শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৬৬ | অশান্ত মন থেকে সুখের অনুপস্থিতি ও স্থির বুদ্ধির শিক্ষা
নাস্তি বুদ্ধিরযুক্তস্য ন চাযুক্তস্য ভাবনা।
ন চাভাবয়তঃ শান্তিরশান্তস্য কুতঃ সুখম্।।৬৬।।
অনুবাদঃ যে ব্যক্তি কৃষ্ণভাবনায় যুক্ত নয়, তার চিত্ত সংযত নয় এবং তার পারমার্থিক বুদ্ধি থাকতে পারে না। আর পরমার্থ চিন্তাশূন্য ব্যক্তির শান্তি লাভের কোন সম্ভাবনা নেই। এই রকম শান্তিহীন ব্যক্তির প্রকুত সুখ কোথায়?
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ছেষট্টিতম শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জীবন, মন, বুদ্ধি, শান্তি ও সুখের মধ্যে গভীর সম্পর্ককে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ অসাধারণ শক্তিশালী ভাষায় প্রকাশ করেছে। এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের প্রকৃত সুখ লাভের পথকে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে বাহ্যিক সম্পদ, ইন্দ্রিয়সুখ বা সাময়িক আনন্দের মাধ্যমে প্রকৃত সুখ অর্জন করা যায় না। প্রকৃত সুখের ভিত্তি হলো অন্তরের স্থিরতা, সংযম, চিন্তার গভীরতা এবং আত্মিক শান্তি। এই শ্লোক মানুষের মানসিক বিকাশের একটি ধারাবাহিক পথ নির্দেশ করে যেখানে প্রথমে প্রয়োজন ইন্দ্রিয় সংযম, তারপর স্থির বুদ্ধি, তার পরে গভীর ভাবনা, এরপর শান্তি এবং সর্বশেষে প্রকৃত সুখের উপলব্ধি।
এই শ্লোকের প্রথম শব্দ হলো নাস্তি যার অর্থ নেই বা অস্তিত্ব নেই। এরপর এসেছে বুদ্ধি শব্দটি, যা সংস্কৃত √বুধ্ ধাতু থেকে উৎপন্ন হয়েছে। বুধ্ ধাতুর অর্থ হলো জাগ্রত হওয়া, জানা, উপলব্ধি করা বা বোধ লাভ করা। বুদ্ধি বলতে এখানে সাধারণ জ্ঞানকে বোঝানো হয়নি, বরং বোঝানো হয়েছে সেই অন্তর্দৃষ্টি যা মানুষকে সত্য ও অসত্য, স্থায়ী ও অস্থায়ী, কল্যাণকর ও অকল্যাণকর বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে সাহায্য করে। এই বুদ্ধিই মানুষের জীবনের পথপ্রদর্শক। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন অযুক্তস্য অর্থাৎ যার মন সংযত নয়, যার ইন্দ্রিয় নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই, তার মধ্যে প্রকৃত স্থির বুদ্ধির উদয় হয় না।
অযুক্ত শব্দটি গঠিত হয়েছে অ উপসর্গ এবং যুক্ত শব্দের সমন্বয়ে। যুক্ত শব্দের অর্থ হলো সংযুক্ত, নিয়ন্ত্রিত বা সঠিকভাবে স্থাপিত। অযুক্ত অর্থ হলো যে ব্যক্তি নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। এমন ব্যক্তি বাইরের আকর্ষণ, কামনা, ক্রোধ, লোভ ও মোহের দ্বারা সহজেই পরিচালিত হয়। তার চিন্তা স্থির থাকে না এবং তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে বোঝাতে চেয়েছেন যে অস্থির মন কখনো গভীর জ্ঞানের আধার হতে পারে না।
এরপর শ্লোকে বলা হয়েছে ন চাযুক্তস্য ভাবনা। ভাবনা শব্দটি এসেছে √ভূ ধাতু থেকে, যার অর্থ হওয়া, সৃষ্টি হওয়া বা অস্তিত্ব লাভ করা। ভাবনা বলতে এখানে কেবল সাধারণ চিন্তা নয়, বরং গভীর মনন, আত্মবিশ্লেষণ এবং সত্য উপলব্ধির জন্য অন্তরের একাগ্র প্রচেষ্টাকে বোঝানো হয়েছে। যার মন অস্থির, যার বুদ্ধি নিয়ন্ত্রিত নয়, তার মধ্যে গভীর চিন্তার শক্তিও বিকশিত হয় না। কারণ অশান্ত মন সবসময় বাহ্যিক বিষয়ের দিকে ছুটে চলে এবং নিজের অন্তরের সত্যকে উপলব্ধি করার সুযোগ পায় না।
শ্রীকৃষ্ণ এরপর বলেন ন চাভাবয়তঃ শান্তিঃ। এখানে শান্তি শব্দটি অত্যন্ত গভীর অর্থ বহন করে। শান্তি কেবল বাইরের ঝামেলাহীন অবস্থার নাম নয়। প্রকৃত শান্তি হলো অন্তরের স্থিরতা, যেখানে মন কামনা, ভয়, দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতা থেকে মুক্ত থাকে। যে ব্যক্তি নিজের মনকে উপলব্ধি করতে পারে না, নিজের চিন্তাকে শুদ্ধ করতে পারে না, সে কখনো প্রকৃত শান্তি লাভ করতে পারে না। কারণ শান্তি কোনো বাহ্যিক বস্তু নয়, এটি মানুষের অন্তরের একটি অবস্থা।
শেষে শ্রীকৃষ্ণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছেন অশান্তস্য কুতঃ সুখম্। অর্থাৎ যে ব্যক্তি শান্তিহীন, তার সুখ কোথায়। এখানে সুখ বলতে সাময়িক আনন্দকে বোঝানো হয়নি। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যে আনন্দ আসে তা ক্ষণস্থায়ী। প্রকৃত সুখ হলো এমন এক অভ্যন্তরীণ আনন্দ যা স্থায়ী, গভীর এবং আত্মার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যার মন অশান্ত, সে ধনসম্পদ, ক্ষমতা বা ভোগবিলাস অর্জন করলেও প্রকৃত সুখ অনুভব করতে পারে না।
এই শ্লোকের মধ্যে একটি গভীর কারণ ও ফলের সম্পর্ক প্রকাশ করা হয়েছে। সংযমহীনতা থেকে বুদ্ধির অস্থিরতা জন্মায়। বুদ্ধির অস্থিরতা থেকে চিন্তার দুর্বলতা আসে। চিন্তার দুর্বলতা শান্তিকে নষ্ট করে এবং শান্তির অভাবে প্রকৃত সুখ অসম্ভব হয়ে ওঠে। তাই শ্রীকৃষ্ণ মানুষের জীবনের উন্নতির জন্য একটি অভ্যন্তরীণ পথ দেখিয়েছেন। এই পথ হলো মনকে নিয়ন্ত্রণ করা, বুদ্ধিকে শুদ্ধ করা এবং আত্মার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোকের গুরুত্ব অপরিসীম। যোগ দর্শনের মতে মানুষের মন যখন ইন্দ্রিয়ের দ্বারা পরিচালিত হয় তখন চিত্ত অস্থির থাকে। কিন্তু যখন মন নিয়ন্ত্রিত হয় তখন আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করা যায়। সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতে বুদ্ধির বিশুদ্ধতা মানুষকে প্রকৃতি ও আত্মার পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। বেদান্ত দর্শনে বলা হয়েছে যে অজ্ঞতা ও আসক্তিই মানুষের দুঃখের মূল কারণ। জ্ঞান ও আত্ম উপলব্ধির মাধ্যমে মানুষ সেই বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এই শ্লোক আধুনিক যুগে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যে ব্যক্তি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে প্রায়ই ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা, উদ্বেগ ও অস্থিরতা মানুষের মানসিক শান্তি নষ্ট করে। আত্মনিয়ন্ত্রণ, সচেতন চিন্তা এবং মানসিক ভারসাম্য মানুষের জীবনে স্থায়ী সুখ নিয়ে আসে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায়, আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ ও আত্মসচেতনতা ছাড়া সুস্থ মানসিক জীবন সম্ভব নয়।
প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দ মানুষের অন্তর্জগতের একটি প্রতিচ্ছবি। বুদ্ধি হলো জীবনের আলো, অযুক্ততা হলো সেই আলোকে আচ্ছন্ন করা অন্ধকার, ভাবনা হলো আত্মঅনুসন্ধানের পথ, শান্তি হলো মনের প্রশান্ত আকাশ এবং সুখ হলো সেই আকাশে উদিত পূর্ণতার সূর্য। মানুষের মন যদি অস্থির সমুদ্রের মতো হয়, তবে জীবনের নৌকা সঠিক পথে চলতে পারে না। কিন্তু মন যখন শান্ত হয়, তখন মানুষ নিজের প্রকৃত গন্তব্য খুঁজে পায়।
বাস্তব জীবনে আমরা এই সত্য প্রতিনিয়ত দেখতে পাই। একজন ব্যক্তি যদি রাগের মুহূর্তে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে সে এমন কথা বা কাজ করতে পারে যার জন্য পরে অনুতপ্ত হতে হয়। আবার যে ব্যক্তি ধৈর্য, চিন্তা ও আত্মসংযমের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সে জীবনে অধিক স্থায়ী সাফল্য ও শান্তি লাভ করে। যেমন ঝড়ের মধ্যে একটি প্রদীপের শিখা টিকে থাকতে পারে না, কিন্তু বাতাস থেকে রক্ষা পেলে সেই প্রদীপ চারপাশকে আলোকিত করে। তেমনি অস্থির মন জ্ঞান প্রকাশ করতে পারে না, কিন্তু শান্ত মন জীবনের পথ আলোকিত করে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোক মানুষের জীবনের এক চিরন্তন সত্য প্রকাশ করে। প্রকৃত সুখ বাইরের জগতে নয়, মানুষের নিজের অন্তরের মধ্যে নিহিত। সংযমহীন মন বুদ্ধিকে দুর্বল করে, দুর্বল বুদ্ধি চিন্তাকে ক্ষীণ করে, চিন্তার অভাব শান্তিকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং শান্তিহীন জীবনে প্রকৃত সুখ আসে না। তাই মানুষের প্রথম সাধনা হওয়া উচিত নিজের মনকে জয় করা। যে ব্যক্তি নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে নিজের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং সেই মানুষই প্রকৃত শান্তি ও আনন্দের অধিকারী হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!