সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৬৩ | ক্রোধ থেকে পতনের পথ ও বুদ্ধিনাশের শিক্ষা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে


ক্রোধাদ্ ভবতি সম্মোহঃ সম্মোহাৎ স্মৃতিবিভ্রমঃ।
স্মৃতিভ্রংশাদ্ বুদ্ধিনাশো বুদ্ধিনাশাৎ প্রণশ্যতি।।৬৩।।

অনুবাদঃ ক্রোধ থেকে সম্মোহ, সম্মোহ থেকে স্মৃুতিবিভ্রম, স্মৃতিবিভ্রম থেকে বুদ্ধিনাশ এবং বুদ্ধিনাশ হওয়ার ফলে সর্বনাশ হয়। অর্থাৎ, মানুষ পুনরায় জড় জগতের অন্ধকূপে অধঃপতিত হয়।

এই শ্লোকের মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের অন্তর্জগতের পতনের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করেছেন। এখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে একটি ক্ষণিকের আবেগ ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তা, স্মৃতি, বিচারশক্তি এবং শেষ পর্যন্ত জীবনের সঠিক পথকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এটি শুধু একটি ধর্মীয় উপদেশ নয়, বরং মানব মনোবিজ্ঞান, নৈতিকতা এবং আত্মজ্ঞান সম্পর্কিত এক চিরন্তন শিক্ষা।

ক্রোধ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ক্রুধ্ ধাতু থেকে, যার অর্থ হলো রাগ করা বা উত্তেজিত হওয়া। ক্রোধ মানুষের স্বাভাবিক একটি আবেগ হলেও এর অশাসিত রূপ অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। যখন মানুষের ইচ্ছা পূরণ হয় না, যখন তার আকাঙ্ক্ষায় বাধা আসে অথবা নিজের অহংকার আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন ক্রোধের জন্ম হয়। গীতার পূর্ববর্তী শ্লোকগুলোতে শ্রীকৃষ্ণ দেখিয়েছেন যে ইন্দ্রিয়ের বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা থেকেই আসক্তি জন্মায়, আসক্তি থেকে কামনা এবং কামনা পূরণে বাধা এলে ক্রোধ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ ক্রোধ হঠাৎ সৃষ্টি হয় না, এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ও আসক্তি।

শ্লোকে বলা হয়েছে ক্রোধ থেকে সম্মোহ জন্মায়। সম্মোহ শব্দটি সংস্কৃত সম্ এবং মুহ্ ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত। সম্ অর্থ সম্পূর্ণভাবে এবং মুহ্ অর্থ বিভ্রান্ত হওয়া। তাই সম্মোহের অর্থ হলো সম্পূর্ণ বিভ্রান্তি বা সত্য উপলব্ধির ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা। ক্রোধের সময় মানুষ বাস্তবতাকে সঠিকভাবে দেখতে পারে না। তার চিন্তা আবেগ দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে যায়। তখন সে ভালো মন্দের পার্থক্য ভুলে যায় এবং এমন কাজ করে বসে যার জন্য পরে অনুতপ্ত হতে হয়।

সম্মোহ থেকে স্মৃতিবিভ্রম সৃষ্টি হয়। স্মৃতি শব্দটি এসেছে স্মৃ ধাতু থেকে, যার অর্থ মনে রাখা। এখানে স্মৃতি বলতে শুধু অতীত ঘটনা মনে রাখাকে বোঝানো হয় না। এর অর্থ হলো জীবনের শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ, অভিজ্ঞতা এবং নিজের প্রকৃত পরিচয়ের স্মরণ। যখন মানুষ মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখন সে তার পূর্বের শিক্ষা ও উপলব্ধি ভুলে যায়। একজন ব্যক্তি জানে যে ক্রোধ ক্ষতিকর, তবুও ক্রোধের মুহূর্তে সে সেই জ্ঞানকে মনে রাখতে পারে না। এটাই স্মৃতিবিভ্রম।

এরপর স্মৃতিভ্রংশ থেকে ঘটে বুদ্ধিনাশ। বুদ্ধি শব্দটি এসেছে বুধ্ ধাতু থেকে, যার অর্থ জাগ্রত হওয়া বা জ্ঞান লাভ করা। বুদ্ধি হলো মানুষের বিচারশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি। যখন স্মৃতি বিভ্রান্ত হয়, তখন বুদ্ধি আর সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। মানুষ তখন আবেগের দ্বারা পরিচালিত হয়, যুক্তির দ্বারা নয়। সে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে যা তার নিজের এবং অন্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

শেষে বলা হয়েছে বুদ্ধিনাশাৎ প্রণশ্যতি অর্থাৎ বুদ্ধির বিনাশ থেকে মানুষের পতন ঘটে। এখানে পতন বলতে শুধু বাহ্যিক ক্ষতি বোঝানো হয় না। এর অর্থ হলো মানুষের চরিত্র, নৈতিকতা, মানসিক শান্তি এবং আত্মিক উন্নতির পতন। যে ব্যক্তি নিজের বুদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না, সে ধীরে ধীরে নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানব চেতনার অবক্ষয়ের একটি মানচিত্র প্রদান করে। সাংখ্য দর্শনের মতে মানুষের মধ্যে সত্ত্ব, রজ এবং তম এই তিন গুণ কাজ করে। ক্রোধ মূলত রজোগুণের অশান্ত প্রকাশ, যা ধীরে ধীরে তমোগুণের অন্ধকারে নিয়ে যায়। যোগ দর্শনের দৃষ্টিতে মনকে নিয়ন্ত্রণ না করলে ইন্দ্রিয়ের টান মানুষকে নিজের প্রকৃত স্বরূপ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। বেদান্ত দর্শন বলে, মানুষ যখন নিজের আত্মিক পরিচয় ভুলে যায় এবং ক্ষণস্থায়ী আবেগকে নিজের সত্য পরিচয় মনে করে, তখনই তার দুঃখের শুরু হয়।

প্রতীকী দৃষ্টিতে ক্রোধকে আগুনের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আগুন যেমন প্রথমে যেখানে জন্মায় তাকেই উত্তপ্ত করে, পরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ধ্বংস ঘটায়, তেমনি ক্রোধ প্রথমে মানুষের নিজের মনকে পুড়িয়ে দেয় এবং পরে সম্পর্ক, সিদ্ধান্ত ও জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সম্মোহ হলো সেই ধোঁয়া যা সত্যকে আড়াল করে দেয়। স্মৃতিবিভ্রম হলো ভাঙা আয়নার মতো, যেখানে বাস্তবতার প্রতিফলন বিকৃত হয়ে যায়। বুদ্ধিনাশ হলো অন্ধকার, যেখানে মানুষ পথ চিনতে পারে না।

বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের সত্যতা দেখা যায়। একজন ব্যক্তি রাগের মুহূর্তে এমন কথা বলে ফেলতে পারে যা সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। একজন নেতা ক্রোধের বশে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতির দিকে নিয়ে যেতে পারেন। ইতিহাসেও বহু যুদ্ধ ও সংঘাতের পেছনে মানুষের অশাসিত ক্রোধ ও অহংকার কাজ করেছে। আবার যারা ধৈর্য, সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্রোধকে জয় করেছেন, তারা জীবনে উচ্চতর সাফল্য অর্জন করেছেন।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত শক্তি তার বাহ্যিক ক্ষমতায় নয়, বরং নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতায়। ক্রোধকে দমন করা নয়, বরং তাকে বোঝা এবং সঠিক পথে পরিচালিত করাই জ্ঞানের লক্ষণ। যে ব্যক্তি নিজের আবেগের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারে, সে নিজের বুদ্ধিকে পরিষ্কার রাখতে পারে এবং জীবনের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়।

সার্বিকভাবে বলা যায়, “ক্রোধাদ্ভবতি সম্মোহঃ” শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর সত্য প্রকাশ করে। এটি দেখায় যে ক্রোধ একটি সাধারণ আবেগ হলেও তার অনিয়ন্ত্রিত প্রবাহ মানুষকে ধীরে ধীরে বিভ্রান্তি, স্মৃতিহানি, বিচারশক্তির ক্ষয় এবং শেষ পর্যন্ত পতনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই আত্মজ্ঞান, ধৈর্য, সংযম এবং সচেতনতার মাধ্যমে ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করাই শান্তি ও উন্নত জীবনের পথ। এই শিক্ষা শুধু প্রাচীন যুগের জন্য নয়, বর্তমান মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 04, 2026 August 04, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি