শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৬৫ | প্রসাদে দুঃখের বিনাশ ও স্থির বুদ্ধির উদয়
প্রসাদে সর্বদুঃখানাং হানিরস্যোপজায়তে।
প্রসন্নচেতসো হ্যাশু বুদ্ধিঃ পর্যবতিষ্ঠতে।।৬৫।।
অনুবাদঃ চিন্ময় চেতনায় অধিষ্ঠিত হওয়ার ফলে তখন আর জড় জগতের ত্রিতাপ দুঃখ থাকে না; এভাবে প্রসন্নতা লাভ করা ফলে বুদ্ধি শীঘ্রই স্থির হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের পঁয়ষট্টিতম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর সত্য প্রকাশ করেছেন। এই শ্লোকে বলা হয়েছে যে যখন মানুষের চিত্ত শান্ত, নির্মল ও ঈশ্বরচেতনায় প্রসন্ন হয়ে ওঠে, তখন তার সমস্ত দুঃখের অবসান ঘটে এবং সেই শান্ত চিত্তের মানুষের বুদ্ধি দ্রুত স্থির ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। এই একটি শ্লোকের মধ্যে মানুষের মন, বুদ্ধি, দুঃখ, শান্তি ও আত্মউপলব্ধির এক গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে।
শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো প্রসাদে। সংস্কৃত প্রসাদ শব্দটি এসেছে প্র উপসর্গের সঙ্গে সদ ধাতুর সংযোগে। সদ ধাতুর অর্থ হলো বসা, স্থির হওয়া বা শান্ত হওয়া। প্র উপসর্গ যুক্ত হয়ে এর অর্থ দাঁড়ায় সম্পূর্ণভাবে শান্ত, নির্মল ও প্রশান্ত অবস্থা। সাধারণ অর্থে প্রসাদ বলতে আমরা ঈশ্বরের কৃপা, আশীর্বাদ বা মন্দিরের পবিত্র অর্ঘ্য বুঝি। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে প্রসাদ বলতে বাহ্যিক কোনো বস্তু নয়, বরং অন্তরের নির্মলতা ও মানসিক প্রশান্তিকে বোঝানো হয়েছে। যখন মানুষের মন কামনা, ক্রোধ, লোভ, মোহ ও অস্থিরতা থেকে মুক্ত হয়, তখন সেই অবস্থাই হলো চিত্তের প্রসাদ।
শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো সর্বদুঃখানাং। এখানে সর্ব অর্থ সমস্ত এবং দুঃখ অর্থ কষ্ট, যন্ত্রণা বা মানসিক অশান্তি। সংস্কৃত দুঃখ শব্দটি এমন এক অবস্থাকে বোঝায় যেখানে জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহে সংকীর্ণতা, চাপ ও অস্বস্তি সৃষ্টি হয়। গীতার দৃষ্টিতে দুঃখ শুধু বাইরের পরিস্থিতির কারণে সৃষ্টি হয় না, বরং মানুষের অশান্ত মন, অতিরিক্ত আসক্তি ও অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা থেকেও জন্ম নেয়। তাই প্রসন্ন চিত্তের মাধ্যমে এই দুঃখের মূল কারণ দূর হয়।
হানি শব্দের অর্থ হলো ক্ষয়, বিনাশ বা অপসারণ। এখানে হানি বলতে দুঃখের সম্পূর্ণ বিলুপ্তিকে বোঝানো হয়েছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বোঝাতে চেয়েছেন যে সত্যিকারের শান্তি লাভ করলে মানুষ দুঃখের দ্বারা আর নিয়ন্ত্রিত হয় না। জীবনে সুখ ও দুঃখ উভয়ই আসবে, কিন্তু স্থিরচিত্ত ব্যক্তি সেগুলোর দ্বারা নিজের অন্তরের শান্তি নষ্ট হতে দেন না।
উপজায়তে শব্দটি এসেছে জন্ম নেওয়া বা উৎপন্ন হওয়ার অর্থে। অর্থাৎ শান্ত চিত্তের ফল হিসেবে একটি বিশেষ পরিবর্তন মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে প্রকাশিত হয়। এটি কোনো বাহ্যিক অর্জন নয়, বরং অন্তরের পরিশুদ্ধতার স্বাভাবিক ফল। যেমন সূর্যের আলো সবসময় থাকে, কিন্তু মেঘ সরে গেলে তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়, তেমনি মানুষের অন্তরের জ্ঞানও চিত্তের অশান্তি দূর হলে প্রকাশিত হয়।
এই শ্লোকে প্রসন্নচেতসো শব্দটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। প্রসন্ন অর্থ আনন্দময়, নির্মল ও শান্ত এবং চেতস অর্থ মন বা চিত্ত। প্রসন্নচেতা ব্যক্তি হলেন তিনি যার মন বাইরের পরিস্থিতির দ্বারা সহজে বিচলিত হয় না। তিনি নিজের অন্তরের অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এমন ব্যক্তি আনন্দের জন্য বাহ্যিক বস্তু বা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল থাকেন না।
এরপর বলা হয়েছে বুদ্ধিঃ পর্যবতিষ্ঠতে। বুদ্ধি শব্দটি সংস্কৃত বুধ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ জাগ্রত হওয়া বা উপলব্ধি করা। এখানে বুদ্ধি বলতে শুধু সাধারণ চিন্তাশক্তিকে বোঝানো হয়নি, বরং সত্য ও অসত্যের পার্থক্য করার ক্ষমতা, বিবেক এবং আত্মজ্ঞান লাভের শক্তিকে বোঝানো হয়েছে। পর্যবতিষ্ঠতে অর্থ হলো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। অর্থাৎ যার মন শান্ত, তার বিচারশক্তি স্থির ও পরিষ্কার হয়।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের অন্তর্জগতের একটি মৌলিক নিয়ম প্রকাশ করে। অশান্ত মন কখনো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। যেমন বাতাসে কাঁপতে থাকা জলে কোনো কিছুর স্পষ্ট প্রতিবিম্ব দেখা যায় না, তেমনি অস্থির চিত্তে সত্যের উপলব্ধি সম্ভব নয়। কিন্তু মন যখন শান্ত হয়, তখন বাস্তবতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। এই কারণেই ভারতীয় দর্শনে মনকে আত্মজ্ঞান লাভের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে প্রসাদ বা চিত্তের শান্তি হলো আত্মজ্ঞান উপলব্ধির প্রস্তুতি। মানুষের প্রকৃত স্বরূপ আত্মা, কিন্তু অশান্ত মন সেই সত্যকে আচ্ছন্ন করে রাখে। যখন মন নির্মল হয়, তখন আত্মার জ্ঞান স্বতঃপ্রকাশিত হয়। যোগ দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোক চিত্তবৃত্তির প্রশমনের কথা বলে। মন যখন কামনা ও দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হয়, তখন যোগীর চেতনা স্থির অবস্থায় পৌঁছায়।
প্রতীকী অর্থে প্রসন্ন চিত্ত হলো নির্মল আয়নার মতো। একটি ধুলোময় আয়নায় যেমন স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখা যায় না, তেমনি অশান্ত মনে সত্যের প্রতিফলন ঘটে না। যখন মন পরিষ্কার হয়, তখন জ্ঞান, বিবেক ও শান্তি সেখানে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়। এই কারণে প্রসাদ শব্দটি আধ্যাত্মিক জীবনে কৃপা ও অন্তরের পবিত্রতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন ব্যক্তি যদি ক্রোধের সময় সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তার বিচারশক্তি অনেক সময় দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু একই ব্যক্তি যদি মন শান্ত রেখে চিন্তা করেন, তাহলে তিনি অধিক সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। একজন পরীক্ষার্থী, একজন নেতা, একজন গৃহস্থ বা একজন সাধক সকলের ক্ষেত্রেই শান্ত মন সফলতার ভিত্তি তৈরি করে।
এই শ্লোকের একটি সুন্দর উপমা হলো শান্ত হ্রদের সঙ্গে মানুষের মনকে তুলনা করা। উত্তাল হ্রদে আকাশের প্রতিবিম্ব দেখা যায় না, কিন্তু শান্ত জলে আকাশের সম্পূর্ণ ছবি ফুটে ওঠে। তেমনি অশান্ত মনে আত্মজ্ঞান ও সত্যের উপলব্ধি স্পষ্ট হয় না। শান্ত চিত্তেই জীবনের গভীর সত্য উপলব্ধি করা যায়।
সার্বিকভাবে বলা যায়, প্রসাদে সর্বদুঃখানাং হানিরস্যোপজায়তে শ্লোকটি মানুষের অন্তরের রূপান্তরের শিক্ষা দেয়। এটি শুধু দুঃখ দূর করার কথা বলে না, বরং দুঃখের মূল কারণকে চিনতে শেখায়। শান্তি কোনো বাহ্যিক অর্জন নয়, এটি অন্তরের একটি অবস্থা। যখন মন নির্মল ও প্রসন্ন হয়, তখন দুঃখের প্রভাব ক্ষীণ হয়ে যায় এবং বুদ্ধি সত্যের পথে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই শ্লোক তাই মানবজীবনের জন্য এক চিরন্তন শিক্ষা প্রদান করে যে আত্মশান্তিই প্রকৃত জ্ঞান, স্থিরতা ও মুক্তির পথ।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!