সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৬০ | ইন্দ্রিয়ের প্রবল আকর্ষণ ও মনের নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে


 যততো হ্যপি কৌন্তেয় পুরুষস্য বিপশ্চিতঃ। 
ইন্দ্রিয়াণি প্রমাথীনি হরন্তি প্রসভং মনঃ।।৬০।।

অনুবাদঃ হে কোন্তেয়! ইন্দ্রিয়সমূহ এতই বলবান এবং ক্ষোভকারী যে, তারা অতি যত্মশীল বিবেকসম্পন্ন পুরুষের মনকেও বলপূর্বক বিষয়াভিমুখে আকর্ষণ করে। 

এই শ্লোকের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে মানুষ যতই জ্ঞানী হোক, যতই আত্মসংযমের চেষ্টা করুক, তবুও যদি ইন্দ্রিয়ের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে সেই ইন্দ্রিয়সমূহ অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে মানুষের মনকে জোরপূর্বক নিজের দিকে আকর্ষণ করতে পারে। এখানে মানুষের অন্তর্জগতের এক চিরন্তন সংগ্রামের কথা বলা হয়েছে। একদিকে রয়েছে জ্ঞান, বিবেক ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি, অন্যদিকে রয়েছে ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণ ও ভোগের প্রবল টান।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “যততো”। সংস্কৃত “যত” ধাতু থেকে এই শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ চেষ্টা করা, নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়াস করা বা সাধনা করা। অর্থাৎ এখানে এমন একজন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে যিনি নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন। পরবর্তী শব্দ “কৌন্তেয়” দ্বারা অর্জুনকে বোঝানো হয়েছে। কুন্তীর পুত্র হওয়ার কারণে অর্জুনকে কৌন্তেয় বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে এই শিক্ষা শুধু অর্জুনের জন্য নয়, বরং সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য।

“পুরুষস্য বিপশ্চিতঃ” শব্দদ্বয়ের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে জ্ঞানী ও বিবেকবান মানুষের কথা। “বিপশ্চিত” শব্দের অর্থ হলো যিনি গভীরভাবে দেখতে পারেন, যিনি সত্য উপলব্ধি করার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ এখানে একটি বিস্ময়কর সত্য তুলে ধরেছেন। একজন জ্ঞানী ব্যক্তিও ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ নন। শুধু জ্ঞান অর্জন করলেই মন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত হয় না। জ্ঞানের সঙ্গে প্রয়োজন অনুশীলন, আত্মসংযম ও অন্তরের শুদ্ধতা।

“ইন্দ্রিয়াণি” শব্দটি মানুষের পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়কে নির্দেশ করে। চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বকের মাধ্যমে মানুষ বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। এই ইন্দ্রিয়গুলি নিজেরা খারাপ নয়, কিন্তু যখন এগুলি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, তখন এগুলিই মানুষের বন্ধনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। “প্রমাথীনি” শব্দের অর্থ হলো প্রবলভাবে অস্থিরকারী বা বিচলিতকারী। এই শব্দের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে ইন্দ্রিয়ের শক্তি অত্যন্ত প্রবল। এগুলি মানুষের মনকে শান্ত অবস্থা থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে আকাঙ্ক্ষা, আসক্তি ও অস্থিরতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

“হরন্তি প্রসভং মনঃ” অংশটি এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর অর্থ বহন করে। “হরন্তি” শব্দের অর্থ হলো হরণ করা বা ছিনিয়ে নেওয়া এবং “প্রসভং” অর্থ হলো জোরপূর্বক। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়সমূহ কখনো কখনো এমন শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে তারা মানুষের মনকে তার নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে টেনে নিয়ে যায়। মানুষ অনেক সময় জানে কোন কাজটি তার জন্য ক্ষতিকর, তবুও সে সেই কাজের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এই অবস্থাই ইন্দ্রিয়ের দ্বারা মনের পরাজয়।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক মানুষের অস্তিত্বের একটি মৌলিক সমস্যার ব্যাখ্যা দেয়। সাংখ্য দর্শনে বলা হয় যে মানুষের প্রকৃত সত্তা হলো পুরুষ বা চৈতন্য, আর মন ও ইন্দ্রিয় হলো প্রকৃতির অংশ। যখন চৈতন্য নিজের প্রকৃত অবস্থাকে ভুলে গিয়ে ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত পরিচিত হয়ে পড়ে, তখন মানুষ বন্ধনের মধ্যে আবদ্ধ হয়। যোগ দর্শনেও বলা হয়েছে যে মনের অস্থিরতা দূর করতে হলে ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ অশান্ত ইন্দ্রিয় কখনো স্থির মন সৃষ্টি করতে পারে না।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এই শ্লোক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলে যে মানুষের মস্তিষ্কে আকাঙ্ক্ষা ও যুক্তির মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। একজন ব্যক্তি জানেন যে অতিরিক্ত ভোগ, আসক্তি বা ক্ষতিকর অভ্যাস তার জন্য ভালো নয়, কিন্তু তবুও অনেক সময় সে সেই অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেন না। গীতার এই শিক্ষা সেই মানবিক দুর্বলতারই একটি প্রাচীন বিশ্লেষণ।

প্রতীকী অর্থে ইন্দ্রিয় হলো বাইরের জগতের আকর্ষণের প্রতীক, মন হলো মানুষের অভ্যন্তরীণ জগতের প্রতীক এবং ইন্দ্রিয়ের দ্বারা মনের হরণ হলো আত্মনিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রতীক। সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক চিন্তায় এই বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। মানুষ যখন নিজের অন্তরের শক্তিকে জাগ্রত করতে পারে না, তখন বাহ্যিক আকর্ষণ তাকে পরিচালিত করে। কিন্তু যে ব্যক্তি আত্মজ্ঞান ও সংযমের পথে এগিয়ে যায়, সে ধীরে ধীরে নিজের মনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।

বাস্তব জীবনে এর অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন শিক্ষার্থী জানে যে নিয়মিত পড়াশোনা তার ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু মোবাইল ফোন বা বিনোদনের আকর্ষণ তাকে বারবার পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। একজন ব্যক্তি জানেন যে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তবুও জিহ্বার আকর্ষণ তাকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য করে। এই সমস্ত ঘটনা ইন্দ্রিয়ের শক্তি ও মনের দুর্বলতার পরিচয় দেয়।

অর্জুনের জীবনেও এই সত্য প্রকাশ পেয়েছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে অর্জুন জ্ঞানী ও বীর হওয়া সত্ত্বেও আবেগ, মায়া ও মানসিক দ্বন্দ্বের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে শিক্ষা দিয়েছিলেন যে সত্য উপলব্ধির জন্য মনকে স্থির করতে হবে এবং ইন্দ্রিয়ের টান অতিক্রম করতে হবে।

এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত সংগ্রাম বাইরের জগতের সঙ্গে নয়, নিজের অন্তরের অস্থিরতার সঙ্গে। জ্ঞান মানুষকে পথ দেখায়, কিন্তু আত্মসংযম তাকে সেই পথে চলার শক্তি দেয়। ইন্দ্রিয়কে শত্রু মনে না করে তাদের সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হয়। কারণ নিয়ন্ত্রিত ইন্দ্রিয় মানুষের উন্নতির মাধ্যম হয়ে ওঠে, আর অনিয়ন্ত্রিত ইন্দ্রিয় মানুষকে পতনের দিকে নিয়ে যায়।

সারসংক্ষেপে বলা যায়, “যততো হ্যপি কৌন্তেয় পুরুষস্য বিপশ্চিতঃ” শ্লোকটি মানব মনের গভীর রহস্য উন্মোচন করে। এটি শেখায় যে শুধু জ্ঞান অর্জন করলেই মুক্তি সম্ভব নয়, প্রয়োজন সেই জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগ করা। ইন্দ্রিয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ, মনের স্থিরতা এবং আত্মসচেতনতার মাধ্যমে মানুষ নিজের প্রকৃত শক্তিকে উপলব্ধি করতে পারে। এই শ্লোক তাই শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, বরং মানব মনোবিজ্ঞান, দর্শন ও আত্মউন্নতির এক চিরন্তন পথনির্দেশ।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 04, 2026 August 04, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি