সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৬৯ | জ্ঞানীর জাগরণ ও সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার পার্থক্য

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে


 যা নিশা সর্বভূতানাং তস্যাং জাগর্তি সংযমী। 
যস্যাং জাগ্রতি ভুতানি সা নিশা পশ্যতো মুনেঃ।।৬৯।।

অনুবাদঃ সমস্ত জীবের পক্ষে যা রাত্রিস্বরূপ, স্থিতপ্রজ্ঞ সেই রাত্রিতে জাগরিত থেকে আত্ম-বুদ্ধিনিষ্ঠ আনন্দকে সাক্ষাৎ অনুভব করেন। আর যখন সমস্ত জীবেরা জেগে থাকে, তখন তত্ত্বাদর্শী মুনির নিকট তা রাত্রিস্বরূপ। 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ঊনসত্তরতম শ্লোকটি মানবচেতনার গভীরতম রহস্যকে অত্যন্ত সুন্দর ও প্রতীকী ভাষায় প্রকাশ করেছে। এই শ্লোকের মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সাধারণ মানুষ ও জ্ঞানী ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে তা ব্যাখ্যা করেছেন। এখানে নিশা অর্থাৎ রাত্রি এবং জাগরণ শব্দ দুটি কেবল বাহ্যিক দিন ও রাতকে বোঝায় না, বরং মানুষের অন্তর্জগতের জ্ঞান ও অজ্ঞানতার অবস্থাকে নির্দেশ করে। একজন সাধারণ মানুষ যে বিষয়কে জীবনের মূল সত্য মনে করে, একজন আত্মজ্ঞানী ব্যক্তি সেই বিষয়কে তুচ্ছ ও অন্ধকারময় বলে উপলব্ধি করেন। আবার যে সত্য সাধারণ মানুষের কাছে অজানা ও অন্ধকারের মতো, জ্ঞানী ব্যক্তি সেখানে চিরজাগ্রত থাকেন।

সংস্কৃত ভাষায় নিশা শব্দের অর্থ হলো রাত্রি, অন্ধকার বা এমন একটি অবস্থা যেখানে আলো অনুপস্থিত। কিন্তু গীতার এই শ্লোকে নিশা শব্দটি গভীর প্রতীকী অর্থ বহন করেছে। এটি কেবল সূর্যের আলোহীন রাত নয়, বরং আত্মজ্ঞানহীনতার অন্ধকারকে বোঝায়। মানুষ যখন শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়ের আনন্দ, বাহ্যিক সম্পদ, ভোগ এবং ক্ষণস্থায়ী সুখের পেছনে ছুটে চলে তখন সে প্রকৃত সত্যের প্রতি অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে। সেই অবস্থাই হলো আধ্যাত্মিক রাত্রি। অন্যদিকে জাগরণ শব্দটি এসেছে জাগৃ ধাতু থেকে, যার অর্থ হলো সচেতন থাকা বা জেগে থাকা। এখানে জাগরণ বলতে কেবল চোখ খোলা রাখা নয়, বরং চেতনার জাগ্রত অবস্থা বোঝানো হয়েছে।

সর্বভূতানাং শব্দের অর্থ হলো সকল জীবের। অর্থাৎ সাধারণভাবে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ যে বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, সেই বিষয়গুলোর কথাই এখানে বলা হয়েছে। মানুষ সাধারণত অর্থ, ক্ষমতা, সম্মান, ইন্দ্রিয়সুখ এবং বাহ্যিক সাফল্যকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য মনে করে। এসব বিষয়ের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণ থাকে। কিন্তু সংযমী ব্যক্তি, যিনি নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছেন, তিনি এই বাহ্যিক আকর্ষণের বাইরে গিয়ে জীবনের গভীর সত্য অনুসন্ধান করেন। তাই যেখানে সাধারণ মানুষ মগ্ন থাকে, সেখানে জ্ঞানী ব্যক্তি অনাসক্ত থাকেন।

সংযমী শব্দটি এই শ্লোকের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। সংযম অর্থ হলো নিয়ন্ত্রণ, আত্মশাসন এবং নিজের প্রবৃত্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। যে ব্যক্তি নিজের মন, ইন্দ্রিয় এবং আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তিনিই প্রকৃত সংযমী। গীতার দৃষ্টিতে সংযম কোনো দমন নয়, বরং নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার ক্ষমতা। একজন সংযমী ব্যক্তি বাহ্যিক জগতের আকর্ষণে হারিয়ে যান না, বরং নিজের অন্তরের আলোকে উপলব্ধি করার জন্য সচেষ্ট থাকেন।

এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য হলো মানুষের চেতনার স্তর অনুযায়ী একই জগতের অর্থ ভিন্ন হয়ে যায়। একজন শিশুর কাছে খেলনা যেমন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু মনে হতে পারে, কিন্তু একজন প্রাপ্তবয়স্কের কাছে সেটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। একইভাবে সাধারণ মানুষের কাছে যে বিষয়গুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয়, আত্মজ্ঞানী ব্যক্তির কাছে সেগুলো ক্ষণস্থায়ী ও অর্থহীন বলে মনে হয়। কারণ জ্ঞানীর দৃষ্টি বাহ্যিক জগত থেকে অন্তর্জগতের দিকে প্রসারিত হয়।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকটি আত্মজ্ঞান ও মায়ার সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করে। অদ্বৈত বেদান্তের মতে মানুষ নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপ ভুলে গিয়ে দেহ ও মনের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখে। এই ভুল পরিচয়ই অজ্ঞানতা। সাধারণ মানুষ এই অজ্ঞানতার মধ্যেই সক্রিয় থাকে, কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি আত্মার সত্য উপলব্ধি করে সেই অন্ধকার থেকে মুক্ত হন। তাঁর কাছে বাহ্যিক জগতের পরিবর্তনশীল সুখ দুঃখের চেয়ে আত্মার চিরন্তন শান্তি অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোক পুরুষ ও প্রকৃতির পার্থক্য বোঝায়। মানুষ যখন প্রকৃতির গুণ দ্বারা পরিচালিত হয় তখন সে ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু যখন সে নিজের চৈতন্যস্বরূপ উপলব্ধি করে তখন সে প্রকৃতির বন্ধন থেকে মুক্তির পথে অগ্রসর হয়। তাই জ্ঞানীর জাগরণ হলো নিজের প্রকৃত অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া।

প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকের নিশা হলো অজ্ঞতা, মোহ, আসক্তি এবং আত্মবিস্মৃতির প্রতীক। আর জাগরণ হলো জ্ঞান, সচেতনতা, আত্মউপলব্ধি এবং মুক্তির প্রতীক। সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক চিন্তায় আলো ও অন্ধকারের যে চিরন্তন প্রতীক ব্যবহৃত হয়, এই শ্লোকেও সেই একই ভাব প্রকাশিত হয়েছে। অন্ধকার মানে শুধু আলোহীনতা নয়, বরং সত্যকে না জানার অবস্থা। আলো মানে শুধু বাহ্যিক উজ্জ্বলতা নয়, বরং অন্তরের জ্ঞান।

বাস্তব জীবনে এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একজন ব্যক্তি যদি সারাদিন কেবল অর্থ উপার্জন, ভোগ এবং সামাজিক মর্যাদার চিন্তায় ব্যস্ত থাকেন, তবে তিনি বাহ্যিক জগতে সফল হলেও অন্তরের শান্তি থেকে দূরে থাকতে পারেন। অন্যদিকে একজন সাধক বা আত্মজ্ঞানী ব্যক্তি ধ্যান, আত্মবিশ্লেষণ এবং সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে এমন এক আনন্দ লাভ করেন যা বাহ্যিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে না। সাধারণ মানুষের চোখে তাঁর জীবন হয়তো ত্যাগময় মনে হতে পারে, কিন্তু তাঁর কাছে সেটিই প্রকৃত স্বাধীনতা।

ইতিহাসেও বহু জ্ঞানী ব্যক্তি এই সত্যের উদাহরণ দিয়েছেন। গৌতম বুদ্ধ রাজপ্রাসাদের ভোগবিলাস ত্যাগ করে জীবনের গভীর সত্য অনুসন্ধান করেছিলেন। সাধারণ মানুষের কাছে রাজকীয় জীবন ছিল সুখের প্রতীক, কিন্তু বুদ্ধের কাছে সেটি ছিল অস্থায়ী বন্ধন। একইভাবে বহু ঋষি ও সাধক বাহ্যিক আরাম ত্যাগ করে আত্মজ্ঞান অর্জনের পথে এগিয়েছেন।

এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত উন্নতি বাহ্যিক অর্জনে নয়, বরং চেতনার পরিবর্তনে। যে ব্যক্তি কেবল বাহ্যিক জগতের মধ্যে আবদ্ধ থাকে, সে প্রকৃত সত্য থেকে দূরে থাকে। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের অন্তরের আলোকে আবিষ্কার করতে পারে, তার কাছে জীবনের প্রকৃত অর্থ প্রকাশিত হয়। সাধারণ মানুষের রাত যেখানে শেষ হয়, জ্ঞানীর জাগরণ সেখান থেকেই শুরু হয়।

সার্বিকভাবে বলা যায়, “যা নিশা সর্বভূতানাং তস্যাং জাগর্ত্তি সংযমী। যস্যাং জাগ্রতি ভূতানি সা নিশা পশ্যতো মুনেঃ” এই শ্লোকটি মানবচেতনার এক গভীর রূপান্তরের শিক্ষা দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সত্য উপলব্ধির জন্য দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। জ্ঞানী ব্যক্তি সেই ব্যক্তি, যিনি বাহ্যিক আকর্ষণের অন্ধকার অতিক্রম করে অন্তরের চিরন্তন আলোর মধ্যে জাগ্রত হতে পারেন। এই শ্লোক তাই কেবল একটি ধর্মীয় শিক্ষা নয়, বরং মানবজীবনের চেতনা, আত্মঅনুসন্ধান এবং সত্য উপলব্ধির এক চিরন্তন দর্শন।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 04, 2026 August 04, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি