ভগবদ্গীতা তৃতীয় অধ্যায়, ১৩তম শ্লোকের ব্যাখ্যা | যজ্ঞশিষ্ট, কৃতজ্ঞতা ও পাপমুক্ত জীবনের শিক্ষা
যজ্ঞশিষ্টাশিনঃ সন্তো মুচ্যন্তে সর্বকিল্বিষৈঃ।
ভুঞ্জতে তে ত্বঘং পাপা যে পচন্ত্যাত্মকারণাৎ।।১৩।।
অনুবাদঃ ভগবদ্ভক্তেরা সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হন, কারণ তাঁরা যজ্ঞাবশিষ্ট অন্নাদি গ্রহণ করেন। যারা কেবল স্বার্থপর হয়ে নিজেদের ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তির জন্য অন্নাদি পাক করে, তারা কেবল পাপই ভোজন করে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোকটি মানবজীবনের নৈতিকতা কর্তব্যবোধ ত্যাগ কৃতজ্ঞতা এবং ঈশ্বরচেতনার এক অনন্য শিক্ষা বহন করে। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের ভোগ এবং কর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন যে যাঁরা যজ্ঞের অবশিষ্ট ভোজন করেন তাঁরা সকল প্রকার পাপ থেকে মুক্ত হন। কিন্তু যারা কেবল নিজের জন্য রান্না করে এবং নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই জীবনযাপন করে তারা প্রকৃতপক্ষে পাপই ভক্ষণ করে। এই শিক্ষা কেবল ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং সমগ্র মানবসভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকে স্পর্শ করে।
যজ্ঞশিষ্টাশিনঃ শব্দটি সংস্কৃত ভাষার একটি গভীর অর্থবহ যৌগিক শব্দ। এটি যজ্ঞ শিষ্ট এবং আশিনঃ এই তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। যজ্ঞ শব্দটি যজ্ ধাতু থেকে উৎপন্ন যার অর্থ পূজা করা উৎসর্গ করা সম্মিলিত কল্যাণের জন্য কর্ম করা অথবা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা। শিষ্ট শব্দটি শিষ্ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ অবশিষ্ট থাকা বা বাকি থাকা। আশিনঃ শব্দটি অশ্ ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ ভোজন করা বা গ্রহণ করা। এই তিনটি অংশ একত্রে যজ্ঞশিষ্টাশিনঃ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় যিনি যজ্ঞের পর অবশিষ্ট অংশ গ্রহণ করেন। ভাষাগতভাবে এটি যজ্ঞাবশিষ্ট ভোজনকারীকে বোঝালেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ অনেক বিস্তৃত। এটি এমন ব্যক্তিকে নির্দেশ করে যিনি জীবনের প্রতিটি প্রাপ্তিকে ঈশ্বরের দান এবং সমাজের সম্মিলিত অবদানের ফল হিসেবে গ্রহণ করেন।
শব্দটির গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি একটি তৎপুরুষ সমাস। যজ্ঞের অবশিষ্ট অংশকে যজ্ঞশিষ্ট বলা হয়েছে এবং যিনি সেই অবশিষ্ট গ্রহণ করেন তিনি যজ্ঞশিষ্টাশিনঃ। এখানে ভোজন কেবল খাদ্য গ্রহণের প্রতীক নয় বরং জীবনের সমস্ত সুযোগ সম্পদ জ্ঞান ক্ষমতা এবং সুখ উপভোগের প্রতীক। অর্থাৎ মানুষ যখন নিজের প্রাপ্তিকে কেবল নিজের পরিশ্রমের ফল না ভেবে ঈশ্বর প্রকৃতি সমাজ এবং অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত অবদানের ফল হিসেবে গ্রহণ করে তখন সেই গ্রহণই যজ্ঞশিষ্ট ভোজন হয়ে ওঠে।
বাংলা ভাষায় যজ্ঞশিষ্টাশিনঃ শব্দের অর্থ যজ্ঞাবশিষ্ট ভোজনকারী ঈশ্বরকে নিবেদন করা অন্ন গ্রহণকারী অথবা নিঃস্বার্থ কর্মের ফল ভোগকারী। তবে এর গভীর অর্থ হলো এমন ব্যক্তি যিনি নিজের অর্জনের পূর্বে কর্তব্য পালন করেন ত্যাগ স্বীকার করেন এবং অন্যের কল্যাণে অবদান রাখেন। তাঁর কাছে ভোগ কোনো ব্যক্তিগত অধিকার নয় বরং একটি পবিত্র দায়িত্বের অংশ। তিনি জানেন যে জীবনের প্রতিটি প্রাপ্তির সঙ্গে অসংখ্য মানুষের শ্রম প্রকৃতির দান এবং ঈশ্বরের কৃপা জড়িয়ে রয়েছে।
আক্ষরিক অর্থে এই শ্লোক বলছে যজ্ঞের পরে যে অবশিষ্ট থাকে তা যারা গ্রহণ করে তারা পাপমুক্ত হয়। কিন্তু কর্মযোগের আলোকে যজ্ঞ কেবল অগ্নিতে আহুতি দেওয়ার অনুষ্ঠান নয়। এখানে যজ্ঞ বলতে বোঝানো হয়েছে কর্তব্য পালন ত্যাগ সহযোগিতা সমাজসেবা এবং ঈশ্বরকে উদ্দেশ্য করে সম্পাদিত সকল নিঃস্বার্থ কর্ম। তাই যজ্ঞশিষ্ট বলতে বোঝায় সেই কর্মফল যা স্বার্থহীনভাবে কর্তব্য সম্পন্ন করার পরে আসে। এমন ফল গ্রহণ করলে মানুষ কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হয় না কারণ সেখানে অহংকার এবং মালিকানার বোধ থাকে না।
প্রাসঙ্গিক ব্যবহারে এই শিক্ষার ব্যাপ্তি অত্যন্ত বিস্তৃত। ধর্মীয় জীবনে আমরা যখন ঈশ্বরকে নিবেদন করা প্রসাদ গ্রহণ করি তখন সেটি যজ্ঞশিষ্ট। সামাজিক জীবনে একজন কৃষক যদি মনে করেন তাঁর উৎপাদিত খাদ্য কেবল তাঁর নিজের জন্য নয় বরং সমগ্র সমাজের কল্যাণের জন্য তখন তাঁর ভোগও যজ্ঞশিষ্ট ভোগে পরিণত হয়। একইভাবে একজন শিক্ষক যখন নিঃস্বার্থভাবে জ্ঞান বিতরণ করেন এবং পরে সমাজের সম্মান লাভ করেন তখন সেই সম্মানও যজ্ঞশিষ্টের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ আগে কর্তব্য পরে প্রাপ্তি এই নীতিই যজ্ঞশিষ্টের মূল শিক্ষা।
এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য হলো মানুষ কখনোই একা নয়। একটি অন্নের দানার মধ্যেও সূর্যের আলো মাটির উর্বরতা বৃষ্টির জল কৃষকের শ্রম পরিবহনকারীর প্রচেষ্টা এবং অসংখ্য মানুষের অবদান লুকিয়ে থাকে। তাই কোনো মানুষই বলতে পারে না যে তার প্রাপ্তি সম্পূর্ণরূপে তার নিজের। এই উপলব্ধি মানুষের অহংকার দূর করে এবং তার মধ্যে কৃতজ্ঞতা বিনয় এবং সহমর্মিতার জন্ম দেয়। যে ব্যক্তি নিজের ভোগের পূর্বে অন্যের অধিকারকে স্বীকার করে সে প্রকৃত অর্থে যজ্ঞশিষ্টাশিনঃ। আর যে ব্যক্তি কেবল নিজের জন্য সঞ্চয় করে নিজের জন্য উৎপাদন করে এবং নিজের জন্যই ভোগ করে সে এই মহাজাগতিক বিনিময় ব্যবস্থাকে অস্বীকার করে।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক কর্মযোগের অন্যতম ভিত্তি। বেদান্ত দর্শন বলে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে প্রকৃত মালিক একমাত্র পরমাত্মা। মানুষ কেবল একজন অস্থায়ী ব্যবহারকারী। তাই সবকিছু ঈশ্বরকে নিবেদন করে গ্রহণ করাই প্রকৃত জ্ঞান। কর্মযোগ শিক্ষা দেয় যে কর্ম করো কিন্তু কর্মফলকে নিজের সম্পত্তি মনে করো না। যখন কর্মফলের প্রতি মালিকানার বোধ বিলীন হয় তখন কর্ম আর বন্ধনের কারণ হয় না বরং মুক্তির পথ হয়ে ওঠে। নৈতিক দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের কাছে একটি প্রশ্ন রাখে। আমি যা গ্রহণ করছি তার আগে আমি কী দিয়েছি। যদি মানুষ কেবল গ্রহণই করে এবং কোনো প্রতিদান না দেয় তবে সে সমাজ এবং প্রকৃতির কাছে ঋণী হয়ে থাকে। এই ঋণই পাপের প্রতীক।
প্রতীকী অর্থে যজ্ঞ হলো আত্মত্যাগ সহযোগিতা এবং মহাজাগতিক সামঞ্জস্যের প্রতীক। শিষ্ট হলো বিনয় এবং কৃতজ্ঞতার প্রতীক। ভোজন হলো জীবনের দান গ্রহণের প্রতীক। অন্যদিকে আত্মকারণাত্ শব্দটি আত্মকেন্দ্রিকতা স্বার্থপরতা এবং বিচ্ছিন্নতার প্রতীক। পাপ ভক্ষণ করার অর্থ কেবল ধর্মীয় অপরাধ নয় বরং এমন মানসিক অবস্থা যেখানে মানুষ লোভ অশান্তি অপরাধবোধ এবং একাকীত্বে ভোগে। যজ্ঞশিষ্টাশিনঃ ব্যক্তি অন্তরে শান্ত কারণ তিনি জানেন যে তাঁর জীবন দানের ধারায় যুক্ত। কিন্তু আত্মকারণাত্ পচন্তি ব্যক্তি কখনোই প্রকৃত শান্তি লাভ করতে পারে না কারণ তার সমস্ত কর্ম কেবল নিজের চারপাশেই আবর্তিত হয়।
বাস্তব জীবনের অসংখ্য উদাহরণ এই শ্লোকের সত্যকে প্রমাণ করে। একটি গাছ নিজের জন্য ফল উৎপন্ন করে না বরং অন্যকে দেয়। প্রকৃতি নিজেই এক অনন্ত যজ্ঞ যেখানে প্রত্যেকে অন্যের জন্য কাজ করে। একজন মা প্রথমে সন্তানকে খাওয়ান পরে নিজে আহার করেন। একজন সৎ শিক্ষক নিজের জ্ঞান বিতরণ করে সমাজকে সমৃদ্ধ করেন। একজন প্রকৃত সমাজসেবক নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করেন। তাঁদের জীবনের প্রতিটি প্রাপ্তিই যজ্ঞশিষ্ট কারণ তা নিঃস্বার্থ কর্তব্যের পর অর্জিত হয়েছে।
শ্লোকে ব্যবহৃত সর্ব্বকিল্বিষৈঃ শব্দটির অর্থ সকল প্রকার পাপ কলুষতা এবং অন্তরের অশুদ্ধি। অর্থাৎ যিনি যজ্ঞশিষ্ট জীবনযাপন করেন তাঁর অন্তর ধীরে ধীরে লোভ অহংকার ঈর্ষা এবং স্বার্থপরতা থেকে মুক্ত হয়। অন্যদিকে অঘং শব্দের অর্থ অমঙ্গল পাপ এবং দুঃখের বীজ। তাই যারা কেবল নিজের জন্যই জীবনযাপন করে তারা বাহ্যিকভাবে সুস্বাদু খাদ্য ভক্ষণ করলেও প্রকৃতপক্ষে নিজেদের অমঙ্গলকেই লালন করে।
এই শ্লোকের সারমর্ম হলো মানুষের জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য ভোগে নয় বরং ত্যাগে। ভাষাগতভাবে যজ্ঞশিষ্টাশিনঃ অর্থ যজ্ঞের অবশিষ্ট ভোজনকারী হলেও দার্শনিকভাবে এটি এমন এক জীবনদর্শনের প্রতীক যেখানে মানুষ নিজের প্রতিটি কর্মকে ঈশ্বর সমাজ এবং মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে। প্রতীকীভাবে যজ্ঞ হলো দান শিষ্ট হলো কৃতজ্ঞতা এবং ভোজন হলো বিনয়ের সঙ্গে জীবনের উপহার গ্রহণ। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃত সুখ কেবল গ্রহণে নয় বরং দেওয়ার মধ্যেই নিহিত। যে মানুষ আগে কর্তব্য পালন করে পরে প্রাপ্তিকে গ্রহণ করে সে পবিত্রতা শান্তি এবং মুক্তির পথে অগ্রসর হয়। আর যে কেবল নিজের জন্য বাঁচে সে বাহ্যিক ভোগের মধ্যেও অন্তরের অশান্তি এবং বন্ধন থেকে কখনো মুক্ত হতে পারে না। এই কারণেই শ্লোকটি মানবজীবনের জন্য এক চিরন্তন নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক আদর্শ হিসেবে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!