শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৬৮ | ইন্দ্রিয় সংযম ও স্থিতপ্রজ্ঞার গভীর শিক্ষা
তস্মাদ্ যস্য মহাবাহো নিগৃহীতানি সর্বশঃ।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেভ্যস্তস্য প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা।।৬৮।।
অনুবাদঃ সুতরাং, হে মহাবাহো! যাঁর ইন্দ্রিয়গুলি ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে সর্বপ্রকারে নিবৃত্ত হয়েছে, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ।
এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো, যে ব্যক্তি তার ইন্দ্রিয়সমূহকে ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে সম্পূর্ণভাবে সংযত রাখতে পারে, তার জ্ঞান বা প্রজ্ঞা স্থির ও প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের অন্তর্জগতের এমন এক অবস্থার কথা বলেছেন যেখানে মন আর বাহ্যিক আকর্ষণের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না, বরং আত্মজ্ঞান ও বিবেকের আলোকে পরিচালিত হয়।
শ্লোকের প্রথম শব্দ তস্মাত্ এর অর্থ হলো সেই কারণে বা তাই। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে পূর্ববর্তী আলোচনার ধারাবাহিকতায় একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হচ্ছে। মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণ দ্বারা পরিচালিত হয়, ততক্ষণ তার মন অস্থির থাকে এবং প্রকৃত জ্ঞান বিকশিত হয় না। তাই ইন্দ্রিয় সংযমই স্থির জ্ঞানের প্রধান ভিত্তি।
মহাবাহো শব্দটি বিশেষভাবে অর্থপূর্ণ। মহা অর্থ মহান এবং বাহু অর্থ বাহু বা শক্তি। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মহাবাহু বলে সম্বোধন করেছেন, কারণ অর্জুন শুধু শারীরিক শক্তির অধিকারী নন, তিনি এমন একজন ব্যক্তি যিনি আত্মসংগ্রামের মাধ্যমে উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের যোগ্য। এই সম্বোধনের মধ্যে উৎসাহ ও দায়িত্বের ইঙ্গিত রয়েছে। মানুষের প্রকৃত শক্তি শুধু বাহুর শক্তিতে নয়, বরং নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতার মধ্যেও নিহিত।
নিগৃহীতানি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ধাতু গ্রহণ থেকে, যার অর্থ ধরা বা নিয়ন্ত্রণ করা। এর সঙ্গে নি উপসর্গ যুক্ত হয়ে শব্দটির অর্থ হয়েছে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত বা সংযত। এখানে ইন্দ্রিয় দমন বলতে জোর করে ইচ্ছাকে ধ্বংস করা বোঝানো হয়নি, বরং ইন্দ্রিয়ের স্বাভাবিক প্রবাহকে সঠিক পথে পরিচালিত করা বোঝানো হয়েছে। যেমন একটি নদী যখন নিয়ন্ত্রিত পথে প্রবাহিত হয় তখন তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তেমনি নিয়ন্ত্রিত ইন্দ্রিয় মানুষের উন্নতির কারণ হয়।
ইন্দ্রিয়াণি শব্দের অর্থ হলো ইন্দ্রিয়সমূহ। মানুষের পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বক এবং পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সে জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। ইন্দ্রিয়ার্থেভ্যঃ শব্দের অর্থ হলো ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ থেকে। অর্থাৎ চোখের জন্য দৃশ্য, কানের জন্য শব্দ, জিহ্বার জন্য স্বাদ, নাকের জন্য গন্ধ এবং ত্বকের জন্য স্পর্শ এই সকল বিষয় থেকে ইন্দ্রিয়কে বিচ্ছিন্ন রাখা বা নিয়ন্ত্রণ করা।
প্রজ্ঞা শব্দটি অত্যন্ত গভীর অর্থ বহন করে। এটি সাধারণ জ্ঞান নয়, বরং এমন এক উচ্চতর উপলব্ধি যা মানুষকে সত্য ও অসত্যের পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। প্রজ্ঞা শব্দটি প্র এবং জ্ঞা এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। প্র অর্থ বিশেষ বা উৎকৃষ্ট এবং জ্ঞা অর্থ জানা। তাই প্রজ্ঞা মানে হলো বিশেষ বা গভীর জ্ঞান। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, যখন ইন্দ্রিয় সংযত হয় তখন এই গভীর জ্ঞান স্থির হয়।
প্রতিষ্ঠিতা শব্দের অর্থ হলো স্থাপিত, দৃঢ়ভাবে অবস্থানকারী বা স্থির। এটি বোঝায় যে জ্ঞান তখন আর ক্ষণিকের অনুভূতি থাকে না, বরং মানুষের চরিত্র ও জীবনের স্থায়ী অংশ হয়ে যায়। যেমন ঝড়ের মধ্যেও একটি গভীর শিকড়যুক্ত বৃক্ষ অটল থাকে, তেমনি স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্যেও অন্তরে শান্ত থাকেন।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের দর্শন প্রকাশ করে। সাংখ্য দর্শনের মতে, মানুষ প্রকৃতির বিভিন্ন প্রভাবের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণ তাকে বাহ্যিক জগতের সঙ্গে যুক্ত রাখে। কিন্তু যখন মানুষ নিজের অন্তর্গত চেতনাকে উপলব্ধি করে, তখন সে ইন্দ্রিয়ের দাস না হয়ে তার নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে ইন্দ্রিয় ও মন অতিক্রম করে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করাই জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতেও এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক জীবনে মানুষ অসংখ্য আকর্ষণ, ভোগের ইচ্ছা এবং বাহ্যিক উদ্দীপনার মধ্যে বাস করে। অতিরিক্ত ভোগের আকাঙ্ক্ষা মনকে অস্থির করে তোলে। যে ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা, আবেগ ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে অধিক মনোযোগী, শান্ত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়।
প্রতীকী অর্থে ইন্দ্রিয়কে অনেক সময় ঘোড়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়, মনকে লাগাম এবং বুদ্ধিকে সারথি বলা হয়। যদি ঘোড়াগুলো লাগামহীন হয়, তবে রথ ভুল পথে চলে যায়। কিন্তু সারথি যদি দক্ষ হয়, তবে রথ সঠিক গন্তব্যে পৌঁছায়। একইভাবে মানুষের বুদ্ধি যদি জাগ্রত থাকে, তবে ইন্দ্রিয় তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
বাস্তব জীবনে এর অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন শিক্ষার্থী যদি নিজের মনোযোগকে বিনোদন ও অলসতা থেকে সরিয়ে শিক্ষার দিকে স্থাপন করে, তবে তার জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। একজন সাধক যদি নিজের ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করে ধ্যান ও আত্মচিন্তায় মনোনিবেশ করেন, তবে তিনি গভীর শান্তি লাভ করেন। একজন নেতা যদি নিজের লোভ, রাগ ও অহংকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তবে তিনি ন্যায়পরায়ণ সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন।
সাহিত্য ও ইতিহাসেও ইন্দ্রিয়জয়ের গুরুত্ব দেখা যায়। বহু ঋষি, সাধক ও জ্ঞানী ব্যক্তি আত্মসংযমের মাধ্যমে উচ্চতর চেতনা অর্জন করেছেন। তাঁদের জীবন প্রমাণ করে যে প্রকৃত শক্তি বাহ্যিক জয় নয়, বরং নিজের অন্তরের প্রবৃত্তির ওপর বিজয় অর্জনের মধ্যে নিহিত।
এই শ্লোকের সারমর্ম হলো, মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা বাহ্যিক সম্পদ বা ক্ষমতার মধ্যে নয়, বরং নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। যে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণের পেছনে ছুটে বেড়ায়, তার মন সর্বদা অস্থির থাকে। কিন্তু যে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করে আত্মজ্ঞান ও বিবেকের পথে চলে, তার প্রজ্ঞা স্থির ও প্রতিষ্ঠিত হয়। ইন্দ্রিয় সংযম তাই শুধু একটি নৈতিক শিক্ষা নয়, এটি আত্মউন্নতি, মানসিক শান্তি এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মূল পথ।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!