শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৬১ | ইন্দ্রিয় সংযম ও স্থিতপ্রজ্ঞের পথে আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা
তানি সর্বাণি সংযম্য যুক্ত আসীত মৎপরঃ।
বশে হি যস্যেন্দ্রিয়াণি তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা।।৬১।।
অনুবাদঃ যিনি তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্ণরুপে সংযত করে আমার প্রতি উত্তমা ভক্তিপরায়ণ হয়ে তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্ণরুপে বশীভুত করেছেন, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ।
এই শ্লোকের মূল ভাব হলো, মানুষ যদি তার সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সংযত করে, মনকে সর্বোচ্চ সত্যের দিকে নিবদ্ধ রাখে এবং আত্মিক চেতনায় প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তার প্রজ্ঞা বা জ্ঞান স্থির ও অটল হয়ে ওঠে। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে প্রকৃত জ্ঞান কেবল বাহ্যিক শিক্ষা বা তথ্যের মাধ্যমে অর্জিত হয় না, বরং নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে অন্তরের স্থিরতা লাভ করা যায়।
“তানি” শব্দের অর্থ হলো সেই সমস্ত বা সেগুলো। এখানে এটি পূর্বে আলোচিত ইন্দ্রিয়সমূহকে নির্দেশ করছে। “সর্ব্বাণি” শব্দের অর্থ হলো সমস্ত বা সম্পূর্ণ। অর্থাৎ শুধু কোনো একটি ইন্দ্রিয় নয়, বরং মানুষের সমস্ত ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলা হয়েছে। মানুষের চোখ, কান, জিহ্বা, নাক, ত্বক এবং মন প্রতিনিয়ত বাইরের জগতের নানা আকর্ষণের দিকে ছুটে চলে। এই ইন্দ্রিয়গুলোর আকর্ষণ যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়, তবে মানুষের মন অস্থির হয়ে পড়ে এবং তার বিচারশক্তি দুর্বল হয়ে যায়।
“সংযম্য” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ধাতু “যম” থেকে, যার অর্থ নিয়ন্ত্রণ করা বা সংযত করা। এর সঙ্গে “সম” উপসর্গ যুক্ত হয়ে এর অর্থ হয়েছে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। এই সংযম কোনো জোরপূর্বক দমন নয়, বরং সচেতন নিয়ন্ত্রণ। যেমন একজন দক্ষ রথচালক ঘোড়াগুলোকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা করেন, তেমনি জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের ইন্দ্রিয়কে সঠিক পথে পরিচালিত করেন।
“যুক্ত” শব্দটি এসেছে “যুজ” ধাতু থেকে, যার অর্থ হলো যুক্ত হওয়া বা মিলিত হওয়া। এখানে যুক্ত বলতে বোঝানো হয়েছে যোগে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। অর্থাৎ যার মন বিচ্ছিন্ন নয়, বরং আত্মিক সত্যের সঙ্গে যুক্ত। “আসীত” শব্দের অর্থ হলো অবস্থান করা বা স্থির থাকা। এই দুটি শব্দ একত্রে বোঝায় যে মানুষকে এমন এক অবস্থায় থাকতে হবে যেখানে তার মন শান্ত, স্থির এবং উচ্চতর চেতনার সঙ্গে যুক্ত থাকে।
“মৎপরঃ” শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। “মৎ” অর্থ আমার এবং “পর” অর্থ সর্বোচ্চ লক্ষ্য। অর্থাৎ যিনি ভগবানকে বা পরম সত্যকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। এই শব্দের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে শুধু ইন্দ্রিয় দমন করলেই হবে না, মনকে একটি উচ্চতর আদর্শের দিকে নিবদ্ধ করতে হবে। কারণ শূন্যতা কখনো স্থায়ী সংযম আনতে পারে না। নিম্নতর আকর্ষণ থেকে মনকে সরিয়ে উচ্চতর সত্যের দিকে স্থাপন করাই প্রকৃত সাধনা।
“বশে” শব্দের অর্থ নিয়ন্ত্রণে বা অধীনে। “ইন্দ্রিয়াণি” শব্দটি ইন্দ্রিয়সমূহকে বোঝায়। সংস্কৃত “ইন্দ্র” শব্দ থেকে ইন্দ্রিয় শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ শক্তিশালী বা প্রভাবশালী। মানুষের ইন্দ্রিয় অত্যন্ত শক্তিশালী, কারণ এগুলো তাকে বাইরের জগতের সঙ্গে যুক্ত করে। কিন্তু এই শক্তিশালী ইন্দ্রিয় যখন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে, তখন তা মানুষের উন্নতির সহায়ক হয়। আর যখন ইন্দ্রিয় মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন তা তার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
“প্রজ্ঞা” শব্দটি এসেছে “প্র” এবং “জ্ঞা” থেকে। “জ্ঞা” মানে জানা এবং “প্র” মানে বিশেষভাবে বা গভীরভাবে। তাই প্রজ্ঞা বলতে শুধু সাধারণ জ্ঞান নয়, বরং গভীর উপলব্ধি বা সত্য জ্ঞানকে বোঝানো হয়। “প্রতিষ্ঠিতা” শব্দের অর্থ হলো স্থাপিত বা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ যার ইন্দ্রিয় বশে থাকে, তার জ্ঞান আর বাইরের পরিস্থিতির দ্বারা সহজে বিচলিত হয় না।
এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য হলো মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা বাহ্যিক জগতকে জয় করার মধ্যে নয়, বরং নিজের অন্তর্জগতকে জয় করার মধ্যে নিহিত। একজন মানুষ অনেক সম্পদ, ক্ষমতা বা জ্ঞান অর্জন করেও যদি নিজের ইচ্ছা, রাগ, লোভ, আকাঙ্ক্ষা ও আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে তার জীবন প্রকৃত অর্থে শান্ত হয় না। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও স্থির থাকতে পারে।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক আত্মসংযমের সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রকাশ করে। অদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে ইন্দ্রিয় ও বাহ্যিক জগত পরিবর্তনশীল, কিন্তু আত্মা চিরস্থায়ী। তাই জ্ঞানী ব্যক্তি পরিবর্তনশীল বিষয়ের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত না হয়ে চিরন্তন সত্যের সন্ধান করেন। সাংখ্য দর্শনে বলা হয়, পুরুষ বা চেতনা এবং প্রকৃতি বা বস্তুজগতের মধ্যে পার্থক্য উপলব্ধি করাই মুক্তির পথ। যোগ দর্শনে এই শ্লোক চিত্তের স্থিরতার সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে মনকে নিয়ন্ত্রণ করে উচ্চতর চেতনায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
প্রতীকী অর্থে ইন্দ্রিয় হলো মানুষের জীবনের বিভিন্ন আকর্ষণ ও প্রবৃত্তির প্রতীক। মন হলো সেই রথের চালক, যেখানে ইন্দ্রিয়গুলো ঘোড়ার মতো কাজ করে। যদি চালক দুর্বল হয়, তবে ঘোড়াগুলো রথকে বিপথে নিয়ে যায়। কিন্তু চালক যদি দক্ষ হয়, তবে সেই একই ঘোড়া রথকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। একইভাবে ইন্দ্রিয় নিজেরা খারাপ নয়, কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার মানুষের দুঃখের কারণ হতে পারে।
বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়। একজন শিক্ষার্থী যদি নিজের বিনোদনের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করে পড়াশোনায় মনোযোগ দেয়, তবে সে সফল হয়। একজন শিল্পী যদি নিজের মনকে একাগ্র করতে পারে, তবে সে অসাধারণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। একজন সাধক যদি ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণ অতিক্রম করে ধ্যানে স্থির হতে পারেন, তবে তিনি আত্মিক উপলব্ধি লাভ করেন।
এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে মানুষের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম বাইরের জগতের সঙ্গে নয়, বরং নিজের অন্তরের অস্থিরতার সঙ্গে। ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করা মানে জীবন থেকে আনন্দ দূর করা নয়, বরং আনন্দের প্রকৃত উৎসকে উপলব্ধি করা। যখন মানুষ ইন্দ্রিয়ের দাস না হয়ে ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে, তখন তার বুদ্ধি স্থির হয়, মন শান্ত হয় এবং জীবন সত্য জ্ঞানের পথে অগ্রসর হয়।
সার্বিকভাবে বলা যায়, “তানি সর্ব্বাণি সংযম্য যুক্ত আসীত মৎপরঃ” শ্লোকটি মানবজীবনের আত্মনিয়ন্ত্রণের এক চিরন্তন শিক্ষা। ভাষাগতভাবে এটি ইন্দ্রিয় সংযম ও প্রজ্ঞার সম্পর্ক প্রকাশ করে, দার্শনিকভাবে এটি আত্মজ্ঞান ও মুক্তির পথ নির্দেশ করে এবং প্রতীকীভাবে এটি শেখায় যে নিজের অন্তর্জগতকে জয় করাই প্রকৃত বিজয়। যে ব্যক্তি নিজের ইন্দ্রিয়কে বশে আনতে পারে, তার জ্ঞান স্থির হয় এবং সে জীবনের গভীর সত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!