শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২.৭২ | ব্রাহ্মী স্থিতি ও ব্রহ্মনির্বাণের চূড়ান্ত শিক্ষা
ব্রাক্ষী স্থিতিঃ পার্থ নৈনাং প্রাপ্য বিমুহ্যতি।
স্থিত্বাস্যামন্তকালেহপি ব্রক্ষনির্বাণমৃচ্ছতি।।৭২।।
অনুবাদঃ এই প্রকার স্থিতিকেই ব্রাক্ষীস্থিতি বলে। হে পার্থ! যিনি এই স্থিতি লাভ করেন, তিনি মোহপ্রাপ্ত হন না। জীবনের অন্তিম সময়ে এই স্থিতি লাভ করে, তিনি এই জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবৎ-ধামে প্রবেশ করেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের শেষ শ্লোকটি মানব জীবনের আধ্যাত্মিক উন্নতির এক চূড়ান্ত অবস্থার বর্ণনা করে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “এষা ব্রাহ্মী স্থিতিঃ পার্থ নৈনাং প্রাপ্য বিমুহ্যতি। স্থিত্বাস্যামন্তকালেঽপি ব্রহ্মনির্বাণমৃচ্ছতি।” অর্থাৎ হে পার্থ, এটাই সেই ব্রহ্মময় স্থিতি, এই অবস্থায় পৌঁছালে মানুষ আর মোহগ্রস্ত হয় না। এই অবস্থায় স্থির থেকে জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও সে ব্রহ্মনির্বাণ লাভ করে। এই শ্লোকের মধ্যে শুধু একটি ধর্মীয় শিক্ষা নয়, বরং মানুষের চেতনা, মন, আত্মজ্ঞান ও মুক্তির এক গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে।
ব্রাহ্মী শব্দটি এসেছে ব্রহ্ম শব্দ থেকে। সংস্কৃত ভাষায় ব্রহ্ম শব্দের মূল ধাতু হল বৃহ্, যার অর্থ বিস্তৃত হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া বা সর্বব্যাপী হওয়া। ব্রহ্ম বলতে বোঝানো হয় সেই পরম সত্য, যা সীমাহীন, চিরন্তন এবং সমস্ত অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। ব্রাহ্মী অর্থ হল ব্রহ্ম সম্পর্কিত বা ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত। স্থিতি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত স্থা ধাতু থেকে, যার অর্থ দাঁড়িয়ে থাকা, অবস্থান করা বা স্থির থাকা। তাই ব্রাহ্মী স্থিতির আক্ষরিক অর্থ হল ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত বা ব্রহ্মের উপলব্ধিতে স্থির থাকা।
মানুষ সাধারণত ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণ, কামনা, ভয়, আশা, হতাশা এবং অহংকারের দ্বারা পরিচালিত হয়। এই মানসিক অবস্থাকে গীতায় মোহ বলা হয়েছে। মোহ মানুষের বিচারশক্তিকে আচ্ছন্ন করে এবং তাকে প্রকৃত সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু যে ব্যক্তি আত্মজ্ঞান লাভ করে এবং নিজের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করে, তার চেতনা আর বাইরের পরিবর্তনশীল জগতের দ্বারা সহজে বিচলিত হয় না। এই স্থির ও নির্মল চেতনার অবস্থাই হল ব্রাহ্মী স্থিতি।
এই অবস্থায় পৌঁছানো মানে সংসার থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং সংসারের মধ্যেই থেকে অন্তরের স্বাধীনতা অর্জন করা। একজন ব্যক্তি কাজ করেন, দায়িত্ব পালন করেন, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন, কিন্তু তার অন্তর আর অতিরিক্ত আসক্তি বা অহংকারের দ্বারা আবদ্ধ থাকে না। তিনি কর্ম করেন, কিন্তু কর্মের ফলের প্রতি অন্ধ আকাঙ্ক্ষা রাখেন না। এই শিক্ষা গীতার কর্মযোগের মূল ভিত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।
ব্রাহ্মী স্থিতির গভীর অর্থ হল নিজের প্রকৃত পরিচয় উপলব্ধি করা। মানুষ সাধারণত নিজেকে শরীর, নাম, পরিচয়, সম্পদ বা সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। কিন্তু গীতা শিক্ষা দেয় যে মানুষের প্রকৃত সত্তা হল আত্মা, যা চিরন্তন এবং পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে। যখন মানুষ এই আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করে, তখন তার মধ্যে এক গভীর শান্তি ও স্থিরতা জন্মায়। তখন বাহ্যিক সুখ দুঃখ তাকে আগের মতো প্রভাবিত করতে পারে না।
দার্শনিক দৃষ্টিতে ব্রাহ্মী স্থিতি বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অদ্বৈত বেদান্তের মতে, এটি সেই অবস্থা যেখানে ব্যক্তি উপলব্ধি করে যে আত্মা ও ব্রহ্ম এক। এখানে ব্যক্তিগত অহংকার বিলীন হয়ে যায় এবং মানুষ সর্বব্যাপী চেতনার সঙ্গে নিজের ঐক্য অনুভব করে। যোগ দর্শনের মতে, এটি হল এমন একটি অবস্থা যেখানে চিত্তের সমস্ত অস্থিরতা দূর হয়ে পুরুষ বা আত্মার প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশিত হয়। সাংখ্য দর্শনের দৃষ্টিতে এটি হল প্রকৃতির পরিবর্তনশীলতা থেকে নিজেকে পৃথক করে চৈতন্যের উপলব্ধি করা।
ব্রহ্মনির্বাণ শব্দটির মধ্যেও গভীর অর্থ রয়েছে। ব্রহ্ম অর্থ পরম সত্য এবং নির্বাণ অর্থ সমস্ত বন্ধন, অশান্তি ও সীমাবদ্ধতার অবসান। তাই ব্রহ্মনির্বাণ হল সেই চূড়ান্ত শান্তির অবস্থা যেখানে ব্যক্তি পরম সত্যের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করে। এটি কোনো শূন্যতা নয়, বরং পরিপূর্ণ চেতনা ও আনন্দের উপলব্ধি।
প্রতীকী দৃষ্টিতে ব্রাহ্মী স্থিতি হল অন্ধকারের মধ্যে আলোর মতো। যেমন একটি প্রদীপ বাতাসহীন স্থানে স্থিরভাবে জ্বলে, তেমনই জ্ঞানী ব্যক্তির মন বাহ্যিক ঝড়ের মধ্যেও স্থির থাকে। জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতি তাকে বিচলিত করতে পারে না, কারণ তার শান্তির উৎস বাইরের জগতে নয়, নিজের অন্তরের গভীরে প্রতিষ্ঠিত থাকে।
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এই ধারণার সঙ্গে গভীর মিল পাওয়া যায়। একজন মানুষ যখন নিজের আবেগ, চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষাকে সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে এবং অন্তরের ভারসাম্য অর্জন করে, তখন সে এক ধরনের উচ্চতর মানসিক স্থিতি লাভ করে। আধুনিক ভাষায় এটিকে গভীর আত্মসচেতনতা, মানসিক স্থিতিশীলতা ও অন্তর্গত শান্তির সঙ্গে তুলনা করা যায়।
বাস্তব জীবনে এর উদাহরণ দেখা যায় এমন মানুষের মধ্যে যারা কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য হারান না। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি যেমন প্রশংসায় অতিরিক্ত উল্লসিত হন না এবং নিন্দায় ভেঙে পড়েন না, কারণ তার মন বাহ্যিক প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়। যেমন সমুদ্রের উপরের অংশে ঢেউ থাকলেও গভীরে থাকে গভীর শান্তি, তেমনি ব্রাহ্মী স্থিতিতে প্রতিষ্ঠিত মানুষের অন্তর থাকে প্রশান্ত ও স্থির।
এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হল মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য কেবল বাহ্যিক সাফল্য অর্জন নয়, বরং নিজের অন্তরের সত্যকে উপলব্ধি করা। ব্রাহ্মী স্থিতি হল সেই চেতনার অবস্থা যেখানে মানুষ মোহ, ভয়, আসক্তি ও অহংকার অতিক্রম করে নিজের প্রকৃত স্বরূপকে জানতে পারে। এই অবস্থায় পৌঁছালে জীবনের পরিবর্তন তাকে আর অস্থির করতে পারে না এবং মৃত্যুর শেষ মুহূর্তেও সে পরম শান্তি বা ব্রহ্মনির্বাণ লাভ করে।
অতএব, “এষা ব্রাহ্মী স্থিতিঃ” শুধু একটি আধ্যাত্মিক ধারণা নয়, এটি মানুষের চেতনার সর্বোচ্চ বিকাশের প্রতীক। এটি শেখায় যে প্রকৃত মুক্তি বাহ্যিক জগতের পরিবর্তনে নয়, বরং নিজের অন্তরের জ্ঞান ও স্থিরতার মধ্যে নিহিত। যে ব্যক্তি নিজের আত্মাকে উপলব্ধি করে, সে জীবনের সকল দ্বন্দ্ব অতিক্রম করে চিরন্তন শান্তির পথে অগ্রসর হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!