শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৭১ | কামনা ত্যাগ, নিস্পৃহতা ও পরম শান্তির মহাসত্য
বিহায় কামান্ যঃ সর্বান পুমাংশ্চরতি নিঃস্পৃহঃ।
নির্মমো নিরহঙ্কারঃ স শান্তিমধিগচ্ছতি।।৭১।।
অনুবাদঃ যে ব্যক্তি সমস্ত কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করে জড় বিষয়ের প্রতি নিষ্পৃহ, নিরহঙ্কার ও মমত্ববোধ রহিত হয়ে বিচরণ করেন, তিনিই প্রকৃত শান্তি লাভ করেন।
অর্থাৎ যে ব্যক্তি সমস্ত কামনা ত্যাগ করে, সমস্ত আকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে উঠে, নিস্পৃহভাবে জীবনযাপন করে, যিনি কোনো কিছুর প্রতি অতিরিক্ত মমত্ববোধ রাখেন না এবং অহংকার থেকে মুক্ত থাকেন, তিনিই প্রকৃত শান্তি লাভ করেন।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “বিহায়”। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ধাতু √হা বা √হি থেকে, যার অর্থ ত্যাগ করা বা পরিত্যাগ করা। এর সঙ্গে “বি” উপসর্গ যুক্ত হয়ে এর অর্থ হয়েছে বিশেষভাবে বা সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করা। এখানে ত্যাগ বলতে বাহ্যিকভাবে কোনো বস্তু ছেড়ে দেওয়া বোঝানো হয়নি, বরং মনের গভীরে যে আসক্তি ও নির্ভরতা তৈরি হয়, সেই বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়াকে বোঝানো হয়েছে। একজন ব্যক্তি সংসারে থেকে দায়িত্ব পালন করেও অন্তরে আসক্তিহীন থাকতে পারেন, গীতার শিক্ষা মূলত সেই অবস্থাকেই নির্দেশ করে।
“কামান্” শব্দটি এসেছে “কাম” শব্দ থেকে। সংস্কৃত ভাষায় কাম অর্থ ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, বাসনা বা কোনো কিছু পাওয়ার প্রবল আকর্ষণ। মানুষের জীবনে কামনা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলেও যখন কামনা মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন তা অশান্তির কারণ হয়ে ওঠে। গীতার দৃষ্টিতে সমস্যা কামনার অস্তিত্বে নয়, সমস্যা হলো কামনার প্রতি মানুষের অতিরিক্ত নির্ভরতা ও আসক্তিতে। যে ব্যক্তি নিজের সুখকে বাইরের বস্তু, সম্মান বা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, সে সর্বদা অস্থিরতার মধ্যে থাকে।
“পুমান্” শব্দের অর্থ মানুষ বা সচেতন ব্যক্তি। এখানে শুধু দেহধারী মানুষকে বোঝানো হয়নি, বরং এমন একজন মানুষকে বোঝানো হয়েছে যিনি নিজের চেতনা সম্পর্কে সচেতন এবং আত্মজ্ঞান লাভের পথে অগ্রসর। “চরতি” শব্দটি এসেছে √চর ধাতু থেকে, যার অর্থ চলা, আচরণ করা বা জীবনযাপন করা। অর্থাৎ শ্লোকে এমন একজন মানুষের কথা বলা হয়েছে যিনি বাহ্যিক জীবনের কর্মকাণ্ডের মধ্যেও অন্তরে স্থির ও মুক্ত থাকেন।
“নিস্পৃহঃ” শব্দটি অত্যন্ত গভীর অর্থ বহন করে। এটি গঠিত হয়েছে “নিঃ” এবং “স্পৃহা” শব্দের সমন্বয়ে। “নিঃ” অর্থ বিহীন বা মুক্ত এবং “স্পৃহা” অর্থ আকাঙ্ক্ষা বা তীব্র বাসনা। তাই নিস্পৃহ অর্থ হলো যিনি অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত। তবে এর অর্থ এই নয় যে তিনি জীবনের প্রতি উদাসীন বা নিষ্ক্রিয়। বরং তিনি কর্ম করেন, কিন্তু কর্মের ফলের প্রতি অন্ধ আসক্তি রাখেন না। তিনি আনন্দ ও দুঃখ উভয় অবস্থাতেই মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন।
এরপর এসেছে “নির্মমঃ” শব্দটি। এটি “নির্” এবং “মম” শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। “মম” অর্থ আমার। নির্মম অর্থ হলো আমার ভাব থেকে মুক্ত হওয়া। সাধারণ মানুষ সবকিছুকে নিজের বলে ভাবতে শুরু করে। আমার সম্পদ, আমার সম্মান, আমার সম্পর্ক, আমার অর্জন এই ধারণাগুলো ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে বন্ধন সৃষ্টি করে। গীতা শিক্ষা দেয় যে মানুষকে নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে, কিন্তু সবকিছুকে চিরস্থায়ী নিজের সম্পত্তি মনে করা উচিত নয়। কারণ জগতের সবকিছুই পরিবর্তনশীল।
“নিরহঙ্কারঃ” শব্দটির অর্থ অহংকারহীন। এটি “নির্” এবং “অহংকার” শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। অহংকার হলো সেই মানসিক ধারণা যেখানে মানুষ নিজেকে পৃথক, শ্রেষ্ঠ বা সবকিছুর কেন্দ্র মনে করে। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে অহংকার হলো আত্মার প্রকৃত স্বরূপকে আচ্ছন্ন করে রাখা এক ধরনের আবরণ। যখন মানুষ বুঝতে পারে যে সে কেবল এই শরীর বা সামাজিক পরিচয় নয়, বরং এক চিরন্তন চেতনার অংশ, তখন অহংকার ধীরে ধীরে বিলীন হতে থাকে।
শ্লোকের শেষ শব্দ হলো “শান্তিমধিগচ্ছতি”। এখানে “শান্তি” শব্দের অর্থ শুধু বাহ্যিক নিরবতা নয়। এটি অন্তরের গভীর স্থিরতা, মানসিক প্রশান্তি এবং আত্মিক পরিতৃপ্তির প্রতীক। “অধিগচ্ছতি” অর্থ লাভ করে বা অর্জন করে। অর্থাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে প্রকৃত শান্তি বাইরে কোথাও পাওয়া যায় না, এটি মানুষের নিজের অন্তরের একটি অবস্থা। যখন কামনা, মমত্ব ও অহংকারের বন্ধন শিথিল হয়, তখন মানুষের অন্তরে স্বাভাবিকভাবেই শান্তির প্রকাশ ঘটে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানবজীবনের মুক্তির পথ নির্দেশ করে। অদ্বৈত দর্শনের মতে, মানুষের প্রকৃত স্বরূপ হলো আত্মা, যা চিরস্থায়ী ও শান্ত। কিন্তু কামনা ও অহংকারের কারণে মানুষ নিজের প্রকৃত পরিচয় ভুলে যায়। সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতে, ব্যক্তি যখন প্রকৃতির পরিবর্তনশীল গুণ থেকে নিজেকে পৃথকভাবে উপলব্ধি করতে পারে, তখন সে মুক্তির পথে অগ্রসর হয়। বৌদ্ধ দর্শনের সঙ্গেও এই শিক্ষার মিল পাওয়া যায়, কারণ বৌদ্ধ দর্শনেও তৃষ্ণা বা অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষাকে দুঃখের মূল কারণ বলা হয়েছে।
প্রতীকী অর্থে কামনা হলো এমন এক আগুন যা যত বেশি পূরণ করা হয়, তত বেশি বৃদ্ধি পায়। মমত্ব হলো এমন এক বন্ধন যা মানুষকে সীমাবদ্ধ করে রাখে। অহংকার হলো এমন এক পর্দা যা সত্য উপলব্ধির পথে বাধা সৃষ্টি করে। আর শান্তি হলো সেই আলো যা সমস্ত অস্থিরতা দূর করে। যেমন একটি শান্ত হ্রদের জলে আকাশের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, তেমনি শান্ত মনেই আত্মার প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করা যায়।
বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন ব্যক্তি যদি সর্বদা ধন, ক্ষমতা, প্রশংসা বা বাহ্যিক সাফল্যের পেছনে ছুটতে থাকেন, তাহলে তার মন কখনো স্থির হতে পারে না। কিন্তু যিনি নিজের কর্তব্য করেন, পরিশ্রম করেন, অথচ ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হন না, তিনি জীবনে গভীর শান্তি অনুভব করেন। ইতিহাসে বহু সাধক ও জ্ঞানী ব্যক্তি এই নীতির মাধ্যমে অন্তরের স্বাধীনতা অর্জন করেছেন।
এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত সুখ বাহ্যিক অর্জনের মধ্যে নয়, বরং নিজের অন্তরের অবস্থার মধ্যে নিহিত। কামনা, মমত্ব ও অহংকার মানুষের মনকে অশান্ত করে, আর ত্যাগ, নিস্পৃহতা ও আত্মজ্ঞান মানুষকে শান্তির পথে নিয়ে যায়। যে ব্যক্তি “আমি” এবং “আমার” এর সংকীর্ণ সীমা অতিক্রম করে আত্মার বিশুদ্ধ অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, সে জীবনের সর্বোচ্চ শান্তি লাভ করে। এই কারণেই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোক মানবজীবনের জন্য এক চিরন্তন সত্যের শিক্ষা বহন করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!