়ী হব নাকি তারা জয়ী হবে, তা আমরা জানি না। কিন্তু এই অজ্ঞতা সাধারণ যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে নয়, বরং জীবনের প্রকৃত অর্থ নিয়ে। কারণ বাহ্যিক জয় সবসময় প্রকৃত জয় নয়। কখনও কখনও একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে সফল হয়েও অন্তরে পরাজিত হতে পারে। আবার কখনও বাহ্যিক পরাজয়ের মধ্যেও নৈতিক বিজয় লুকিয়ে থাকতে পারে।
শ্লোকের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অংশ হলো “যানেব হত্বা ন জিজীবিষামস্”। এখানে “হত্বা” শব্দটি এসেছে √হন্ ধাতু থেকে, যার অর্থ হত্যা করা। “জিজীবিষামস্” শব্দটি এসেছে √জীব্ ধাতু থেকে, যার অর্থ বেঁচে থাকা। এর সঙ্গে ইচ্ছার ভাব যুক্ত হয়ে হয়েছে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা। অর্জুন বলছেন, যাদের হত্যা করে আমরা বাঁচতেও চাই না। এই বক্তব্যের মধ্যে তাঁর গভীর মানবিকতা প্রকাশ পেয়েছে। একজন যোদ্ধার জন্য শত্রুকে পরাজিত করা স্বাভাবিক বিষয় হলেও, যখন সেই শত্রুরা নিজের পরিবার ও প্রিয়জন হয়, তখন যুদ্ধের অর্থ সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে যায়।
“তেঽবস্থিতাঃ প্রমুখে ধার্ত্তরাষ্ট্রাঃ” অংশে বলা হয়েছে, সেই ধৃতরাষ্ট্রের পুত্ররা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। “অবস্থিতাঃ” শব্দের অর্থ দাঁড়িয়ে থাকা বা উপস্থিত থাকা। “প্রমুখে” অর্থ সামনে। “ধার্ত্তরাষ্ট্রাঃ” বলতে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের বোঝানো হয়েছে। এখানে কৌরবরা শুধু একটি রাজবংশের প্রতিনিধি নয়, বরং প্রতীকী অর্থে মানুষের জীবনের সেই সমস্ত শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে, যেগুলো মানুষের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত হয়।
ভাষাগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক সংস্কৃত ভাষার গভীর সৌন্দর্যের একটি উদাহরণ। প্রতিটি শব্দের মধ্যে শুধু ব্যাকরণিক অর্থ নয়, একটি সম্পূর্ণ মানসিক অবস্থা প্রকাশ পেয়েছে। “বিদ্মঃ” শব্দের মাধ্যমে অনিশ্চয়তা, “গরীয়ঃ” শব্দের মাধ্যমে শ্রেয় পথের অনুসন্ধান, “জিজীবিষামস্” শব্দের মাধ্যমে জীবনের প্রতি আকাঙ্ক্ষা এবং “অবস্থিতাঃ” শব্দের মাধ্যমে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক কর্ম, কর্তব্য ও নৈতিকতার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গভীর চিন্তার জন্ম দেয়। একজন মানুষ জীবনে অনেক সময় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় যেখানে কোনো সিদ্ধান্তই সম্পূর্ণ সহজ নয়। একদিকে থাকে দায়িত্ব, অন্যদিকে থাকে আবেগ। একদিকে থাকে ব্যক্তিগত লাভ, অন্যদিকে থাকে বৃহত্তর কল্যাণ। অর্জুনের এই দ্বিধা আসলে প্রত্যেক মানুষের অন্তরের দ্বিধা। একজন চিকিৎসক, একজন বিচারক, একজন প্রশাসক কিংবা একজন সাধারণ মানুষও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারেন যেখানে সঠিক পথ নির্বাচন কঠিন হয়ে ওঠে।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানব আত্মার জাগরণের সূচনা নির্দেশ করে। অর্জুন এখানে দুর্বল নন, বরং তিনি গভীর চিন্তাশীল। তিনি প্রশ্ন করছেন কারণ তিনি জীবনের সত্যকে উপলব্ধি করতে চাইছেন। তাঁর এই প্রশ্ন থেকেই পরবর্তীতে কৃষ্ণের জ্ঞান, কর্মযোগ, ভক্তিযোগ ও আত্মজ্ঞানের শিক্ষা প্রকাশিত হয়। তাই অর্জুনের বিষাদকে কেবল হতাশা বলা যায় না, এটি জ্ঞানের পথে প্রথম পদক্ষেপ।
প্রতীকী অর্থে কুরুক্ষেত্র হলো মানুষের নিজের জীবনক্ষেত্র। প্রতিটি মানুষের ভেতরে প্রতিনিয়ত একটি যুদ্ধ চলে। একদিকে থাকে লোভ, অহংকার, ভয় ও আসক্তি, অন্যদিকে থাকে বিবেক, সত্য ও কর্তব্য। অর্জুন সেই মানব আত্মার প্রতীক, যে নিজের অন্তরের দ্বন্দ্বের সামনে দাঁড়িয়ে সঠিক পথ খুঁজছে। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্ররা এখানে শুধু ঐতিহাসিক চরিত্র নয়, বরং মানুষের অন্তরের নেতিবাচক প্রবৃত্তির প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়।
বাস্তব জীবনের উদাহরণে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি যদি এমন একটি কাজের সুযোগ পান যা তাকে প্রচুর অর্থ দেবে কিন্তু তা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, তখন তাঁর মধ্যেও অর্জুনের মতো দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। তিনি ভাবেন, লাভের জন্য কি নিজের মূল্যবোধ বিসর্জন দেওয়া উচিত। আবার ইতিহাসেও দেখা যায়, অনেক মহান ব্যক্তি ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে ন্যায় ও সত্যের পথ বেছে নিয়েছেন, যদিও সেই পথ কঠিন ছিল।
সাহিত্যিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের সঙ্গে বিশ্বের বহু মহান রচনার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন একজন মানুষ যখন নিজের অস্তিত্ব, দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করে, তখন সেই প্রশ্ন মানব সভ্যতার সবচেয়ে গভীর চিন্তার অংশ হয়ে ওঠে। অর্জুনের প্রশ্ন তাই শুধু একটি যুদ্ধের প্রশ্ন নয়, এটি মানুষের জীবনের অর্থ খোঁজার প্রশ্ন।
সবশেষে বলা যায়, “ন চৈতদ্বিদ্মঃ কতরম্নো গরীয়ো যদ্বা জয়েম যদি বা নো জয়েয়ুঃ” শ্লোকটি ভাষাগত সৌন্দর্য, নৈতিক গভীরতা এবং দার্শনিক তাৎপর্যের এক অনন্য উদাহরণ। এটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃত জীবনসংগ্রামে শুধু জয় লাভ করাই বড় বিষয় নয়, বরং কোন পথে জয় অর্জিত হচ্ছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের প্রকৃত বিজয় তখনই সম্ভব, যখন সে নিজের অন্তরের দ্বন্দ্ব অতিক্রম করে সত্য, কর্তব্য ও ন্যায়ের পথ উপলব্ধি করতে পারে। এই কারণেই এই শ্লোক হাজার বছর পরেও মানব জীবনের সিদ্ধান্ত, নৈতিকতা ও আত্মঅনুসন্ধানের এক চিরন্তন পথপ্রদর্শক হয়ে রয়েছে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!